শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.২৯ | প্রকৃতির ত্রিগুণে মোহগ্রস্ত মানুষের আসক্তির গভীর রহস্য
প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ সজ্জন্তে গুণকর্মসু।
তানকৃৎস্নবিদো মন্দান্ কৃৎস্নবিন্ন বিচালয়েৎ।।২৯।।
অনুবাদঃ জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা মোহাচ্ছন্ন হয়ে, অজ্ঞান ব্যক্তিরা জাগতিক কার্যকলাপে প্রবৃত্ত হয়। কিন্তু তাদের কর্ম নিকৃষ্ট হলেও তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষেরা সেই মন্দবুদ্ধি ও অল্পজ্ঞ ব্যক্তিগণকে বিচলিত করেন না।
প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ শব্দটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক শব্দ, যা মানুষের মন, স্বভাব, কর্ম এবং আত্মস্বরূপ সম্পর্কে গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। শব্দটি সংস্কৃত প্রকৃতি, গুণ এবং সংমূঢ় এই তিনটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। প্রকৃতি শব্দটির উৎপত্তি প্র উপসর্গ এবং কৃ ধাতু থেকে, যার অর্থ সৃষ্টি করা, প্রকাশ করা বা স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হওয়া। প্রকৃতি বলতে এখানে সমগ্র জড়জগৎ, মানবদেহ, মন, ইন্দ্রিয় এবং সমস্ত পরিবর্তনশীল সৃষ্টির মূল শক্তিকে বোঝানো হয়েছে। গুণ শব্দের প্রাচীন অর্থ দড়ি বা বন্ধন হলেও দর্শনের ভাষায় এটি প্রকৃতির তিনটি মৌলিক শক্তি অর্থাৎ সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃকে নির্দেশ করে। সংমূঢ় শব্দটি মুহ্ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বিভ্রান্ত বা মোহাচ্ছন্ন হওয়া। সম উপসর্গ যুক্ত হওয়ার ফলে এর অর্থ দাঁড়ায় সম্পূর্ণভাবে মোহগ্রস্ত বা গভীরভাবে বিভ্রান্ত। এই তিনটি অংশ একত্রে প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় যারা প্রকৃতির ত্রিগুণের প্রভাবে সম্পূর্ণভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে নিজেদের প্রকৃত স্বরূপকে ভুলে গেছে।
বাংলা অর্থে প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ বলতে বোঝায় প্রকৃতির গুণে আবিষ্ট মানুষ, প্রকৃতির প্রভাবে বিভ্রান্ত ব্যক্তি, স্বভাবগত প্রবৃত্তিতে আবদ্ধ জীব অথবা জড়প্রকৃতির প্রভাবে সত্যচেতনা হারিয়ে ফেলা মানুষ। আক্ষরিক অর্থে এটি সেইসব ব্যক্তিকে নির্দেশ করে যারা প্রকৃতির তিন গুণের কার্যকলাপকেই নিজের ইচ্ছা, নিজের কর্ম এবং নিজের পরিচয় বলে মনে করে। তারা উপলব্ধি করতে পারে না যে তাদের রাগ, লোভ, ভয়, আসক্তি, অহংকার কিংবা অলসতা আসলে প্রকৃতির গুণের প্রকাশ মাত্র। তারা মনে করে আমি করছি, আমি সফল হচ্ছি, আমি ব্যর্থ হচ্ছি কিংবা আমি সুখী ও দুঃখী হচ্ছি। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো প্রকৃতপক্ষে গুণই গুণের মধ্যে ক্রিয়া করে এবং আত্মা সেই সমস্ত ক্রিয়ার সাক্ষীমাত্র।
এই শব্দটির প্রাসঙ্গিক অর্থ কর্মযোগের আলোচনায় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ নিজের স্বভাব, অভ্যাস এবং মানসিক প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত হলেও সে মনে করে তার সমস্ত সিদ্ধান্তই সম্পূর্ণ স্বাধীন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চান যে প্রকৃতির গুণসমূহ মানুষের চিন্তা, অনুভূতি এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। যে ব্যক্তি এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে না, সে কর্মে আসক্ত হয় এবং ফলের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। অপরদিকে জ্ঞানী ব্যক্তি বুঝতে পারেন যে প্রকৃতির গুণসমূহই সমস্ত কার্য সম্পাদন করছে, তাই তিনি কর্ম করেন কিন্তু কর্মে আবদ্ধ হন না। এই উপলব্ধিই কর্মযোগের অন্যতম ভিত্তি।
মনোবিজ্ঞানের আলোকে প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ শব্দটির একটি বিস্ময়কর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আধুনিক মনোবিজ্ঞানে মানুষের আচরণকে অনেকাংশে অবচেতন অভ্যাস, পরিবেশ, শিক্ষা এবং মানসিক শর্তায়নের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। একজন মানুষ বহু সময় নিজের অভ্যাস, আবেগ এবং মানসিক প্রতিক্রিয়াকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় বলে ধরে নেয়। কিন্তু বাস্তবে সে তার মানসিক গঠন এবং দীর্ঘদিনের অভ্যাসের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই অবস্থাই গীতার ভাষায় প্রকৃতির গুণে মোহাচ্ছন্ন হওয়া। মানুষ যদি নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে তবে সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে সে তার রাগ নয়, লোভ নয়, ভয় নয়, বরং এই সমস্ত অনুভূতির সাক্ষী।
এই শব্দটির গভীর তাৎপর্য মানুষের আত্মবিকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। মানুষ সাধারণত তিনটি স্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। প্রথম স্তরে সে গুণের অধীন। সেখানে রাগ এলে সে রেগে যায়, লোভ এলে লোভী হয়ে ওঠে এবং কামনা জাগলে তার অনুসরণ করে। দ্বিতীয় স্তরে সে নিজের মনকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখে এবং বুঝতে পারে যে তার মধ্যে রাগ, ভয় কিংবা আকাঙ্ক্ষা উদিত হচ্ছে, কিন্তু সেগুলোই তার প্রকৃত পরিচয় নয়। তৃতীয় স্তরে সে উপলব্ধি করে যে প্রকৃতির গুণসমূহ নিজেদের মধ্যেই ক্রিয়াশীল এবং আত্মা সেই সমস্ত ঘটনার নীরব সাক্ষী। এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই মানুষ ধীরে ধীরে গুণের বন্ধন অতিক্রম করে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়।
দার্শনিক অর্থে প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ শব্দটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাংখ্য দর্শন অনুযায়ী সমগ্র বিশ্ব দুটি চিরন্তন তত্ত্বের সমন্বয়ে গঠিত। একটি হলো পুরুষ, যা চৈতন্য এবং অপরিবর্তনীয় সত্য। অন্যটি হলো প্রকৃতি, যা পরিবর্তনশীল এবং ত্রিগুণময়। প্রকৃতের্গুণসংমূঢ় ব্যক্তি এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে পারে না। সে চৈতন্যকে জড়ের সঙ্গে একীভূত করে ফেলে এবং নিজের প্রকৃত স্বরূপকে ভুলে যায়। বেদান্ত দর্শন এই অবস্থাকে অবিদ্যা বা অজ্ঞান বলে ব্যাখ্যা করে। মানুষের প্রকৃত পরিচয় আত্মা হলেও সে দেহ, মন এবং ইন্দ্রিয়কেই নিজের পরিচয় মনে করে। অদ্বৈত বেদান্তে একে অধ্যাস বলা হয়, অর্থাৎ যা নিজের নয় তাকেই নিজের বলে মনে করা। এই ভ্রান্তিই সমস্ত দুঃখ এবং বন্ধনের মূল কারণ।
প্রতীকী অর্থে প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ শব্দটি মানুষের আধ্যাত্মিক অবস্থার একটি শক্তিশালী রূপক। যেমন মেঘ সূর্যের আলোকে আড়াল করে কিন্তু সূর্যকে কখনো স্পর্শ করতে পারে না, তেমনি প্রকৃতির গুণসমূহ আত্মার জ্যোতিকে আচ্ছন্ন করে রাখে কিন্তু আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে পরিবর্তন করতে পারে না। আবার সুতোয় বাঁধা পুতুল যেমন নিজেকে স্বাধীন নৃত্যশিল্পী মনে করলে তা বিভ্রান্তি হবে, তেমনি মানুষও যদি প্রকৃতির প্রভাবে সংঘটিত কর্মকে নিজের স্বাধীন কর্ম বলে মনে করে তবে সেটিই প্রকৃতের্গুণসংমূঢ় অবস্থার প্রকাশ। একজন অভিনেতা যদি অভিনয়ের চরিত্রকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় মনে করতে শুরু করে তবে সে যেমন বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হয়, তেমনি মানুষও দেহ ও মনের পরিচয়ে আবদ্ধ হয়ে আত্মস্বরূপকে বিস্মৃত হয়।
বাস্তব জীবনে এর বহু উদাহরণ দেখা যায়। একজন ব্যক্তি যদি বলেন তিনি স্বভাবগতভাবে রাগী, তবে গীতার শিক্ষা অনুযায়ী রাগ তার চিরন্তন পরিচয় নয়। রাগ একটি সাময়িক মানসিক অবস্থা যা প্রকৃতির নির্দিষ্ট গুণের প্রকাশ। আবার কেউ যদি সাফল্যে অহংকারে ভরে ওঠেন অথবা ব্যর্থতায় নিজেকে সম্পূর্ণ মূল্যহীন মনে করেন, তবে তিনিও প্রকৃতির গুণের প্রভাবে নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে যাচ্ছেন। আত্মজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষ উপলব্ধি করতে শেখে যে সুখ, দুঃখ, লাভ, ক্ষতি, প্রশংসা কিংবা নিন্দা সবই পরিবর্তনশীল এবং এগুলোর কোনোটিই তার প্রকৃত সত্তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, প্রকৃতের্গুণসংমূঢ়াঃ শব্দটি কেবল একটি ব্যাকরণগত বা দার্শনিক পরিভাষা নয়, বরং মানবজীবনের গভীরতম বাস্তবতার এক অনন্য প্রকাশ। ভাষাগতভাবে এটি প্রকৃতির ত্রিগুণ দ্বারা মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তিকে নির্দেশ করে। দার্শনিকভাবে এটি আত্মা এবং প্রকৃতির পার্থক্য না বোঝার অবস্থাকে প্রকাশ করে। মনোবৈজ্ঞানিকভাবে এটি মানুষের অভ্যাস, প্রবৃত্তি এবং অবচেতন প্রভাবের অধীন অবস্থার প্রতীক। আধ্যাত্মিকভাবে এটি সেই জীবনের চিত্র, যেখানে মানুষ নিজের অন্তর্নিহিত চৈতন্যকে ভুলে জড়প্রকৃতির খেলায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো এই মোহকে জ্ঞান, আত্মসচেতনতা এবং অনাসক্ত কর্মের মাধ্যমে অতিক্রম করে নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে উপলব্ধি করা। সেই উপলব্ধিই মানুষকে প্রকৃত স্বাধীনতা, শান্তি এবং মুক্তির পথে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!