সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.২৭ | প্রকৃতির গুণ, কর্ম ও অহংকারের গভীর রহস্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণনি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ।অহঙ্কারবিমুঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে।।২৭।।
প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণনি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ।
অহঙ্কারবিমুঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে।।২৭।।

অনুবাদঃ অহঙ্কারে মোহাচ্ছন্ন জীব জড়া প্রকৃতির ত্রিগুণ দ্বারা ক্রিয়মাণ সমস্ত কার্যকে স্বীয় কার্য বলে মনে করে ‘আমি কর্তা’-এই রকম অভিমান করে।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের সাতাশতম শ্লোক মানবজীবনের কর্ম, অহংকার এবং প্রকৃত আত্মপরিচয় সম্পর্কে এক অসাধারণ দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ। অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে। এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর বাণীর মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চেয়েছেন যে জগতের সমস্ত কর্ম প্রকৃতির গুণসমূহের দ্বারাই সম্পন্ন হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি অহংকারে আচ্ছন্ন এবং আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ, সে মনে করে যে সকল কর্মের একমাত্র কর্তা সে নিজেই। এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় নয় বরং ভাষাতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো প্রকৃতেঃ। এটি সংস্কৃত প্রকৃতি শব্দের ষষ্ঠী বিভক্তির রূপ যার অর্থ প্রকৃতির। প্রকৃতি শব্দটি প্র উপসর্গ এবং কৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে। কৃ ধাতুর অর্থ করা, সৃষ্টি করা বা নির্মাণ করা। প্র উপসর্গ যুক্ত হওয়ার ফলে এর অর্থ দাঁড়ায় মূল বা আদিগত সৃষ্টি কিংবা স্বাভাবিক অবস্থা। ভারতীয় দর্শনে প্রকৃতি বলতে সমগ্র জড়জগতের মূল কারণকে বোঝায়। এটি সেই মৌলিক শক্তি যার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি এবং পরিবর্তন সংঘটিত হয়। মানুষের শরীর, মন, ইন্দ্রিয়, অনুভূতি এবং মানসিক প্রবৃত্তিও এই প্রকৃতির অন্তর্গত। অতএব শ্লোকে প্রকৃতি কেবল বাহ্যিক প্রকৃতিকে নির্দেশ করে না বরং মানুষের সম্পূর্ণ মানসিক ও শারীরিক ব্যবস্থাকেও নির্দেশ করে।

ক্রিয়মাণানি শব্দটি কৃ ধাতু থেকে গঠিত হয়েছে এবং এর অর্থ হচ্ছে সম্পাদিত হচ্ছে বা সংঘটিত হচ্ছে। এটি এমন একটি ক্রিয়ারূপ যা বোঝায় যে কর্ম নিজে নিজেই একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এখানে কোনো ব্যক্তিগত কর্তার ওপর জোর দেওয়া হয়নি। বরং কর্মের স্বাভাবিক প্রবাহকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মাণি শব্দটিও একই কৃ ধাতু থেকে উদ্ভূত এবং এর অর্থ সমস্ত কাজ, কার্য বা কর্মসমূহ। এই দুটি শব্দ একত্রে প্রকাশ করে যে জগতের সকল কার্যক্রম একটি বৃহত্তর প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে সংঘটিত হয়।

গুণৈঃ শব্দটি গুণ শব্দের তৃতীয়া বিভক্তির বহুবচন রূপ যার অর্থ গুণসমূহ দ্বারা। সাংখ্য দর্শনে গুণ বলতে সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই তিনটি মৌলিক শক্তিকে বোঝানো হয়। সত্ত্ব গুণ জ্ঞান, পবিত্রতা এবং সামঞ্জস্যের প্রতীক। রজোগুণ কর্ম, আকাঙ্ক্ষা এবং গতিশীলতার প্রতীক। তমোগুণ জড়তা, অজ্ঞতা এবং অলসতার প্রতীক। এই তিন গুণের পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমেই মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ এবং কর্ম নির্ধারিত হয়। তাই গীতা বলছে মানুষের কর্ম প্রকৃতপক্ষে এই গুণত্রয়ের কার্যকলাপের ফল।

অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা শব্দটি অত্যন্ত গভীর অর্থবহ। এটি অহংকার, বিমূঢ় এবং আত্মা এই তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অহংকার অর্থ আমি বোধ বা নিজেকে পৃথক ও স্বতন্ত্র কর্তা বলে মনে করা। বিমূঢ় অর্থ মোহাচ্ছন্ন, বিভ্রান্ত বা সত্য সম্পর্কে অজ্ঞ। আত্মা এখানে ব্যক্তিসত্তাকে নির্দেশ করছে। অতএব অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যার আত্মচেতনা অহংকারের কারণে সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং যে নিজের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারেনি। এমন ব্যক্তি বাহ্যিক সাফল্য বা ব্যর্থতাকেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় বলে মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে তার সমস্ত অর্জনের একমাত্র কারণ সে নিজেই।

কর্তাহমিতি মন্যতে অংশটির অর্থ আমি কর্তা বলে মনে করে। কর্তা শব্দটি কৃ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ কাজের সম্পাদনকারী। মন্যতে শব্দটি মন ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ মনে করা, বিশ্বাস করা বা ধারণা করা। এখানে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাচ্ছেন যে কর্তার এই ধারণাটি বাস্তব সত্য নয় বরং অহংকারের সৃষ্টি একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস। ব্যক্তি মনে করে সে নিজেই সমস্ত কর্মের নিয়ন্ত্রক অথচ বাস্তবে তার শরীর, মন, প্রবৃত্তি, শিক্ষা, পরিবেশ, সামাজিক অবস্থা এবং প্রকৃতির অসংখ্য শক্তি মিলেই তার কর্মকে পরিচালিত করে।

এই শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ হলো প্রকৃতির গুণসমূহ দ্বারা সমস্ত কর্ম সম্পাদিত হয় কিন্তু অহংকারে মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তি মনে করে আমিই সকল কর্মের কর্তা। তবে এর অন্তর্নিহিত অর্থ আরও গভীর। মানুষ যখন নিজের সাফল্যকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কৃতিত্ব বলে মনে করে তখন তার মধ্যে অহংকার জন্মায়। আবার ব্যর্থ হলে সে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়। কিন্তু যদি সে উপলব্ধি করতে পারে যে জীবনের প্রতিটি কর্ম অসংখ্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শক্তির সম্মিলিত ফল তবে তার মধ্যে বিনয়, কৃতজ্ঞতা এবং মানসিক স্থিতি জন্ম নেয়।

সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দর্শন অনুসারে পুরুষ এবং প্রকৃতি দুটি চিরন্তন সত্য। পুরুষ হলো চৈতন্য বা সাক্ষীস্বরূপ সত্তা এবং প্রকৃতি হলো সমস্ত পরিবর্তনশীল জগতের মূল শক্তি। সমস্ত কর্ম প্রকৃতির মাধ্যমে সংঘটিত হয় কিন্তু পুরুষ কেবল সেই কর্মের সাক্ষী। তাই আত্মা কখনো প্রকৃত অর্থে কর্তা নয়। যোগ দর্শনও একই শিক্ষা প্রদান করে। সেখানে বলা হয় মন, ইন্দ্রিয় এবং শরীর প্রকৃতির অংশ। আত্মা কেবল তাদের কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করে। অদ্বৈত বেদান্ত আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে আত্মা কখনোই কর্মে আবদ্ধ নয়। কর্তার ধারণা মায়াজাত এবং আত্মজ্ঞান লাভের মাধ্যমে এই ভ্রান্তি দূর হয়।

মনোবিজ্ঞানের আলোকে শ্লোকটির গুরুত্বও বিস্ময়কর। আধুনিক মনোবিজ্ঞান দেখায় যে মানুষের বহু সিদ্ধান্ত তার অবচেতন মন, জৈবিক প্রবণতা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং জিনগত বৈশিষ্ট্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে মানুষ যতটা স্বাধীন কর্তা বলে নিজেকে মনে করে বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি সে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। এই উপলব্ধি মানুষের অহংকার কমায় এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতা বৃদ্ধি করে।

প্রতীকী অর্থে প্রকৃতি সমগ্র সৃষ্টির গতিশীল শক্তির প্রতীক। গুণ মানুষের অন্তর্নিহিত মানসিক প্রবণতা ও চরিত্রের প্রতীক। অহংকার সীমাবদ্ধ আত্মপরিচয় এবং মিথ্যা স্বাধীনতার প্রতীক। বিমূঢ়তা সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থাকে নির্দেশ করে এবং কর্তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে। এই প্রতীকগুলোর মাধ্যমে শ্লোকটি শেখায় যে মানুষ যখন নিজেকে মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন একটি স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে কল্পনা করে তখনই তার দুঃখের সূচনা হয়। আর যখন সে উপলব্ধি করে যে সে মহাজাগতিক নিয়মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ তখন তার মধ্যে মুক্তি, শান্তি এবং জ্ঞানের বিকাশ ঘটে।

বাস্তব জীবনের একটি সহজ উদাহরণ এই শিক্ষাকে স্পষ্ট করে। একজন বিজ্ঞানী যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেন তখন সেটি কেবল তার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফল নয়। তার পূর্বসূরিদের জ্ঞান, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা, সমাজের অবদান, প্রাকৃতিক প্রতিভা, অনুকূল পরিবেশ এবং অসংখ্য অদৃশ্য সহায়তা সেই সাফল্যের পেছনে কাজ করে। তবুও মানুষ প্রায়ই মনে করে সবকিছু সে একাই করেছে। ঠিক তেমনি একটি নদীর ঢেউ যদি মনে করে যে সে নিজেই নদীকে প্রবাহিত করছে তবে সেটি যেমন বিভ্রম তেমনি মানুষও নিজের কর্তার অহংকারে একই ভুল করে।

এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব যখন সে উপলব্ধি করবে যে কর্মের প্রকৃত চালিকাশক্তি প্রকৃতি এবং তার গুণসমূহ। আত্মা সেই কর্মের চিরন্তন সাক্ষী মাত্র। অহংকার মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ রাখে এবং কর্তার ভ্রান্ত ধারণা জন্ম দেয়। কিন্তু আত্মজ্ঞান মানুষকে শেখায় যে সে মহাজাগতিক সৃষ্টির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উপলব্ধি মানুষের মধ্যে বিনয়, সমতা, কৃতজ্ঞতা এবং অন্তরের শান্তি প্রতিষ্ঠা করে। তাই এই শ্লোক কেবল কর্মতত্ত্বের শিক্ষা নয় বরং মানবজীবনের গভীরতম আত্মজ্ঞান ও মুক্তির পথের এক অনন্ত আলোকবর্তিকা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 08, 2026 August 08, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি