শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.৩৪ | ইন্দ্রিয়ের রাগদ্বেষ ও আত্মসংযমের গভীর শিক্ষা
ইন্দ্রিয়স্যেন্দ্রিয়স্যার্থে রাগদ্বেষৌ ব্যবস্থিতৌ।
তয়োর্ন বশমাগচ্ছেৎ তৌ হ্যস্য পরিপন্থিনৌ।।৩৪।।
অনুবাদঃ সমস্ত জীবই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুতে আসক্তি অথবা বিরক্তি অনুভব করে, কিন্তু এভাবে ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের বশীভূত হওয়া উচিত নয়, কারণ তা পারমার্থিক প্রগতির পথে প্রতিবন্ধক।
ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের চৌত্রিশতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের মন, ইন্দ্রিয় এবং আত্মোন্নতির পথে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন যে প্রত্যেক ইন্দ্রিয়ের নিজস্ব বিষয়ের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই রাগ অর্থাৎ আকর্ষণ এবং দ্বেষ অর্থাৎ বিরাগ বিদ্যমান থাকে। কিন্তু মানুষ যেন এই দুই প্রবৃত্তির বশবর্তী না হয়, কারণ এগুলোই তার কল্যাণ, জ্ঞান এবং মুক্তির পথে প্রধান অন্তরায়। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যেই মানবমনের গভীর মনস্তত্ত্ব, নৈতিক শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য নির্দেশনা নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ইন্দ্রিয়। সংস্কৃত ইন্দ্র শব্দ থেকে ইন্দ্রিয় শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ শক্তি, সামর্থ্য বা নিয়ন্ত্রণক্ষমতা। ইন্দ্রিয় বলতে সেই সমস্ত মাধ্যমকে বোঝায় যার মাধ্যমে মানুষ বাইরের জগতকে উপলব্ধি করে। চোখ রূপ দেখে, কান শব্দ শোনে, নাক গন্ধ গ্রহণ করে, জিহ্বা স্বাদ অনুভব করে এবং ত্বক স্পর্শ উপলব্ধি করে। প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের নিজস্ব একটি বিষয় রয়েছে, যাকে বলা হয় ইন্দ্রিয়ার্থ। অর্থ শব্দটির উৎপত্তি অর্থ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, বস্তু বা কাম্য বিষয়। তাই ইন্দ্রিয়ার্থ বলতে বোঝায় ইন্দ্রিয়ের ভোগ্য বিষয়। চোখের জন্য রূপ, কানের জন্য শব্দ, জিহ্বার জন্য স্বাদ, নাকের জন্য গন্ধ এবং ত্বকের জন্য স্পর্শই হলো তাদের নিজ নিজ অর্থ বা বিষয়।
শ্লোকে ব্যবহৃত রাগ শব্দটির উৎপত্তি রঞ্জ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ রঞ্জিত করা, রঙিন করা বা আকৃষ্ট করা। এই অর্থ থেকেই রাগ বলতে এমন মানসিক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে যেখানে মন কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা অভিজ্ঞতার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অন্যদিকে দ্বেষ শব্দটি দ্বিষ্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ঘৃণা করা, অপছন্দ করা বা বিরূপ মনোভাব পোষণ করা। রাগ যেমন মানুষকে কোনো কিছুর দিকে টেনে নিয়ে যায়, তেমনি দ্বেষ মানুষকে কোনো কিছুর থেকে দূরে ঠেলে দেয়। এই দুই বিপরীত প্রবণতা মানুষের মানসিক জগতকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। শ্লোকে ব্যবস্থিতৌ শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে এই দুই প্রবৃত্তি মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির মধ্যেই অবস্থান করে। এগুলো বাহ্যিকভাবে আরোপিত নয়, বরং জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠে। পরিপন্থিনৌ শব্দটির অর্থ পথরোধকারী বা অগ্রগতির অন্তরায়। এখানে রাগ ও দ্বেষকে আত্মোন্নতির পথের দুই প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আক্ষরিক অর্থে এই শ্লোকের বক্তব্য অত্যন্ত সরল। প্রত্যেক ইন্দ্রিয়ের নিজস্ব বিষয়ের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণ এবং বিরাগ জন্মায়। কিন্তু মানুষ যদি এই আকর্ষণ বা বিরাগের দাস হয়ে পড়ে, তবে সে তার প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই মানুষকে সতর্ক করে বলেছেন যে রাগ এবং দ্বেষকে অনুভব করা স্বাভাবিক হলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে নিজেকে সমর্পণ করা উচিত নয়।
প্রাসঙ্গিক অর্থে এই শ্লোকের শিক্ষা মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার অধিকাংশই ভালো লাগা এবং খারাপ লাগার দ্বারা পরিচালিত হয়। যেটিকে সে পছন্দ করে তার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ে এবং যেটিকে অপছন্দ করে তার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। এই দুই প্রবণতা বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ফলে মানুষ অনেক সময় সত্যকে নয়, নিজের পছন্দ এবং অপছন্দকে অনুসরণ করে। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও রাগ ও দ্বেষ মানুষের নিরপেক্ষ বিচারকে দুর্বল করে দেয়। তাই গীতার শিক্ষা হলো মানুষের সিদ্ধান্ত যেন আবেগের বশে নয়, বরং বিবেক ও প্রজ্ঞার আলোকে পরিচালিত হয়।
এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের প্রকৃত শত্রু বাইরের কোনো ব্যক্তি বা বস্তু নয়, বরং নিজের অন্তরের আসক্তি এবং বিদ্বেষ। মানুষ সাধারণত মনে করে কোনো বস্তু তাকে সুখী করবে অথবা কোনো ব্যক্তি তার দুঃখের কারণ। কিন্তু বাস্তবে সুখ বা দুঃখের মূল কারণ সেই বস্তু বা ব্যক্তি নয়, বরং তাদের প্রতি মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়া। রাগ মানুষকে বলে যে নির্দিষ্ট কোনো বস্তু বা ব্যক্তি ছাড়া সুখ সম্ভব নয়। আবার দ্বেষ মানুষকে বিশ্বাস করায় যে কোনো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি থাকলে সুখ অসম্ভব। এই দুই ধারণাই মানুষকে স্বাধীনতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসে যখন মানুষ নিজের পছন্দ এবং অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবতাকে যেমন আছে তেমনভাবে গ্রহণ করতে শেখে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের ব্যাখ্যা অত্যন্ত গভীর। সাংখ্য দর্শন অনুযায়ী রাগ এবং দ্বেষ প্রকৃতির গুণের বিকার মাত্র। আত্মা এসবের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে এবং কেবল সাক্ষীর ভূমিকা পালন করে। যোগ দর্শনে রাগ ও দ্বেষকে মানুষের দুঃখের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। এগুলো মনকে অস্থির করে, ধ্যানকে ব্যাহত করে এবং আত্মজ্ঞান অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। বেদান্ত দর্শন শিক্ষা দেয় যে মানুষ তার মন, ইন্দ্রিয় বা আবেগ নয়। তার প্রকৃত পরিচয় হলো চিরশুদ্ধ, চিরমুক্ত আত্মা। যখন মানুষ উপলব্ধি করতে পারে যে রাগ এবং দ্বেষ কেবল মনের অস্থায়ী তরঙ্গ, তখন সে তাদের দ্বারা আর পরিচালিত হয় না। বৌদ্ধ দর্শনেও তৃষ্ণা এবং বিদ্বেষকে দুঃখের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এইভাবে বিভিন্ন দর্শন একই মৌলিক সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে যে আকর্ষণ এবং বিরাগ উভয়ই মানুষের মুক্তির পথে অন্তরায়।
প্রতীকী অর্থে রাগ এবং দ্বেষ মানুষের অন্তর্জগতের দুই বিপরীত শক্তির প্রতীক। একদিকে আকর্ষণ মানুষকে টেনে নিয়ে যায়, অন্যদিকে বিরাগ তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে মন সর্বদা এক অস্থির দোলাচলের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এই দুই প্রবণতা মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, পক্ষপাত এবং মানসিক অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আধ্যাত্মিক অর্থে রাগ এবং দ্বেষ এমন দুই প্রহরীর মতো যারা আত্মজ্ঞান অর্জনের পথ রুদ্ধ করে রাখে। যতক্ষণ মানুষ এই দুই শক্তিকে অতিক্রম করতে না পারে, ততক্ষণ সে প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় না।
বাস্তব জীবনের অসংখ্য উদাহরণ এই শিক্ষাকে স্পষ্ট করে। একজন ব্যক্তি যদি প্রশংসার প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ে, তবে সমালোচনা শুনলেই সে ভেঙে পড়বে। আবার কেউ যদি কোনো ব্যক্তির প্রতি গভীর বিদ্বেষ পোষণ করে, তবে তার সব ভালো কাজও তার চোখে মূল্যহীন মনে হবে। একইভাবে মহাভারতে দুর্যোধনের পাণ্ডবদের প্রতি বিদ্বেষ এবং রাজ্যের প্রতি অন্ধ আসক্তিই শেষ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের ভয়াবহ যুদ্ধ ও তার নিজের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিপরীতভাবে যে ব্যক্তি নিজের মনকে সংযত রাখতে পারে এবং রাগ ও দ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায় ও সত্যকে অনুসরণ করে, সে জীবনে অধিক শান্তি, স্থিতি এবং প্রজ্ঞা লাভ করে।
সবশেষে বলা যায় যে এই শ্লোক মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন নির্দেশনা। ভাষাগতভাবে এটি ইন্দ্রিয়, রাগ, দ্বেষ এবং আত্মসংযমের গভীর অর্থ প্রকাশ করে। দার্শনিকভাবে এটি শেখায় যে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা বাহ্যিক জগৎকে জয় করার মধ্যে নয়, বরং নিজের অন্তর্জগতকে জয় করার মধ্যে নিহিত। প্রতীকীভাবে রাগ এবং দ্বেষ মানুষের অন্তরের সেই দুই প্রবল স্রোত, যা তাকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে চায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো মানুষ যেন এই দুই প্রবৃত্তির দাস না হয়ে তাদের সচেতন পর্যবেক্ষক হয়। কারণ যে ব্যক্তি আকর্ষণ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে উঠে সমত্ববোধ অর্জন করতে পারে, সেই ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী, স্বাধীন এবং মুক্ত জীবনের অধিকারী হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!