শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.২৫ | জ্ঞানীর নিঃস্বার্থ কর্ম ও লোকসংগ্রহের আদর্শ
সক্তাঃ কর্মণ্যবিদ্বাংসো যথা কুর্বন্তি ভারত।
কুর্যাদ্ বিদ্বাংস্তথাসক্তশ্চিকীর্ষুর্লোকসংগ্রহম্।।২৫।।
অনুবাদঃ হে ভারত! অজ্ঞানীরা যেমন কর্মফলের প্রতি আসক্ত হয়ে তাদের কর্তব্যকর্ম করে, তেমনই জ্ঞানীরা অনাসক্ত হয়ে মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য কর্ম করবেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের পঁচিশতম শ্লোক কর্মযোগ দর্শনের এক অনন্য শিক্ষা উপস্থাপন করে যেখানে জ্ঞানী ও অজ্ঞ মানুষের কর্মের বাহ্যিক মিল এবং অন্তর্নিহিত পার্থক্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শ্লোকে বলা হয়েছে যে অজ্ঞ মানুষ যেমন কর্মের প্রতি আসক্ত হয়ে কাজ করে তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তিও কর্ম করেন। তবে উভয়ের কর্মের উদ্দেশ্য এক নয়। অজ্ঞ ব্যক্তি ব্যক্তিগত লাভ আকাঙ্ক্ষা ও ফলের প্রতি মোহ দ্বারা পরিচালিত হয়। অপরদিকে জ্ঞানী ব্যক্তি কোনো ব্যক্তিগত আসক্তি ছাড়াই সমাজের কল্যাণ এবং বিশ্বের শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে কর্ম সম্পাদন করেন। এই শিক্ষার মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্পষ্ট করে দেন যে প্রকৃত জ্ঞান কখনো কর্মবিমুখতা শেখায় না বরং নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠার পথ নির্দেশ করে।
শ্লোকটির প্রধান শব্দগুলোর মধ্যে সক্তাঃ শব্দটি সংস্কৃত সজ্ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ যুক্ত হওয়া বা আসক্ত হওয়া। এখানে সক্তাঃ বলতে সেইসব মানুষকে বোঝানো হয়েছে যারা কর্মের ফলের প্রতি আকৃষ্ট এবং নিজেদের সাফল্য লাভ ও ভোগের আকাঙ্ক্ষায় কাজ করে। কর্ম্মণি শব্দটি কৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। এটি মানুষের সমস্ত কর্তব্য কাজ দায়িত্ব ও জীবনের কার্যকলাপকে নির্দেশ করে। অবিদ্বাংসঃ শব্দটি অ এবং বিদ্বান এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে অ উপসর্গটি নঞর্থক অর্থ প্রকাশ করে এবং বিদ্বান শব্দটি বিদ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। ফলে অবিদ্বান বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি আত্মসত্য ও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞ। বিদ্বান শব্দটি সেই ব্যক্তিকে নির্দেশ করে যিনি আত্মজ্ঞান লাভ করেছেন এবং কর্মের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করেছেন। অসক্ত শব্দটি অ এবং সক্ত এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত যার অর্থ কর্মে যুক্ত থেকেও কর্মফলের প্রতি অনাসক্ত থাকা। চিকীর্ষু শব্দটি কৃ ধাতুর ইচ্ছাবাচক রূপ যার অর্থ কোনো মহৎ কাজ সম্পাদনের আন্তরিক ইচ্ছা। লোকসংগ্রহ শব্দটি লোক এবং সংগ্রহ এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। লোক অর্থ সমগ্র মানবসমাজ এবং সংগ্রহ অর্থ ধারণ করা রক্ষা করা বা ঐক্যবদ্ধ রাখা। ফলে লোকসংগ্রহ বলতে এমন কর্মকে বোঝায় যা সমাজকে সুসংহত রাখে মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে এবং নৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে।
বাংলা অর্থে শ্লোকটির সারমর্ম হলো যে হে ভারত অজ্ঞ মানুষ যেমন কর্মের প্রতি আসক্ত হয়ে কাজ করে তেমনি জ্ঞানী ব্যক্তিও কর্ম করবেন তবে তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ফলের আকাঙ্ক্ষায় নয় বরং সমাজের কল্যাণ ও মানবজাতির মঙ্গলের জন্য অনাসক্তভাবে কর্ম সম্পাদন করবেন। আক্ষরিক অর্থেও এই শ্লোক একই সত্য প্রকাশ করে। এখানে কর্ম ত্যাগের নির্দেশ নেই বরং কর্মের অন্তর্নিহিত মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাহ্যিক কর্ম একই থাকতে পারে কিন্তু কর্মের উদ্দেশ্য এবং চেতনা ভিন্ন হলে তার আধ্যাত্মিক মূল্যও সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়।
এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিক অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। কর্মযোগের আলোচনায় এটি প্রমাণ করে যে জ্ঞান অর্জনের পর মানুষ কর্ম থেকে সরে যায় না বরং আরও বৃহত্তর দায়িত্ব গ্রহণ করে। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে সমাজ তাঁকে অনুসরণ করে। তাই তিনি নিজের ব্যক্তিগত মুক্তির জন্য নির্জনে অবস্থান না করে মানুষের কল্যাণের জন্য কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় থাকেন। একজন শিক্ষক যদি নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা দেন একজন চিকিৎসক যদি মানবসেবাকে নিজের কর্তব্য মনে করেন একজন বিচারক যদি নিরপেক্ষভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন অথবা একজন রাষ্ট্রনায়ক যদি জনগণের মঙ্গলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেন তবে তাঁদের প্রত্যেকের কর্মই লোকসংগ্রহের আদর্শকে বাস্তব রূপ দেয়। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে সত্যিকার নেতৃত্ব কথায় নয় বরং আদর্শ কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই শিক্ষার গভীর তাৎপর্য মানুষের অন্তর্জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ সাধারণত ফলের প্রত্যাশায় কাজ করে এবং সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে নিজের পরিচয়কে যুক্ত করে ফেলে। এই আসক্তিই দুঃখ উদ্বেগ হতাশা এবং অহংকারের জন্ম দেয়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে কর্ম তাঁর কর্তব্য হলেও ফল তাঁর নিয়ন্ত্রণে নয়। তাই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন কিন্তু ফলের প্রতি নিজের মনকে আবদ্ধ করেন না। এর ফলে তাঁর কর্ম শান্ত হয় মন স্থির হয় এবং জীবন মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। এই অনাসক্তি কর্মবিমুখতা নয় বরং কর্মের সর্বোচ্চ পরিশুদ্ধ রূপ।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক বেদান্ত কর্মযোগ এবং নৈতিক দর্শনের এক অপূর্ব সমন্বয়। বেদান্ত মতে আত্মা কখনো কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হয় না। আবদ্ধ হয় মানুষের অহংকার এবং মমত্ববোধ। যখন মানুষ নিজেকে কর্মের একমাত্র কর্তা মনে করে তখনই বন্ধনের সৃষ্টি হয়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে সে কেবল কর্তব্য পালন করছে তখন কর্ম মুক্তির পথ হয়ে ওঠে। কর্মযোগ দর্শনও এই একই সত্য প্রতিষ্ঠা করে। এখানে কর্মকে ত্যাগ করতে বলা হয়নি বরং কর্মকে শুদ্ধ করতে বলা হয়েছে। নৈতিক দর্শনের দৃষ্টিতেও এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান কারণ প্রকৃত নৈতিকতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন মানুষ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ অতিক্রম করে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
প্রতীকী অর্থে সক্ত শব্দটি মানুষের বন্ধন লোভ এবং আকর্ষণের প্রতীক। এটি সেই মানসিক অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে মানুষ বাহ্যিক অর্জনের মাধ্যমে নিজের পরিচয় নির্মাণ করতে চায়। অসক্ত শব্দটি পদ্মফুলের মতো নির্মলতার প্রতীক। পদ্ম জলের মধ্যে জন্মায় এবং জলের মধ্যেই অবস্থান করে কিন্তু জল তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তেমনি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি সংসারের মধ্যে থেকেও সংসারের আসক্তিতে আবদ্ধ হন না। লোকসংগ্রহ মানবসমাজের ঐক্য সহযোগিতা এবং নৈতিক সংহতির প্রতীক। এটি এমন এক শক্তিকে নির্দেশ করে যা সমাজকে বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্যের পথে পরিচালিত করে। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও অনাসক্ত কর্ম মানসিক পরিপক্বতা আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং অহং অতিক্রমের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাস্তব জীবনে এই শ্লোকের বহু উদাহরণ দেখা যায়। সূর্য প্রতিদিন সমগ্র পৃথিবীকে আলো দেয় কিন্তু কখনো প্রতিদানের প্রত্যাশা করে না। বৃক্ষ নিজে নিজের ফল ভোগ না করে অন্যকে ফল দান করে। নদী অবিরাম প্রবাহিত হয়ে সকলের তৃষ্ণা নিবারণ করে কিন্তু কোনো স্বীকৃতি চায় না। একজন আদর্শ শিক্ষক নিজের জ্ঞান কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলেন। একজন প্রকৃত সমাজসেবক মানুষের প্রশংসা বা সম্মানের জন্য নয় বরং মানবকল্যাণের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করেন। এই সকল উদাহরণ লোকসংগ্রহের জীবন্ত প্রকাশ।
সার্বিকভাবে এই শ্লোক আমাদের শিক্ষা দেয় যে প্রকৃত জ্ঞান কর্মবিমুখতার নাম নয় বরং নিঃস্বার্থ কর্মের মধ্যেই জ্ঞানের পূর্ণতা প্রকাশ পায়। অজ্ঞ ব্যক্তি নিজের জন্য কাজ করে আর জ্ঞানী ব্যক্তি সকলের জন্য কাজ করেন। অজ্ঞের কর্ম ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার দ্বারা পরিচালিত হয় কিন্তু জ্ঞানীর কর্ম পরিচালিত হয় কর্তব্যবোধ মানবপ্রেম এবং বিশ্বকল্যাণের আদর্শ দ্বারা। ভাষাগত দৃষ্টিতে এই শ্লোক কর্ম আসক্তি অনাসক্তি এবং লোকসংগ্রহের গভীর সম্পর্ককে প্রকাশ করে। দার্শনিক দৃষ্টিতে এটি আত্মমুক্তির পথ নির্দেশ করে এবং প্রতীকী অর্থে এটি মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ থেকে বিশ্বমানবতার দিকে উত্তরণের আহ্বান জানায়। তাই এই শ্লোক কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন নৈতিক আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক আদর্শ যা ব্যক্তি সমাজ এবং সমগ্র মানবসভ্যতাকে সুষম ও কল্যাণময় পথে পরিচালিত করতে সক্ষম।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!