ভগবদ্গীতা তৃতীয় অধ্যায়, ১৬তম শ্লোকের ব্যাখ্যা | বিশ্বচক্র, কর্তব্য ও মানবজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য
এবং প্রবর্তিতং চক্রং নানুবর্তয়তীহ যঃ।
অঘায়ুরিন্দ্রিয়ারামো মোঘং পার্থ স জীবতি।।১৬।।
অনুবাদঃ হে অর্জুন! যে ব্যক্তি এই জীবনে বেদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যজ্ঞ অনুষ্ঠানের পন্থা অনুসরণ করে না, সেই ইন্দ্রিয়সুখ-পরায়ণ পাপী ব্যক্তি বৃথা জীবন ধারণ করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের ষোড়শ শ্লোক কর্মযোগের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা তুলে ধরে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানবজীবনের এমন একটি সর্বজনীন নীতির কথা বলেছেন যা ব্যক্তি সমাজ প্রকৃতি এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের পারস্পরিক সম্পর্ককে এক অবিচ্ছিন্ন ধারায় যুক্ত করে। শ্লোকে ব্যবহৃত প্রবর্তিতং চক্রং শব্দযুগল কেবল একটি আবর্তনশীল চাকার ধারণা প্রকাশ করে না বরং ঈশ্বর প্রতিষ্ঠিত সেই চিরন্তন কর্মব্যবস্থাকে নির্দেশ করে যার মাধ্যমে সৃষ্টি পুষ্টি দায়িত্ব এবং কল্যাণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই বিশ্বচক্র অনুসরণ না করে যে ব্যক্তি কেবল নিজের ইন্দ্রিয়সুখে নিমগ্ন থাকে তার জীবনকে ভগবান নিষ্ফল ও পাপময় বলে ঘোষণা করেছেন।
প্রবর্তিতং শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত প্র উপসর্গ এবং বৃত্ ধাতু থেকে। বৃত্ ধাতুর অর্থ ঘোরা চলা বা আবর্তিত হওয়া এবং প্র উপসর্গ যুক্ত হলে তার অর্থ দাঁড়ায় বিশেষভাবে চালু করা বা অগ্রসর করা। এই ধাতুর সঙ্গে কৃত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে প্রবর্তিতং শব্দের সৃষ্টি হয়েছে যার অর্থ প্রতিষ্ঠিত সচল করা বা কার্যকর করে তোলা। অন্যদিকে চক্রং শব্দটি চর্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত যার অর্থ চলা বা গমন করা। এই শব্দের আদি অর্থ চাকা হলেও বৈদিক ও দার্শনিক সাহিত্যে এটি সময়ের প্রবাহ কর্মের ধারাবাহিকতা প্রকৃতির নিয়ম এবং বিশ্বব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে প্রবর্তিতং চক্রং বলতে বোঝায় সেই বিশ্বব্যবস্থা যা ঈশ্বর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান।
শ্লোকে ব্যবহৃত নানুবর্ত্তয়তি শব্দটি অনুসরণ না করা বা মেনে না চলার অর্থ প্রকাশ করে। অঘায়ুঃ শব্দটি অঘ অর্থাৎ পাপ এবং আয়ুঃ অর্থাৎ জীবন এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। এর অর্থ এমন ব্যক্তি যার জীবন পাপময় কর্মে ব্যয়িত হয়। ইন্দ্রিয়ারামো শব্দটি ইন্দ্রিয় এবং আরাম এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে এমন মানুষ যে কেবল ইন্দ্রিয়ভোগেই আনন্দ খুঁজে বেড়ায়। মোঘং শব্দের অর্থ বৃথা নিষ্ফল অথবা অর্থহীন। এই শব্দগুলোর সমন্বয়ে শ্লোকটি এমন এক গভীর সত্য প্রকাশ করে যেখানে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি ঈশ্বর প্রতিষ্ঠিত কর্মচক্রকে অস্বীকার করে কেবল নিজের ভোগলালসাকে জীবনের উদ্দেশ্য বানায় তার জীবন প্রকৃত অর্থে সফল হয় না।
বাংলা অর্থে শ্লোকটির বক্তব্য হলো এই যে হে পার্থ এইভাবে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বচক্রকে যে ব্যক্তি অনুসরণ করে না এবং কেবল ইন্দ্রিয়সুখেই মগ্ন থাকে সে পাপময় জীবনযাপন করে এবং তার জীবন বৃথা হয়ে যায়। এখানে জীবনকে কেবল অস্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়নি বরং তা অর্থবহ কর্তব্যনিষ্ঠ এবং সমাজকল্যাণমূলক হওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আক্ষরিক অর্থে প্রবর্তিতং চক্রং বলতে বোঝায় চালু করা বা সচল করা একটি চক্র। কিন্তু গীতার ভাষায় এই চক্র কোনো যান্ত্রিক চাকা নয় বরং সৃষ্টি থেকে জীবন জীবন থেকে কর্ম কর্ম থেকে যজ্ঞ যজ্ঞ থেকে বৃষ্টি বৃষ্টি থেকে খাদ্য এবং খাদ্য থেকে জীবনের ধারাবাহিক প্রবাহকে বোঝায়। এটি এমন একটি পরস্পর নির্ভরশীল ব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেকটি উপাদান অন্যটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই চক্রের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সমগ্র ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
প্রাসঙ্গিক অর্থে এই শ্লোক মানুষের সামাজিক নৈতিক এবং পরিবেশগত দায়িত্বের শিক্ষা দেয়। মানুষ কেবল প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করবে না বরং সমাজ ও প্রকৃতির প্রতি নিজের কর্তব্যও পালন করবে। একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন একজন শিক্ষক জ্ঞান প্রদান করেন একজন চিকিৎসক মানুষের জীবন রক্ষা করেন আবার একজন শ্রমিক সমাজের উন্নয়নের জন্য পরিশ্রম করেন। প্রত্যেকেই এই বিশ্বচক্রের অংশ। যদি সবাই কেবল গ্রহণ করতে চায় কিন্তু ফিরিয়ে দিতে না চায় তবে সমাজ ও সভ্যতার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। এই কারণেই গীতা মানুষকে ভোগের পরিবর্তে কর্তব্য এবং অবদানের জীবন বেছে নিতে আহ্বান জানায়।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষ কখনোই সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নয়। প্রত্যেক মানুষ প্রকৃতির কাছে সমাজের কাছে পরিবার ও পূর্বপুরুষের কাছে এবং সর্বোপরি ঈশ্বরের কাছে ঋণী। সেই ঋণ পরিশোধের উপায় হলো কর্তব্য পালন সৎকর্ম সম্পাদন এবং নিঃস্বার্থভাবে অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করা। যে ব্যক্তি কেবল নিজের সুখ এবং স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে সে ধীরে ধীরে নিজের মানবিকতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের কর্মকে বৃহত্তর কল্যাণের অংশ হিসেবে দেখে তার জীবন অর্থবহ হয়ে ওঠে এবং সে বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের তাৎপর্য অত্যন্ত বিস্তৃত। বেদান্ত দর্শনের মতে এই চক্র মায়াময় জগতের কর্মধারা যেখানে মানুষ কর্মের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে এবং শেষে ঈশ্বরসাক্ষাৎ লাভের পথে অগ্রসর হয়। সাংখ্য দর্শনে এটি প্রকৃতির তিন গুণের অবিরাম ক্রিয়ার প্রতিফলন। কর্মদর্শনের আলোকে প্রতিটি কর্ম একটি নতুন ফল সৃষ্টি করে এবং সেই ফল আবার নতুন কর্মের জন্ম দেয়। এই অবিরাম ধারাই কর্মচক্র। আধুনিক অস্তিত্ববাদী ব্যাখ্যায়ও বলা হয় মানুষের জীবনের প্রকৃত অর্থ কেবল ভোগে নয় বরং দায়িত্ব গ্রহণ সৃষ্টিশীলতা এবং অন্যের কল্যাণে নিজের অবদান রাখার মধ্যেই নিহিত।
প্রতীকী অর্থে চক্র সময়ের অবিরাম গতি প্রকৃতির নিয়ম কর্মফল এবং মহাজাগতিক শৃঙ্খলার প্রতীক। এটি মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে কিছুই স্থির নয়। প্রতিটি ঘটনা একটি বৃহত্তর ধারার অংশ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই চক্র মানুষের চিন্তা অভ্যাস আচরণ এবং তার ফলাফলের পুনরাবৃত্তিকে নির্দেশ করে। আধ্যাত্মিক অর্থে এটি ঈশ্বরের বিধান এবং বিশ্বশৃঙ্খলার প্রতীক যেখানে প্রত্যেক জীবের একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। সেই ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করাই ধর্ম।
বাস্তব জীবনের একটি সহজ উদাহরণ হলো নদীর জলচক্র। সমুদ্রের জল বাষ্প হয়ে মেঘে পরিণত হয় মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়ে নদীতে ফিরে আসে এবং আবার সমুদ্রে মিশে যায়। এই চক্রের কোনো একটি ধাপ বন্ধ হয়ে গেলে সমগ্র প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়। মানবসমাজেও একই নীতি প্রযোজ্য। যদি মানুষ কেবল নিজের জন্য সম্পদ সঞ্চয় করে কিন্তু সমাজের কল্যাণে কিছুই না করে তবে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। আবার মানবদেহের রক্তসঞ্চালনও একটি চক্র। হৃদয় থেকে রক্ত বেরিয়ে আবার হৃদয়ে ফিরে আসে। যদি এই প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় তবে জীবনও থেমে যায়। ঠিক তেমনি গ্রহণ এবং দানের সমন্বয়ই মানবজীবনের প্রকৃত ভিত্তি।
সারসংক্ষেপে বলা যায় প্রবর্তিতং চক্রং শব্দযুগল শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এক অনন্য জীবনদর্শনের প্রতীক। ভাষাগতভাবে এটি প্রতিষ্ঠিত এবং সচল বিশ্বব্যবস্থাকে নির্দেশ করে। দার্শনিকভাবে এটি কর্ম প্রকৃতি সময় এবং দায়িত্বের চিরন্তন নিয়মকে প্রকাশ করে। প্রতীকীভাবে এটি জীবন ও সৃষ্টির অবিরাম প্রবাহের চিহ্ন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই শ্লোকে শিক্ষা দিয়েছেন যে মানুষ যদি এই বিশ্বচক্রের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখে কর্তব্য পালন করে তবে তার জীবন অর্থবহ ও কল্যাণময় হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল ইন্দ্রিয়সুখে নিমগ্ন থেকে এই মহাজাগতিক নিয়মকে অস্বীকার করে তার জীবন বাহ্যিকভাবে যত সমৃদ্ধই হোক না কেন প্রকৃত অর্থে তা নিষ্ফল এবং উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। এই কারণেই প্রবর্তিতং চক্রং কেবল একটি শব্দ নয় বরং মানবজীবনের দায়িত্ব সচেতনতা সামঞ্জস্য এবং পরম সত্যের এক চিরন্তন প্রতীক।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!