শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.৩৭ | কাম ও ক্রোধ মানবজীবনের পরম শত্রু কেন?
শ্রীভগবানুবাচ
কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণসমুদ্ভবঃ।
মহাশনো মহাপাপ্মা বিদ্ধ্যেনমিহ বৈরিণম্।।৩৭।।
অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে অর্জুন! রজোগুণ থেকে সমুদ্ভত কামই মানুষকে এই পাপে প্রবৃত্ত করে এবং এই কামই ক্রোধে পরিণত হয়। কাম সর্বগ্রাসী ও পাপাাত্মক; কামকেই জীবের প্রধান শত্রু বলে জানবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের সাতত্রিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানবজীবনের অন্যতম গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সত্য উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেন যে মানুষের প্রকৃত শত্রু বাইরে নয় বরং তার নিজের অন্তরের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। সেই শত্রুর নাম কাম। এই কামই পরবর্তীকালে ক্রোধে পরিণত হয় এবং মানুষকে জ্ঞান থেকে বিচ্যুত করে অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়। এখানে কাম বলতে কেবল যৌন আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়নি। বরং সমস্ত প্রকার অশান্ত বাসনা অতৃপ্ত লালসা সীমাহীন চাওয়া এবং ইন্দ্রিয়ভোগের প্রতি অন্ধ আকর্ষণকেই কাম বলা হয়েছে। এই কাম মানুষের মনকে এমনভাবে অধিকার করে যে সে নিজের প্রকৃত কল্যাণ ভুলে গিয়ে ক্ষণস্থায়ী সুখের পেছনে ছুটতে থাকে।
কাম শব্দটি সংস্কৃত কম্ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ইচ্ছা করা আকাঙ্ক্ষা করা ভালোবাসা বা কোনো কিছু লাভ করতে চাওয়া। বৈদিক সাহিত্যে এই শব্দের অর্থ ছিল সৃষ্টির প্রথম ইচ্ছা বা সৃষ্টিশক্তির সূচনা। ঋগ্বেদে কামকে বিশ্বসৃষ্টির প্রথম স্পন্দন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু উপনিষদ গীতা এবং পরবর্তী দার্শনিক সাহিত্যে এই শব্দের অর্থ আরও গভীর হয়েছে। সেখানে কাম বলতে এমন আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়েছে যা মানুষকে নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করে। ভাষাগত দিক থেকে এটি একটি সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ হলেও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এটি মানুষের বন্ধনের অন্যতম প্রধান কারণ।
বাংলা ভাষায় কাম শব্দের অর্থ ইচ্ছা বাসনা আকাঙ্ক্ষা লালসা তৃষ্ণা ভোগস্পৃহা কিংবা কোনো কিছু অর্জনের প্রবল আকুলতা। তবে সব ইচ্ছাই কাম নয়। জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা সৎকর্ম করার ইচ্ছা কিংবা মানুষের কল্যাণ কামনা ইতিবাচক ও নির্মল আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু যখন কোনো ইচ্ছা স্বার্থপরতা আসক্তি অহংকার কিংবা সীমাহীন ভোগলালসার সঙ্গে যুক্ত হয় তখন সেটিই গীতার ভাষায় কাম হয়ে ওঠে। এই কাম মানুষকে ধীরে ধীরে নিজের বিবেক থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
আক্ষরিক অর্থে কাম হলো এমন এক মানসিক আকর্ষণ যা মানুষকে কোনো বস্তু ব্যক্তি অবস্থান বা অভিজ্ঞতার দিকে টেনে নিয়ে যায়। এটি মানুষের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করে যে নির্দিষ্ট কোনো বস্তু বা সাফল্য অর্জন করলেই সে সম্পূর্ণ সুখী হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলেও নতুন আরেকটি আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়। ফলে মানুষের চাওয়ার কোনো শেষ থাকে না। এই অন্তহীন চাওয়াই মানুষকে কখনো স্থায়ী শান্তি লাভ করতে দেয় না।
এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে কাম এবং ক্রোধ রজোগুণ থেকে উৎপন্ন। রজোগুণ হলো প্রকৃতির সেই শক্তি যা কর্মপ্রবণতা চঞ্চলতা উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অস্থিরতার জন্ম দেয়। যখন এই শক্তি জ্ঞান এবং সংযম দ্বারা পরিচালিত হয় না তখন তা কামনার রূপ ধারণ করে। আবার সেই কামনা পূরণে বাধা সৃষ্টি হলে জন্ম নেয় ক্রোধ। তাই ক্রোধ কখনো একা আসে না। তার উৎস হলো অপূর্ণ কামনা। এই কারণেই গীতায় কাম এবং ক্রোধকে একই শত্রুর দুটি ভিন্ন রূপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শ্লোকে কামকে মহাশন বলা হয়েছে। এই শব্দের অর্থ যে সর্বদা ভক্ষণ করে অথচ কখনো তৃপ্ত হয় না। যেমন আগুনে যত কাঠ দেওয়া হয় আগুন ততই জ্বলে ওঠে তেমনি কামনাও পূরণ হতে হতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মানুষ ভাবে একটি লক্ষ্য অর্জন করলেই সে শান্তি পাবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পরই আরেকটি নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। এই অন্তহীন ক্ষুধার কারণেই কামকে মহাশন বলা হয়েছে। এটি মানুষের সময় শক্তি বুদ্ধি এবং শান্তিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলে।
শ্রীকৃষ্ণ আরও বলেন যে কাম মহাপাপ্মা অর্থাৎ মহাপাপের উৎস। কারণ অধিকাংশ অন্যায়ের মূলেই কোনো না কোনো লোভ বা বাসনা কাজ করে। ক্ষমতার লোভ ধনের লোভ ভোগের লোভ কিংবা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে এমন সব কাজ করতে বাধ্য করে যা তার নিজের এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তাই পাপের প্রকৃত সূচনা বাহ্যিক কর্মে নয় বরং অন্তরের কামনায়। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মন এই কামনার দ্বারা পরিচালিত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত বাহ্যিক নৈতিকতা তাকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারবে না।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও কাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা। বেদান্ত দর্শন বলে মানুষ যখন নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ ভুলে শরীর ও ইন্দ্রিয়কেই নিজের পরিচয় মনে করে তখন তার মধ্যে নানা কামনার জন্ম হয়। সে বাহ্যিক বস্তু দিয়ে নিজের শূন্যতা পূরণ করতে চায়। কিন্তু আত্মার প্রকৃত তৃপ্তি কখনো বস্তু দিয়ে আসে না। তাই তার চাওয়া কখনো শেষ হয় না। সাংখ্য দর্শন এই কামনার উৎস হিসেবে রজোগুণকে চিহ্নিত করে এবং বলে যে রজসিক চিত্ত সর্বদা পরিবর্তন চায় এবং নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধানে অস্থির থাকে। আবার বৌদ্ধ দর্শনে এই কামনাকেই তৃষ্ণা বলা হয়েছে এবং ঘোষণা করা হয়েছে যে সমস্ত দুঃখের মূল হলো এই তৃষ্ণা। ভিন্ন ভিন্ন দর্শনের ভাষা আলাদা হলেও তাদের মূল বক্তব্য একই। মানুষের অন্তহীন আকাঙ্ক্ষাই তার অশান্তির প্রধান কারণ।
প্রতীকী অর্থে কাম হলো মানুষের অন্তরের অস্থিরতা এবং অপূর্ণতার প্রতীক। সাহিত্যে এটি প্রায়ই অগ্নি সমুদ্র কিংবা অতৃপ্ত ক্ষুধার রূপকে প্রকাশ করা হয়। আগুন যেমন জ্বালানি পেলেই আরও প্রজ্বলিত হয় তেমনি কামনাও পূরণ হতে হতে আরও বৃদ্ধি পায়। সমুদ্র যেমন অসংখ্য নদীর জল গ্রহণ করেও পূর্ণতার দাবি করে না তেমনি মানুষের কামনাও সীমাহীন। আধ্যাত্মিক অর্থে কাম হলো আত্মবিস্মৃতির প্রতীক। যখন মানুষ নিজের চিরন্তন সত্তাকে ভুলে কেবল বাহ্যিক ভোগের মধ্যে সুখ খুঁজতে থাকে তখন সে কামনার দাসে পরিণত হয়।
বাস্তব জীবনেও এই সত্য প্রতিনিয়ত দেখা যায়। একজন মানুষ ভাবেন একটি ভালো চাকরি পেলেই তিনি সুখী হবেন। চাকরি পাওয়ার পরে তিনি আরও বড় পদ চান। এরপর আরও বেশি অর্থ আরও বেশি সম্মান আরও বেশি ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। একইভাবে একজন ব্যবসায়ী প্রথমে একটি ছোট সাফল্য চান। পরে সেই সাফল্যই আরও বড় সাফল্যের ক্ষুধা সৃষ্টি করে। এভাবে মানুষের চাওয়া ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। ইতিহাসেও বহু সম্রাট অসীম ক্ষমতা অর্জনের পরেও আরও রাজ্য জয়ের লোভে নিজের পতন ডেকে এনেছেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে নিয়ন্ত্রণহীন কামনা কখনো মানুষকে স্থায়ী সুখ দেয় না বরং তাকে আরও অশান্ত করে তোলে।
এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত শত্রু বাইরের কোনো ব্যক্তি নয় বরং নিজের অন্তরের অশাসিত কামনা। এই কামনা থেকেই ক্রোধ জন্মায় এবং ক্রোধ থেকে মোহ বিভ্রান্তি ও পতনের সূচনা হয়। তাই শ্রীকৃষ্ণ মানুষকে বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে নয় বরং নিজের অন্তরের কামনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে আহ্বান জানিয়েছেন। জ্ঞান আত্মসংযম অনাসক্ত কর্ম এবং ঈশ্বরচিন্তার মাধ্যমে এই কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তখন মানুষ বাহ্যিক ভোগের পরিবর্তে অন্তরের শান্তি লাভ করে এবং প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করতে পারে। এই কারণেই গীতার এই শ্লোক কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং মানবমন ও মানবজীবনের এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক এবং দার্শনিক বিশ্লেষণ হিসেবে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!