Related

Share

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৬ষ্ঠ শ্লোকের বিস্তারিত

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Posted on July 28, 2026


যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্য্যবান্।
সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব্ব এব মহারথাঃ॥ ৬

অনুবাদ: 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোক। এখানে দুর্যোধন আচার্য দ্রোণের সামনে পাণ্ডবপক্ষের প্রধান প্রধান বীরযোদ্ধাদের পরিচয় তুলে ধরছেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত কয়েকজন বীরের নামোল্লেখমাত্র হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনেক গভীর। প্রতিটি নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এক একটি চরিত্রগুণ, আদর্শ, মানসিক শক্তি ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের প্রতীক। ভাষাগত, দার্শনিক ও প্রতীকী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এই শ্লোকটি কেবল ইতিহাসের দলিল নয়, বরং মানবজীবনের সংগ্রাম, সাহস, ন্যায় ও আত্মশক্তির এক চিরন্তন শিক্ষা।

‘যুধামন্যু’ শব্দটি সংস্কৃত “যুধ” (√যুধ্) ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ যুদ্ধ করা, সংগ্রাম করা বা প্রতিরোধ করা; আর “মন্যু” শব্দের অর্থ ক্রোধ, উদ্যম, আত্মশক্তি বা ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ। এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত ‘যুধামন্যু’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় যিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধোৎসাহী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়চিত্ত এবং সংগ্রামী। এখানে ক্রোধ ধ্বংসাত্মক নয়; বরং অধর্ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত প্রতিবাদের প্রতীক। মানবজীবনে এমন শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অন্যায়কে নীরবে মেনে নেওয়া কখনো ধর্মের পরিচায়ক হতে পারে না। যুধামন্যু তাই কেবল একজন যোদ্ধার নাম নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে অটল থাকার এক অনন্ত আহ্বান।

‘বিক্রান্ত’ শব্দটি “বি” উপসর্গ এবং √ক্রম্ ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আক্ষরিক অর্থ বিশেষভাবে অগ্রসর হওয়া, পরাক্রমের সঙ্গে এগিয়ে চলা বা অসাধারণ সাহস প্রদর্শন করা। এই শব্দটি এমন এক ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে, যিনি ভয়কে জয় করে লক্ষ্যপানে দৃঢ় পদক্ষেপে অগ্রসর হন। জীবনের প্রতিটি সংগ্রামে কেবল শক্তি নয়, অগ্রসর হওয়ার সাহসই প্রকৃত বিজয়ের পথ উন্মুক্ত করে। বিক্রান্ত তাই মানুষের সেই অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক, যা বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে আদর্শের পথে এগিয়ে যেতে শেখায়।

‘উত্তমৌজা’ শব্দটি “উত্তম” এবং “ওজস্” এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘উত্তম’ অর্থ শ্রেষ্ঠ, উৎকৃষ্ট; আর ‘ওজস্’ অর্থ তেজ, প্রাণশক্তি, বল, দীপ্তি ও জীবনীশক্তি। সুতরাং উত্তমৌজা হলেন সেই ব্যক্তি, যাঁর প্রাণশক্তি, তেজস্বিতা ও উদ্যম সর্বোচ্চ পর্যায়ের। ভারতীয় দর্শনে ‘ওজস্’ কেবল শারীরিক বল নয়। এটি মানসিক স্থৈর্য, আত্মবিশ্বাস, আধ্যাত্মিক দীপ্তি ও নৈতিক দৃঢ়তারও প্রতীক। যে মানুষের অন্তরে ওজস্ জাগ্রত থাকে, সে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভেঙে পড়ে না; বরং আলোর উৎস হয়ে অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করে।

‘বীর্যবান্’ শব্দটি ‘বীর্য’ এবং ‘বান্’ প্রত্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত। ‘বীর্য’ অর্থ বীরত্ব, শক্তি, সক্ষমতা, সাহস ও কর্মশক্তি; আর ‘বান্’ অর্থ। যিনি সেই গুণের অধিকারী। তাই বীর্যবান্ বলতে বোঝায় এমন একজন মানুষ, যিনি শুধু বলবান নন, বরং নৈতিক সাহস, কর্মক্ষমতা ও দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী। ভারতীয় দর্শনে বীর্য কেবল শারীরিক শক্তির পরিচায়ক নয়; এটি আত্মসংযম, অধ্যবসায়, চরিত্রবল এবং জীবনের কঠিন পরীক্ষায় অবিচল থাকার সামর্থ্যের প্রতীক। প্রকৃত বীর সেই, যিনি নিজের দুর্বলতাকে জয় করতে পারেন।

‘সৌভদ্র’ শব্দটি ‘সুভদ্রা’ থেকে তদ্ধিত প্রত্যয়ের মাধ্যমে গঠিত, যার অর্থ সুভদ্রার পুত্র। এখানে সৌভদ্র বলতে অভিমন্যুকে বোঝানো হয়েছে। অভিমন্যু ভারতীয় মহাকাব্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর। অল্প বয়সে চক্রব্যূহে প্রবেশ করে অতুলনীয় সাহস ও আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা যুগে যুগে বীরত্বের প্রতীক হয়ে আছে। তিনি নবযৌবনের সাহস, আদর্শের জন্য আত্মোৎসর্গ এবং কর্তব্যপালনের এক অনন্য উদাহরণ। তাই সৌভদ্র নামটি কেবল একটি পারিবারিক পরিচয় নয়; এটি তরুণ শক্তির দীপ্তি, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মবিসর্জনের প্রতীক।

‘দ্রৌপদেয়’ শব্দটি ‘দ্রৌপদী’ থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ দ্রৌপদীর পুত্রগণ। তাঁরা পাঁচজন প্রতিবিন্ধ্য, সুতসোম, শ্রুতকীর্তি, শতানীক ও শ্রুতসেন। এই শব্দটি শুধু একটি বংশপরিচয় বহন করে না; এটি উত্তরাধিকার, মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা এবং আদর্শের পরম্পরার প্রতীক। এক প্রজন্মের আদর্শ, ত্যাগ ও ধর্মচেতনা পরবর্তী প্রজন্মের মাধ্যমে বহমান থাকে দ্রৌপদেয়গণ সেই চিরন্তন ধারাবাহিকতার প্রতীক।

‘মহারথ’ শব্দটি ‘মহা’ এবং ‘রথ’ এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। আক্ষরিক অর্থ মহান রথী বা শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। প্রাচীন সামরিক পরিভাষায় মহারথ সেই যোদ্ধা, যিনি একাই বহু সহস্র যোদ্ধার সঙ্গে সমান দক্ষতায় যুদ্ধ করতে সক্ষম। কিন্তু দার্শনিক অর্থে ‘মহারথ’ এমন একজন ব্যক্তি, যিনি জীবনের বৃহৎ দায়িত্ব, সংকট ও সংগ্রামকে সাহস, প্রজ্ঞা ও আত্মসংযমের সঙ্গে বহন করতে পারেন। প্রকৃত মহারথ হওয়া মানে কেবল বাহ্যিক শত্রুকে নয়, নিজের অন্তরের ভয়, লোভ, অহংকার ও দুর্বলতাকেও জয় করা।

এই শ্লোকটির ভাষাগত সৌন্দর্যও অত্যন্ত লক্ষণীয়। এখানে সমাস, তদ্ধিত প্রত্যয় এবং গুণবাচক বিশেষণের মাধ্যমে প্রতিটি নামের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়েছে। এটি সংস্কৃত ভাষার এমন এক বৈশিষ্ট্য, যেখানে একটি নামই বহুস্তরীয় অর্থ, ইতিহাস ও দর্শনের বাহক হয়ে ওঠে। ফলে এই শ্লোক কেবল কয়েকজন যোদ্ধার তালিকা নয়; বরং মানবচরিত্রের নানা মহৎ গুণের এক কাব্যিক উপস্থাপনা।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। বেদান্ত মতে, মানুষের অন্তরে দেবত্ব ও আসুরিক প্রবৃত্তির যে সংঘর্ষ চলে, সেই অন্তর্জাগতিক যুদ্ধে বিজয়ী হতে বিভিন্ন সদ্গুণের প্রয়োজন। যুধামন্যু ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদের শক্তি, বিক্রান্ত নির্ভীক অগ্রযাত্রা, উত্তমৌজা প্রাণশক্তি, বীর্যবান আত্মবিশ্বাস, সৌভদ্র আত্মত্যাগ এবং দ্রৌপদেয়গণ আদর্শের উত্তরাধিকারের প্রতীক। এই সকল গুণ একত্রে বিকশিত হলেই মানুষ সত্যিকার অর্থে ধর্মপথে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রতীকী অর্থে এই শ্লোকটি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির এক অপূর্ব রূপক। জীবনের প্রতিটি সংগ্রামই এক একটি কুরুক্ষেত্র। সেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য যুধামন্যুর সাহস, প্রতিকূলতার মুখে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বিক্রান্তের পরাক্রম, ক্লান্তির মধ্যেও উদ্যম ধরে রাখার জন্য উত্তমৌজার তেজ, লক্ষ্যপূরণের জন্য বীর্যবানের কর্মশক্তি, আদর্শের জন্য আত্মত্যাগের ক্ষেত্রে অভিমন্যুর দৃঢ়তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার জন্য দ্রৌপদেয়দের মতো উত্তরাধিকার প্রয়োজন। এই প্রতীকগুলো মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

বাস্তব জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কেবল একজন নেতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং সাহসী, তেজস্বী, কর্মঠ, আদর্শবাদী ও আত্মত্যাগী মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে। যেমন একটি রথ চলার জন্য অশ্ব, সারথি, চাকা ও যোদ্ধার সমন্বয় প্রয়োজন, তেমনি জীবনের রথকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহস, প্রজ্ঞা, আত্মসংযম, নৈতিকতা এবং কর্মশক্তির সমন্বয় অপরিহার্য।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, “যুধামন্যুশ্চ বিক্রান্ত উত্তমৌজাশ্চ বীর্য্যবান্। সৌভদ্রো দ্রৌপদেয়াশ্চ সর্ব্ব এব মহারথাঃ॥” শ্লোকটি কেবল পাণ্ডবপক্ষের বীরযোদ্ধাদের পরিচয় নয়; এটি মানবজীবনের মহান আদর্শের এক অনুপম প্রতিচ্ছবি। ভাষাতাত্ত্বিকভাবে এটি সমাস ও তদ্ধিত প্রত্যয়ের উৎকৃষ্ট নিদর্শন; ঐতিহাসিকভাবে এটি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বাস্তব চিত্র দার্শনিকভাবে এটি আত্মসংগ্রামের রূপক; এবং প্রতীকীভাবে এটি সাহস, তেজ, আত্মশক্তি, আত্মত্যাগ ও আদর্শের উত্তরাধিকারের এক চিরন্তন ঘোষণা। এই কারণেই শ্লোকটি যুগে যুগে কেবল একটি যুদ্ধবর্ণনা নয়, বরং মানবসভ্যতার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার এক অনবদ্য দিশারী হিসেবে সমাদৃত।

 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৭ম শ্লোকের বিস্তারিত

Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.

30 Day Money-Back Guarantee

Say goodbye to your low online sales rate!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
Published at: July 23, 2026 July 28, 2026

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৬ষ্ঠ শ্লোকের বিস্তারিত

More insight about শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১ম অধ্যায়, ৬ষ্ঠ শ্লোকের বিস্তারিত