শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.১৯ | আসক্তিহীন কর্ম ও কর্মযোগের মহাশিক্ষা
তস্মাদসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচর।
অসক্তো হ্যাচরন্ কর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ।।১৯।।
অনুবাদঃ অতএব, কর্মফলের প্রতি আসক্তি রহিত হয়ে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন কর। অনাসক্ত হয়ে কর্ম করার ফলেই মানুষ পরতত্ত্বকে লাভ করতে পারে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের উনিশ নম্বর শ্লোক কর্মযোগের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা প্রদান করে। শ্লোকটি হলো তস্মাদসক্তঃ সততং কার্য্যং কর্ম্ম সমাচর। অসক্তো হ্যাচরন্ কর্ম্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে মানুষ কখনোই কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। বরং কর্তব্যকর্ম যথাযথভাবে সম্পাদন করাই মানবজীবনের প্রকৃত ধর্ম। তবে সেই কর্ম হতে হবে আসক্তিহীন। অর্থাৎ কর্মের ফলের প্রতি আকাঙ্ক্ষা, অহংকার কিংবা ব্যক্তিগত লাভের চিন্তা পরিত্যাগ করে কেবল কর্তব্যবোধ থেকে কর্ম সম্পাদন করাই প্রকৃত কর্মযোগের পথ। এই শিক্ষা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের জন্য নয় বরং প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
এই শ্লোকের প্রথম শব্দ তস্মাদ শব্দটি সংস্কৃত তদ্ সর্বনামের পঞ্চমী বিভক্তি রূপ, যার অর্থ অতএব, সুতরাং অথবা সেই কারণে। এটি একটি সিদ্ধান্তসূচক শব্দ যা পূর্ববর্তী আলোচনার যৌক্তিক উপসংহার প্রকাশ করে। পূর্ববর্তী শ্লোকগুলোতে শ্রীকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেছেন যে কর্ম এড়িয়ে গেলে মুক্তি আসে না এবং কর্ম ত্যাগ করাও সমাধান নয়। সেই কারণেই এখানে তস্মাদ শব্দের মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে অর্জুনকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে কর্তব্যকর্ম পালন করাই উচিত।
অসক্তঃ শব্দটি গঠিত হয়েছে অ এবং সক্ত এই দুই অংশ থেকে। অ উপসর্গের অর্থ নয় বা অভাব এবং সক্ত শব্দটি এসেছে সঞ্জ্ ধাতু থেকে যার অর্থ যুক্ত হওয়া, লেগে থাকা বা আসক্ত হওয়া। ফলে অসক্ত অর্থ দাঁড়ায় যিনি কোনো কিছুর সঙ্গে লিপ্ত নন, বিশেষ করে কর্মের ফল, ভোগ, প্রশংসা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে যাঁর মন জড়িয়ে নেই। এখানে অনাসক্তি মানে দায়িত্বহীনতা নয় কিংবা কর্মবিমুখতাও নয়। বরং এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে কিন্তু নিজের অহংকার বা ফললাভের আকাঙ্ক্ষাকে সেই কর্মের কেন্দ্রস্থলে স্থান দেয় না।
সততং শব্দের অর্থ সর্বদা, নিরন্তর কিংবা অবিরাম। এটি নির্দেশ করে যে অনাসক্তি কোনো সাময়িক মানসিক অবস্থা নয় বরং জীবনব্যাপী চর্চার বিষয়। কর্তব্য একদিন পালন করলেই যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রতিদিনের জীবনেই দায়িত্ব, কর্তব্য এবং নৈতিকতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হয়। এই ধারাবাহিক কর্মই চরিত্রকে গঠন করে এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
কার্য্যং শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ করা। কার্য্য বলতে বোঝায় যা করা উচিত, যা কর্তব্য, যা নৈতিকভাবে পালনীয়। কর্ম শব্দটিও একই ধাতু থেকে এসেছে, তবে এর অর্থ কাজ বা কার্যসম্পাদন। কার্য্য এবং কর্ম এই দুটি শব্দ পাশাপাশি ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চেয়েছেন যে প্রত্যেক কাজ সমান নয়। মানুষের উচিত সেই কাজই করা যা কর্তব্য, যা ন্যায়সঙ্গত এবং যা নিজের ও সমাজের কল্যাণে সহায়ক।
সমাচর শব্দটি সম্ উপসর্গ এবং চর ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। চর ধাতুর অর্থ চলা, আচরণ করা বা পালন করা। সম্ উপসর্গ যুক্ত হওয়ায় এর অর্থ হয়েছে যথাযথভাবে, সম্পূর্ণভাবে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা। এখানে কেবল কাজ করার কথা বলা হয়নি বরং সঠিক মনোভাব, শুদ্ধ উদ্দেশ্য এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে পরমাপ্নোতি শব্দটি এসেছে পরম এবং আপ্নোতি থেকে। পরম অর্থ সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত কিংবা শ্রেষ্ঠ। আপ্নোতি এসেছে আপ্ ধাতু থেকে যার অর্থ লাভ করা বা অর্জন করা। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অনাসক্তভাবে কর্ম সম্পাদন করে সে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বা পরম সিদ্ধি লাভ করে। এখানে পরম বলতে কেবল পার্থিব সাফল্য বোঝানো হয়নি। এর দ্বারা আত্মিক মুক্তি, চিত্তের শান্তি, জ্ঞানপ্রাপ্তি এবং ঈশ্বরসান্নিধ্যকে বোঝানো হয়েছে। পুরুষঃ শব্দটি মানুষের প্রতীক। তবে দর্শনের ভাষায় এটি কেবল জৈবিক মানুষ নয় বরং চৈতন্যময় আত্মসত্তাকেও নির্দেশ করে।
এই শ্লোকের বাংলা অর্থ হলো অতএব তুমি সর্বদা অনাসক্ত হয়ে তোমার কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করো। কারণ মানুষ অনাসক্তভাবে কর্ম সম্পাদন করতে করতে সর্বোচ্চ সিদ্ধি লাভ করে। আক্ষরিক অর্থের মধ্যেই শ্লোকটির গভীর দার্শনিক শিক্ষা নিহিত রয়েছে। এখানে কর্ম ত্যাগের শিক্ষা নেই, বরং কর্মকে পবিত্র করার শিক্ষা রয়েছে। কর্মকে ফলের আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত করাই এই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
প্রাসঙ্গিক অর্থে এই শ্লোকের প্রয়োগ অত্যন্ত বিস্তৃত। একজন শিক্ষক যদি কেবল বেতনের জন্য নয় বরং জ্ঞান বিতরণের আনন্দে পড়ান তবে তিনি এই শিক্ষার অনুসারী। একজন চিকিৎসক যদি খ্যাতি বা অর্থের জন্য নয় বরং রোগীর সেবাকে নিজের কর্তব্য মনে করেন তবে তিনিও অনাসক্ত কর্মের আদর্শ অনুসরণ করছেন। একজন কৃষক নিষ্ঠার সঙ্গে জমি চাষ করেন কিন্তু বৃষ্টি হবে কি হবে না তা নিয়ে অহংকার বা হতাশায় ভেঙে পড়েন না। একজন মা সন্তানের যত্ন নেন প্রতিদানের প্রত্যাশায় নয় বরং ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধে। এসব উদাহরণ দেখায় যে অনাসক্ত কর্ম কোনো বিমূর্ত ধারণা নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব অনুশীলন।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের বন্ধনের মূল কারণ কর্ম নয় বরং কর্মের প্রতি আসক্তি। মানুষ যখন নিজের পরিচয়কে সাফল্য, সম্পদ বা প্রশংসার সঙ্গে যুক্ত করে তখন সে মানসিকভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন সে বুঝতে শেখে যে তার অধিকার কেবল কর্তব্য পালনে, ফলের ওপর নয়, তখন তার মন স্বাধীন হতে শুরু করে। এই স্বাধীনতাই কর্মযোগের প্রকৃত শক্তি। তখন কাজ আর বোঝা মনে হয় না, বরং আত্মবিকাশের একটি পবিত্র উপায়ে পরিণত হয়।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক কর্মযোগের মূল ভিত্তি। বেদান্ত মতে আত্মা প্রকৃতপক্ষে কর্ম করে না, কর্ম সম্পাদন করে প্রকৃতি। জ্ঞানী ব্যক্তি এই সত্য উপলব্ধি করে নিজের অহংকার ত্যাগ করেন এবং কর্মকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। সাংখ্য দর্শনেও পুরুষকে চৈতন্যস্বরূপ সাক্ষী এবং প্রকৃতিকে কর্মের কর্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে অনাসক্তি কোনো কৃত্রিম সংযম নয় বরং বাস্তব সত্যের উপলব্ধি। কর্ম করেও যে অন্তরে মুক্ত থাকা যায় এই উপলব্ধিই কর্মযোগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা।
প্রতীকী অর্থে অসক্ত মানুষ পদ্মফুলের মতো। পদ্ম জলের মধ্যেই জন্মায়, জলের মধ্যেই বেড়ে ওঠে, কিন্তু জল তাকে ভিজিয়ে রাখতে পারে না। তেমনি একজন কর্মযোগী পৃথিবীর সকল দায়িত্ব পালন করেন, মানুষের সঙ্গে মিশে থাকেন, সমাজের জন্য কাজ করেন, কিন্তু ভোগ, অহংকার বা লোভের দ্বারা আবদ্ধ হন না। আবার প্রবাহমান নদীর মতো তিনি নিজের স্বভাব অনুযায়ী অবিরাম চলতে থাকেন। নদী যেমন সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হয়, তেমনি অনাসক্ত কর্ম মানুষকে ধীরে ধীরে পরম সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
এই শ্লোকের শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক যুগে মানুষ প্রায়ই ফলের উদ্বেগ, প্রতিযোগিতা, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যর্থতার ভয়ে মানসিক অশান্তিতে ভোগে। শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা জানায় যে সফলতার প্রকৃত রহস্য ফলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় নয়, বরং নিজের কর্তব্য সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পাদন করার মধ্যেই নিহিত। যখন মানুষ কর্মকে উপাসনা হিসেবে গ্রহণ করে এবং ফলকে ঈশ্বরের হাতে সমর্পণ করে, তখন তার জীবনে শান্তি, স্থিরতা এবং অন্তর্গত শক্তির বিকাশ ঘটে।
সারসংক্ষেপে বলা যায় এই শ্লোক মানবজীবনের কর্মদর্শনের এক অনন্য ঘোষণা। ভাষাগতভাবে এটি কর্তব্য, কর্ম এবং অনাসক্তির সূক্ষ্ম সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে। দার্শনিকভাবে এটি মানুষকে শেখায় যে কর্মই মুক্তির পথ হতে পারে যদি সেই কর্ম ফলের আকাঙ্ক্ষামুক্ত হয়। প্রতীকীভাবে এটি পদ্মের নির্মলতা এবং নদীর অবিরাম গতির মাধ্যমে মানবজীবনের আদর্শ তুলে ধরে। এই শ্লোক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবনের প্রকৃত সার্থকতা কর্ম পরিত্যাগে নয়, বরং অনাসক্তচিত্তে কর্তব্য পালন করার মধ্যেই নিহিত। এমন কর্মই মানুষকে ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধি, অন্তরের শান্তি এবং পরম সত্যের উপলব্ধির দিকে অগ্রসর করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!