শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.২৩ | সঙ্কর ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে রক্ষায় কর্মের মহত্ত্ব
যদি হ্যহং ন বর্তেয়ং জাতু কর্মণ্যতন্দ্রিতঃ।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।২৩।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! আমি যদি অনলস হয়ে কর্তব্যকর্মে প্রবৃত্ত না হই, তবে আমার অনুবর্তী হয়ে সমস্ত মানুষই কর্ম ত্যাগ করবে।
সংস্কৃত ভাষার সঙ্কর শব্দটি বহুমাত্রিক অর্থবাহী একটি প্রাচীন শব্দ, যার ব্যবহার ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, সমাজচিন্তা, ধর্ম, সাহিত্য এবং মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে সম্ উপসর্গ এবং কৃ ধাতু থেকে। সম্ অর্থ একত্রে বা সম্মিলিতভাবে এবং কৃ ধাতুর অর্থ করা, সৃষ্টি করা বা উৎপন্ন করা। এই দুটি উপাদানের সমন্বয়ে সঙ্কর শব্দের সৃষ্টি, যার মৌলিক অর্থ বিভিন্ন উপাদান, গুণ, অবস্থা কিংবা সত্তার মিলনের ফলে সৃষ্ট একটি নতুন অবস্থা। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে এই শব্দটি সাধারণত সংমিশ্রণ অর্থে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীকালে এটি সামাজিক, নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক তাৎপর্য লাভ করে। বিশেষ করে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শব্দটি কেবল বাহ্যিক মিশ্রণ নয়, বরং সমাজের শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বাংলা ভাষায় সঙ্কর শব্দের অর্থ মিশ্রণ, সংমিশ্রণ, মিশ্র জাতি, বিশৃঙ্খল সংযোগ, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক বিভ্রান্তি এবং শৃঙ্খলার ভঙ্গ। তবে গীতার আলোচনায় এই শব্দের অর্থ আরও গভীর। এখানে সঙ্কর বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে যেখানে সমাজের স্বাভাবিক ধর্ম, কর্তব্য এবং নৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। মানুষ যখন নিজের কর্তব্য পালন থেকে বিরত থাকে এবং আদর্শ জীবনচর্চা পরিত্যাগ করে, তখন ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে সমগ্র মানবসভ্যতার মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা জন্ম নেয়। শ্রীকৃষ্ণ এই কারণেই ঘোষণা করেন যে তিনি যদি কর্ম না করতেন, তবে সমগ্র সমাজ ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হতো এবং তিনিই সেই অবক্ষয়ের কারণ হয়ে উঠতেন।
আক্ষরিক অর্থে সঙ্কর মানে বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণে সৃষ্ট অবস্থা। এই অর্থে শব্দটির মধ্যে কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক মূল্যায়ন নেই। যেমন কৃষিক্ষেত্রে দুটি জাতের উদ্ভিদের সংমিশ্রণে নতুন জাতের সৃষ্টি অথবা দুটি সংস্কৃতির মিলনে নতুন সাংস্কৃতিক রূপের উদ্ভবও সঙ্কর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যখন এই সংমিশ্রণ স্বাভাবিক শৃঙ্খলা, পরিচয় বা নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়, তখন সঙ্কর শব্দটি নেতিবাচক তাৎপর্য বহন করে।
দৈনন্দিন জীবনে সঙ্কর নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। সামাজিক ক্ষেত্রে এটি এমন এক অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে কর্তব্যবোধ, মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্বের অবক্ষয় ঘটে। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সঙ্কর হলো সত্য ও অসত্যের সীমারেখা মুছে যাওয়া, যেখানে মানুষ সঠিক এবং ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি পরিচয়ের সংকট, আত্মদ্বন্দ্ব এবং মূল্যবোধের বিভ্রান্তির প্রতীক। আবার আধ্যাত্মিক অর্থে সঙ্কর হলো আত্মস্বরূপকে ভুলে গিয়ে অহং, মোহ এবং অজ্ঞানের সঙ্গে নিজেকে একাকার করে ফেলা।
সঙ্কর শব্দটির গভীর তাৎপর্য মানুষের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। প্রকৃতির প্রতিটি স্তরে শৃঙ্খলা বিদ্যমান। সূর্যের নিয়মিত উদয় ও অস্ত, ঋতুচক্রের ধারাবাহিকতা, নদীর প্রবাহ কিংবা জীবনের স্বাভাবিক বিকাশ সবই একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন। মানুষ যখন এই শৃঙ্খলা অনুসরণ করে তখন সমাজে স্থিতি, শান্তি এবং উন্নতি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কর্তব্যবিমুখতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং দায়িত্বহীনতা যখন বিস্তার লাভ করে তখন সেই শৃঙ্খলা ভেঙে যায় এবং তার ফলস্বরূপ সঙ্কর সৃষ্টি হয়। এই কারণে গীতায় সঙ্করকে কেবল একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য একটি গভীর সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সঙ্কর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বেদান্ত দর্শন অনুযায়ী মানুষের মূল সমস্যা হলো চিরন্তন সত্য এবং পরিবর্তনশীল মায়ার মধ্যে বিভ্রান্তি। আত্মাকে দেহের সঙ্গে একীভূত করে দেখা এবং ক্ষণস্থায়ী জগতকে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করাই এক ধরনের সঙ্কর। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ এবং প্রকৃতির পার্থক্য অনুধাবন করতে না পারা বন্ধনের কারণ এবং এটিও সঙ্করের একটি সূক্ষ্ম রূপ। বৌদ্ধ দর্শনে অনিত্যকে নিত্য, দুঃখকে সুখ এবং অনাত্মাকে আত্মা মনে করার ভুল ধারণা মানুষের অজ্ঞানের উৎস। আধুনিক অস্তিত্ববাদী দর্শনের আলোচনায়ও মানুষ যখন নিজের প্রকৃত পরিচয় বিসর্জন দিয়ে সমাজের কৃত্রিম পরিচয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তার অস্তিত্বে সঙ্কর সৃষ্টি হয়।
প্রতীকী অর্থে সঙ্কর মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, মূল্যবোধের সংঘর্ষ এবং পরিচয়ের সংকটের প্রতীক। সাহিত্যে এমন বহু চরিত্র রয়েছে যারা দুটি আদর্শ, দুটি সংস্কৃতি অথবা দুটি মানসিক অবস্থার মধ্যে দোদুল্যমান। এই দ্বৈততা সঙ্করের প্রতীকী রূপ প্রকাশ করে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সঙ্কর কখনো বিভিন্ন ঐতিহ্যের সৃজনশীল মিলনকে নির্দেশ করে, আবার কখনো মৌলিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত বহন করে। মনোবিজ্ঞানে এটি চেতনা এবং অবচেতনের অসম্পূর্ণ সমন্বয়ের ফলে সৃষ্ট বিভ্রান্তির প্রতীক। আধ্যাত্মিক অর্থে সঙ্কর এমন এক সন্ধিক্ষণ যেখানে মানুষ সত্য ও মায়া, জ্ঞান ও অজ্ঞান, আলো ও অন্ধকারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের পথ নির্বাচন করে।
বাস্তব জীবনেও সঙ্করের অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন শিক্ষক যদি শিক্ষা প্রদানের দায়িত্ব পালন না করেন, একজন শাসক যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা না করেন কিংবা একজন অভিভাবক যদি সন্তানকে সঠিক মূল্যবোধে গড়ে না তোলেন, তবে সমাজে ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হয়। একজন ব্যক্তি যদি সত্যকে গ্রহণ করতে চাইলেও স্বার্থের কারণে মিথ্যার আশ্রয় নেন, তবে তার চরিত্রের মধ্যেও এক ধরনের সঙ্কর জন্ম নেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বহু শক্তিশালী সভ্যতা বাহ্যিক আক্রমণের আগে নিজেদের নৈতিক অবক্ষয়, শৃঙ্খলার অভাব এবং কর্তব্যবিমুখতার কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই ঘটনাগুলো গীতার সঙ্কর ধারণার বাস্তব প্রতিফলন।
সার্বিকভাবে সঙ্কর শব্দটি কেবল মিশ্রণ বা সংমিশ্রণের সাধারণ ধারণা নয়। এটি মানবজীবনের নৈতিক, সামাজিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি মৌলিক দর্শন। ভাষাতাত্ত্বিকভাবে এটি বিভিন্ন উপাদানের সম্মিলিত সৃষ্টিকে নির্দেশ করলেও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আলোচনায় এটি শৃঙ্খলার ভাঙন, কর্তব্যচ্যুতি, মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং আত্মপরিচয়ের সংকটের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই শব্দ আমাদের শিক্ষা দেয় যে ব্যক্তি যদি নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এবং সত্য, ন্যায় ও ধর্মের পথে অবিচল থাকে, তবে সমাজে শৃঙ্খলা, স্থিতি এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু যখন মানুষ কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয় এবং সত্য ও অসত্যের সীমারেখা মুছে ফেলে, তখন সঙ্কর জন্ম নেয় এবং সেই সঙ্করই ধীরে ধীরে ব্যক্তি, সমাজ ও সভ্যতার অবক্ষয়ের কারণ হয়ে ওঠে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!