ভগবদ্গীতা তৃতীয় অধ্যায়, ৬ষ্ঠ শ্লোকের ব্যাখ্যা | বাহ্যিক সংযম নয়, অন্তরের শুদ্ধতাই প্রকৃত সাধনা
কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্ ।
ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে।।৬।।
অনুবাদঃ যে ব্যক্তি পঞ্চ-কর্মেন্দ্রিয় সংযত করেও মনে মনে শব্দ,রস আদি ইন্দ্রিয় বিষয়গুলি স্মরণ করে, সেই মূঢ় অবশ্যই নিজেকে বিভ্রান্ত করে এবং তাকে মিথ্যাচারী ভন্ড বলা হয়ে থাকে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোক মানব চরিত্রের এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমন একজন মানুষের কথা বলেছেন যিনি বাহ্যিকভাবে নিজেকে সংযত ও ধর্মপরায়ণ হিসেবে উপস্থাপন করেন কিন্তু অন্তরে ইন্দ্রিয়ভোগের আকাঙ্ক্ষাকে লালন করেন। এই শ্লোকের মাধ্যমে গীতা শিক্ষা দেয় যে প্রকৃত সংযম কেবল বাহ্যিক আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং মন এবং চেতনার বিশুদ্ধতার মধ্যেই তার প্রকৃত পরিচয় নিহিত। বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ যদি অন্তরের পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত না হয় তবে সেই সংযম কৃত্রিম হয়ে ওঠে এবং মানুষ নিজের কাছেই অসত্য হয়ে পড়ে।
শ্লোকের শুরুতে কর্ম্মেন্দ্রিয়াণি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে যার অর্থ কর্ম সম্পাদনের ইন্দ্রিয়সমূহ। সংস্কৃত কর্ম এবং ইন্দ্রিয় এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে এর সৃষ্টি হয়েছে। বাক হাত পা পায়ু এবং উপস্থ এই পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় মানুষের সকল বাহ্যিক কর্মের প্রধান মাধ্যম। সংযম্য শব্দটি যম ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা অথবা সংযত করা। অর্থাৎ ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে তার কর্মেন্দ্রিয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং এমনভাবে জীবনযাপন করছে যেন সে সকল কামনা বাসনা ত্যাগ করেছে।
এরপর এসেছে মনসা স্মরন্ অর্থাৎ মনে মনে স্মরণ করা বা চিন্তা করতে থাকা। এখানে বোঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি বাহ্যিক আচরণে সংযত হলেও তার মন এখনও ইন্দ্রিয়বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট। ইন্দ্রিয়ার্থান্ শব্দটি ইন্দ্রিয়ের বিষয়বস্তুকে নির্দেশ করে। রূপ রস গন্ধ শব্দ এবং স্পর্শ এই পাঁচটি বিষয়ই ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণের কেন্দ্র। বাহ্যিকভাবে এগুলো থেকে দূরে থাকলেও যদি মন সর্বদা এগুলোর চিন্তায় নিমগ্ন থাকে তবে প্রকৃত সংযম অর্জিত হয় না।
শ্লোকে বিমূঢ়াত্মা শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বিমূঢ় এবং আত্মা এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। বিমূঢ় অর্থ বিভ্রান্ত বা মোহাচ্ছন্ন এবং আত্মা এখানে ব্যক্তির অন্তঃসত্তাকে নির্দেশ করে। বিমূঢ়াত্মা বলতে এমন মানুষকে বোঝায় যার বিবেক মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সত্য এবং অসত্যের মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধি করতে পারে না। সে মনে করে বাহ্যিক আচরণই ধর্মের মূল পরিচয় অথচ নিজের অন্তরের অবস্থাকে সে অবহেলা করে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো মিথ্যাচারঃ। শব্দটি মিথ্যা এবং আচার এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। মিথ্যা অর্থ অসত্য ভ্রান্ত বা প্রতারণাপূর্ণ এবং আচার অর্থ আচরণ জীবনধারা অথবা ব্যবহার। এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে মিথ্যাচার অর্থ দাঁড়ায় এমন আচরণ যা বাহ্যিকভাবে সত্য বা পবিত্র বলে প্রতীয়মান হলেও অন্তরে তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বাংলা ভাষায় এর অর্থ ভণ্ডামি কপটতা দ্বিচারিতা অথবা আত্মপ্রতারণা। তবে গীতার দৃষ্টিতে মিথ্যাচার কেবল অন্যকে প্রতারণা করা নয় বরং নিজের প্রকৃত অবস্থাকে অস্বীকার করে কৃত্রিম জীবনযাপন করাও মিথ্যাচার।
আক্ষরিক অর্থে মিথ্যাচার হলো অসত্য আচরণ। কিন্তু গীতার প্রেক্ষাপটে এর অর্থ আরও গভীর। এখানে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যে বাহ্যিকভাবে ইন্দ্রিয়সংযমের অভিনয় করে কিন্তু অন্তরে ভোগবিলাসের আকাঙ্ক্ষা লালন করে। তার জীবন বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ দুই স্তরে বিভক্ত হয়ে যায়। এই দ্বৈততা মানুষকে প্রকৃত আত্মোন্নতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
এই শিক্ষার গভীর তাৎপর্য হলো মানুষের চরিত্রের প্রকৃত মূল্যায়ন বাহ্যিক আচরণ দিয়ে নয় বরং অন্তরের অবস্থা দিয়ে করতে হবে। কেবল কর্ম ত্যাগ করলেই কেউ যোগী বা সন্ন্যাসী হয়ে যায় না। মন যদি এখনও কামনা বাসনা লোভ কিংবা আসক্তিতে পূর্ণ থাকে তবে বাহ্যিক সংযমের কোনো আধ্যাত্মিক মূল্য থাকে না। গীতা শিক্ষা দেয় যে প্রকৃত সংযম হলো মনের রূপান্তর। জোর করে ইচ্ছাকে দমন করা সাময়িক ফল দিতে পারে কিন্তু জ্ঞান ভক্তি এবং আত্মউপলব্ধির মাধ্যমে সেই আকাঙ্ক্ষাকে অতিক্রম করাই প্রকৃত মুক্তির পথ।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বেদান্ত দর্শন অনুযায়ী মানুষের প্রকৃত পরিচয় শরীর নয় বরং আত্মা। বাহ্যিক আচরণ তখনই অর্থবহ হয় যখন তা অন্তরের বিশুদ্ধতার প্রতিফলন হয়। সাংখ্য দর্শন মনে করে মন এবং ইন্দ্রিয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হলে মানুষ মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং নিজের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না। যোগদর্শনের আলোকে সংযম মানে কেবল শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করা নয় বরং চিত্তের সকল বিক্ষিপ্ত প্রবণতাকে শান্ত করা। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যখন মানুষ নিজের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করে কৃত্রিম ব্যক্তিত্ব ধারণ করে তখন তার মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং সেই দ্বন্দ্ব তাকে অস্থির ও অসুখী করে তোলে।
প্রতীকী অর্থেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ধর্মীয় দৃষ্টিতে মিথ্যাচার বাহ্যিক সাধুতার মুখোশকে নির্দেশ করে যার অন্তরে প্রকৃত পবিত্রতা নেই। সাহিত্যে এটি দ্বৈত চরিত্র এবং মুখোশধারী মানুষের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মনোবিজ্ঞানে এটি মানুষের দমিত আকাঙ্ক্ষা এবং অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতীক। আধ্যাত্মিক অর্থে এটি অহংকারের নির্মিত এক কৃত্রিম পরিচয় যা আত্মজ্ঞান লাভের পথে প্রধান অন্তরায়।
বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হয়। একজন ব্যক্তি হয়তো উপবাস পালন করছেন কিন্তু সারাদিন মনে মনে সুস্বাদু খাবারের কথাই ভাবছেন। আবার কেউ সততার কথা প্রচার করছেন অথচ ব্যক্তিগত জীবনে অসৎ কাজ করছেন। কেউ বাহ্যিকভাবে সন্ন্যাসীর জীবন গ্রহণ করেছেন কিন্তু অন্তরে ভোগবিলাসের আকাঙ্ক্ষা লালন করছেন। এসব ক্ষেত্রেই বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ অবস্থার অসামঞ্জস্য প্রকাশ পায় যা গীতার ভাষায় মিথ্যাচার।
সার্বিকভাবে এই শ্লোক মানুষের আত্মশুদ্ধির এক চিরন্তন শিক্ষা প্রদান করে। এটি জানিয়ে দেয় যে ধর্ম কেবল বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠানের নাম নয় বরং অন্তরের সত্যতা এবং চরিত্রের সততার নাম। ভাষাগতভাবে মিথ্যাচার শব্দটি অসত্য আচরণকে নির্দেশ করলেও এর প্রকৃত তাৎপর্য মানুষের অন্তর এবং বাহিরের ঐক্যের মধ্যে নিহিত। যে ব্যক্তি নিজের মনকে বিশুদ্ধ করতে পারে এবং বাহ্যিক আচরণের সঙ্গে অন্তরের সামঞ্জস্য স্থাপন করতে সক্ষম হয় সেই প্রকৃত যোগী এবং প্রকৃত সাধক। আর যে ব্যক্তি বাহ্যিক সংযমের আড়ালে অন্তরের আসক্তিকে লুকিয়ে রাখে সে নিজের কাছেই অসত্য হয়ে থাকে। এই কারণেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঘোষণা করেছেন যে এমন ব্যক্তি মিথ্যাচারী নামে পরিচিত এবং প্রকৃত আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য বাহ্যিক সংযমের পাশাপাশি অন্তরের শুদ্ধি অপরিহার্য।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!