শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৮ম শ্লোকের বিস্তারিত
ভবান্ ভীষ্মশ্চ কর্ণশ্চ কৃপশ্চ সমিতিঞ্জয়ঃ।
অশ্বত্থামা বিকর্ণশ্চ সৌমদত্তির্জয়দ্রথঃ॥
অনুবাদ : ভবান্ (আপসি ) ভীষ্মশ্চ (ভীষ্ম) কণশ্চ (কণ) সসিমসিতঞ্জয়ঃ কৃপশ্চ (র্যুদ্ধজয়ী কৃপ) অশ্বত্থামা (অশ্বত্থামা) সিবকণশ্চ (সিবকণ) গসৌমদসিত্তঃ (ভূ সির বা) জয়দ্রথঃ (জয়দ্রথ) া াশস্ত্রপ্রহরণাঃ (সিবসিবধ শস্ত্রধারী) অজে ্য চ বহবঃ শূরাঃ (অ ্যা ্য বহুবীর) [সসিন্ত] (আজে ), সজের্ব্ব (তাঁহারা সকজেল) র্যুদ্ধসিবশারদাঃ (র্যুদ্ধপারদশী) মদজেথ (আমার জ ্য) ত্য জীসিবতাঃ (প্রাণ-ত্যাজেগও কৃতসঙ্কল্প)॥৮–৯॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকে দুর্যোধন আচার্য দ্রোণকে উদ্দেশ্য করে কৌরবপক্ষের প্রধান প্রধান বীরদের পরিচয় করিয়ে দেন। এই শ্লোকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ও নাম কেবল একজন যোদ্ধার পরিচয় বহন করে না; বরং মানবচরিত্র, নৈতিকতা, কর্তব্যবোধ, অহংকার, করুণা, বিবেক, প্রতিশোধ, বংশমর্যাদা এবং আত্মপরিচয়ের মতো গভীর জীবনদর্শনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভাষাতাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এই শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জগতের এক বিস্ময়কর মানসিক মানচিত্র।
‘ভবান্’ (भवान्) শব্দটি সংস্কৃত ‘ভূ’ (भू) ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ ‘হওয়া’, ‘অস্তিত্ব লাভ করা’ বা ‘বিদ্যমান থাকা’। ‘ভবত্’ শব্দের সম্মানসূচক রূপ হলো ‘ভবান্’ যার বাংলা অর্থ ‘আপনি’, ‘মহাশয়’ বা ‘সম্মানিত ব্যক্তি’। আক্ষরিক অর্থে এটি সেই ব্যক্তিকে নির্দেশ করে, যিনি মর্যাদাসম্পন্ন এবং শ্রদ্ধার যোগ্য। এই শ্লোকে দুর্যোধন আচার্য দ্রোণকে ‘ভবান্’ বলে সম্বোধন করেছেন, যা তাঁর বাহ্যিক ভদ্রতা ও সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন। দার্শনিকভাবে এই শব্দটি শেখায় যে প্রকৃত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সামনে বিনয়ই মানুষের শ্রেষ্ঠ অলংকার। প্রতীকী অর্থে ‘ভবান্’ গুরু শিক্ষক এবং জ্ঞানপ্রাপ্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধের প্রতীক।
‘ভীষ্ম’ (भीष्म) শব্দটি ‘ভীষ্’ (भीष्) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ভীতিজনক হওয়া’ বা ‘ভয় প্রদর্শন করা’। আক্ষরিক অর্থে ‘ভীষ্ম’ বলতে বোঝায় যিনি ভয়ংকর প্রতিজ্ঞা করেছেন অথবা যাঁর অটল সংকল্প সকলকে বিস্মিত করে। মহাভারতে আজীবন ব্রহ্মচর্য পালন এবং সিংহাসনের দাবিত্যাগের ভয়ংকর প্রতিজ্ঞার কারণেই দেবব্রত ‘ভীষ্ম’ নামে পরিচিত হন। ভাষাগতভাবে এই নাম দৃঢ়তা ও অটলতার পরিচায়ক হলেও দার্শনিকভাবে ভীষ্ম আমাদের শেখান যে কেবল প্রতিজ্ঞা নয়, প্রতিজ্ঞার লক্ষ্যও ন্যায়সঙ্গত হওয়া উচিত। অন্যায়ের পক্ষে নীরব আনুগত্য কখনো প্রকৃত ধর্ম হতে পারে না। প্রতীকীভাবে ভীষ্ম মানবজীবনের অটল নীতি, আত্মসংযম এবং একই সঙ্গে কর্তব্য ও ন্যায়ের জটিল দ্বন্দ্বের প্রতীক।
‘কর্ণ’ (कर्ण) শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘কান’। সংস্কৃত ভাষায় ‘কর্ণ’ শব্দটি শ্রবণশক্তির প্রতীক হলেও মহাভারতের কর্ণের জীবন এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির ইতিহাস। তিনি সূর্যদেব ও কুন্তীর পুত্র হলেও জন্মপরিচয় গোপন থাকার কারণে সারাজীবন অবমূল্যায়ন ও পরিচয় সংকটে ভুগেছেন। বাংলা অর্থে কর্ণ দানবীর, বীরযোদ্ধা ও বিশ্বস্ত বন্ধুর প্রতীক। দার্শনিকভাবে কর্ণ মানুষের আত্মমর্যাদা, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। প্রতীকী অর্থে কর্ণ আমাদের শেখান যে অসাধারণ প্রতিভাও ভুল সঙ্গ, অহংকার কিংবা পক্ষপাতের কারণে জীবনের প্রকৃত সাফল্য থেকে বিচ্যুত হতে পারে।
‘কৃপ’ (कृप) শব্দটি ‘কৃপ্’ (कृप्) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘দয়া করা’, ‘অনুগ্রহ করা’ বা ‘করুণা প্রদর্শন করা’। এর বাংলা অর্থ করুণা, অনুকম্পা ও সহমর্মিতা। কৃপাচার্য ছিলেন মহাভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এবং অসামান্য যোদ্ধা। তাঁর নাম করুণার প্রতীক হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেন। এই বৈপরীত্য মানবজীবনের এক গভীর সত্যকে প্রকাশ করে ব্যক্তিগত গুণাবলি সবসময় নৈতিক সিদ্ধান্তকে সঠিক পথে পরিচালিত করে না। দার্শনিকভাবে কৃপ শেখান যে জ্ঞান ও করুণার সঙ্গে ন্যায়বোধের সমন্বয় না ঘটলে মানবজীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রতীকী অর্থে তিনি মানবিকতার প্রতীক।
‘সমিতিঞ্জয়ঃ’ (समितिञ्जयः) শব্দটি ‘সমিতি’ এবং ‘জয়’ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘সমিতি’ অর্থ যুদ্ধ বা সমাবেশ এবং ‘জয়’ অর্থ বিজয়। অর্থাৎ সমিতিঞ্জয়ঃ হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি যুদ্ধে বিজয়ী। শ্লোকে এটি কৃপাচার্যের একটি বিশেষণ। তবে দার্শনিক অর্থে প্রকৃত যুদ্ধ বাইরের শত্রুর সঙ্গে নয়, নিজের অন্তরের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও অহংকারের সঙ্গে। যে ব্যক্তি নিজের দুর্বলতাকে জয় করতে পারে, প্রকৃত অর্থে তিনিই সমিতিঞ্জয়। প্রতীকীভাবে এই শব্দ আত্মবিজয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতীক।
‘অশ্বত্থামা’ (अश्वत्थामा) শব্দটি ‘অশ্ব’ অর্থাৎ ঘোড়া এবং ‘স্থামা’ বা ‘স্থামन्’ অর্থ শক্তি, ধ্বনি বা স্থৈর্য থেকে গঠিত। প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী জন্মের সময় তাঁর কান্নার শব্দ ঘোড়ার ডাকার মতো ছিল বলেই তাঁর এই নাম। তিনি দ্রোণাচার্যের পুত্র এবং মহাভারতের অন্যতম শক্তিশালী যোদ্ধা। কিন্তু তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিশোধস্পৃহা। দার্শনিকভাবে অশ্বত্থামা শেখান যে নিয়ন্ত্রণহীন ক্রোধ ও প্রতিহিংসা মানুষকে এমন অপরাধে পরিচালিত করতে পারে, যা সারাজীবনের অনুতাপের কারণ হয়। প্রতীকীভাবে তিনি আহত অহংকার, প্রতিশোধ এবং নিয়ন্ত্রণহীন আবেগের ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতীক।
‘বিকর্ণ’ (विकर्ण) শব্দটি ‘বি’ উপসর্গ এবং ‘কর্ণ’ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘বি’ অর্থ বিশেষ বা ভিন্ন এবং ‘কর্ণ’ অর্থ কান। আক্ষরিক অর্থে বিকর্ণ সেই ব্যক্তি, যিনি অন্যদের তুলনায় ভিন্নভাবে শোনেন বা গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। মহাভারতের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় একমাত্র কৌরব হিসেবে বিকর্ণ প্রকাশ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই কারণে তিনি কৌরবদের মধ্যে বিবেকের কণ্ঠস্বর হিসেবে স্মরণীয়। দার্শনিকভাবে বিকর্ণ শেখান যে সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে থাকাই সবসময় সত্যের পক্ষে থাকা নয়। প্রতীকীভাবে তিনি ন্যায়বোধ, বিবেক এবং সত্য বলার সাহসের প্রতীক।
‘সৌমদত্তি’ (सौमदत्त) শব্দটির অর্থ ‘সোমদত্তের পুত্র’। এটি একটি পিতৃপরিচয়ভিত্তিক নাম, যা মহাভারতের ভূরিশ্রবাকে নির্দেশ করে। ভাষাগতভাবে এটি বংশপরিচয়ের ধারক হলেও দার্শনিকভাবে এই নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার জন্মে নয়, তার কর্মে। প্রতীকীভাবে সৌমদত্তি ঐতিহ্য, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার প্রতীক।
‘জয়দ্রথ’ (जयद्रथः) শব্দটি ‘জয়’ এবং ‘রথ’ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর আক্ষরিক অর্থ ‘বিজয়ী রথের অধিকারী’ অথবা ‘যার রথ বিজয় বহন করে’। মহাভারতে অভিমন্যুর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। সাময়িক বিজয় তাঁকে অহংকারে অন্ধ করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অহংকারই তাঁর পতনের কারণ হয়। দার্শনিকভাবে জয়দ্রথ শিক্ষা দেন যে অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিজয় কখনো স্থায়ী হয় না এবং কর্মফল অবধারিত। প্রতীকীভাবে তিনি অহংকার, ক্ষমতার মোহ এবং নৈতিক পতনের প্রতীক।
বাস্তব জীবনে এই শ্লোকের চরিত্রগুলো আমাদের অন্তর্জগতের বিভিন্ন প্রবণতার প্রতিরূপ। যখন আমরা আদর্শ রক্ষার জন্য দৃঢ় থাকি, তখন আমাদের মধ্যে ভীষ্ম জাগ্রত হন; যখন স্বীকৃতির অভাবে অন্তরে বেদনা জন্মায়, তখন কর্ণের জীবন আমাদের প্রতিফলিত হয়। যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা দাঁড়ানোর সাহস করি, তখন বিকর্ণের আদর্শ প্রকাশিত হয়; আবার ক্রোধ ও প্রতিশোধে বিবেক হারিয়ে ফেললে অশ্বত্থামার ছায়া আমাদের গ্রাস করে। করুণার প্রকাশে কৃপ, আত্মসংযমে সমিতিঞ্জয় এবং অহংকারে জয়দ্রথ এই সব চরিত্র প্রতিনিয়ত মানুষের মনোজগতে সক্রিয় থাকে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ ভাষাতাত্ত্বিক অর্থে একটি নাম, ঐতিহাসিক অর্থে একটি চরিত্র, সাহিত্যিক অর্থে একটি শক্তিশালী প্রতীক এবং দার্শনিক অর্থে মানবচরিত্রের এক একটি চিরন্তন দিকের প্রতিনিধিত্ব করে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই সংক্ষিপ্ত শ্লোক তাই কেবল কৌরববাহিনীর যোদ্ধাদের পরিচয় নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতের নৈতিক সংগ্রাম, কর্তব্য ও বিবেকের দ্বন্দ্ব, আত্মমর্যাদা, করুণা, অহংকার, প্রতিশোধ এবং আত্মবিজয়ের এক অনন্য জীবনদর্শন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যেমন বাহ্যিক সংঘর্ষের ইতিহাস, তেমনি এই শ্লোক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষের প্রকৃত যুদ্ধ প্রতিনিয়ত তার নিজের অন্তরেই সংঘটিত হয়, এবং সেই যুদ্ধে বিজয়ী হওয়াই জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৯ম শ্লোকের বিস্তারিত | ‘অন্যে’ শব্দের ব্যুৎপত্তি, দর্শন ও প্রতীকী অর্থ
Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.
30 Day Money-Back Guarantee
Say goodbye to your low online sales rate!