সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

গীতা ১০.৩৬ — দ্যূত, তেজ, জয় ও সত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
দ্যূতং ছলয়তামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্। জয়োহস্মি ব্যবসায়োহস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্।।৩৬।।
দ্যূতং ছলয়তামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্। 
জয়োহস্মি ব্যবসায়োহস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্।।৩৬।।

অনুবাদঃ সমস্ত বঞ্চনাকারীদের মধ্যে আমি দ্যূতক্রীড়া এবং তেজস্বীদের মধ্যে আমি তেজ। আমি বিজয়, আমি উদ্যম এবং বলবানদের মধ্যে আমি বল।

ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতিযোগে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বরিক প্রকাশকে মানুষের বোধগম্য করে তুলতে জগতের বিভিন্ন শক্তি, গুণ, মহত্ত্ব ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নিজের উপস্থিতির কথা প্রকাশ করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় দশম অধ্যায়ের ছত্রিশতম শ্লোকটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, দ্যূতং ছলয়তামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্। জয়োহস্মি ব্যবসায়োহস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্। অর্থাৎ ছলনাকারীদের মধ্যে আমি দ্যূত, তেজস্বীদের মধ্যে আমি তেজ, আমি জয়, আমি দৃঢ় সংকল্প ও অধ্যবসায় এবং সত্ত্ববানদের মধ্যে আমি সত্ত্ব। এই শ্লোকের সৌন্দর্য এখানেই যে এখানে ঈশ্বরের প্রকাশকে কেবল পবিত্র, সুন্দর বা কোমল বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বরং মানবজীবনের শক্তি, কৌশল, সংগ্রাম, বিজয়, অধ্যবসায় এবং চেতনার স্বচ্ছতা সবকিছুর মধ্যেই সেই পরম শক্তির প্রকাশ দেখানো হয়েছে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো দ্যূতং। সংস্কৃত দ্যূত শব্দের সঙ্গে দীপ্তি ও চমকের ধারণার একটি ভাষাগত সম্পর্ক থাকলেও শাস্ত্রীয় ব্যবহারে দ্যূত বলতে পাশা বা জুয়া বোঝায়। মহাভারতের কাহিনিতে দ্যূত বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলা কেবল একটি খেলা ছিল না, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রাজনীতি, কৌশল, আসক্তি, প্রতারণা, অহংকার এবং নৈতিক পতনের এক গভীর ইতিহাস। তাই যখন কৃষ্ণ বলেন ছলয়তামস্মি দ্যূতম্, তখন এর অর্থ এই নয় যে তিনি জুয়া বা প্রতারণাকে নৈতিকভাবে অনুমোদন করছেন। বরং তিনি বোঝাচ্ছেন যে জগতের যে কোনো প্রবল কার্যকর শক্তির মধ্যেই তাঁর শক্তির একটি প্রকাশ রয়েছে। জুয়ার মধ্যে যেমন অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি, কৌশল এবং মানুষের মনকে প্রভাবিত করার এক প্রবল ক্ষমতা রয়েছে, সেই শক্তির উৎসও পরম সত্যের বাইরে নয়।

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। কোনো কিছুর মধ্যে ঈশ্বরীয় শক্তির উপস্থিতি থাকা এবং সেই বিষয়টিকে নৈতিকভাবে অনুসরণযোগ্য বলে ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। আগুনের মধ্যে শক্তি রয়েছে, কিন্তু আগুন দিয়ে অন্যায়ভাবে কাউকে ক্ষতি করা ন্যায়সঙ্গত নয়। বুদ্ধির মধ্যে অসাধারণ শক্তি রয়েছে, কিন্তু সেই বুদ্ধি প্রতারণায় ব্যবহার করলে তা নৈতিকভাবে কল্যাণকর হয় না। একইভাবে দ্যূতের মধ্যে কৌশল, ঝুঁকি ও আকর্ষণের শক্তি থাকতে পারে, কিন্তু জুয়ার আসক্তি বা প্রতারণা গীতার আদর্শ নয়। কৃষ্ণ এখানে শক্তির অস্তিত্বকে নির্দেশ করছেন, তার অপব্যবহারকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি উপলব্ধি না করলে শ্লোকটির প্রকৃত তাৎপর্য সহজেই বিকৃত হতে পারে।

এরপর আসে তেজ শব্দটি। সংস্কৃত তেজঃ শব্দের মধ্যে দীপ্তি, আলো, প্রখরতা, শক্তি, প্রতাপ, বীর্য এবং ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতার ধারণা রয়েছে। সূর্যের আলো যেমন চারদিকে প্রকাশিত হয়, তেমনি কোনো মানুষের অন্তরের শক্তি তার চরিত্র, আচরণ, জ্ঞান ও সাহসের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাই তেজ কেবল শারীরিক শক্তি নয়। একজন মানুষের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস, সাহস, বুদ্ধির দীপ্তি, নৈতিক দৃঢ়তা এবং ব্যক্তিত্বের প্রভাব দেখা যায়, তার সমষ্টিগত প্রকাশকেও তেজ বলা যায়। কৃষ্ণ বলেন তেজস্তেজস্বিনামহম্। অর্থাৎ তেজস্বীদের যে তেজ, তার অন্তর্নিহিত উৎস আমি। এই বক্তব্য মানুষকে নিজের শক্তির অহংকার থেকে সরিয়ে শক্তির প্রকৃত উৎসের দিকে দৃষ্টি ফেরায়। মানুষ শক্তিমান হতে পারে, প্রতিভাবান হতে পারে, জ্ঞানী হতে পারে, কিন্তু সেই শক্তির চূড়ান্ত উৎস তার ব্যক্তিগত অহংকার নয়।

এরপর কৃষ্ণ বলেন জয়োহস্মি। এখানে জয় শব্দটির মূল সংস্কৃত জি ধাতু, যার অর্থ জয় করা বা পরাজিত করা। জয় মানে সাধারণভাবে বিজয়, সাফল্য বা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে অতিক্রম করা। কিন্তু গীতার দর্শনে জয়ের অর্থ কেবল বাহ্যিক বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রকৃত জয় অনেক সময় নিজের ওপর জয়। যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে জয়ী। যে ব্যক্তি নিজের লোভকে অতিক্রম করতে পারে, সে জয়ী। যে ব্যক্তি ভয়কে অতিক্রম করে সত্যের পথে দাঁড়াতে পারে, সে জয়ী। যে ব্যক্তি অজ্ঞতাকে জ্ঞানের মাধ্যমে অতিক্রম করে, তার অর্জিত জয় বাহ্যিক বিজয়ের চেয়ে অনেক গভীর। তাই কৃষ্ণের জয় মানুষের অন্তর্জয়েরও প্রতীক।

জয়ের পরেই আসে ব্যবসায় শব্দটি। আধুনিক বাংলায় ব্যবসায় শব্দটি শুনলে সাধারণত বাণিজ্য বা ব্যবসার কথা মনে পড়ে। কিন্তু গীতার সংস্কৃত ব্যবহারে ব্যবসায় শব্দের অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ব্যবসায় বলতে দৃঢ় সংকল্প, স্থির সিদ্ধান্ত, অধ্যবসায়, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের প্রতি অবিচল প্রচেষ্টা এবং কর্মে স্থিত থাকার শক্তিকে বোঝানো হয়েছে। এই শব্দটি গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ব্যবসায়াত্মিকা বুদ্ধি ধারণার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেখানে কৃষ্ণ একাগ্র ও দৃঢ়নিশ্চয়সম্পন্ন বুদ্ধির কথা বলেছেন। অতএব এখানে ব্যবসায় হলো সেই অন্তর্নিহিত মানসিক শক্তি যার দ্বারা মানুষ কোনো মহৎ লক্ষ্য গ্রহণ করে এবং বাধা এলেও সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় না।

মানবজীবনে প্রতিভা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রতিভা একা মানুষকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে যেতে পারে না। একটি বীজের মধ্যে বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে সময়, পরিবেশ, ধৈর্য এবং নিরবচ্ছিন্ন বিকাশের প্রয়োজন হয়। মানুষের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। জ্ঞান থাকলেও যদি সংকল্প না থাকে, প্রতিভা থাকলেও যদি অধ্যবসায় না থাকে, স্বপ্ন থাকলেও যদি নিয়মিত প্রচেষ্টা না থাকে, তাহলে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে প্রকাশিত হয় না। এই কারণে কৃষ্ণ বলেন ব্যবসায়োহস্মি। মানুষের অবিচল প্রচেষ্টা, দৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং লক্ষ্যপূরণের অন্তর্নিহিত শক্তির মধ্যেও তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন।

এরপর শ্লোকটি আরও গভীর স্তরে প্রবেশ করে সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্ এই ঘোষণার মাধ্যমে। সত্ত্ব শব্দটি সংস্কৃত সৎ শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মূল ভাব অস্তিত্ব, সত্তা বা যা সত্যভাবে বিদ্যমান। দর্শনের ক্ষেত্রে সত্ত্ব আবার প্রকৃতির তিন গুণের একটি। সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই তিন গুণের মধ্যে সত্ত্বের সঙ্গে স্বচ্ছতা, জ্ঞান, সাম্য, পবিত্রতা, প্রশান্তি এবং আলোর সম্পর্ক রয়েছে। তাই সত্ত্ব শব্দটি শুধু একটি গুণের নাম নয়, বরং এমন এক চেতনার অবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে মন অস্থিরতা ও অন্ধকারের পরিবর্তে স্বচ্ছতা ও জ্ঞানের দিকে অগ্রসর হয়।

সত্ত্ববানদের মধ্যে আমি সত্ত্ব এই কথার মাধ্যমে কৃষ্ণ মানুষের অন্তরের সেই স্বচ্ছ ও নির্মল শক্তিকে নিজের বিভূতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যে মানুষের মন শান্ত, বুদ্ধি স্বচ্ছ, বিচারবোধ সুস্থ এবং কর্ম কল্যাণমুখী, তার মধ্যে সত্ত্বগুণ প্রকাশিত হয়। এই সত্ত্ব মানুষকে বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দেখতে সাহায্য করে। যেমন পরিষ্কার জলে কোনো বস্তু সহজে দেখা যায়, তেমনি সত্ত্বগুণে পরিশুদ্ধ মন সত্যকে তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে। এই কারণে সত্ত্বকে একটি স্বচ্ছ আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যায়। মন যত বেশি নির্মল হয়, সত্যের প্রতিফলন তত বেশি পরিষ্কার হয়।

এই শ্লোকের মধ্যে একটি বিস্ময়কর অন্তর্নিহিত ধারাবাহিকতাও লক্ষ্য করা যায়। দ্যূত জীবনের অনিশ্চয়তা ও কৌশলের প্রতীক। তেজ অন্তরের শক্তি ও দীপ্তির প্রতীক। জয় বাধা অতিক্রমের প্রতীক। ব্যবসায় সেই জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় দৃঢ় সংকল্পের প্রতীক। আর সত্ত্ব হলো চেতনার স্বচ্ছতা ও সাম্যের প্রতীক। যেন মানুষের জীবনকে বাহ্যিক অনিশ্চয়তা থেকে অন্তরের স্বচ্ছতার দিকে একটি যাত্রা হিসেবে এখানে দেখা হয়েছে। মানুষ প্রথমে জীবনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়, তারপর নিজের শক্তিকে আবিষ্কার করে, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জয় অর্জন করে, অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সেই জয়কে সম্ভব করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের চেতনাকে স্বচ্ছ ও শান্ত করার দিকে এগিয়ে যায়।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির গভীরতা অসাধারণ। মানুষের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা আছে, প্রতিযোগিতার আকাঙ্ক্ষা আছে, আত্মপ্রকাশের শক্তি আছে এবং কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘদিন পরিশ্রম করার ক্ষমতাও আছে। কিন্তু এই সমস্ত শক্তি যদি স্বচ্ছ বিবেক দ্বারা পরিচালিত না হয়, তাহলে এগুলিই ধ্বংসের কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত ঝুঁকি জুয়ার আসক্তিতে পরিণত হতে পারে। তেজ অহংকারে পরিণত হতে পারে। জয়ের আকাঙ্ক্ষা প্রতিহিংসায় পরিণত হতে পারে। অধ্যবসায় ভুল লক্ষ্যকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই ব্যবসায়ের সঙ্গে সত্ত্বের সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংকল্প যত শক্তিশালী হবে, সেই সংকল্পের লক্ষ্য তত নির্মল হওয়া প্রয়োজন।

এই কারণে শ্লোকটি আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে তার সামনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সে চাইলে ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতে পারে, যা দ্যূতের মানসিকতার সঙ্গে তুলনীয়। সে চাইলে নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রেখে তেজ প্রকাশ করতে পারে। এরপর যদি সে নিয়মিত পড়াশোনা, ভুল সংশোধন এবং ধৈর্য ধরে পরিশ্রম করতে থাকে, সেখানে ব্যবসায় প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় সাফল্য অর্জিত হলে জয় আসে। কিন্তু প্রকৃত সত্ত্ব তখনই প্রকাশিত হয় যখন সে সাফল্যের পরও অহংকারী না হয়ে শান্ত, কৃতজ্ঞ, সংযত ও জ্ঞানমুখী থাকে।

মহাভারতের প্রেক্ষাপটে দ্যূত শব্দটি বিশেষভাবে অর্থবহ। যুধিষ্ঠিরের পাশাখেলা দেখায় যে মানুষের দুর্বলতা, আসক্তি এবং সিদ্ধান্তের ভুল কত বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। আবার গীতার কৃষ্ণ দেখাচ্ছেন যে একই মানবজীবনে এমন শক্তিও রয়েছে যা মানুষকে আত্মসংযম, অধ্যবসায় এবং জ্ঞানের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ফলে এই শ্লোককে এক ধরনের নৈতিক সতর্কবার্তা হিসেবেও পড়া যায়। মানুষের মধ্যে যে শক্তি রয়েছে তা নিরপেক্ষ শক্তি। সেই শক্তি কীভাবে ব্যবহৃত হবে তার ওপর তার ফল নির্ভর করে।

দার্শনিকভাবে এই শ্লোকের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো ঈশ্বরকে কেবল আমাদের পছন্দের সুন্দর ও পবিত্র বিষয়ের মধ্যে খুঁজলে ঈশ্বরের সর্বব্যাপী ধারণাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কৃষ্ণ বিভূতিযোগে দেখাচ্ছেন যে বিশ্বজগতের সমস্ত শক্তি একই পরম বাস্তবতার বিভিন্ন প্রকাশ। আলো যেমন ঈশ্বরীয়, তেমনি শক্তির অস্তিত্বও তাঁর প্রকাশ। বিজয় যেমন তাঁর বিভূতি, তেমনি মানুষের সংকল্পের শক্তিও তাঁর প্রকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে জগতকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। তখন কোনো শক্তিশালী গুণ দেখলে শুধু তার বাহ্যিক রূপ দেখা হয় না, তার অন্তর্নিহিত শক্তির উৎসের কথাও স্মরণ করা যায়।

অদ্বৈত ভাবনায় এই উপলব্ধি আরও গভীর হয়ে ওঠে। যদি পরম সত্য সর্বত্র বিরাজমান হয়, তাহলে জগতের কোনো শক্তিই তার বাইরে নয়। দ্যূতের শক্তি, তেজের দীপ্তি, জয়ের সম্ভাবনা, ব্যবসায়ের অধ্যবসায় এবং সত্ত্বের স্বচ্ছতা সবই একই পরম বাস্তবতার বিভিন্ন প্রকাশ হিসেবে উপলব্ধ হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব কাজ নৈতিকভাবে সমান। বরং এর অর্থ হলো বাস্তবতার কোনো ক্ষেত্রই ঈশ্বরের অস্তিত্বের বাইরে নয়। মানুষের কর্তব্য হলো সেই শক্তিকে কোন পথে পরিচালিত করবে তা বিবেক ও জ্ঞানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা।

সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। দ্যূত এখানে অনিশ্চিত ভাগ্যের প্রতীক, তেজ ব্যক্তিত্বের দীপ্তির প্রতীক, জয় সংগ্রামের পরিণতির প্রতীক, ব্যবসায় মানব সংকল্পের প্রতীক এবং সত্ত্ব অন্তরের নির্মলতার প্রতীক। এই প্রতীকগুলো একত্রে মানবজীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করে। জীবন কখনো অনিশ্চিত, কখনো সংগ্রামময়, কখনো বিজয়ময় এবং কখনো আত্মঅনুসন্ধানের শান্ত স্তরে পৌঁছে যায়। কৃষ্ণ এই সমস্ত স্তরের মধ্যেই ঈশ্বরীয় শক্তির উপস্থিতি অনুভব করতে শিক্ষা দেন।

সবশেষে বলা যায়, দ্যূতং ছলয়তামস্মি তেজস্তেজস্বিনামহম্। জয়োহস্মি ব্যবসায়োহস্মি সত্ত্বং সত্ত্ববতামহম্ এই শ্লোকটি কেবল কয়েকটি বিভূতির তালিকা নয়। এটি মানুষের শক্তি ও চেতনার একটি গভীর দর্শন। দ্যূত আমাদের জীবনের অনিশ্চয়তার কথা মনে করায়। তেজ আমাদের অন্তর্নিহিত শক্তির কথা স্মরণ করায়। জয় আমাদের বাধা অতিক্রমের সম্ভাবনা দেখায়। ব্যবসায় আমাদের শেখায় যে দৃঢ় সংকল্প ও অধ্যবসায় ছাড়া প্রকৃত অর্জন সম্ভব নয়। আর সত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাহ্যিক সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তরের স্বচ্ছতা ও সাম্য। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষের জীবনের প্রতিটি শক্তিকে সচেতনভাবে উপলব্ধি করা এবং সেই শক্তিকে উচ্চতর সত্যের দিকে পরিচালিত করা। ঝুঁকি যেন আসক্তিতে পরিণত না হয়, তেজ যেন অহংকারে পরিণত না হয়, জয়ের আকাঙ্ক্ষা যেন হিংসায় পরিণত না হয়, অধ্যবসায় যেন অন্যায় লক্ষ্যের সেবায় না লাগে এবং সমস্ত শক্তির চূড়ান্ত পরিণতি যেন সত্ত্বের স্বচ্ছতা ও জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন মানুষের কর্ম, শক্তি, সাফল্য ও চেতনা এক বৃহত্তর আধ্যাত্মিক সত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এই উপলব্ধিই বিভূতিযোগের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য এবং এই শ্লোকের চিরন্তন তাৎপর্য।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 19, 2026 August 19, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি