Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৫ম শ্লোকের বিস্তারিত

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 24, 2026


ধৃষ্টকেতুশ্চেকিতানঃ কাশীরাজশ্চ বীর্য্যবান্।
পুরুজিৎ কুন্তিভোজশ্চ শৈব্যশ্চ নরপুঙ্গবঃ॥৫॥ 

 অনুবাদ : ধৃষ্টকেতুঃ (ধৃষ্টকেতু) চেকিতানঃ (চেকিতান রাজা)বীর্য্যবান্ কাশীরাজশ্চ (বলশালী কাশীরাজ) পুরুজিৎ (পুরুজিৎ)কুন্তিভোজশ্চ (কুন্তিভোজ) নরপুঙ্গবঃ (নরশ্রেষ্ঠ) শৈব্যঃ চ (শৈব্যরাজ)বিক্রান্তঃ (বিক্রমশালী) যুধামন্যুশ্চ (যুধামন্যু) বীর্য্যবান্ উত্তমৌজাশ্চ (বীরউত্তমৌজা) সৌভদ্রঃ (অভিমন্যু) দ্রৌপদেয়াশ্চ (ও দ্রৌপদীর প্রতিবিন্ধ্যপ্রভৃতি পঞ্চ পুত্ত্র) সর্ব্বে এব মহারথাঃ (সকলেই মহারথ) ।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রের নিকট পাণ্ডবপক্ষের বিশিষ্ট বীরদের পরিচয় তুলে ধরেছেন। প্রথম দৃষ্টিতে এই শ্লোকটি কেবল কয়েকজন যোদ্ধার নামের তালিকা বলে মনে হলেও, এর অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত ও গভীর। এখানে উল্লিখিত প্রতিটি নাম কেবল একটি ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না; বরং একেকটি মহৎ মানবিক গুণ, নৈতিক আদর্শ, আধ্যাত্মিক শক্তি এবং নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যের প্রতীক। ভাষাতাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং প্রতীকী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এই শ্লোক মানবজীবনের আদর্শ চরিত্র নির্মাণের এক অনন্য রূপরেখা উপস্থাপন করে।

‘ধৃষ্টকেতু’ শব্দটি সংস্কৃত ‘ধৃষ্’ (धृष्) ধাতু থেকে উদ্ভূত ‘ধৃষ্ট’ এবং ‘কেতু’ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘ধৃষ্ট’ অর্থ নির্ভীক, সাহসী বা দুঃসাহসিক এবং ‘কেতু’ অর্থ পতাকা, চিহ্ন বা প্রতীক। ফলে ‘ধৃষ্টকেতু’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায়—‘সাহসের পতাকা’ বা ‘বীরত্বের প্রতীক’। মহাভারতে তিনি ছিলেন চেদিরাজ শিশুপালের পুত্র এবং পাণ্ডবদের অন্যতম মিত্র। তবে তাঁর নামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ঐতিহাসিক পরিচয়ের চেয়ে অনেক গভীর। তিনি সেই ব্যক্তিত্বের প্রতীক, যিনি অন্যায়ের সামনে কখনো মাথা নত করেন না এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত থাকেন। মানুষের জীবনে সত্যের পথে চলার জন্য যে অদম্য সাহস প্রয়োজন, ধৃষ্টকেতু সেই সাহসেরই জীবন্ত প্রতীক। যেমন ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও পতাকা অবিচলভাবে উড়তে থাকে, তেমনি আদর্শবান মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের নীতিকে অক্ষুণ্ণ রাখেন।

পরবর্তী শব্দ ‘চেকিতান’ সংস্কৃত ‘চি’ বা ‘চিত্’ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যার অর্থ জানা, উপলব্ধি করা, সচেতন হওয়া বা জ্ঞান অর্জন করা। এই শব্দের অর্থ যিনি জ্ঞানসম্পন্ন, বিচক্ষণ এবং সুদূরদর্শী। মহাভারতে চেকিতান ছিলেন যাদব বংশের এক প্রসিদ্ধ যোদ্ধা। কিন্তু প্রতীকী অর্থে তিনি বোঝান এমন একজন মানুষকে, যিনি কেবল শক্তিশালী নন, বরং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে নিজের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম। অন্ধ সাহস যেমন বিপদের কারণ হতে পারে, তেমনি জ্ঞানহীন শক্তিও ধ্বংস ডেকে আনে। তাই চেকিতান শিক্ষা দেন যে সত্যিকারের বিজয়ের জন্য বীরত্বের পাশাপাশি প্রজ্ঞা ও আত্মসচেতনতা অপরিহার্য।

‘কাশীরাজ’ শব্দটি ‘কাশী’ এবং ‘রাজ’ এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। ‘কাশ’ ধাতুর অর্থ জ্বলা, দীপ্ত হওয়া বা আলোকিত হওয়া। সেই অর্থে ‘কাশী’ হলো আলোর নগরী, আর ‘কাশীরাজ’ অর্থ সেই আলোকময় রাজ্যের অধিপতি। ঐতিহাসিকভাবে তিনি বারাণসীর রাজা হলেও প্রতীকীভাবে তিনি আলোকিত নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি। প্রকৃত নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জ্ঞান, ন্যায়, নৈতিকতা এবং দূরদর্শিতার দ্বারা সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার মধ্যেই তার সার্থকতা। একজন আলোকিত নেতা সমাজকে যেমন অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যান, তেমনি কাশীরাজও জ্ঞাননির্ভর শাসনের এক অনন্য আদর্শ।

এই কাশীরাজকে বিশেষিত করা হয়েছে ‘বীর্যবান্’ শব্দ দ্বারা। ‘বীর্য’ অর্থ শক্তি, পরাক্রম, সামর্থ্য বা বীরত্ব এবং ‘বান্’ প্রত্যয়ের অর্থ অধিকারী। ফলে ‘বীর্যবান্’ অর্থ যিনি শক্তি ও পরাক্রমের অধিকারী। তবে এখানে শক্তি কেবল শারীরিক বল নয়; মানসিক দৃঢ়তা, আত্মসংযম, নৈতিক সাহস এবং অধ্যবসায়ও এর অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃত শক্তিমান সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের প্রবৃত্তি, লোভ, ক্রোধ ও অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। বাহ্যিক শত্রুকে পরাজিত করা অপেক্ষা নিজের অন্তর্দুর্বলতাকে জয় করাই প্রকৃত বীরত্বের পরিচয়।

‘পুরুজিৎ’ শব্দটি ‘পুরু’ অর্থাৎ বহু এবং ‘জি’ ধাতু থেকে উৎপন্ন ‘জিৎ’ অর্থাৎ বিজয়ী এই দুই অংশে গঠিত। এর আক্ষরিক অর্থ যিনি বহু শত্রুকে জয় করেছেন। মহাভারতের প্রেক্ষাপটে তিনি ছিলেন কুন্তীর বংশীয় এবং পাণ্ডবদের একজন মিত্র। কিন্তু দর্শনের দৃষ্টিতে ‘পুরুজিৎ’ মানুষের আত্মজয়ের প্রতীক। বাইরের অসংখ্য শত্রুকে জয় করা যত বড় সাফল্যই হোক না কেন, নিজের কামনা, ক্রোধ, মোহ, লোভ ও অহংকারকে জয় করাই সর্বোচ্চ বিজয়। যে ব্যক্তি নিজের অন্তর্জগতকে জয় করতে সক্ষম, প্রকৃত অর্থে তিনিই সর্ববিজয়ী।

‘কুন্তিভোজ’ শব্দটি ‘কুন্তি’ এবং ‘ভোজ’ শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘ভোজ’ অর্থ পালনকারী, পোষণকারী বা রক্ষক। মহাভারতের কাহিনিতে কুন্তিভোজ ছিলেন কুন্তীর পালক পিতা, যিনি তাঁকে স্নেহ ও দায়িত্বের সঙ্গে লালন-পালন করেছিলেন। তাই তাঁর নামের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কেবল একটি পরিচয় নয়। বরং অভিভাবকত্ব, দায়িত্ববোধ এবং নিঃস্বার্থ স্নেহের প্রতীক। জন্মদাতা হওয়ার চেয়ে পালনকর্তার ভূমিকা অনেক সময় অধিক মহৎ হতে পারে এই সত্য কুন্তিভোজের চরিত্রে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মানবজীবনে ভালোবাসা কেবল রক্তের সম্পর্কের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং দায়িত্ব, ত্যাগ এবং মমতার মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে।

‘শৈব্য’ শব্দটি শিবি বা শৈব্য বংশের পরিচয় বহন করে। শিবি বংশ ভারতীয় ঐতিহ্যে ন্যায়, ত্যাগ এবং প্রজাপ্রীতির জন্য সুপ্রসিদ্ধ। ফলে শৈব্য কেবল একজন রাজা নন; তিনি আদর্শ রাজধর্ম, নৈতিকতা এবং আত্মত্যাগের প্রতীক। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা জন্মসূত্রে নয়, বরং কর্ম ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এই শিক্ষা শৈব্যের পরিচয়ের মধ্যেই নিহিত।

সবশেষে ব্যবহৃত হয়েছে ‘নরপুঙ্গব’ শব্দটি। এটি ‘নর’ এবং ‘পুঙ্গব’ এই দুই অংশে গঠিত। ‘নর’ অর্থ মানুষ এবং ‘পুঙ্গব’ অর্থ শ্রেষ্ঠ, উৎকৃষ্ট বা সর্বোত্তম। সুতরাং ‘নরপুঙ্গব’ অর্থ মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। এই বিশেষণটি কেবল শারীরিক শক্তি বা রাজকীয় মর্যাদার নির্দেশক নয়; বরং চরিত্র, নৈতিকতা, প্রজ্ঞা, আত্মসংযম এবং মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে যে ব্যক্তি অন্যদের তুলনায় মহত্তর হয়ে ওঠেন, তাকেই প্রকৃত নরপুঙ্গব বলা যায়। ভারতীয় দর্শনে মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য কেবল মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়া নয়; বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের মাধ্যমে ‘নর’ থেকে ‘নরোত্তমে’ উত্তরণ লাভ করা।

এই শ্লোকের সামগ্রিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এখানে উল্লিখিত প্রতিটি বীর যেন মানবচরিত্রের এক একটি অপরিহার্য গুণের প্রতিনিধিত্ব করেন। ধৃষ্টকেতু সাহসের, চেকিতান প্রজ্ঞার, কাশীরাজ আলোকিত নেতৃত্বের, বীর্যবান অন্তর্নিহিত শক্তির, পুরুজিৎ আত্মবিজয়ের, কুন্তিভোজ দায়িত্বপূর্ণ স্নেহের, শৈব্য ন্যায় ও আত্মত্যাগের এবং নরপুঙ্গব মানবীয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। এই সকল গুণের সমন্বয়েই একজন আদর্শ মানুষ গড়ে ওঠেন। যেমন একটি রথের প্রতিটি চাকা, অক্ষ, লাগাম ও অশ্ব পরস্পরের সমন্বয়ে রথকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, তেমনি মানুষের জীবনে সাহস, জ্ঞান, আত্মসংযম, ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার সমন্বয়ই তাকে প্রকৃত সাফল্য ও মহত্ত্বের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

অতএব, এই শ্লোক কেবল পাণ্ডবপক্ষের যোদ্ধাদের পরিচয় নয় এটি মানবচরিত্রের উৎকর্ষের এক কালজয়ী দর্শন। ভাষাগতভাবে প্রতিটি শব্দের উৎপত্তি তার অর্থকে সমৃদ্ধ করেছে, দার্শনিকভাবে প্রতিটি নাম একটি চিরন্তন মানবিক আদর্শকে ধারণ করেছে এবং প্রতীকীভাবে তারা আমাদের অন্তর্জগতের বিভিন্ন শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেছে। তাই এই শ্লোক আজও কেবল ইতিহাসের দলিল নয়; বরং ন্যায়, সাহস, জ্ঞান, আত্মবিজয় এবং মানবিক মহত্ত্বের এক চিরন্তন প্রেরণার উৎস।

 

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 24, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৫ম শ্লোকের বিস্তারিত

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৫ম শ্লোকের বিস্তারিত