ভগবদ্গীতা তৃতীয় অধ্যায়, প্রথম শ্লোকের ব্যাখ্যা
অর্জুন উবাচ
জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দন।
তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব।।১।।
অনুবাদঃ অর্জুন বললেন-হে জনার্দন! হে কেশব! যদি তোমার মতো কর্ম অপেক্ষা ভক্তি-বিষয়িনী বুদ্ধি শ্রেয়তর হয়, তাহলে এই ভয়ানক যুদ্ধে নিযুক্ত হওয়ার জন্য কেন আমাকে প্ররোচিত করছ?
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে এক গভীর এবং চিরন্তন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। শ্লোকটি হলো অর্জ্জুন উবাচ জ্যায়সী চেৎ কর্ম্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দ্দন তৎ কিং কর্ম্মণি ঘোরে মাং নিযোজয়সি কেশব। এই প্রশ্নটি কেবল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে এক যোদ্ধার সংশয় নয় বরং মানবমনের এক সর্বজনীন দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। এখানে অর্জুন এমন এক জিজ্ঞাসু আত্মার প্রতীক যিনি সত্যকে জানতে চান এবং জীবনের প্রকৃত কর্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। তিনি ভগবানকে সম্বোধন করে জানতে চান যে যদি জ্ঞান এবং বুদ্ধিই সর্বোচ্চ পথ হয় তবে তাঁকে কেন এমন এক ভয়ংকর কর্মে অর্থাৎ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বলা হচ্ছে।
অর্জুন শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত অর্জুন শব্দ থেকে যার অর্থ উজ্জ্বল নির্মল বিশুদ্ধ এবং সরল। এই নামটি কেবল একজন ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক বীরের পরিচয় বহন করে না বরং এমন এক ব্যক্তিত্বের প্রতীক যিনি সত্য অনুসন্ধানে আন্তরিক এবং নৈতিক দ্বিধার সম্মুখীন হয়েও সঠিক পথ খুঁজে ফিরেন। উবাচ শব্দটি সংস্কৃত বচ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ বলা বা উচ্চারণ করা। এই শব্দটি বৈদিক সাহিত্য ও পুরাণে অত্যন্ত প্রচলিত এবং সম্মানসূচকভাবে কারও বক্তব্য প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। জ্যায়সী শব্দের অর্থ অধিক শ্রেষ্ঠ বা উৎকৃষ্ট। কর্ম্মণঃ শব্দটি কৃ ধাতু থেকে উদ্ভূত কর্ম শব্দের বিভক্তি রূপ যার অর্থ কাজ কর্তব্য বা কার্যসম্পাদন। মতা শব্দের অর্থ বিবেচিত বা মনে করা হয়েছে এবং এটি মন ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বুদ্ধি শব্দটি বুধ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ জাগ্রত হওয়া জানা বা উপলব্ধি করা। জনার্দ্দন শব্দের অর্থ যিনি মানুষের দুঃখ দূর করেন এবং কেশব শব্দটি ভগবান কৃষ্ণের এক প্রসিদ্ধ নাম যার মাধ্যমে তাঁর ঐশ্বরিক শক্তি এবং রক্ষাকারী স্বরূপকে বোঝানো হয়।
শ্লোকটির বাংলা অর্থ হলো হে জনার্দ্দন যদি আপনার মতে জ্ঞান কর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয় তবে হে কেশব কেন আমাকে এই ভয়ংকর কর্মে অর্থাৎ যুদ্ধে নিযুক্ত করছেন। আক্ষরিক অর্থে অর্জুন এখানে ভগবান কৃষ্ণের উপদেশের মধ্যে আপাত একটি বৈপরীত্য উপলব্ধি করছেন। তিনি অনুভব করছেন যে একদিকে জ্ঞান এবং স্থিতপ্রজ্ঞতার প্রশংসা করা হচ্ছে আবার অন্যদিকে তাঁকে যুদ্ধের মতো কঠিন কর্তব্য পালনের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁর মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে এবং সেই বিভ্রান্তিই প্রশ্নের রূপে প্রকাশ পেয়েছে।
এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিক অর্থ কেবল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিটি মানুষের জীবনের একটি বাস্তব প্রশ্ন। মানুষ প্রায়ই ভাবতে বাধ্য হয় যে সে কি নিভৃতে আত্মজ্ঞান অর্জনের পথে অগ্রসর হবে নাকি সমাজ সংসার এবং কর্তব্যের মধ্যে থেকে নিজের দায়িত্ব পালন করবে। ধ্যান না কর্ম জ্ঞান না কর্তব্য বৈরাগ্য না সংগ্রাম এই দ্বন্দ্বই অর্জুনের প্রশ্নে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই এই শ্লোক যুগে যুগে সকল চিন্তাশীল মানুষের মনের ভাষা হয়ে উঠেছে।
এই প্রশ্নের গভীর তাৎপর্য হলো জ্ঞান এবং কর্মকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু ভগবদ্গীতার শিক্ষা হলো প্রকৃত জ্ঞান কখনও কর্ম থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় না বরং কর্মকে বিশুদ্ধ ও নিঃস্বার্থ করে তোলে। মানুষ যদি কেবল জ্ঞান অর্জন করে অথচ সেই জ্ঞানকে জীবনের কাজে প্রয়োগ না করে তবে সেই জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আবার কর্ম যদি জ্ঞানহীন হয় তবে তা মানুষকে বন্ধনের দিকে নিয়ে যায়। তাই জ্ঞান এবং কর্মের সমন্বয়ই প্রকৃত জীবনের পথ।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেদান্ত দর্শনে বুদ্ধি আত্মস্বরূপ উপলব্ধির প্রধান উপায় হলেও সেই উপলব্ধি মানুষের কর্তব্যকে অস্বীকার করে না। সাংখ্য দর্শনে চৈতন্য এবং প্রকৃতির পার্থক্য উপলব্ধি করার শিক্ষা দেওয়া হয় কিন্তু গীতা সেই উপলব্ধিকে কর্মের মধ্যেই বাস্তবায়িত করতে বলে। কর্মযোগের মূল শিক্ষা হলো ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে কর্তব্য পালন করা। এই শ্লোক সেই মহান দর্শনের সূচনা করে যেখানে মানুষকে শেখানো হয় যে সত্যিকারের জ্ঞান কর্মবিমুখতা নয় বরং সঠিক মনোভাব নিয়ে কর্তব্য পালন।
প্রতীকী অর্থে অর্জুন মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতীক। কৃষ্ণ অন্তরের প্রজ্ঞা এবং ঈশ্বরীয় পথপ্রদর্শনের প্রতীক। কুরুক্ষেত্র বাহ্যিক যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি মানুষের অন্তর্জগতেরও প্রতীক যেখানে প্রতিদিন সত্য এবং অসত্য সাহস এবং ভয় কর্তব্য এবং স্বার্থের মধ্যে সংগ্রাম চলতে থাকে। জনার্দ্দন নামটি মানুষের দুঃখ মোচনকারী চেতনার প্রতীক এবং কেশব নামটি অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে জ্ঞান প্রতিষ্ঠাকারী শক্তির প্রতীক। এইভাবে পুরো শ্লোকটি মানুষের আত্মিক যাত্রার একটি জীবন্ত চিত্র হয়ে ওঠে।
বাস্তব জীবনে এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন চিকিৎসক যদি জানেন যে একটি অভ্যাস ক্ষতিকর কিন্তু নিজে সেই অভ্যাস ত্যাগ না করেন তবে তাঁর জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে না। একজন শিক্ষার্থী যদি সফলতার উপায় জানেন কিন্তু অধ্যবসায় না করেন তবে সেই জ্ঞান ফলপ্রসূ হয় না। একইভাবে একজন সমাজসংস্কারক যদি ন্যায়বিচারের আদর্শে বিশ্বাস করেন তবে তাঁকে সেই আদর্শ বাস্তব কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। ইতিহাসে বহু মহান ব্যক্তি তাঁদের জ্ঞানকে কর্মের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করে মানবসমাজকে আলোকিত করেছেন। এই কারণেই গীতা কেবল চিন্তার শিক্ষা দেয় না বরং সেই চিন্তাকে জীবনের প্রতিটি কাজে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানায়।
এই শ্লোকের সারমর্ম হলো মানুষের জীবনে জ্ঞান এবং কর্ম একে অপরের পরিপূরক। অর্জুনের প্রশ্ন মানবমনের সংশয়কে প্রকাশ করে আর ভগবান কৃষ্ণের উত্তর সেই সংশয় দূর করে জীবনের পূর্ণাঙ্গ দর্শন প্রতিষ্ঠা করে। ভাষাগতভাবে এটি একটি প্রশ্ন হলেও দার্শনিকভাবে এটি সমগ্র কর্মযোগ দর্শনের সূচনা। আধ্যাত্মিকভাবে এটি মানুষকে শেখায় যে প্রকৃত জ্ঞান কখনও কর্তব্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না বরং কর্তব্যকে পবিত্র এবং অর্থবহ করে তোলে। তাই এই শ্লোক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সত্যিকারের প্রজ্ঞা তখনই পরিপূর্ণ হয় যখন তা নিঃস্বার্থ কর্মের মাধ্যমে জীবনের বাস্তব ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!