সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.৩৩ | স্বভাব ও প্রকৃতির প্রভাব থেকে মানবআচরণের গভীর রহস্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রকৃতের্জ্ঞানবানপি। প্রকৃতিং যান্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি।।৩৩।।
সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রকৃতের্জ্ঞানবানপি। 
প্রকৃতিং যান্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি।।৩৩।।

অনুবাদঃ জ্ঞানবান ব্যক্তিও তাঁর স্বভাব অনুসারে কার্য করেন, কারণ প্রত্যেকেই ত্রিগুণজাত তাঁর স্বীয় স্বভাবকে অনুগমন করেন। সুতরাং নিগ্রহ করে কি লাভ হবে?

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের তেত্রিশতম শ্লোক মানবস্বভাব এবং আচরণের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রকৃতের্জ্ঞানবানপি। প্রকৃতিং যান্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে জ্ঞান অর্জন করলেও মানুষ তার সহজাত প্রকৃতির প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারে না। প্রত্যেক জীব তার নিজস্ব স্বভাব এবং প্রকৃতির অনুসারেই আচরণ করে। তাই কেবল বাহ্যিকভাবে দমন বা জোরপূর্বক সংযম আরোপ করে প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ সদৃশং যার অর্থ অনুরূপভাবে অথবা নিজের প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। শব্দটি সংস্কৃত স এবং দৃশ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে এমন একটি ভাব নিহিত রয়েছে যা নির্দেশ করে যে প্রতিটি কাজ মানুষের অন্তর্নিহিত স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে প্রকাশিত হয়। চেষ্টতে শব্দটি এসেছে চেষ্টা বা চেষ্ট ধাতু থেকে যার অর্থ আচরণ করা কর্ম করা অথবা সক্রিয় হওয়া। অর্থাৎ মানুষের সকল কর্ম তার অন্তর্গত প্রকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ। স্বস্যাঃ অর্থ নিজের এবং প্রকৃতেঃ শব্দটি প্র উপসর্গ ও কৃ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত যার অর্থ মূল স্বভাব মৌলিক গঠন অথবা সহজাত প্রকৃতি। জ্ঞানবান অর্থ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি এবং নিগ্রহ অর্থ জোরপূর্বক দমন বা নিয়ন্ত্রণ। এই শব্দগুলোর সমন্বয়ে শ্লোকটি এমন এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ করে যে জ্ঞানী ব্যক্তিও নিজের প্রকৃতির প্রভাবমুক্ত হয়ে আচরণ করতে পারেন না এবং সকল জীবই তাদের স্বভাবের দিকেই স্বাভাবিকভাবে অগ্রসর হয়।

বাংলা অর্থে এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষ তার অন্তর্নিহিত স্বভাব অনুযায়ী কাজ করে। জ্ঞান অর্জন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাস প্রবৃত্তি এবং সংস্কারকে মুহূর্তের মধ্যে পরিবর্তন করে না। তাই কেবল বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। আক্ষরিক অর্থেও শ্লোকটি একই শিক্ষা দেয় যে জ্ঞানী ব্যক্তিও নিজের প্রকৃতির মতোই আচরণ করেন এবং সমস্ত জীব তাদের নিজস্ব প্রকৃতির অনুসরণ করে। ফলে নিছক দমন বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের দ্বারা মানুষের স্বভাবকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করা যায় না।

এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা আধুনিক জীবনেও অত্যন্ত গভীর। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের ব্যক্তিত্ব অভ্যাস প্রবৃত্তি এবং অবচেতন মন তার আচরণকে পরিচালিত করে। একজন ব্যক্তি যদি জন্মগতভাবে শিল্পপ্রবণ হন তবে তাকে জোর করে অন্য কোনো পথে পরিচালিত করা গেলেও তার প্রকৃত সৃজনশীলতা বারবার প্রকাশ পাবে। একইভাবে যিনি সেবামূলক কাজে আনন্দ পান তাকে কেবল বাহ্যিক চাপ দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করা কঠিন। মানুষের প্রকৃতি তার চিন্তা অনুভূতি সিদ্ধান্ত এবং কর্মের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো জ্ঞান এবং রূপান্তর এক নয়। কোনো বিষয় সম্পর্কে জেনে যাওয়া মানেই সেই অনুযায়ী জীবনযাপন করা নয়। একজন ব্যক্তি ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থাকতে পারেন তবুও বহু বছরের অভ্যাস তাকে সেই কাজ থেকে বিরত থাকতে দেয় না। কারণ জ্ঞান মস্তিষ্ককে আলোকিত করে কিন্তু প্রকৃত রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন আত্মসংযম নিয়মিত অনুশীলন এবং অন্তরের পরিবর্তন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই বোঝাতে চেয়েছেন যে কেবল দমন নয় বরং প্রকৃতিকে শুদ্ধ এবং রূপান্তরিত করাই প্রকৃত সাধনা।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক সাংখ্য এবং বেদান্ত উভয় দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাংখ্য দর্শনে বলা হয়েছে যে সমগ্র জগৎ সত্ত্ব রজ এবং তম এই তিন গুণের দ্বারা পরিচালিত হয়। মানুষের আচরণও এই গুণত্রয়ের প্রভাবে নির্ধারিত হয়। বেদান্ত দর্শন আবার শিক্ষা দেয় যে আত্মা চিরমুক্ত এবং অপরিবর্তনীয় হলেও দেহ ও মন প্রকৃতির অধীন। তাই জ্ঞান অর্জনের পরও দেহ ও মনের পুরোনো প্রবণতা কিছু সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকে। এই কারণেই আধ্যাত্মিক সাধনায় ধৈর্য অধ্যবসায় এবং আত্মপর্যবেক্ষণের ওপর এত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতীকী অর্থে প্রকৃতি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি এবং সহজাত প্রবণতার প্রতীক। নিগ্রহ প্রতীক বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ এবং জোরপূর্বক দমনের। জ্ঞানবান প্রতীক সচেতনতা এবং আত্মউপলব্ধির। শ্লোকটি প্রতীকী ভাষায় জানিয়ে দেয় যে একটি বীজকে জোর করে বড় করা যায় না। তাকে উপযুক্ত পরিবেশ জল আলো এবং পরিচর্যা দিতে হয়। তখন তার অন্তর্নিহিত শক্তিই তাকে ধীরে ধীরে পূর্ণ বিকাশের দিকে নিয়ে যায়। একইভাবে মানুষের চরিত্রও জোর করে নয় বরং সঠিক শিক্ষা আত্মশুদ্ধি এবং ধারাবাহিক সাধনার মাধ্যমে বিকশিত হয়।

বাস্তব জীবনে এই সত্যের অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একটি নদীর স্বভাব হলো সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হওয়া। কিছু সময়ের জন্য বাঁধ দিয়ে তার প্রবাহ রোধ করা গেলেও সুযোগ পেলেই সে আবার নিজের স্বাভাবিক গতিপথে ফিরে আসে। একজন সৃজনশীল শিশু যদি দীর্ঘদিন নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ না পায় তবুও অনুকূল পরিবেশ পেলে তার সেই স্বভাব পুনরায় প্রকাশিত হয়। ইতিহাসে গৌতম বুদ্ধের জীবনও এই সত্যের উজ্জ্বল উদাহরণ। রাজকীয় ভোগবিলাসের মধ্যে থেকেও তাঁর অন্তরের সত্য অনুসন্ধানের প্রবণতা দমন করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত সেই সহজাত আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে জ্ঞানলাভের পথে পরিচালিত করেছিল।

সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক মানবজীবনের এক চিরন্তন বাস্তবতার শিক্ষা দেয়। মানুষ তার সহজাত প্রকৃতির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয় এবং জ্ঞান অর্জন সেই প্রকৃতিকে বুঝতে সাহায্য করলেও তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করতে পারে না। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন আত্মজ্ঞান আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘ সাধনা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই আমাদের শিক্ষা দেন যে মানুষের প্রকৃতিকে দমন নয় বরং বুঝে তাকে শুদ্ধ ও উন্নত করার মধ্যেই প্রকৃত মুক্তি নিহিত রয়েছে। এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় নয় বরং ভাষাতাত্ত্বিক দার্শনিক মনোবৈজ্ঞানিক এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সমানভাবে গভীর ও সর্বকালীন সত্য।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 08, 2026 August 08, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি