সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.১ — পরম বচন, ঈশ্বরের কৃপা ও বিভূতিতত্ত্বের সূচনা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
 শ্রীভগবানুবাচভূয় এব মহাবাহো শৃণু মে পরমং বচঃ।যত্তেহহং প্রীয়মাণায় বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়।।১।।
 শ্রীভগবানুবাচ
ভূয় এব মহাবাহো শৃণু মে পরমং বচঃ।
যত্তেহহং প্রীয়মাণায় বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়।।১।।

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে মহাবাহো! পুনরায় শ্রবণ কর। যেহেতু তুমি আমার প্রিয় পাত্র, তাই তোমার হিতকামনায় আমি পূর্বে যা বলেছি, তার থেকেও উৎকৃষ্ট তত্ত্ব বলছি।

ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটি শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা ধারার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। নবম অধ্যায়ে তিনি অর্জুনকে রাজবিদ্যা ও রাজগুহ্য যোগের মাধ্যমে ঈশ্বর, ভক্তি, কর্ম ও আত্মসমর্পণের গভীর তত্ত্ব বোঝানোর পর দশম অধ্যায়ে তাঁর ঐশ্বরিক বিভূতিগুলোর কথা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাই এই শ্লোকটি শুধু একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা নয়, বরং পূর্ববর্তী আধ্যাত্মিক শিক্ষাকে আরও বিস্তৃত ও গভীরভাবে উপলব্ধি করার জন্য একটি নতুন দ্বার খুলে দেয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “ভূয় এব মহাবাহো শৃণু মে পরমং বচঃ। যত্তেহং প্রীয়মাণায় বক্ষ্যামি হিতকাম্যয়া।” অর্থাৎ হে মহাবাহু অর্জুন, আবারও আমার পরম বাণী শোনো। তোমার প্রতি স্নেহ ও প্রীতি রেখে এবং তোমার কল্যাণ কামনা করে আমি তোমাকে সেই শ্রেষ্ঠ সত্যের কথা বলব।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ভূয় এব। ভূয় অর্থ আবার, পুনরায় বা আরও একবার এবং এব শব্দটি বক্তব্যের মধ্যে বিশেষ জোর সৃষ্টি করে। কৃষ্ণ কেন অর্জুনকে আবার শুনতে বলছেন, তার মধ্যেই রয়েছে গভীর শিক্ষা। জীবনের কোনো গভীর সত্য একবার শুনলেই মানুষ তা সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারে না। একই সত্য কখনো প্রথমবার কেবল শব্দ হিসেবে শোনা যায়, পরে চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে এবং আরও গভীর মননের মাধ্যমে তা জীবনের উপলব্ধিতে পরিণত হয়। তাই আধ্যাত্মিক জ্ঞান বারবার শ্রবণ, চিন্তা ও উপলব্ধির মধ্য দিয়ে পরিপক্ব হয়। কৃষ্ণের আবার শোনার আহ্বান আসলে মানুষের চেতনাকে আরও গভীর স্তরে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান।

এরপর কৃষ্ণ অর্জুনকে মহাবাহো বলে সম্বোধন করেছেন। মহা অর্থ মহান বা বিশাল এবং বাহু অর্থ বাহু বা হাত। মহাবাহু অর্থ শক্তিশালী বাহুর অধিকারী, অর্থাৎ বীর ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। কিন্তু এখানে এর তাৎপর্য কেবল অর্জুনের শারীরিক শক্তির প্রশংসা নয়। অর্জুন ছিলেন অসাধারণ যোদ্ধা, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এসে তাঁর অন্তরে ভয়, মমতা, দ্বন্দ্ব ও মোহ সৃষ্টি হয়েছিল। এর মাধ্যমে গীতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ করে যে মানুষের বাহ্যিক শক্তি যতই বড় হোক, অন্তরের দুর্বলতা তাকে বিচলিত করতে পারে। তাই মহাবাহু অর্জুনকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যাতে তাঁর বাহুর শক্তির সঙ্গে অন্তরের জ্ঞান ও বিবেকের শক্তিও যুক্ত হয়। প্রকৃত শক্তি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন বাহ্যিক কর্মক্ষমতার সঙ্গে অন্তরের স্থিরতা ও আত্মজ্ঞান যুক্ত হয়।

শৃণু শব্দটিও এই শ্লোকের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। এটি সংস্কৃত শ্রু ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ শোনা বা শ্রবণ করা। কিন্তু কৃষ্ণের শৃণু কেবল কানে শব্দ প্রবেশ করানোর অর্থ বহন করে না। এখানে শোনা মানে মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করা, নিজের পূর্বধারণাকে কিছুক্ষণের জন্য পাশে রেখে সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করা। মানুষ সাধারণত নিজের বিশ্বাস ও ধারণার সঙ্গে মিল আছে এমন কথাই সহজে গ্রহণ করে। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান লাভের জন্য এমন কথাও শুনতে হয় যা নিজের পুরোনো ধারণাকে পরিবর্তন করতে পারে। অর্জুনের ক্ষেত্রে শৃণু তাই শুধু শ্রবণের নির্দেশ নয়, বরং আত্মিক গ্রহণক্ষমতার আহ্বান।

কৃষ্ণ এরপর বলেন পরমং বচঃ। পরম অর্থ সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ বা চূড়ান্ত এবং বচঃ অর্থ বাক্য, কথা বা বাণী। পরম বচঃ বলতে তাই সাধারণ কোনো উপদেশ বোঝানো হয় না। এটি এমন এক জ্ঞানবাণী যা মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ কে, জীবনের উদ্দেশ্য কী, কর্তব্য কী, জগতের প্রকৃতি কী, ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী এবং কীভাবে মানুষ অজ্ঞতা ও বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে, এই ধরনের প্রশ্নের সঙ্গে পরম বাণীর সম্পর্ক রয়েছে। কৃষ্ণ যে শিক্ষা দিতে চলেছেন তা কোনো সাময়িক সমস্যার সমাধান মাত্র নয়। এটি মানুষের জীবন, জগত ও ঈশ্বর সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করার শিক্ষা।

এই শ্লোকের সবচেয়ে কোমল ও মানবিক অংশগুলোর একটি হলো প্রীয়মাণায় এবং হিতকাম্যয়া। প্রীয়মাণায় শব্দের মধ্যে প্রীতি, আনন্দ, স্নেহ ও ভালোবাসার ভাব রয়েছে। কৃষ্ণ অর্জুনকে কেবল একজন শিষ্য হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের মধ্যে রয়েছে গভীর বন্ধুত্ব, আস্থা ও স্নেহের সম্পর্ক। আর হিতকাম্যয়া অর্থ কল্যাণ কামনা করে বা মঙ্গল ইচ্ছা করে। কৃষ্ণ স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে তিনি অর্জুনকে এই জ্ঞান নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের জন্য দিচ্ছেন না। তিনি বলছেন কারণ তিনি অর্জুনের কল্যাণ চান। এখানেই প্রকৃত শিক্ষকের একটি আদর্শ রূপ প্রকাশিত হয়। সত্যিকারের শিক্ষক শুধু তথ্য প্রদান করেন না, তিনি শিক্ষার্থীর উন্নতি ও মঙ্গল কামনা করেন।

বক্ষ্যামি শব্দের অর্থ আমি বলব বা আমি প্রকাশ করব। এই শব্দের মধ্যে ভবিষ্যৎ প্রকাশের একটি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কৃষ্ণ যেন অর্জুনকে প্রস্তুত করছেন এমন একটি জ্ঞানের জন্য যা তার বর্তমান উপলব্ধিকে আরও বিস্তৃত করবে। এইভাবে শ্লোকটি একটি বিশেষ মানসিক পরিবেশ তৈরি করে। প্রথমে অর্জুনকে আবার শুনতে বলা হচ্ছে, তারপর তাকে মহাবাহু বলে তার শক্তির কথা স্মরণ করানো হচ্ছে, এরপর তাকে পরম বাণী শোনার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং শেষে জানানো হচ্ছে যে এই শিক্ষা তার কল্যাণের জন্যই প্রদান করা হচ্ছে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে কৃষ্ণের পরম বাণী শেষ পর্যন্ত মানুষের অন্তর্নিহিত আত্মস্বরূপ ও পরম সত্যের উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। জগতের অসংখ্য রূপ ও প্রকাশের অন্তরে যে এক চৈতন্য বিদ্যমান, বিভূতি যোগের শিক্ষা সেই এক সত্যকে বহুর মধ্যে দেখতে সাহায্য করে। ভক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে আবার এই শ্লোক ঈশ্বর ও ভক্তের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে সামনে আনে। এখানে ঈশ্বর কেবল দূরবর্তী কোনো পরম সত্তা নন। তিনি এমন এক সত্তা যিনি ভক্তের কল্যাণ চান, তাকে ভালোবাসেন এবং তার অন্তরের সংকটের সময় তাকে পথ দেখান। কর্মযোগের দৃষ্টিতে মহাবাহু শব্দটি বিশেষ অর্থ বহন করে, কারণ অর্জুন একজন কর্মী ও যোদ্ধা। কৃষ্ণ তাকে কর্ম থেকে পালিয়ে যেতে বলছেন না। বরং জ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে সঠিকভাবে কর্ম করার জন্য প্রস্তুত করছেন।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংকটের সময় মানুষের চিন্তা সংকুচিত হয়ে যায় এবং সে সমস্যার একটি নির্দিষ্ট দিককেই সম্পূর্ণ বাস্তবতা বলে মনে করতে শুরু করে। অর্জুনও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের আত্মীয়স্বজন, কর্তব্য ও সম্ভাব্য মৃত্যুর চিন্তায় এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন যে বৃহত্তর সত্যটি দেখতে পারছিলেন না। কৃষ্ণ তাকে বারবার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে শেখাচ্ছেন। আবার শোনার আহ্বান আসলে নিজের মানসিক সীমাবদ্ধতার বাইরে যাওয়ার আহ্বান। জীবনে আমরাও অনেক সময় কোনো সমস্যাকে এত কাছ থেকে দেখি যে তার বৃহত্তর অর্থ দেখতে পাই না। তখন নতুন করে শোনা, চিন্তা করা এবং নিজের অবস্থানকে পুনর্বিবেচনা করা আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে পারে।

সাহিত্যিক দৃষ্টিতে শ্লোকটির নির্মাণও অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে রয়েছে আবার শোনার আহ্বান, তারপর অর্জুনের শক্তির স্বীকৃতি, এরপর পরম বাণীর ঘোষণা এবং শেষে রয়েছে ভালোবাসা ও কল্যাণের কথা। ফলে শ্লোকটির মধ্যে এক ধরনের আবেগগত অগ্রগতি তৈরি হয়েছে। কৃষ্ণ প্রথমে অর্জুনের মনোযোগ আকর্ষণ করছেন, তারপর তার আত্মবিশ্বাসকে জাগ্রত করছেন, এরপর তাকে উচ্চতর জ্ঞান গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করছেন এবং শেষে জানাচ্ছেন যে এই জ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য তার কল্যাণ। জ্ঞান, শক্তি, ভালোবাসা ও মঙ্গল এখানে একসূত্রে যুক্ত হয়েছে।

মানবজীবনের সঙ্গে এই শ্লোকের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একজন বাবা যখন তার সন্তানকে বলেন, “আবার মন দিয়ে শোনো, আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি”, তখন সেই কথার মধ্যে যে স্নেহ ও উদ্বেগ থাকে, কৃষ্ণের হিতকাম্যয়া শব্দের মধ্যে একই মানবিক অনুভূতির এক মহত্তর রূপ দেখা যায়। আবার একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক যখন বিপজ্জনক পথ থেকে কাউকে সাবধান করেন এবং তাকে বারবার সতর্ক করেন, তখন পুনরাবৃত্তি বিরক্তির প্রকাশ নয়, বরং যত্নের প্রকাশ। একইভাবে কৃষ্ণের বারবার শিক্ষা দেওয়া কোনো অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি নয়। এটি অর্জুনকে সত্যের গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভালোবাসাপূর্ণ প্রচেষ্টা।

এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে গভীর সত্যকে শুধু একবার শোনা যথেষ্ট নয়। কোনো মহান শিক্ষা জীবনে কার্যকর হতে হলে তাকে বারবার শুনতে হয়, চিন্তা করতে হয় এবং নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। একটি সত্য প্রথমে জ্ঞান হতে পারে, পরে তা উপলব্ধি হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত তা চরিত্রের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এই কারণেই কৃষ্ণের ভূয় এব শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেন বলছেন, সত্যের কাছে একবার এসেই থেমে যেও না। আবার এসো, আবার শোনো এবং আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করো।

সবকিছু মিলিয়ে ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটি জ্ঞান, ভালোবাসা, শক্তি ও কল্যাণের এক অপূর্ব সমন্বয়। এখানে কৃষ্ণের কণ্ঠে একই সঙ্গে রয়েছে একজন গুরুর জ্ঞান, একজন বন্ধুর স্নেহ এবং একজন পথপ্রদর্শকের কল্যাণকামিতা। মহাবাহু অর্জুনের বাহ্যিক শক্তিকে অন্তরের জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য কৃষ্ণ তাকে আবার শুনতে আহ্বান করেন। পরম বচঃ তাকে সাধারণ জ্ঞানের ঊর্ধ্বে চূড়ান্ত সত্যের দিকে নিয়ে যায় এবং হিতকাম্যয়া জানিয়ে দেয় যে সেই সত্যের উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ ও আত্মিক উন্নতি। তাই এই শ্লোকের সারকথা হলো, জীবনের সংকট যতবারই আমাদের বিভ্রান্ত করুক না কেন, সত্যের কাছে ফিরে এসে আবার মন দিয়ে শুনতে হবে। কারণ প্রকৃত জ্ঞান শুধু মস্তিষ্ককে তথ্য দেয় না, হৃদয়কে প্রসারিত করে, দৃষ্টিকে নির্মল করে, কর্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিজের গভীরতম সত্যের দিকে নিয়ে যায়।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 19, 2026 August 19, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি