কর্তব্যের প্রকৃত অর্থ ৩,২২| মানবজীবনে কর্তব্য ও নৈতিকতার গভীর তাৎপর্য
ন মে পার্থাস্তি কর্তব্যং ত্রিষু লোকেষু কিঞ্চন।
নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বর্ত এব চ কর্মণি।।২২।।
অনুবাদঃ হে পার্থ! এই ত্রিজগতে আমার কিছুই কর্তব্য নেই। আমার অপ্রাপ্ত কিছু নেই এবং প্রাপ্তব্যও কিছু নেই। তবুও আমি কর্মে ব্যাপৃত আছি।
কর্তব্য শব্দটি মানবজীবনের অন্যতম গভীর ও সর্বজনীন ধারণা। এর ভাষাগত উৎপত্তি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে যেখানে কৃ অর্থ করা সম্পাদন করা বা সৃষ্টি করা এবং এর সঙ্গে তব্য প্রত্যয় যুক্ত হয়ে কর্তব্য শব্দের সৃষ্টি হয়েছে যার অর্থ যা অবশ্যই করা উচিত বা করণীয়। বাংলা ভাষায় শব্দটি তৎসম রূপে গৃহীত হয়েছে এবং দীর্ঘকাল ধরে নৈতিকতা ধর্ম সমাজনীতি ও দর্শনের একটি মৌলিক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কর্তব্য শব্দের মধ্যে কেবল কোনো কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ নয় বরং একটি নৈতিক আহ্বান নিহিত রয়েছে যা মানুষকে নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে।
আক্ষরিক অর্থে কর্তব্য বলতে বোঝায় এমন কাজ যা করা উচিত অথবা যা পালন করা আবশ্যক। কিন্তু এর তাৎপর্য কেবল অভিধানগত অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৈনন্দিন জীবনে একজন সন্তানের পিতা মাতার প্রতি দায়িত্ব একজন শিক্ষকের শিক্ষাদান একজন চিকিৎসকের রোগীর সেবা একজন নাগরিকের দেশের আইন মেনে চলা এবং একজন মানুষের অপর মানুষের প্রতি সহমর্মিতা সবই কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। তাই কর্তব্য এমন একটি আদর্শ যা ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুসংগঠিত রাখে এবং পারস্পরিক আস্থা ও শৃঙ্খলার ভিত্তি নির্মাণ করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের বাইশতম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে তিন জগতে তাঁর কোনো কর্তব্য নেই। এমন কোনো বস্তু নেই যা তিনি অর্জন করেননি অথবা অর্জন করা তাঁর বাকি রয়েছে। তবুও তিনি নিরন্তর কর্মে নিয়োজিত থাকেন। এই বক্তব্য কর্তব্যের ধারণাকে এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছে। সাধারণ মানুষ প্রয়োজন পূরণের জন্য কর্ম করে কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ কর্ম করেন বিশ্বকল্যাণের জন্য এবং মানুষকে আদর্শ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। এখানে কর্তব্য ব্যক্তিগত অভাব পূরণের উপায় নয় বরং বিশ্বধর্ম রক্ষা এবং সমাজে আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম।
গভীর অর্থে কর্তব্য মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত করে দায়িত্ববোধের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ যখন কেবল লাভ ক্ষতি সুখ বা ভোগের হিসাব না করে ন্যায় ও সত্যের স্বার্থে কাজ করে তখনই প্রকৃত কর্তব্যবোধের প্রকাশ ঘটে। ইচ্ছা পরিবর্তনশীল কিন্তু কর্তব্য স্থির। ইচ্ছা মানুষকে কখনো অলস করে তোলে আবার কখনো বিভ্রান্ত করে। কিন্তু কর্তব্য মানুষকে দৃঢ়তা শৃঙ্খলা আত্মসংযম এবং চরিত্রের দৃঢ় ভিত্তি প্রদান করে। এই কারণেই কর্তব্য কেবল একটি সামাজিক প্রয়োজন নয় বরং ব্যক্তিত্ব গঠনের অন্যতম প্রধান শক্তি।
দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে কর্তব্যের ব্যাখ্যা অত্যন্ত গভীর। গীতার কর্মযোগ দর্শনে কর্তব্য মানে ফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে নিজের ধর্ম অনুযায়ী কর্ম করে যাওয়া। এখানে কর্মই উপাসনা এবং কর্তব্য পালনই আত্মোন্নতির পথ। পাশ্চাত্য দর্শনেও কর্তব্যের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট মনে করেন যে মানুষের উচিত কেবল কর্তব্যবোধ থেকে কাজ করা কারণ নৈতিকতার প্রকৃত মূল্য ব্যক্তিগত লাভে নয় বরং কর্তব্য পালনের আন্তরিকতায় নিহিত। স্টোইক দর্শনও শিক্ষা দেয় যে মানুষকে প্রকৃতি প্রদত্ত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। ফলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় দর্শনেই কর্তব্যকে নৈতিক জীবনের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
প্রতীকী অর্থে কর্তব্য আত্মনিয়ন্ত্রণ আদর্শ নৈতিকতা এবং আত্মত্যাগের প্রতীক। সাহিত্যে কর্তব্য এমন চরিত্রকে নির্দেশ করে যে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য কাজ করে। ধর্মীয় অর্থে কর্তব্য ধর্মপালনেরই আরেকটি রূপ কারণ সত্য ন্যায় ও কল্যাণের পথে চলাই প্রকৃত ধর্ম। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কর্তব্য একজন মানুষের পরিপক্বতা দায়িত্ববোধ এবং আত্মশাসনের পরিচয় বহন করে। আধ্যাত্মিক অর্থে কর্তব্য মানুষকে আমি কী পাব এই সংকীর্ণ চিন্তা থেকে আমি কী দিতে পারি এই মহৎ চেতনার দিকে নিয়ে যায়। এই পরিবর্তনই আত্মার বিকাশের অন্যতম লক্ষণ।
কর্তব্যকে আরও সহজে বোঝার জন্য সূর্যের উদাহরণ দেওয়া যায়। সূর্য প্রতিদিন আলো ও তাপ প্রদান করে কিন্তু এর বিনিময়ে কিছুই প্রত্যাশা করে না। একইভাবে একজন মা সন্তানের লালন পালন করেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে। ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধী ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয় বরং জাতির মুক্তিকে নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে প্রকৃত কর্তব্য কখনো স্বার্থকেন্দ্রিক নয় বরং তা বৃহত্তর কল্যাণের জন্য নিবেদিত।
সব দিক থেকে বিচার করলে কর্তব্য শব্দটি কেবল একটি ভাষাগত ধারণা নয় বরং মানবসভ্যতার নৈতিক ভিত্তি। এর মধ্যে দায়িত্ব ন্যায় আত্মসংযম মানবতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির এক অনন্য সমন্বয় রয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার আলোচ্য শ্লোক আমাদের শিক্ষা দেয় যে প্রকৃত মহত্ত্ব ব্যক্তিগত অর্জনে নয় বরং নিঃস্বার্থভাবে নিজের করণীয় পালন করার মধ্যে নিহিত। কর্তব্য তাই মানুষের চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে সমাজকে সুসংগঠিত করে এবং আত্মাকে সত্য ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। এই কারণেই কর্তব্যকে মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আদর্শ এবং নৈতিক উৎকর্ষের চিরন্তন ভিত্তি বলা হয়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!