শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৩.৪১ | ইন্দ্রিয় সংযমে কামজয় ও জ্ঞানরক্ষার শিক্ষা
তস্মাত্ত্বমিন্দ্রিয়াণ্যাদৌ নিয়ম্য ভরতর্ষভ।
পাপ্মানং প্রজহি হ্যেনং জ্ঞানবিজ্ঞাননাশনম্।৪১।।
অনুবাদঃ অতএব, হে ভরতশ্রেষ্ঠ! তুমি প্রথমে ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রিত করে জ্ঞান ও বিজ্ঞান-নাশক পাপের প্রতীকরূপ এই কামকে বিনাশ কর।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের একচল্লিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে মানবজীবনের অন্যতম গভীর সত্য শিক্ষা দিয়েছেন। শ্লোকটি হলো তস্মাৎ ত্বমিন্দ্রিয়াণ্যাদৌ নিয়ম্য ভরতর্ষভ। পাপ্মানং প্রজহি হ্যেনং জ্ঞানবিজ্ঞাননাশনম্। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ মানুষের অন্তর্জগতের এক একটি মৌলিক সত্যকে প্রকাশ করে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করছেন না বরং নিজের অন্তরের শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামের পথও দেখাচ্ছেন। এই শিক্ষা কেবল অর্জুনের জন্য নয় বরং প্রতিটি মানুষের জীবনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
তস্মাৎ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত তদ্ শব্দ থেকে যার অর্থ সেই বা তা। তস্মাৎ অর্থ অতএব অথবা এই কারণে। এটি এমন একটি শব্দ যা পূর্বে আলোচিত বিষয়ের ভিত্তিতে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ পূর্ববর্তী শ্লোকগুলোতে ব্যাখ্যা করেছেন যে কামনা মানুষের জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে তাকে বিভ্রান্ত করে। তাই এই শব্দের মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্ত টানছেন যে মানুষের প্রথম কর্তব্য হলো নিজের ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করা। ত্বম্ শব্দের অর্থ তুমি যা সরাসরি অর্জুনকে সম্বোধন করলেও প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক মানুষের প্রতি এই আহ্বান প্রযোজ্য।
ইন্দ্রিয়াণি শব্দটি সংস্কৃত ইন্দ্রিয় শব্দের বহুবচন। এর মূল উৎস ইন্দ্র শব্দ যার অর্থ শক্তি ক্ষমতা বা প্রভুত্ব। ইন্দ্রিয় বলতে সেই সব শক্তিকে বোঝায় যার মাধ্যমে মানুষ বাইরের জগতকে অনুভব করে এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। চোখ কান নাক জিহ্বা ত্বক এবং কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য ইন্দ্রিয় মানুষের অভিজ্ঞতার প্রধান মাধ্যম। শ্রীকৃষ্ণ এখানে ইন্দ্রিয়কে দোষারোপ করেননি বরং বলেছেন যে নিয়ন্ত্রণহীন ইন্দ্রিয়ই কামনার প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠে। আদৌ শব্দটির অর্থ প্রথমে বা সূচনাতেই। এই একটি শব্দের মধ্যেই শ্লোকটির কৌশলগত শিক্ষা নিহিত রয়েছে। সমস্যার পরিণতি নয় বরং সমস্যার সূচনাস্থলেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেমন ছোট অবস্থায় আগাছা তুলে ফেললে ক্ষেত রক্ষা করা সহজ হয় কিন্তু বড় হয়ে গেলে তা নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিয়ম্য শব্দটি নি উপসর্গ এবং যম্ ধাতু থেকে গঠিত যার অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা সংযত করা অথবা নিজের বশে আনা। এখানে নিয়ন্ত্রণ বলতে দমন নয় বরং সচেতন পরিচালনাকে বোঝানো হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ কখনো ইন্দ্রিয়কে ধ্বংস করতে বলেননি বরং সঠিক পথে পরিচালিত করতে বলেছেন। ভরতর্ষভ শব্দটি ভরত এবং ঋষভ এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ঋষভ অর্থ শ্রেষ্ঠ বা উৎকৃষ্ট। তাই ভরতর্ষভ অর্থ ভরত বংশের শ্রেষ্ঠ পুরুষ। এই সম্বোধনের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তার মহৎ বংশ মর্যাদা এবং অন্তর্নিহিত শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যাতে তিনি নিজের দুর্বলতার কাছে আত্মসমর্পণ না করেন।
পাপ্মানম্ শব্দটি পাপ শব্দ থেকে উৎপন্ন যার অর্থ অকল্যাণকর শক্তি বা আত্মবিনাশী প্রবৃত্তি। এখানে পাপ বলতে কোনো বাহ্যিক অপরাধকে বোঝানো হয়নি বরং মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা সেই কামনাকে বোঝানো হয়েছে যা ধীরে ধীরে তার বিবেককে গ্রাস করে। প্রজহি শব্দটি হা ধাতু এবং প্র উপসর্গ থেকে গঠিত যার অর্থ সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা অথবা ধ্বংস করা। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই অন্তর্নিহিত শত্রুকে নির্মূল করার নির্দেশ দিচ্ছেন কারণ এটি মানুষের প্রকৃত উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
জ্ঞানবিজ্ঞাননাশনম্ শব্দটি তিনটি পৃথক শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। জ্ঞান অর্থ তাত্ত্বিক উপলব্ধি বিজ্ঞান অর্থ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধি এবং নাশন অর্থ ধ্বংসকারী। অর্থাৎ কামনা এমন এক শক্তি যা কেবল মানুষের জ্ঞানকেই নয় বরং সেই জ্ঞানকে জীবনে বাস্তবায়িত করার ক্ষমতাকেও ধ্বংস করে দেয়। মানুষ অনেক সময় সঠিক এবং ভুলের পার্থক্য জানে কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন কামনার কারণে সেই জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করতে পারে না। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ কামনাকে জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের বিনাশকারী বলেছেন।
এই শ্লোকের বাংলা অর্থ হলো অতএব হে ভরতবংশের শ্রেষ্ঠ অর্জুন প্রথমেই তোমার ইন্দ্রিয়সমূহকে সংযত কর এবং এই পাপরূপ কামনাকে ধ্বংস কর কারণ এটি মানুষের জ্ঞান এবং প্রত্যক্ষ উপলব্ধি উভয়েরই বিনাশ ঘটায়। আক্ষরিক অর্থের পাশাপাশি এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। এটি মানুষের আত্মসংযমের শিক্ষা দেয় এবং জানায় যে জীবনের সব বড় সমস্যার মূল মানুষের নিজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। বাহ্যিক শত্রুকে জয় করার আগে নিজের মন এবং ইন্দ্রিয়কে জয় করা অপরিহার্য।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক বেদান্ত দর্শনের একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে। অবিদ্যা থেকে কামনা জন্মায় কামনা থেকে কর্ম এবং কর্ম থেকে জন্ম নেয় বন্ধন। এই বন্ধন থেকে মুক্তি লাভের জন্য প্রথমেই ইন্দ্রিয়সংযম প্রয়োজন। যোগদর্শনের ভাষায় মন এবং ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রণই যোগের মূল উদ্দেশ্য। আবার বৌদ্ধ দর্শনেও তৃষ্ণাকে দুঃখের প্রধান কারণ বলা হয়েছে। এই দুই দর্শনের মধ্যে গভীর মিল রয়েছে কারণ উভয়েই মানুষের অন্তরের অশান্ত আকাঙ্ক্ষাকেই দুঃখের মূল হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রতীকী অর্থে ইন্দ্রিয় মানুষের বাহ্যজগতের প্রবেশদ্বারকে নির্দেশ করে। কাম প্রতীক অশান্ত আকাঙ্ক্ষার। জ্ঞান প্রতীক আলোর এবং বিজ্ঞান সেই আলোর প্রত্যক্ষ উপলব্ধির প্রতীক। পাপ্মান প্রতীক মানুষের অন্তরের অন্ধকার শক্তির। যখন ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রিত থাকে তখন জ্ঞানের আলো উজ্জ্বল থাকে কিন্তু ইন্দ্রিয় অসংযত হলে কামনা সেই আলোকে আচ্ছন্ন করে দেয়। এই প্রতীকী ব্যাখ্যা মানুষের আধ্যাত্মিক এবং মনস্তাত্ত্বিক উভয় বিকাশের ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের মোবাইল ব্যবহার বিনোদনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এবং অলসতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তবে সে সহজেই জ্ঞানের পথে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি সে ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণে নিজেকে ভাসিয়ে দেয় তবে তার মনোযোগ স্মৃতিশক্তি এবং বিচারবোধ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। একইভাবে একজন কর্মজীবী মানুষ যদি লোভ ক্রোধ এবং সীমাহীন ভোগের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তবে তিনি নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং মানসিকভাবে শান্ত জীবন লাভ করেন। ইতিহাসে গৌতম বুদ্ধের জীবনও এই শিক্ষার এক উজ্জ্বল উদাহরণ যেখানে তিনি বাহ্যিক ভোগবিলাস ত্যাগ করে আত্মসংযমের মাধ্যমে চরম সত্যের অনুসন্ধান করেছিলেন।
সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক মানুষের আত্মবিকাশের একটি চিরন্তন নির্দেশনা। ভাষাগতভাবে এটি সংযম এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে। দার্শনিকভাবে এটি মানুষের অন্তরের প্রকৃত শত্রুকে চিহ্নিত করে। প্রতীকীভাবে এটি শিক্ষা দেয় যে ইন্দ্রিয় হলো জীবনের প্রবেশদ্বার আর কামনা সেই দ্বার দিয়ে প্রবেশকারী অশান্ত শক্তি যা জ্ঞানের আলোকে নিভিয়ে দিতে চায়। তাই আত্মজয়ের প্রথম শর্ত হলো ইন্দ্রিয়জয়। যে ব্যক্তি নিজের ইন্দ্রিয়কে সংযত করতে পারে সে ধীরে ধীরে কামনাকে জয় করে জ্ঞানকে রক্ষা করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত সত্য প্রজ্ঞা শান্তি ও মুক্তির পথে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!