শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.৪০ | ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধিতে কামনার অধিষ্ঠান
ইন্দ্রিয়াণি মনো বুদ্ধিরস্যাধিষ্ঠানমুচ্যতে।
এতৈর্বিমোহয়ত্যেষ জ্ঞানমাবৃত্য দেহিনম্।।৪০।।
অনুবাদঃ ইন্দ্রিয়সমূহ, মন ও বুদ্ধি এই কামের আশ্রয়স্থল। এই ইন্দ্রিয় আদির দ্বারা কাম জীবের প্রকৃত জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে তাকে বিভ্রান্ত করে।
ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের চল্লিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সত্য উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেছেন যে ইন্দ্রিয় মন এবং বুদ্ধিই হলো কামের প্রধান অধিষ্ঠান। এই তিনটি স্তরের মাধ্যমেই কাম মানুষের জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে তাকে মোহগ্রস্ত করে তোলে। এই শ্লোকটি কেবল একটি নৈতিক উপদেশ নয় বরং মানবচেতনার গঠন এবং তার পতনের সূক্ষ্ম কারণ সম্পর্কে এক অসাধারণ বিশ্লেষণ। এখানে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের মধ্যে ভাষাগত সৌন্দর্য দার্শনিক গভীরতা এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষা একত্রে নিহিত রয়েছে।
ইন্দ্রিয়াণি শব্দটি সংস্কৃত ইন্দ্রিয় শব্দের বহুবচন রূপ। এর মূল উৎস ইন্দ্র শব্দ যার অর্থ শক্তি প্রভুত্ব বা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। সেই অর্থে ইন্দ্রিয় হলো এমন সব শক্তি বা উপায় যার মাধ্যমে মানুষ বাহ্যজগতকে অনুভব করে এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। চোখ কান নাক জিহ্বা এবং ত্বক কেবল শরীরের অঙ্গ নয় বরং জ্ঞান আহরণের দ্বার। মানুষ পৃথিবীকে সরাসরি দেখে না বরং ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে দেখে। তাই ইন্দ্রিয় সত্য উপলব্ধির মাধ্যম যেমন হতে পারে তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় বিভ্রান্তিরও কারণ হতে পারে। গীতার ভাষায় কাম প্রথমে ইন্দ্রিয়কে আকর্ষণ করে এবং সেই আকর্ষণের মধ্য দিয়েই মানুষের অন্তর্জগতে প্রবেশ করে।
মন শব্দটির উৎপত্তি মন ধাতু থেকে যার অর্থ চিন্তা করা উপলব্ধি করা এবং কল্পনা করা। মন হলো অনুভূতি ইচ্ছা স্মৃতি এবং কল্পনার কেন্দ্র। ইন্দ্রিয় বাহ্যজগত থেকে যা সংগ্রহ করে মন তাকে গ্রহণ করে এবং তার অর্থ নির্মাণ করে। একই ঘটনা দুই ব্যক্তির মনে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে কারণ তাদের মানসিক অবস্থা এক নয়। এই কারণে মনকে মানুষের অভিজ্ঞতার নির্মাতা বলা হয়। যখন মন ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণে অস্থির হয়ে পড়ে তখন সত্য এবং মায়ার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যায়। তাই মন নিয়ন্ত্রিত না হলে জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
বুদ্ধি শব্দটি বুধ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জাগ্রত হওয়া জানা এবং উপলব্ধি করা। বুদ্ধি মানুষের বিচারবোধ বিবেক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার প্রতীক। ইন্দ্রিয় বিষয় সংগ্রহ করে মন তা নিয়ে ভাবনা সৃষ্টি করে আর বুদ্ধি সেই ভাবনার যথার্থতা বিচার করে। তাই বুদ্ধিকে মানুষের অন্তরের বিচারক বলা যায়। কিন্তু যখন কাম বুদ্ধিকেও আচ্ছন্ন করে তখন মানুষ ভালো এবং মন্দের পার্থক্য বুঝেও ভুল পথ বেছে নেয়। এই অবস্থায় জ্ঞান নষ্ট হয় না বরং তার কার্যকারিতা হারিয়ে যায়। যেমন সূর্য সবসময় আকাশে থাকে কিন্তু মেঘ তার আলোকে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখে তেমনি কাম মানুষের অন্তর্নিহিত জ্ঞানকে আবৃত করে রাখে।
অধিষ্ঠান শব্দটির অর্থ আশ্রয়স্থল ভিত্তি বা অবস্থানের কেন্দ্র। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ইন্দ্রিয় মন এবং বুদ্ধিই কামের অধিষ্ঠান। অর্থাৎ কাম কোনো বাহ্যিক শক্তি নয় যা বাইরে থেকে এসে মানুষকে আক্রমণ করে। এটি মানুষের নিজের চেতনার মধ্যেই অবস্থান করে এবং সুযোগ পেলেই ইন্দ্রিয় মন ও বুদ্ধিকে প্রভাবিত করে। এই ব্যাখ্যা মানুষের আত্মসমালোচনার পথ খুলে দেয় কারণ সমস্যার মূল বাইরে নয় বরং নিজের অন্তর্জগতেই লুকিয়ে থাকে।
বিমোহয়তি শব্দের অর্থ বিভ্রান্ত করা বা মোহগ্রস্ত করে তোলা। মোহ মানে কেবল অজ্ঞতা নয় বরং অসত্যকে সত্য বলে গ্রহণ করা। মানুষ যখন ক্ষণস্থায়ী সুখকে স্থায়ী সুখ মনে করে অথবা দেহকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় মনে করে তখন সে মোহগ্রস্ত হয়। এই মোহের কারণেই মানুষ নিজের প্রকৃত কল্যাণ থেকে দূরে সরে যায়। শ্লোকে বলা হয়েছে কাম মানুষের জ্ঞানকে আবৃত করে তাকে বিভ্রান্ত করে। এখানে জ্ঞান ধ্বংস হয় না বরং তার উপর অজ্ঞতার পর্দা নেমে আসে।
দেহিনম শব্দটির অর্থ দেহধারী। গীতা মানুষকে দেহ বলে পরিচয় দেয় না বরং দেহধারী বলে সম্বোধন করে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে মানুষের প্রকৃত পরিচয় শরীর নয় বরং আত্মা। দেহ পরিবর্তিত হয় কিন্তু আত্মা অপরিবর্তনীয়। তাই কাম যখন জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে তখন প্রকৃতপক্ষে আত্মা নয় বরং আত্মার সঙ্গে যুক্ত মন বুদ্ধি এবং ইন্দ্রিয় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের চেতনার তিনটি স্তরের একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। ইন্দ্রিয় বাহ্যজগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে মন সেই অভিজ্ঞতার অর্থ নির্মাণ করে এবং বুদ্ধি তার মূল্যায়ন করে। এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য থাকলে মানুষ সত্য উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু কাম যদি এই তিনটি স্তরকে অধিকার করে তবে জ্ঞান আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ ভুলে বসে। সাংখ্য দর্শনে ইন্দ্রিয় প্রকৃতির বিকার হিসেবে বিবেচিত হলেও বেদান্তে আত্মাকে ইন্দ্রিয় মন এবং বুদ্ধির সাক্ষী বলা হয়েছে। এই কারণেই আত্মজ্ঞান লাভের জন্য বাহ্যিক জগতের পরিবর্তনের চেয়ে অন্তর্জগতের শুদ্ধি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতীকী অর্থে ইন্দ্রিয় হলো জানালা মন হলো আয়না এবং বুদ্ধি হলো প্রদীপ। জানালা দিয়ে বাইরের জগৎ প্রবেশ করে আয়নায় তার প্রতিফলন ঘটে এবং প্রদীপ সেই প্রতিফলনের সত্যতা প্রকাশ করে। কিন্তু কাম ধোঁয়ার মতো এই তিনটিকেই আচ্ছন্ন করে দেয়। তখন জানালা অস্পষ্ট হয়ে যায় আয়না মলিন হয়ে পড়ে এবং প্রদীপের আলো ম্লান হয়ে যায়। ফলে মানুষ সত্যকে আর স্পষ্টভাবে দেখতে পারে না। এই প্রতীকী ব্যাখ্যা শ্লোকটির গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যকে অত্যন্ত সহজভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের সত্য প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হয়। একজন মানুষ জানেন যে লোভ ক্রোধ কিংবা অতিরিক্ত ভোগ তাকে ক্ষতির দিকে নিয়ে যাবে তবুও তিনি সেই পথেই চলেন। কারণ তার জ্ঞান সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি বরং কাম তার বিচারবোধকে আচ্ছন্ন করেছে। কঠোপনিষদের রথের উপমায় ইন্দ্রিয়কে ঘোড়া মনকে লাগাম বুদ্ধিকে সারথি এবং আত্মাকে রথের যাত্রী বলা হয়েছে। যদি ঘোড়াগুলি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে তবে রথ সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। একইভাবে ইন্দ্রিয় মন এবং বুদ্ধি নিয়ন্ত্রিত না হলে মানুষ জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের প্রকৃত শত্রু বাহ্যিক জগতে নয় বরং নিজের অন্তর্জগতের অনিয়ন্ত্রিত কামনায়। ইন্দ্রিয় মন এবং বুদ্ধি মানুষের জ্ঞান অর্জনের শ্রেষ্ঠ উপকরণ হলেও এগুলো যদি কামের অধীন হয়ে পড়ে তবে সেই জ্ঞানই আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তাই আত্মজ্ঞান অর্জনের প্রথম শর্ত হলো ইন্দ্রিয় সংযম মনকে স্থির করা এবং বুদ্ধিকে শুদ্ধ রাখা। তখনই মোহের আবরণ সরে যায় অন্তরের জ্ঞানের আলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। এই কারণেই ভগবদ্গীতার এই শ্লোক কেবল ধর্মগ্রন্থের শিক্ষা নয় বরং মানবজীবনের মনস্তত্ত্ব নৈতিকতা এবং আত্মোন্নয়নের এক চিরন্তন নির্দেশনা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!