শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.৩২ | ঈশ্বরীয় জ্ঞান অস্বীকারের পরিণতি ও আত্মবোধের পতন
যে ত্বেতদভ্যসূয়ন্তো নানুতিষ্ঠন্তি মে মতম্।
সর্বজ্ঞানবিমূঢ়াংস্তান্ বিদ্ধি নষ্টানচেতসঃ।।৩২।।
অনুবাদঃ কিন্তু যারা অসূয়াপূূর্বক আমার এই উপদেশ পালন করে না, তাদেরকে সমস্ত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত, বিমূঢ় এবং পরমার্থ লাভের সকল প্রচেষ্টা থেকে ভ্রষ্ট বলে জানবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের বত্রিশতম শ্লোক মানবচরিত্রের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক সত্যকে উন্মোচন করে। শ্লোকটি হলো যে ত্বেতদভ্যসূয়ন্তো নানুতিষ্ঠন্তি মে মতম্ সর্বজ্ঞানবিমূঢ়াংস্তান্ বিদ্ধি নষ্টানচেতসঃ। এখানে শ্রীকৃষ্ণ এমন মানুষের কথা বলেছেন যারা বিদ্বেষ, অহংকার কিংবা সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে ঈশ্বরীয় সত্য ও ধর্মময় জীবনদর্শনকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ ভাষাতাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে গভীর অর্থ বহন করে এবং মানুষের জ্ঞান, বিবেক ও আত্মিক বিকাশের প্রকৃত ভিত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে।
শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ অভ্যসূয়ন্তঃ। এই শব্দটি সংস্কৃত অসূয়া শব্দ থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ঈর্ষা করা, দোষ খোঁজা বা বিদ্বেষ পোষণ করা। এর সঙ্গে অভি উপসর্গ যুক্ত হয়ে অর্থকে আরও গভীর করেছে। এখানে সাধারণ সমালোচনা বোঝানো হয়নি বরং এমন এক মানসিক অবস্থার কথা বলা হয়েছে যেখানে ব্যক্তি অহংকার বা বিদ্বেষের কারণে সত্যকে গ্রহণ না করে বরং তার মধ্যে ত্রুটি অনুসন্ধান করে। এই মনোভাব মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং আত্মিক উন্নতির পথ রুদ্ধ করে। নানুতিষ্ঠন্তি শব্দটি অনু এবং স্থা ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত যার অর্থ অনুসরণ করা বা পালন করা। অর্থাৎ যারা ঈশ্বরের উপদেশ শুনেও তা জীবনে বাস্তবায়ন করে না তাদের কথাই এখানে বলা হয়েছে। মে মতম্ বলতে বোঝানো হয়েছে শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা, ধর্মনীতি বা ঈশ্বরপ্রদত্ত জীবনদর্শন। এটি কেবল ব্যক্তিগত মত নয় বরং মানবকল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত এক চিরন্তন নৈতিক আদর্শ।
সর্বজ্ঞানবিমূঢ়ান্ শব্দটি একটি গভীর যৌগিক শব্দ। এটি সর্ব, জ্ঞান এবং বিমূঢ় এই তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। এর অর্থ এমন ব্যক্তি যে নানা প্রকার জ্ঞান অর্জন করেও প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। এখানে অজ্ঞতার অর্থ তথ্যের অভাব নয় বরং সঠিক জ্ঞানকে গ্রহণ করতে না পারার মানসিক অক্ষমতা। নষ্টানচেতসঃ শব্দটি নষ্ট এবং চেতস এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ এমন ব্যক্তি যার বিবেক, বিচারবোধ এবং অন্তর্দৃষ্টি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। বাহ্যিকভাবে সে জ্ঞানী, শিক্ষিত কিংবা অভিজ্ঞ হতে পারে কিন্তু অন্তরের আলোক নিভে গেলে সেই জ্ঞান তার জীবনকে আলোকিত করতে পারে না।
বাংলা অর্থে এই শ্লোকের সারমর্ম হলো যারা বিদ্বেষবশত ঈশ্বরের উপদেশ অনুসরণ করে না তাদের সর্বপ্রকার জ্ঞানে বিভ্রান্ত এবং বিবেকহীন বলে জানা উচিত। আক্ষরিক অর্থে এটি এমন মানুষের পরিচয় দেয় যারা সত্যকে জানার সুযোগ পেয়েও তা গ্রহণ করে না। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা আরও গভীর। এখানে শ্রীকৃষ্ণ বোঝাতে চেয়েছেন যে মানুষের প্রকৃত পতনের কারণ জ্ঞানের অভাব নয় বরং সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা। যখন অহংকার, ঈর্ষা কিংবা সংকীর্ণতা মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে তখন সে সত্যের সামনে দাঁড়িয়েও তাকে চিনতে পারে না।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বেদান্ত দর্শনে অবিদ্যা বা অজ্ঞতা বলতে কেবল তথ্য না জানা বোঝায় না বরং আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে না পারাকে বোঝায়। এই শ্লোকের সর্বজ্ঞানবিমূঢ় ব্যক্তি সেই মানুষ যার বাহ্যিক জ্ঞান প্রচুর কিন্তু আত্মজ্ঞান অনুপস্থিত। সাংখ্য দর্শনের আলোকে বলা যায় যে প্রকৃতি এবং পুরুষের প্রকৃত ভেদ বুঝতে না পারার ফলেই মোহ সৃষ্টি হয় এবং মানুষ সত্য থেকে বিচ্যুত হয়। অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা এবং তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মানুষ সত্য জানার সুযোগ পেয়েও যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে তবে সেই সিদ্ধান্তের দায়ভার তাকেই বহন করতে হয়।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। এখানে শ্রীকৃষ্ণ পরম সত্যের প্রতীক। তাঁর মত বা উপদেশ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক নিয়মের প্রতীক। অভ্যসূয়া মানুষের অহংকার এবং সংকীর্ণ মানসিকতার প্রতীক যা সত্যকে গ্রহণ করতে বাধা দেয়। সর্বজ্ঞানবিমূঢ়তা প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় সেই অবস্থার যেখানে মানুষ জ্ঞানের আলোয় থেকেও অন্তরে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। নষ্টানচেতসঃ প্রতীক এমন এক চেতনার যা নিজের অহংকারের কারণে আত্মবিনাশের পথে এগিয়ে যায়।
বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন চিকিৎসক যদি রোগীকে ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ করার পরামর্শ দেন কিন্তু রোগী অহংকার বা অবহেলার কারণে তা না মানে তবে তার রোগ আরও বৃদ্ধি পায়। এখানে চিকিৎসকের জ্ঞান নয় বরং রোগীর মানসিক প্রতিবন্ধকতাই তার ক্ষতির কারণ হয়। একইভাবে একজন ছাত্র যদি শিক্ষকের উপদেশকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের অহংকারে পরিচালিত হয় তবে তার শিক্ষাজীবন ব্যর্থ হতে পারে। ইতিহাসেও দেখা যায় যে বহু শক্তিশালী ব্যক্তি সঠিক পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজের পতন ডেকে এনেছেন। মহাভারতের দুর্যোধন এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি ধর্ম সম্পর্কে অবগত ছিলেন কিন্তু অহংকার এবং ঈর্ষার কারণে সেই জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করতে পারেননি। ফলস্বরূপ তার জ্ঞান তাকে রক্ষা করতে পারেনি।
এই শ্লোক আমাদের শেখায় যে সত্যকে জানা এবং সত্যকে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। মানুষ অনেক সময় বিপুল জ্ঞান অর্জন করেও আত্মিকভাবে অপরিণত থেকে যায় কারণ তার অন্তরে বিনয়, গ্রহণযোগ্যতা এবং সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে না। জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল তথ্য সঞ্চয় নয় বরং চরিত্র, বিবেক এবং জীবনকে আলোকিত করা। তাই অহংকার, বিদ্বেষ এবং সংকীর্ণতা যতক্ষণ মানুষের অন্তরে অবস্থান করবে ততক্ষণ প্রকৃত জ্ঞান লাভ অসম্ভব।
সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যের শিক্ষা দেয়। ভাষাগতভাবে এটি গভীর অর্থবহ যৌগিক শব্দের মাধ্যমে মানুষের মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছে। দার্শনিকভাবে এটি জানিয়ে দেয় যে আত্মজ্ঞান ছাড়া বাহ্যিক জ্ঞান অসম্পূর্ণ। প্রতীকীভাবে এটি শিক্ষা দেয় যে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের অন্ধকার নয় বরং নিজের অহংকার এবং বিদ্বেষ। তাই যে ব্যক্তি বিনয়ের সঙ্গে সত্যকে গ্রহণ করে এবং জীবনকে ধর্মময় আদর্শের আলোকে পরিচালিত করে সেই প্রকৃত জ্ঞানী। আর যে ব্যক্তি অহংকারের কারণে সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে সে অসংখ্য জ্ঞান অর্জন করেও অন্তরে বিভ্রান্ত এবং চেতনায় পথভ্রষ্ট হয়ে থাকে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!