সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.৩৯ | অতৃপ্ত কামনা জ্ঞানের চিরশত্রু কেন?

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
আবৃতং জ্ঞানমেতেন জ্ঞানিনো নিত্যবৈরিণা। কামরূপেণ কৌন্তেয় দুষ্পূরেণানলেন চ।।৩৯।।
আবৃতং জ্ঞানমেতেন জ্ঞানিনো নিত্যবৈরিণা। 
কামরূপেণ কৌন্তেয় দুষ্পূরেণানলেন চ।।৩৯।।

অনুবাদঃ কামরূপী চির শত্রুর দ্বারা জীবের শুদ্ধ চেতনা আবৃত হয়। এই কাম দুর্বারিত অগ্নির মতো চিরঅতৃপ্ত।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের ঊনচল্লিশতম শ্লোক মানবজীবনের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং আধ্যাত্মিক সত্যকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন যে কামনা মানুষের জ্ঞানকে আচ্ছাদিত করে রাখে এবং এটি জ্ঞানীরও চিরশত্রু। এই কামনা এমন এক অগ্নির মতো যার কখনও তৃপ্তি হয় না। এই শিক্ষা কেবল ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং মানবমনের প্রকৃতি এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের এক শাশ্বত বিশ্লেষণ। শ্লোকটি মানুষের অন্তরের সেই শক্তিকে চিহ্নিত করে যা সত্য উপলব্ধির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

এই শ্লোকের মূল ধারণা হলো কাম। সংস্কৃত কাম শব্দটি কম ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ইচ্ছা করা আকাঙ্ক্ষা করা আনন্দ লাভ করা কিংবা কিছু অর্জনের বাসনা করা। বৈদিক সাহিত্যে কাম শব্দটি প্রথমে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। বরং সৃষ্টির আদিম প্রেরণা এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উদ্ভবের সূচনাকারী ইচ্ছাশক্তি হিসেবেই একে বিবেচনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে বলা হয়েছে যে সৃষ্টির পূর্বে প্রথম যে শক্তির উদ্ভব হয়েছিল তা ছিল কাম। অর্থাৎ কাম মূলত সৃষ্টিশীল শক্তির প্রতীক। কিন্তু যখন এই কাম আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সীমাহীন ভোগলালসায় রূপ নেয় তখন সেটিই মানুষের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গীতার এই শ্লোকে সেই অসংযত এবং অশান্ত কামনাকেই বোঝানো হয়েছে।

শ্লোকের প্রতিটি শব্দ গভীর অর্থ বহন করে। আবৃতং শব্দের অর্থ আচ্ছাদিত বা সম্পূর্ণরূপে ঢেকে দেওয়া। জ্ঞানম অর্থ সত্য উপলব্ধির ক্ষমতা বা প্রকৃত জ্ঞান। নিত্যবৈরিণা বলতে বোঝানো হয়েছে চিরশত্রুকে। কামরূপেণ অর্থ কামনার রূপ ধারণ করে। দুষ্পূরেণ শব্দের অর্থ যা কখনও পূর্ণ করা যায় না এবং অনলেন অর্থ আগুন। এই শব্দগুলোর সম্মিলিত অর্থ দাঁড়ায় যে সীমাহীন কামনা মানুষের জ্ঞানকে এমনভাবে ঢেকে রাখে যেন ঘন ধোঁয়া আগুনকে আড়াল করে দেয়। ফলে মানুষ সত্যকে সামনে রেখেও তা দেখতে পারে না।

বাংলা ভাষায় কাম শব্দের অর্থ ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা বাসনা চাওয়া বা লালসা। তবে গীতার আলোচনায় এটি কেবল ইন্দ্রিয়ভোগ বা যৌন আকাঙ্ক্ষাকে বোঝায় না। এখানে কাম বলতে সমস্ত সীমাহীন চাওয়া পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ক্ষমতার লোভ ধনসম্পদের লালসা সম্মানের আকাঙ্ক্ষা এবং অহংকারজাত ভোগপ্রবণতাকে বোঝানো হয়েছে। মানুষের জীবনে যখন চাওয়ার শেষ থাকে না তখন সেই কামনা ধীরে ধীরে মানুষের স্বাধীন চিন্তা এবং বিবেককে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

আক্ষরিক অর্থে এই শ্লোকের বক্তব্য হলো যে কামনা মানুষের জ্ঞানকে আচ্ছাদিত করে রাখে এবং এটি জ্ঞানীরও চিরশত্রু। আগুনে যত জ্বালানি দেওয়া হয় আগুন ততই প্রজ্বলিত হয় কিন্তু কখনও বলে না যে যথেষ্ট হয়েছে। একইভাবে কামনাও যত পূরণ করা হয় ততই আরও নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। তাই ভোগের মাধ্যমে কামনাকে শেষ করা যায় না বরং সংযম এবং আত্মজ্ঞানই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিক অর্থ আধুনিক জীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে মানুষ যখন কোনো আকাঙ্ক্ষায় অতিমাত্রায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে তখন তার বিচারবোধ দুর্বল হয়ে যায়। অর্থের লোভ ক্ষমতার মোহ কিংবা খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করতে পারে। তখন সে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্য স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। সামাজিক ক্ষেত্রেও অধিকাংশ সংঘাতের পেছনে সীমাহীন কামনা কাজ করে। ব্যক্তি পরিবার সমাজ এবং রাষ্ট্রের বহু সমস্যা জন্ম নেয় অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা থেকে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই কামনাই মানুষের আত্মোপলব্ধির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক কারণ এটি মানুষকে বাইরের বস্তুতে আবদ্ধ রাখে এবং অন্তরের সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

শ্লোকটির গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের প্রকৃত শত্রু বাইরে নয় বরং নিজের অন্তরে লুকিয়ে থাকে। মানুষ প্রায়ই মনে করে আরও কিছু সম্পদ আরও কিছু সম্মান কিংবা আরও কিছু ভোগ অর্জন করতে পারলেই সে সুখী হবে। কিন্তু সেই চাওয়া কখনও শেষ হয় না। একটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। এই অন্তহীন চাওয়ার প্রবাহই মানুষের অস্থিরতা এবং অসন্তোষের মূল কারণ। তাই গীতা শিক্ষা দেয় যে সুখের উৎস বাহ্যিক ভোগে নয় বরং অন্তরের সংযম এবং আত্মজ্ঞানেই নিহিত।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বেদান্ত দর্শন অনুসারে অবিদ্যা থেকে অহংকারের জন্ম হয় এবং অহংকার থেকে কামনার উৎপত্তি। এই কামনাই মানুষকে সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে। সাংখ্য দর্শনে কামকে রজোগুণের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। রজোগুণ মানুষের মধ্যে অস্থিরতা কর্মস্পৃহা এবং ভোগপ্রবণতা সৃষ্টি করে। বৌদ্ধ দর্শনে এই একই ধারণা তৃষ্ণা নামে পরিচিত এবং বুদ্ধ ঘোষণা করেছেন যে তৃষ্ণাই দুঃখের মূল কারণ। পাশ্চাত্যের স্টোইক দর্শনও বলে যে যে ব্যক্তি নিজের কামনার দাস সে কখনও প্রকৃত স্বাধীন হতে পারে না। এইভাবে বিভিন্ন দর্শনের মধ্যে আশ্চর্যজনক এক ঐক্য লক্ষ্য করা যায়।

প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে আগুন কেবল ভৌত অগ্নি নয় বরং মানুষের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আগুন যেমন সবকিছু গ্রাস করে তেমনি অসংযত কামনাও মানুষের শান্তি বিবেক এবং সুখকে গ্রাস করে। ধোঁয়া যেমন আগুনের আলোকে আড়াল করে তেমনি কামনা মানুষের জ্ঞানের আলোকে ঢেকে দেয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় কাম মানুষের অবচেতন আকাঙ্ক্ষা এবং অপূর্ণতার প্রতীক। আধ্যাত্মিক অর্থে এটি আত্মা এবং পরম সত্যের মাঝখানে থাকা এক অদৃশ্য আবরণ যা মানুষকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে বাধা দেয়।

বাস্তব জীবনেও এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। ইতিহাসে বহু সম্রাট বিপুল সম্পদ এবং অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়েও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাদের সীমাহীন লোভই শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের কারণ হয়েছে। আধুনিক সমাজেও একজন মানুষ মনে করেন একটি বাড়ি একটি গাড়ি কিংবা একটি পদ পেলেই তিনি সুখী হবেন। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পর আবার নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়। এই অন্তহীন চাওয়ার চক্রই গীতার ভাষায় দুষ্পূরণীয় অগ্নি। সমুদ্র যেমন অসংখ্য নদীর জল গ্রহণ করেও কখনও পূর্ণতার ঘোষণা দেয় না তেমনি অসংযত কামনাও কখনও তৃপ্ত হয় না।

সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে। কাম এখানে কেবল ইন্দ্রিয়ভোগের বাসনা নয় বরং মানুষের অন্তহীন আরও চাই প্রবৃত্তির প্রতীক। ভাষাগতভাবে এটি ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষার ধারণা বহন করলেও দার্শনিকভাবে এটি আত্মজ্ঞানকে আচ্ছন্নকারী এক অন্তর্গত শক্তি। প্রতীকীভাবে এটি এমন এক আগুন যা যত পুষ্টি পায় ততই জ্বলে ওঠে। তাই শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত শত্রু বাইরের কোনো ব্যক্তি নয় বরং নিজের অন্তরের অসংযত কামনা। যে ব্যক্তি এই কামনাকে জ্ঞান সংযম এবং আত্মচেতনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সে ধীরে ধীরে সত্য উপলব্ধির পথে অগ্রসর হয় এবং অন্তরের শান্তি ও মুক্তির স্বাদ লাভ করে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 08, 2026 August 08, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি