সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.২৬ | জ্ঞানীর আদর্শ কর্ম ও অজ্ঞের বুদ্ধিভেদ না করার শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্মসঙ্গিনাম্ । জোষয়েৎ সর্বকর্মাণি বিদ্বান্ যুক্তঃ সমাচরন্।।২৬।।
ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্মসঙ্গিনাম্ । 
জোষয়েৎ সর্বকর্মাণি বিদ্বান্ যুক্তঃ সমাচরন্।।২৬।।

অনুবাদঃ জ্ঞানবান ব্যক্তিরা কর্মাসক্ত জ্ঞানহীন ব্যক্তিদের বুদ্ধি বিভ্রান্ত করবেন না। বরং, তাঁরা ভক্তিযুক্ত চিত্তে সমস্ত কর্ম অনুষ্ঠান করে জ্ঞানহীন ব্যক্তিদের কর্মে প্রবৃত্ত করবেন।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের ছাব্বিশতম শ্লোকটি কর্মযোগের একটি অত্যন্ত গভীর এবং মানবকল্যাণমূলক শিক্ষা বহন করে। শ্লোকটি হলো ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্মসঙ্গিনাম্ যোজয়েৎ সর্বকর্ম্মাণি বিদ্বান্ যুক্তঃ সমাচরন্। এই শ্লোকের মূল বক্তব্য হলো একজন প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো কর্মে আসক্ত অজ্ঞ মানুষের বুদ্ধিতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবেন না। বরং তিনি নিজে নিষ্কামভাবে এবং আদর্শ আচরণের মাধ্যমে কর্ম সম্পাদন করে অন্যদেরও সৎ ও কর্তব্যপরায়ণ কর্মে উৎসাহিত করবেন। এই শিক্ষার মধ্যে ভাষাগত সৌন্দর্য যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমাজ গঠনের এক অনন্য নীতি।

এই শ্লোকের প্রধান ধারণাগুলোর মধ্যে বুদ্ধিভেদ শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বুদ্ধি শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত বুধ্ ধাতু থেকে যার অর্থ জাগ্রত হওয়া উপলব্ধি করা বা সত্যকে জানা। ভেদ শব্দটি ভিদ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ বিভক্ত করা বা বিচ্ছিন্ন করা। এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে বুদ্ধিভেদ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে যার অর্থ চিন্তায় বিভাজন সৃষ্টি করা অথবা কারও সুস্থ বিচারবোধকে বিভ্রান্ত করে দেওয়া। একইভাবে অজ্ঞান শব্দটি অ উপসর্গ এবং জ্ঞান শব্দের সমন্বয়ে গঠিত যার অর্থ সত্য জ্ঞান থেকে বঞ্চিত ব্যক্তি। কর্মসঙ্গিনাম্ শব্দটি কর্ম এবং সঙ্গ এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। কর্ম এসেছে কৃ ধাতু থেকে যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা এবং সঙ্গ অর্থ আসক্তি বা সংযুক্তি। ফলে কর্মসঙ্গী বলতে বোঝায় সেই সকল মানুষ যারা কর্মের ফল কিংবা কর্মের বাহ্যিক রূপের প্রতি আসক্ত। বিদ্বান শব্দটি বিদ্ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা এবং যুক্ত শব্দটি যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ যোগে প্রতিষ্ঠিত বা আত্মসংযমে অবিচল থাকা। সমাচরন্ শব্দটির অর্থ যথাযথভাবে আচরণ করা অথবা আদর্শভাবে কর্তব্য পালন করা।

বাংলা অর্থে এই শ্লোকের বক্তব্য হলো জ্ঞানী ব্যক্তি যেন কর্মে আসক্ত অজ্ঞ মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করেন। বরং তিনি নিজে যোগে প্রতিষ্ঠিত থেকে সৎভাবে কর্ম সম্পাদন করবেন এবং নিজের আচরণের মাধ্যমে অন্যদেরও কর্মে উদ্বুদ্ধ করবেন। আক্ষরিক অর্থেও শ্লোকটি একই সত্য প্রকাশ করে। এখানে বলা হয়েছে যে জ্ঞানীর কর্তব্য কেবল সত্য জানা নয় বরং সেই সত্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে সাধারণ মানুষের মন বিভ্রান্ত না হয় এবং তারা তাদের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত না হয়।

প্রাসঙ্গিক অর্থের দিক থেকে এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। সমাজে প্রত্যেক মানুষের মানসিক বিকাশ এবং জ্ঞানের স্তর এক নয়। একজন উচ্চজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি যদি হঠাৎ করে এমন কোনো সত্য প্রকাশ করেন যা সাধারণ মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয় তবে তারা বিভ্রান্ত হতে পারে। একজন শিক্ষক যেমন প্রথম শ্রেণির ছাত্রকে সরাসরি উচ্চতর গণিত শেখান না বরং ধাপে ধাপে শিক্ষা দেন তেমনি একজন আধ্যাত্মিক শিক্ষকও মানুষের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা প্রদান করেন। এই শ্লোক সেই বাস্তব নীতিকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখানে জ্ঞানকে অহংকারের বিষয় হিসেবে নয় বরং দায়িত্বের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো সত্যিকারের জ্ঞান কখনো বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে না বরং ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ জানেন যে মানুষের পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটে। তাই তিনি কাউকে অবজ্ঞা করেন না কিংবা তার সীমাবদ্ধতাকে উপহাস করেন না। তিনি নিজের জীবনকে এমনভাবে পরিচালিত করেন যাতে অন্যরা তার আচরণ দেখে অনুপ্রাণিত হয়। এই শিক্ষা নেতৃত্বের এক অনন্য আদর্শও প্রকাশ করে। একজন প্রকৃত নেতা কখনো শুধু নির্দেশ দেন না বরং নিজের জীবন দিয়েই অনুসরণ করার মতো পথ দেখান।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক কর্মযোগ দর্শনের অন্যতম ভিত্তি। বেদান্ত মতে আত্মা প্রকৃতপক্ষে অক্রিয় হলেও দেহধারী সাধারণ মানুষ সেই সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। তাই তাদের জন্য কর্তব্যকর্ম অপরিহার্য। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি যদি তাদের কর্মত্যাগে উৎসাহিত করেন তবে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এজন্য গীতা বলছে যে জ্ঞানী ব্যক্তি নিজেও কর্ম করবেন এবং অন্যদেরও কর্মে নিয়োজিত রাখবেন। এখানে জ্ঞান এবং কর্মের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই বরং উভয়ের এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে। এই সমন্বয়ই কর্মযোগের মূল শিক্ষা।

প্রতীকী অর্থে বুদ্ধিভেদ মানুষের অন্তরের বিভ্রান্তি এবং অহংকারের প্রতীক। কর্ম জীবনপ্রবাহ এবং কর্তব্যের প্রতীক। বিদ্বান আলোর প্রতীক যিনি অন্ধকার দূর করে পথ দেখান। যুক্ত ব্যক্তি মানসিক ভারসাম্য এবং আত্মসংযমের প্রতীক। এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষ সূর্যের মতো আলো দেন কিন্তু কাউকে অন্ধ করে দেন না। তিনি নদীর মতো নীরবে প্রবাহিত হন এবং তার জীবন দিয়ে সমাজকে সঞ্জীবিত করেন।

বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন দক্ষ শিক্ষক শিক্ষার্থীর সামর্থ্য অনুযায়ী পাঠদান করেন। একজন চিকিৎসক রোগীকে এমন ভাষায় চিকিৎসার বিষয় বোঝান যা রোগী সহজে বুঝতে পারে। একজন অভিজ্ঞ নেতা নিজে সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করেন। শ্রীকৃষ্ণ নিজেও এই নীতির সর্বোত্তম উদাহরণ। তিনি সর্বজ্ঞ হয়েও কর্ম থেকে বিরত থাকেননি বরং নিজ কর্মের মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতিকে কর্তব্যপালনের আদর্শ দেখিয়েছেন।

সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক ভাষাগত দিক থেকে যেমন গভীর তেমনি দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক দিক থেকেও অসাধারণ সমৃদ্ধ। এটি আমাদের শেখায় যে জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষকে বিভ্রান্ত করা নয় বরং তার বিকাশের উপযোগী পথে পরিচালিত করা। সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি নিজের আচরণের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করেন এবং মানুষকে তাদের কর্তব্যপথে দৃঢ় রাখেন। তাই এই শ্লোকের চিরন্তন শিক্ষা হলো উপদেশের চেয়ে আদর্শের শক্তি অনেক বেশি এবং জ্ঞানীর সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় তার কথায় নয় বরং তার জীবনাচরণে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 08, 2026 August 08, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি