শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.২০ | কর্মের মাধ্যমে পরম সিদ্ধি ও লোককল্যাণের শিক্ষা
কর্মণৈব হি সংসিদ্ধিমাস্থিতা জনকাদয়ঃ।
লোকসংগ্রহমেবাপি সংপশ্যন্ কর্তুমর্হসি।।২০।।
অনুবাদঃ জনক আদি রাজারাও কর্ম দ্বারাই সংসিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। অতএব, জনসাধারণকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তোমার কর্ম করা উচিত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের বিংশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ কর্মযোগের এক অনন্য আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা কর্ম থেকে পলায়নে নয় বরং কর্তব্যনিষ্ঠ কর্মের মধ্যেই নিহিত। এই শ্লোকে তিনি বলেন যে জনক প্রমুখ মহাপুরুষ কেবল কর্মের মাধ্যমেই পরম সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। তাই অর্জুনেরও উচিত সমাজের কল্যাণ ও মানুষের মঙ্গলকে সামনে রেখে নিজের কর্তব্য পালন করা। এই শিক্ষার মাধ্যমে গীতা ব্যক্তিগত মুক্তি এবং সামাজিক দায়িত্বকে এক অবিচ্ছেদ্য আদর্শে পরিণত করেছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ কর্ম্মণৈব যার উৎপত্তি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে। কৃ ধাতুর অর্থ করা সৃষ্টি করা বা সম্পাদন করা। কর্ম শব্দের সঙ্গে তৃতীয়া বিভক্তির কর্মণা এবং অব্যয় এব যুক্ত হয়ে কর্ম্মণৈব শব্দটি গঠিত হয়েছে যার অর্থ কেবল কর্মের দ্বারাই। এখানে কর্ম বলতে শুধু শারীরিক শ্রম বা দৈনন্দিন কাজকে বোঝানো হয়নি। বরং ধর্মসম্মত কর্তব্য পালন নিঃস্বার্থ সেবা ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ এবং জীবনের প্রতি দায়িত্বশীল অংশগ্রহণকেই বোঝানো হয়েছে। গীতার দৃষ্টিতে কর্ম হলো মানুষের আত্মোন্নতির অন্যতম প্রধান উপায়। মানুষ যখন ফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করে তখন সেই কর্মই যোগে পরিণত হয় এবং তাকে আত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কর্ম এখানে মানুষের সৃষ্টিশীল শক্তি কর্তব্যবোধ এবং জীবনের অবিরাম গতির প্রতীক।
এরপর এসেছে সংসিদ্ধিম্ শব্দটি যার উৎপত্তি সম্ উপসর্গ এবং সিদ্ধি শব্দ থেকে। সিদ্ধি এসেছে সিধ্ ধাতু থেকে যার অর্থ সফল হওয়া বা পূর্ণতা লাভ করা। সম্ উপসর্গ যুক্ত হওয়ার ফলে সংসিদ্ধি অর্থ হয়েছে সম্পূর্ণ সিদ্ধি বা পরম পূর্ণতা। বাংলা অর্থে এটি পরিপূর্ণ সাফল্য আত্মউপলব্ধি মুক্তি কিংবা জীবনের চূড়ান্ত সার্থকতাকে নির্দেশ করে। তবে এখানে বাহ্যিক অর্জন বা পার্থিব সাফল্য বোঝানো হয়নি। গীতার আলোকে সংসিদ্ধি হলো অন্তরের বিকাশ চিত্তের পরিশুদ্ধি এবং আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি। মানুষ যখন নিজের কর্তব্যকে ঈশ্বরার্পণ বুদ্ধিতে সম্পন্ন করে তখন ধীরে ধীরে তার মন নির্মল হয় এবং সেই নির্মল চিত্তই তাকে পরম জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। তাই সংসিদ্ধি হলো আত্মিক পূর্ণতার প্রতীক যেখানে মানুষ নিজের প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করে।
শ্লোকে জনকাদয়ঃ শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জনক ছিলেন মিথিলার বিখ্যাত রাজা যিনি রাজ্য পরিচালনার মধ্যেই আত্মজ্ঞান লাভ করেছিলেন। জনকাদয়ঃ অর্থ জনক এবং তাঁর মতো অন্যান্য মহাপুরুষ। শ্রীকৃষ্ণ জনকের উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে সংসার ত্যাগ করলেই জ্ঞান লাভ হয় না। বরং সংসারের মধ্যেই অনাসক্ত থেকে কর্তব্য পালন করেও মুক্তি অর্জন করা যায়। জনক এমন এক আদর্শ যেখানে জ্ঞান এবং কর্ম পরস্পরের বিরোধী নয় বরং একে অপরের পরিপূরক। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একজন শাসকও আধ্যাত্মিকভাবে মুক্ত হতে পারেন যদি তিনি নিঃস্বার্থভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। এই কারণে জনক আদর্শ কর্মযোগীর প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর ও বহুমাত্রিক শব্দ হলো লোকসংগ্রহ। লোক অর্থ মানুষ সমাজ বা জগৎ এবং সংগ্রহ শব্দটি গ্রহ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ ধারণ করা রক্ষা করা বা একত্রে ধরে রাখা। ফলে লোকসংগ্রহ অর্থ সমাজকে ধারণ করা মানুষের কল্যাণ সাধন করা এবং বিশ্বজীবনের শৃঙ্খলা রক্ষা করা। এটি কেবল সমাজসেবা নয় বরং এমন এক নৈতিক আদর্শ যেখানে নিজের প্রতিটি কর্ম অন্যের মঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। গীতার মতে জ্ঞানী ব্যক্তি কেবল নিজের মুক্তির জন্য কাজ করেন না। তিনি সমাজের কল্যাণের জন্যও কর্ম করেন যাতে সাধারণ মানুষ সৎপথে চলতে উৎসাহিত হয়। লোকসংগ্রহ আমাদের শেখায় যে মানুষ কখনও একা নয়। প্রত্যেকের কর্ম পরিবার সমাজ এবং সমগ্র মানবজাতির উপর প্রভাব ফেলে। তাই নিজের স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কাজ করাই প্রকৃত মানবধর্ম। এই ধারণা সাহিত্য সংস্কৃতি ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও বিশ্বজনীন দায়িত্ববোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
শ্লোকের শেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ কর্ত্তুমর্হসি যার অর্থ তোমার করা উচিত অথবা তোমার কর্তব্য। এটি কেবল একটি নির্দেশ নয় বরং এক গভীর নৈতিক আহ্বান। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যে জ্ঞান অর্জন করার পর কর্ম থেকে সরে যাওয়া নয় বরং সেই জ্ঞানকে কর্মের মাধ্যমে সমাজে কার্যকর করা উচিত। সত্যিকারের জ্ঞান কখনও নিষ্ক্রিয়তা সৃষ্টি করে না বরং মানুষকে আরও দায়িত্ববান করে তোলে। এই শব্দের মাধ্যমে গীতা কর্তব্যবোধকে মানবজীবনের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
এই শ্লোকের সামগ্রিক দার্শনিক শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। এখানে কর্ম ব্যক্তিগত উন্নতির পথ আবার একই সঙ্গে সমাজকল্যাণের মাধ্যম। সংসিদ্ধি ব্যক্তিগত আত্মজাগরণের প্রতীক আবার লোকসংগ্রহ সামাজিক দায়িত্বের প্রতীক। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গীতার কর্মযোগ সম্পূর্ণতা লাভ করেছে। ব্যক্তি যদি কেবল নিজের মুক্তির চিন্তায় নিমগ্ন থাকে তবে সমাজ উপকৃত হয় না। আবার যদি কেবল সমাজের জন্য কাজ করে কিন্তু অন্তরের শুদ্ধি না ঘটে তবে সেই কর্মও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। গীতা তাই ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের মধ্যে এক অপূর্ব ভারসাম্য স্থাপন করেছে।
বাস্তব জীবনেও এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন সৎ শিক্ষক কেবল নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য শিক্ষা দেন না। তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। একজন সৎ চিকিৎসক কেবল পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন না। তিনি মানুষের জীবন রক্ষার মাধ্যমে সমাজের কল্যাণ সাধন করেন। একজন আদর্শ বিচারক ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। ঠিক তেমনি সূর্য যেমন নিজের জন্য আলো দেয় না বরং সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করে তেমনি প্রকৃত কর্মযোগী নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যের মঙ্গলের জন্য কর্ম করেন। আবার পদ্মফুল যেমন কাদার মধ্যে থেকেও নির্মল থাকে তেমনি কর্মযোগী সংসারে অবস্থান করেও আসক্তির ঊর্ধ্বে থাকেন।
সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন দিকনির্দেশনা। এখানে কর্মকে আত্মউন্নতির সোপান এবং সমাজকল্যাণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কর্ম্মণৈব মানুষকে শেখায় যে কর্তব্যই উন্নতির পথ। সংসিদ্ধি জানায় আত্মিক পূর্ণতাই জীবনের প্রকৃত সাফল্য। জনকাদয়ঃ প্রমাণ করে সংসারে থেকেই মুক্তি অর্জন সম্ভব। লোকসংগ্রহ শেখায় নিজের মঙ্গলকে সমগ্র বিশ্বের মঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত করতে। আর কর্ত্তুমর্হসি স্মরণ করিয়ে দেয় যে জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয় যখন তা কর্মে প্রকাশ পায়। এইভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক ব্যক্তি সমাজ এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য এমন এক জীবনদর্শন উপস্থাপন করে যেখানে নিঃস্বার্থ কর্ম আত্মিক উন্নতি এবং বিশ্বকল্যাণ এক মহান আদর্শে মিলিত হয়েছে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!