শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.২৮ | তত্ত্বজ্ঞানের মহত্ত্ব ও প্রকৃতির গুণ থেকে অনাসক্তির শিক্ষা
তত্ত্ববিত্তু মহাবাহো গুণকর্মবিভাগয়োঃ।
গুণা গুণেষু বর্তন্ত ইতি মত্বা ন সজ্জতে।।২৮।।
অনুবাদঃ হে মহাবাহো! তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি ভগবদ্ভক্তিমুখী কর্ম ও সকাম কর্মের পার্থক্য ভালভাবে অবগত হয়ে কখনও ইন্দ্রিয়সুখ ভোগাত্মক কার্যে প্রবৃত্ত হন না।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের এই শ্লোকে ব্যবহৃত তত্ত্ববিৎ শব্দটি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক তাৎপর্য বহন করে। শব্দটি সংস্কৃত তত্ত্ব এবং বিৎ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। তত্ত্ব শব্দটি তৎ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ সেই বা পরম সত্য এবং এর সঙ্গে ত্ব প্রত্যয় যুক্ত হয়ে এমন এক বাস্তবতাকে নির্দেশ করে যা অপরিবর্তনীয় এবং চিরন্তন। অপরদিকে বিৎ শব্দটি বিদ্ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জানা উপলব্ধি করা বা সত্যকে প্রত্যক্ষভাবে অনুধাবন করা। ফলে তত্ত্ববিৎ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হয় তত্ত্বের জ্ঞাতা অথবা যিনি বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছেন। এখানে জ্ঞান বলতে কেবল পুস্তকগত তথ্য নয় বরং আত্মানুভূতির মাধ্যমে অর্জিত সত্যের উপলব্ধিকে বোঝানো হয়েছে।
বাংলা ভাষায় তত্ত্ববিৎ শব্দের অর্থ তত্ত্বজ্ঞ সত্যদর্শী প্রকৃত জ্ঞানী আত্মজ্ঞ বা ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তি। তবে এই অর্থ কেবল সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের পরিচয় নয়। তত্ত্ববিৎ সেই ব্যক্তি যিনি বাহ্যিক রূপের আড়ালে নিহিত প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। তিনি জানেন যে মানুষের দেহ মন ইন্দ্রিয় এবং তাদের সমস্ত কার্যকলাপ প্রকৃতির অধীন। আত্মা এসব ক্রিয়ার কর্তা নয় বরং নীরব সাক্ষী। এই উপলব্ধিই তাঁকে অহংকার এবং আসক্তি থেকে মুক্ত রাখে।
গীতার আলোচ্য শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি উপলব্ধি করেন গুণসমূহই গুণসমূহের মধ্যে ক্রিয়াশীল। অর্থাৎ প্রকৃতির তিনটি গুণ সত্ত্ব রজঃ এবং তমঃ পরস্পরের প্রভাবে সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে। মানুষের শরীর মন বুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয় এই গুণত্রয়ের অধীন হওয়ায় তাদের মাধ্যমে কর্ম সংঘটিত হয়। কিন্তু আত্মা এসব কর্মের কর্তা নয়। তত্ত্ববিৎ ব্যক্তি এই সত্য হৃদয়ঙ্গম করেন বলেই তিনি নিজের মধ্যে কর্তার অহংকার সৃষ্টি করেন না এবং কোনো কর্মের ফলের প্রতিও আসক্ত হন না। তাঁর কাছে কর্ম কেবল প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহ মাত্র।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে তত্ত্ববিৎ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অদ্বৈত বেদান্তে তত্ত্ববিৎ সেই ব্যক্তি যিনি আত্মা ও ব্রহ্মের অভেদ উপলব্ধি করেছেন এবং জগতের সমস্ত ভেদাভেদকে মায়ার প্রকাশ হিসেবে দেখেন। সাংখ্য দর্শনে তত্ত্ববিৎ জানেন যে পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ এবং প্রকৃতি কর্মশীল। তাই তিনি উপলব্ধি করেন যে কর্ম করছে প্রকৃতি আর আত্মা কেবল দর্শক। যোগ দর্শনের ভাষায় তত্ত্ববিৎ হলেন সাক্ষীচৈতন্য যিনি মন এবং চিন্তার সঙ্গে নিজেকে একীভূত করেন না। বৌদ্ধ দর্শনের আলোকে তিনি এমন একজন যিনি অনিত্যতা উপলব্ধি করেছেন এবং জানেন যে সবকিছুই পরিবর্তনশীল।
এই শব্দটির গভীর তাৎপর্য মানবজীবনের জন্য অপরিসীম। সাধারণ মানুষ জীবনের সুখ দুঃখ লাভ ক্ষতি সম্মান অপমান সবকিছুকেই নিজের সঙ্গে একাত্ম করে দেখেন। ফলে তিনি আনন্দে উল্লসিত হন এবং দুঃখে ভেঙে পড়েন। কিন্তু তত্ত্ববিৎ ব্যক্তি জানেন যে এসব পরিবর্তন প্রকৃতির ধর্ম। আত্মা এসবের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। তাই তিনি সমদর্শী হন এবং জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে অন্তরের শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হন। তাঁর কাছে কর্ম কর্তব্যে পরিণত হয় কিন্তু সেই কর্মের ফল তাঁর চিত্তকে আবদ্ধ করতে পারে না।
প্রতীকী অর্থেও তত্ত্ববিৎ শব্দটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এটি জাগরণ প্রজ্ঞা অন্তর্দৃষ্টি এবং আত্মবিকাশের প্রতীক। সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতায় তত্ত্ববিৎ এমন একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি যিনি অন্ধকার থেকে আলোর পথে অগ্রসর হয়েছেন। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তিনি এমন এক পরিণত ব্যক্তিত্বের প্রতীক যিনি নিজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে চিনতে পেরেছেন এবং অহংকারের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছেন। ধর্মীয় পরিভাষায় ঋষি মুনি সিদ্ধপুরুষ এবং ব্রহ্মজ্ঞ সাধকের মধ্যে এই তত্ত্ববিৎ ভাবেরই প্রকাশ দেখা যায়।
বাস্তব জীবনেও তত্ত্ববিৎ ধারণাটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। যেমন আকাশে মেঘ আসে আবার চলে যায় কিন্তু আকাশ অপরিবর্তিত থাকে। তেমনি মানুষের মনে সুখ দুঃখ রাগ ভয় আশা নিরাশা একের পর এক উদিত হয় এবং বিলীন হয়ে যায় কিন্তু আত্মা অপরিবর্তিত থাকে। তত্ত্ববিৎ ব্যক্তি এই আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত থাকেন। আবার একজন দক্ষ অভিনেতা যেমন জানেন যে মঞ্চের চরিত্র তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয় তেমনি তত্ত্ববিৎ ব্যক্তি জানেন যে দেহ মন এবং সামাজিক পরিচয় তাঁর চূড়ান্ত সত্তা নয়। এই উপলব্ধিই তাঁকে আসক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত করে।
সার্বিকভাবে তত্ত্ববিৎ শব্দটি কেবল একজন জ্ঞানী মানুষকে নির্দেশ করে না বরং এমন এক উচ্চতম চেতনার প্রতীক যেখানে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে। ভাষাগতভাবে এটি সত্যের জ্ঞাতাকে নির্দেশ করে। দার্শনিকভাবে এটি আত্মজ্ঞান এবং ব্রহ্মজ্ঞানের পরিচায়ক। প্রতীকীভাবে এটি আলো প্রজ্ঞা মুক্তি এবং আত্মজাগরণের প্রতিরূপ। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোকে তত্ত্ববিৎ সেই মহান ব্যক্তিকে নির্দেশ করে যিনি উপলব্ধি করেছেন যে প্রকৃতির গুণসমূহই সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে এবং আত্মা কেবল নীরব সাক্ষী। এই উপলব্ধির ফলেই তিনি অহংকার আসক্তি এবং কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে সত্যিকারের শান্তি মুক্তি এবং পরম জ্ঞানের অধিকারী হন।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!