ভগবদ্গীতা তৃতীয় অধ্যায়, ৭ম শ্লোকের ব্যাখ্যা | শ্রীভগবানুবাচ শব্দের অর্থ ও প্রকৃত কর্মযোগীর পরিচয়
যস্ত্বিন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্যারভতেহর্জুন।
কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্মযোগমসক্তঃ স বিশষ্যতে।।৭।।
অনুবাদঃ কিন্তু যিনি মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে অনাসক্তভাবে কর্মযোগের অনুষ্ঠান করেন, তিনি পূর্বোক্ত মিথ্যাচারী অপেক্ষা অনেক গুণে শ্রেষ্ঠ।
শ্রীভগবানুবাচ শব্দটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ এবং গভীর অর্থবহ একটি পদ। এটি সংস্কৃত ভাষার তিনটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। শ্রী ভগবান এবং উবাচ। শ্রী শব্দটি সংস্কৃত শ্রি ধাতু থেকে উদ্ভূত যার অর্থ সৌন্দর্য কল্যাণ ঐশ্বর্য মঙ্গল সমৃদ্ধি এবং জ্যোতি। ভগবান শব্দটি ভগ এবং মতুপ প্রত্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত। ভগ অর্থ ঐশ্বর্য জ্ঞান শক্তি যশ সৌন্দর্য এবং বৈরাগ্য। যাঁর মধ্যে এই ছয়টি ঐশ্বর্য পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান তিনিই ভগবান। উবাচ শব্দটি বচ ধাতু থেকে উৎপন্ন যার অর্থ বললেন বা উচ্চারণ করলেন। এই তিনটি অংশ একত্রে শ্রীভগবানুবাচ শব্দের সৃষ্টি করেছে যার আক্ষরিক অর্থ শ্রীভগবান বললেন অথবা পরমেশ্বর বললেন। তবে এই অর্থ কেবল ভাষাগত নয় বরং গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক তাৎপর্য বহন করে।
ভগবদ্গীতার প্রতিটি অধ্যায়ে যখন শ্রীভগবানুবাচ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তখন তা শুধু বক্তার পরিচয় দেওয়ার জন্য নয় বরং এই ঘোষণা করার জন্য যে এখন যে বাণী উচ্চারিত হবে তা কোনো সাধারণ মানুষের মতামত নয়। এটি পরম সত্যের বাণী। এটি সর্বজ্ঞ চৈতন্যের জ্ঞান। এটি এমন এক নির্দেশনা যা কেবল অর্জুনের জন্য নয় বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য। এই শব্দটি পাঠককে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে দেয় যে এখন যে শিক্ষা আসছে তা জীবনের গভীরতম সত্যকে উপলব্ধি করার পথ প্রদর্শন করবে।
এই শ্লোকে শ্রীভগবান অর্জুনকে শিক্ষা দিচ্ছেন যে প্রকৃত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তিনি নন যিনি কেবল বাহ্যিকভাবে কর্ম ত্যাগ করেন অথবা ইন্দ্রিয়কে দমন করার ভান করেন। বরং প্রকৃত শ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি যিনি মন দ্বারা ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং কর্মফলের প্রতি আসক্ত না হয়ে কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করেন। এখানে মনকে ইন্দ্রিয়ের পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে। মন যদি নিয়ন্ত্রিত হয় তবে ইন্দ্রিয়ও নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু মন যদি ভোগবিলাস এবং আকাঙ্ক্ষার অধীন থাকে তবে বাহ্যিক সংযমের কোনো মূল্য থাকে না। তাই এই শ্লোক কর্ম এবং সংযমের প্রকৃত অর্থকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক কর্মযোগের মৌলিক ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠা করে। বেদান্ত দর্শনে ভগবান হলেন পরম ব্রহ্মের ব্যক্তিগত প্রকাশ যিনি জগতের কল্যাণের জন্য নিজেই জ্ঞান প্রদান করেন। সাংখ্য দর্শনের আলোকে মানুষের বন্ধনের মূল কারণ হলো ইন্দ্রিয়ের প্রতি আসক্তি। এই শ্লোক সেই আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মন নিয়ন্ত্রণ এবং অনাসক্ত কর্মের শিক্ষা দেয়। কর্মযোগ দর্শনে বলা হয় কর্ম কখনো বন্ধনের কারণ নয় বরং কর্মের ফলের প্রতি আসক্তিই বন্ধনের কারণ। তাই মানুষকে কর্ম পরিত্যাগ নয় বরং কর্মের মধ্যেই আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির পথ অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের অন্তর্জগতের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। অর্জুন এখানে দ্বিধাগ্রস্ত মানুষের প্রতীক। ভগবান উচ্চতর চেতনা এবং অন্তরের প্রজ্ঞার প্রতীক। ইন্দ্রিয় মানুষের প্রবৃত্তি ও আকর্ষণকে নির্দেশ করে। যখন মানুষের অন্তরের উচ্চতর চেতনা তার মনকে পরিচালিত করে তখন সে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে এবং জীবনের জটিল পরিস্থিতিতেও স্থির থাকতে সক্ষম হয়। এই অর্থে শ্রীভগবানুবাচ মানুষের নিজের অন্তরের জ্ঞানস্বরেরও প্রতীক।
প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকের প্রতিটি উপাদান গভীর তাৎপর্য বহন করে। কুরুক্ষেত্র মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতীক। অর্জুন বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত মানবমনের প্রতীক। শ্রীকৃষ্ণ সর্বোচ্চ জ্ঞান এবং ঈশ্বরীয় চেতনার প্রতীক। ইন্দ্রিয় মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ভোগপ্রবণতার প্রতীক। কর্মযোগ এমন এক জীবনপদ্ধতির প্রতীক যেখানে মানুষ পৃথিবীর সকল কর্তব্য পালন করেও অন্তরে স্বাধীন ও শান্ত থাকতে পারে। এই প্রতীকী ব্যাখ্যা শ্লোকটিকে কেবল একটি ধর্মীয় উপদেশ নয় বরং সার্বজনীন মানবজীবনের দর্শনে উন্নীত করেছে।
বাস্তব জীবনেও এই শিক্ষার গভীর প্রয়োগ দেখা যায়। একজন ছাত্র যদি কেবল বই খুলে বসে থাকে কিন্তু তার মন অন্যত্র বিচরণ করে তবে তার অধ্যয়ন ফলপ্রসূ হয় না। অন্যদিকে যে ছাত্র মনোযোগ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা করে এবং ফলের চিন্তার পরিবর্তে নিজের কর্তব্য পালন করে সে প্রকৃত অর্থে সফলতার পথে এগিয়ে যায়। একইভাবে একজন চিকিৎসক যদি কেবল অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে চিকিৎসা করেন তবে তার কর্ম সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যিনি সেবাকে কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং নিষ্ঠার সঙ্গে রোগীর চিকিৎসা করেন তিনিই কর্মযোগের আদর্শ অনুসরণ করেন। আবার পদ্মফুল যেমন জলের মধ্যে থেকেও জলে লিপ্ত হয় না তেমনি কর্মযোগী মানুষ সংসারের সমস্ত কর্মের মধ্যে অবস্থান করেও আসক্তির বন্ধনে আবদ্ধ হন না।
সার্বিকভাবে শ্রীভগবানুবাচ শব্দটি ভাষাগতভাবে একটি সাধারণ বাক্যাংশ হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অসীম। এটি ঐশ্বরিক জ্ঞানের সূচনা নির্দেশ করে। এটি মানুষের অন্তরের জাগরণকে আহ্বান জানায়। এটি শেখায় যে প্রকৃত সংযম বাহ্যিক আচরণে নয় বরং অন্তরের নিয়ন্ত্রণে নিহিত। এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো কর্ম থেকে পালিয়ে নয় বরং মনকে নিয়ন্ত্রণ করে অনাসক্তভাবে কর্তব্য পালন করেই মানুষ আত্মিক উন্নতি লাভ করতে পারে। তাই শ্রীভগবানুবাচ কেবল একটি সূচনাবাক্য নয় বরং মানবজীবনের জন্য চিরন্তন জ্ঞান সত্য এবং মুক্তির আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!