সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা তৃতীয় অধ্যায়, ৪র্থ শ্লোকের ব্যাখ্যা | কর্ম ত্যাগ নয়, নিঃস্বার্থ কর্মই মুক্তির পথ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


ন কর্মণামনারম্ভান্ নৈষ্কর্ম্যং পুরুষোহশ্লুতে।
ন চ সন্ন্যসনাদেব সিদ্ধং সমাধিগচ্ছতি।।৪।।

অনুবাদঃ কেবল কর্মের অনুষ্ঠান না করার মাধ্যমে কর্মফল থেকে মুক্ত হওয়া যায় না, আবার কর্মত্যাগের মাধ্যমেও সিদ্ধি লাভ করা যায় না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোক কর্মযোগের একটি মৌলিক এবং চিরন্তন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। শ্লোকটি হলো শ্রীভগবানুবাচ ন কর্ম্মণামনারম্ভান্নৈষ্কর্ম্ম্যং পুরুষোঽশ্নুতে। ন চ সন্ন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি। এর অর্থ হলো শ্রীভগবান বললেন কর্ম আরম্ভ না করার দ্বারা মানুষ কখনো নৈষ্কর্ম্য বা কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত অবস্থা লাভ করতে পারে না এবং কেবল বাহ্যিক সন্ন্যাস গ্রহণ করলেই সিদ্ধি বা পরম সাফল্য অর্জিত হয় না। এই শ্লোকের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাতে চেয়েছেন যে কর্ম থেকে পলায়ন নয় বরং শুদ্ধ চিত্তে কর্তব্য পালনই প্রকৃত মুক্তির পথ।

শ্রীভগবানুবাচ শব্দটি তিনটি অংশে গঠিত। শ্রী শব্দের অর্থ মঙ্গল সৌন্দর্য ঐশ্বর্য এবং কল্যাণ। ভগবান শব্দটি ভগ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ ঐশ্বর্য জ্ঞান শক্তি যশ বৈরাগ্য এবং ধর্মের পূর্ণ অধিকারী সত্তা। উবাচ শব্দটি বচ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ বললেন বা উচ্চারণ করলেন। ফলে শ্রীভগবানুবাচ অর্থ দাঁড়ায় মঙ্গলময় সর্বঐশ্বর্যের অধিকারী ভগবান বললেন। এই সূচনা কেবল একটি বক্তার পরিচয় নয় বরং এমন এক সর্বজ্ঞ সত্যবক্তার ঘোষণা যার প্রতিটি বাক্য মানবকল্যাণের জন্য নিবেদিত।

শ্লোকের কর্ম শব্দটি কৃ ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ করা সৃষ্টি করা বা সম্পাদন করা। কর্ম বলতে কেবল শারীরিক কাজ নয় বরং চিন্তা বাক্য এবং আচরণের সমস্ত কার্যকলাপকেই বোঝায়। অনারম্ভ অর্থ শুরু না করা এবং নৈষ্কর্ম্য শব্দটি নিষ এবং কর্ম এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। এর প্রকৃত অর্থ কর্মহীনতা নয় বরং কর্মের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থা। সন্ন্যাস শব্দের অর্থ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা। তবে এখানে ত্যাগ বলতে কেবল বাহ্যিক বস্তু ত্যাগ নয় বরং অহংকার আসক্তি এবং ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করাকে বোঝানো হয়েছে। সিদ্ধি শব্দটি সিদ্ধ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ পূর্ণতা সাফল্য আত্মউপলব্ধি বা চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো।

আক্ষরিকভাবে এই শ্লোক ঘোষণা করে যে কর্ম না করলে কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না এবং কেবল বাহ্যিক সন্ন্যাস গ্রহণ করলেও আত্মসিদ্ধি অর্জিত হয় না। অনেকেই মনে করেন সংসার ত্যাগ করলেই আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব অথবা কাজ না করলেই পাপ এড়ানো যায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ভ্রান্ত ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে প্রকৃত মুক্তি কর্ম এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে নয় বরং কর্মকে সঠিকভাবে সম্পাদন করার মধ্যে নিহিত।

এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিক অর্থ বিশেষভাবে কর্মযোগের দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুন নিজের কর্তব্য পালন থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যুদ্ধ না করলে তিনি পাপ থেকে মুক্ত থাকবেন। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বোঝালেন যে কর্তব্য এড়িয়ে যাওয়া কখনো ধর্ম নয়। মানুষ যতক্ষণ জীবিত ততক্ষণ সে কোনো না কোনোভাবে কর্মের সঙ্গে যুক্ত। তাই কর্ম থেকে পালিয়ে নয় বরং কর্মকে ঈশ্বরার্পণ করে এবং ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে জীবনযাপন করাই প্রকৃত পথ।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতি কখনো স্থির নয়। মানুষের হৃদয় অবিরাম স্পন্দিত হচ্ছে শ্বাসপ্রশ্বাস চলমান রয়েছে মন নিরন্তর চিন্তা করছে। অর্থাৎ জীবন নিজেই এক অবিরাম কর্মপ্রবাহ। তাই কর্মহীন হয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। আসল প্রশ্ন হলো মানুষ কীভাবে কর্ম করছে। যদি কর্ম স্বার্থপরতা অহংকার এবং ফলের লোভ দ্বারা পরিচালিত হয় তবে সেই কর্ম বন্ধনের কারণ হয়। কিন্তু যদি কর্ম নিঃস্বার্থ কর্তব্যবোধ এবং ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণের মানসিকতা নিয়ে সম্পাদিত হয় তবে সেই একই কর্ম মুক্তির সোপান হয়ে ওঠে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের ব্যাখ্যা অত্যন্ত গভীর। বেদান্ত দর্শন অনুসারে আত্মা কখনো কর্ম করে না। প্রকৃতি সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে এবং অজ্ঞানের কারণে মানুষ নিজেকে কর্তা বলে মনে করে। যখন জ্ঞান উদিত হয় তখন মানুষ উপলব্ধি করে যে সে কেবল চৈতন্যস্বরূপ সাক্ষী। সাংখ্য দর্শনও একইভাবে পুরুষকে নিষ্ক্রিয় চৈতন্য এবং প্রকৃতিকে কর্মশীল শক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। কর্মযোগ দর্শন এই দুই ভাবনাকে একত্রিত করে শিক্ষা দেয় যে কর্ম থেকে নয় বরং কর্মের প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়াই প্রকৃত যোগ। এই কারণেই ভগবান ঘোষণা করেন যে কেবল সন্ন্যাস গ্রহণে নয় বরং শুদ্ধ কর্মের মধ্য দিয়েই সিদ্ধি লাভ সম্ভব।

প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কর্ম এখানে মানুষের জীবনসংগ্রাম কর্তব্য সৃষ্টিশীলতা এবং আত্মবিকাশের প্রতীক। নৈষ্কর্ম্য প্রতীক আত্মিক স্বাধীনতার যেখানে কর্ম চলমান থাকলেও কর্মের বন্ধন আর মানুষকে আবদ্ধ করতে পারে না। সন্ন্যাস প্রতীক বাহ্যিক পোশাক বা আশ্রম পরিবর্তনের নয় বরং অন্তরের আসক্তি অহংকার এবং স্বার্থপরতা ত্যাগের। মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কর্ম এড়িয়ে যাওয়া প্রায়ই ভয় অনিশ্চয়তা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবের বহিঃপ্রকাশ। গীতা শেখায় যে সাহসের সঙ্গে কর্তব্য পালনই মানুষের মানসিক এবং আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রধান উপায়।

বাস্তব জীবনের উদাহরণ এই শ্লোকের শিক্ষাকে আরও স্পষ্ট করে। একজন কৃষক যদি চাষাবাদ না করেন তবে তিনি কখনো ফসল পাবেন না। একজন ছাত্র যদি পড়াশোনা না করে তবে জ্ঞানের আশা করা অর্থহীন। একজন চিকিৎসক যদি রোগীর সেবা করা থেকে বিরত থাকেন তবে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর কর্তব্য অপূর্ণ থেকে যাবে। একইভাবে অর্জুন যদি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতেন তবে তিনি নিজের ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করতে পারতেন না। তাই কর্ম থেকে পলায়ন নয় বরং সৎ উদ্দেশ্যে এবং নিঃস্বার্থভাবে কর্ম সম্পাদন করাই প্রকৃত ধর্ম।

এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের জীবনে কর্ম অনিবার্য। মুক্তি কর্ম ত্যাগের মধ্যে নয় বরং কর্মের প্রতি আসক্তি ত্যাগের মধ্যে নিহিত। বাহ্যিক সন্ন্যাস মানুষকে পরিপূর্ণতা দেয় না যদি তার অন্তরে এখনও অহংকার লোভ এবং স্বার্থপরতা বিরাজ করে। প্রকৃত সন্ন্যাস হলো নিজের কর্তব্য পালন করতে করতে ফলের প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করা এবং সমস্ত কর্ম ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই শিক্ষা কেবল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নয় বরং প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এই শ্লোক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নিষ্ক্রিয়তা কখনো মুক্তির পথ নয় বরং জ্ঞান অনাসক্তি এবং নিঃস্বার্থ কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়েই মানুষ প্রকৃত সিদ্ধি এবং আত্মমুক্তির দিকে অগ্রসর হয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 06, 2026 August 06, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি