সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা তৃতীয় অধ্যায়, ৮ম শ্লোকের ব্যাখ্যা | কেন কর্তব্যকর্ম পালন করা উচিত?

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে


নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হ্যকর্মণঃ।
শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিদ্ধ্যেদকর্মণ।।৮।।

অনুবাদঃ তুমি শাস্ত্রোক্ত কর্মের অনুষ্ঠান কর, কেন না কর্মত্যাগ থেকে কর্মের অনুষ্ঠান শ্রেয়। কর্ম না করে কেউ দেহযাত্রাও নির্বাহ করতে পারে না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকটি কর্মযোগ দর্শনের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা বহন করে। এই শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উপদেশ দিচ্ছেন যে মানুষকে সর্বদা তার নির্ধারিত কর্তব্য পালন করতে হবে, কারণ কর্মই মানবজীবনের প্রকৃত ধর্ম এবং কর্মহীনতা কখনোই কল্যাণের পথ হতে পারে না। শ্লোকটির প্রতিটি শব্দ ভাষাতাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি নৈতিক উপদেশ নয়, বরং সমগ্র মানবজীবনের গতিশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মোন্নতির এক চিরন্তন ঘোষণা।

এই শ্লোকে ব্যবহৃত নিয়তং শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত যম ধাতু থেকে, যার অর্থ নিয়ন্ত্রণ করা, সংযত করা অথবা সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত করা। এর পূর্বে নি উপসর্গ যুক্ত হয়ে শব্দটির অর্থ দাঁড়িয়েছে নির্ধারিত, নিয়মিত অথবা কর্তব্যরূপে নির্দিষ্ট। কুরু শব্দটি কৃ ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যার অর্থ করা বা সম্পাদন করা। এটি আজ্ঞাসূচক রূপ, যার মাধ্যমে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে কর্তব্য পালন করতেই হবে। কর্ম্ম শব্দটিও একই কৃ ধাতু থেকে গঠিত এবং এর অর্থ কাজ, কর্তব্য, কার্য অথবা এমন সব কর্ম যা মানুষের জীবনকে পরিচালিত করে। জ্যায়ো শব্দের অর্থ শ্রেষ্ঠ, অধিক কল্যাণকর অথবা উৎকৃষ্ট। অপরদিকে অকর্ম্মণঃ শব্দটি অ নিষেধসূচক উপসর্গ এবং কর্ম শব্দের সমন্বয়ে গঠিত, যার অর্থ কর্মহীনতা, নিষ্ক্রিয়তা অথবা কর্তব্য পরিত্যাগ। শরীরযাত্রাপি শব্দটি শরীর এবং যাত্রা এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ শরীরের রক্ষণাবেক্ষণ, জীবনধারণ কিংবা অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা। প্রসিধ্যেত শব্দটির অর্থ সম্পন্ন হওয়া, সফল হওয়া অথবা সুষ্ঠুভাবে চলতে থাকা। এইভাবে শ্লোকের প্রতিটি শব্দ একত্রে এমন একটি অর্থবহ বাক্য নির্মাণ করেছে যেখানে মানবজীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে কর্মকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

শ্লোকটির সরল বাংলা অর্থ হলো তুমি তোমার নির্ধারিত কর্তব্য পালন কর, কারণ কর্ম কর্মহীনতার তুলনায় শ্রেষ্ঠ। এমনকি কর্ম না করলে তোমার শরীরধারণও সম্ভব হবে না। আক্ষরিক অর্থে এটি একটি বাস্তব সত্যের প্রকাশ। মানুষ যদি কোনো কাজ না করে, তবে সে নিজের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় উপায়ও অর্জন করতে পারবে না। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান কিংবা জীবনের অন্য যেকোনো প্রয়োজন পূরণ করতে কর্ম অপরিহার্য। তাই কর্ম কেবল অর্থনৈতিক বা সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং জীবনধারণেরও মৌলিক শর্ত।

প্রাসঙ্গিক অর্থে এই শ্লোকের শিক্ষা আরও বিস্তৃত। এখানে কর্ম বলতে শুধু পেশাগত কাজ বা জীবিকা নির্বাহকে বোঝানো হয়নি। বরং প্রত্যেক মানুষের স্বধর্ম, নৈতিক দায়িত্ব, সামাজিক কর্তব্য এবং আত্মোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সৎ প্রচেষ্টাকেই কর্ম বলা হয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর জন্য অধ্যয়ন তার নিয়ত কর্ম। একজন চিকিৎসকের জন্য রোগীর সেবা, একজন কৃষকের জন্য কৃষিকাজ, একজন শিক্ষকের জন্য শিক্ষা প্রদান এবং একজন অভিভাবকের জন্য সন্তানের লালন পালনই তার নিয়ত কর্ম। প্রত্যেক মানুষ তার অবস্থান অনুযায়ী একটি বিশেষ দায়িত্ব বহন করে এবং সেই দায়িত্ব পালনই প্রকৃত কর্মযোগ।

এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য হলো জীবন নিজেই এক অবিরাম কর্মপ্রবাহ। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে। সূর্য প্রতিদিন আলো দিচ্ছে, নদী অবিরাম প্রবাহিত হচ্ছে, বৃক্ষ নিরন্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, পৃথিবী নিজের কক্ষপথে ঘুরছে এবং মানবদেহের হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্বাভাবিক ধর্মই হলো ক্রিয়া। তাই কর্মহীনতা প্রকৃতির নিয়মের বিরোধী। যে ব্যক্তি নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকে, সে নিজের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেদান্ত দর্শন বলে যে কর্ম মানুষকে আবদ্ধ করে না, বরং কর্মের প্রতি আসক্তিই মানুষকে বন্ধনে আবদ্ধ করে। তাই কর্তব্য পালন করতে হবে কিন্তু ফলের প্রতি আসক্ত হওয়া চলবে না। সাংখ্য দর্শনের মতে প্রকৃতি সর্বদা কর্মশীল এবং মানুষের শরীরও প্রকৃতির অংশ হওয়ায় সম্পূর্ণ কর্মহীন থাকা কখনো সম্ভব নয়। নৈতিক দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের প্রধান কর্তব্যবোধকে জাগ্রত করে এবং শেখায় যে নিজের দায়িত্ব থেকে পলায়ন নয়, বরং নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালনই প্রকৃত নৈতিকতার পরিচয়। আধুনিক অস্তিত্ববাদী দর্শনের আলোচনায়ও মানুষের পরিচয় তার কর্মের মধ্যেই প্রকাশ পায়। মানুষ তার কর্মের মাধ্যমেই নিজের চরিত্র, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।

প্রতীকী অর্থে কর্ম হলো জীবন, গতি, সৃজনশীলতা এবং বিকাশের প্রতীক। অন্যদিকে অকর্ম হলো স্থবিরতা, জড়তা, অবক্ষয় এবং সম্ভাবনার মৃত্যুর প্রতীক। শরীরযাত্রা এখানে শুধু শারীরিক জীবনধারণের প্রতীক নয়, বরং সমগ্র মানবজীবনের যাত্রাপথের প্রতীক। কর্মকে আধ্যাত্মিকভাবে আত্মশুদ্ধির অগ্নি হিসেবে দেখা যায়, কারণ নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদিত নিঃস্বার্থ কর্ম মানুষের অহংকার, স্বার্থপরতা এবং অজ্ঞতাকে ধীরে ধীরে দূর করে। বিপরীতে কর্মহীনতা অজ্ঞানতা, অলসতা এবং আত্মবিকাশের প্রতিবন্ধকতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত বাস্তব। অর্থপূর্ণ কর্ম মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান এবং জীবনের উদ্দেশ্যবোধ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা হতাশা, উদ্বেগ, আত্মগ্লানি এবং মানসিক অবসাদের জন্ম দিতে পারে। তাই গীতার এই শিক্ষা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সঙ্গেও বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাস্তব জীবনের বহু উদাহরণ এই শ্লোকের সত্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। একজন কৃষক যদি জমিতে বীজ না বোনেন তবে কখনোই ফসল পাবেন না। একজন শিক্ষার্থী যদি নিয়মিত অধ্যয়ন না করেন তবে জ্ঞান অর্জন সম্ভব হবে না। একটি নদী যতক্ষণ প্রবাহিত থাকে ততক্ষণ তার জল নির্মল থাকে, কিন্তু স্থির জল ধীরে ধীরে দূষিত হয়ে যায়। তেমনি মানুষের জীবনও কর্মের মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ হয়ে ওঠে, আর নিষ্ক্রিয়তা তাকে ধীরে ধীরে দুর্বল ও স্থবির করে তোলে। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে অর্জুন যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বোঝান যে কর্তব্য থেকে পলায়ন নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে কর্তব্য পালনই প্রকৃত ধর্ম। ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধীর জীবনও এই কর্মদর্শনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ, কারণ তিনি কেবল আদর্শ প্রচার করেননি, বরং নিরন্তর কর্মের মাধ্যমে সেই আদর্শকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

সবশেষে বলা যায় এই শ্লোক মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। ভাষাগতভাবে এটি কর্তব্য, কর্ম এবং নিষ্ক্রিয়তার সম্পর্ককে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে। দার্শনিকভাবে এটি শেখায় যে কর্মই আত্মোন্নতি ও মুক্তির পথ, যদি তা নিঃস্বার্থভাবে সম্পাদিত হয়। প্রতীকীভাবে কর্ম হলো প্রবাহমান নদী, উদীয়মান সূর্য এবং বিকশিত বৃক্ষের মতো জীবনশক্তির প্রতীক, আর অকর্ম হলো স্থবিরতা ও অবক্ষয়ের প্রতীক। তাই এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষকে সর্বদা নিজের নির্ধারিত কর্তব্য নিষ্ঠা, সততা এবং আত্মনিবেদনের সঙ্গে পালন করতে হবে। কারণ কর্মই জীবনকে অর্থপূর্ণ করে, চরিত্রকে মহৎ করে এবং মানুষকে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 06, 2026 August 06, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি