সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.১১ — ঈশ্বরের করুণা, জ্ঞানের দীপ ও অজ্ঞানের অন্ধকার বিনাশের তত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
তেষামেবানুকম্পার্থমহজ্ঞানজং তমঃ।নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।।১১।।
তেষামেবানুকম্পার্থমহজ্ঞানজং তমঃ।
নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।।১১।।

অনুবাদঃ তাঁদের প্রতি অনুগ্রহ করার অনুগ্রহ করার জন্য আমি তাঁদের হৃদয়ে অবস্থিত হয়ে, উজ্জ্বল জ্ঞান-প্রদীপের দ্বারা অজ্ঞান-জনিত অন্ধকার নাশ করি।

ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের একাদশ শ্লোকটি শ্রীকৃষ্ণের ঈশ্বরীয় করুণা এবং জ্ঞানের আলোকপ্রাপ্তির এক অসাধারণ আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা। শ্লোকে বলা হয়েছে, তেষামেবানুকম্পার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা। এর সরল অর্থ হলো, সেই ভক্তদের প্রতি অনুকম্পা করে আমি তাদের অন্তরে অবস্থান করে দীপ্তিমান জ্ঞানের প্রদীপের সাহায্যে অজ্ঞান থেকে উৎপন্ন অন্ধকারকে বিনষ্ট করি। কিন্তু এই কথার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এখানে কেবল ঈশ্বরের করুণার কথা বলা হয়নি। মানুষের অন্তর্গত অন্ধকার, আত্মপরিচয়ের সংকট, জ্ঞানের প্রকৃতি, ঈশ্বরের অন্তর্নিহিত উপস্থিতি এবং আত্মজাগরণের সম্পূর্ণ দর্শনকে অত্যন্ত সুন্দর প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।

এই শ্লোকটি ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। শ্রীকৃষ্ণ এর আগে বলেছেন যে যারা সর্বদা তাঁর প্রতি নিবিষ্টচিত্ত হয়ে প্রেমের সঙ্গে তাঁকে ভজনা করে, তাদের তিনি সেই বুদ্ধিযোগ প্রদান করেন যার দ্বারা তারা তাঁকে লাভ করতে পারে। তার পরেই তিনি বলেন যে সেই ভক্তদের প্রতি অনুকম্পা করে তিনি তাদের অন্তরে অবস্থান করে জ্ঞানের দীপ জ্বালিয়ে অজ্ঞানের অন্ধকার দূর করেন। ফলে এখানে ভক্তি ও জ্ঞানের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং ভক্তির মাধ্যমে হৃদয় প্রস্তুত হয়, ঈশ্বরীয় করুণার মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি জাগে এবং জ্ঞানের আলো অজ্ঞানের আবরণ দূর করে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ তেষাম্। এটি সংস্কৃত তদ্ সর্বনাম থেকে গঠিত এবং এর অর্থ তাদের। এখানে সেই ভক্তদের বোঝানো হয়েছে যারা আন্তরিকভাবে ঈশ্বরের প্রতি চিত্ত নিবদ্ধ করে তাঁকে ভজনা করেন। তেষাম্ এর সঙ্গে এব অব্যয় যুক্ত হয়ে তেষামেব হয়েছে। এব শব্দের অর্থ ই, কেবল, বিশেষভাবে বা তাদেরই। ফলে তেষামেব অর্থ দাঁড়ায় তাদেরই। এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যেও একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ সেইসব মানুষের কথা বলছেন যারা হৃদয়কে ঈশ্বরের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছে এবং আত্মিক সত্য উপলব্ধির জন্য প্রস্তুত হয়েছে।

এরপর এসেছে অনুকম্পার্থম্ শব্দটি। অনুকম্পা শব্দটি অনু এবং কম্প ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। কম্প অর্থ কাঁপা বা কম্পিত হওয়া এবং অনু অর্থ অনুসরণ করে বা সঙ্গে। অন্যের দুঃখ ও অবস্থাকে নিজের হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করে যে হৃদয়কম্পন সৃষ্টি হয়, তার মধ্য থেকেই অনুকম্পার ভাবটি প্রকাশিত হয়। তাই অনুকম্পা শুধু দয়া নয়। এর মধ্যে সহানুভূতি, মমতা, করুণা এবং অন্যের অবস্থাকে অন্তর দিয়ে অনুভব করার একটি গভীর অর্থ রয়েছে। অনুকম্পার্থম্ অর্থ অনুকম্পার জন্য বা করুণাবশত। শ্রীকৃষ্ণের জ্ঞানদান তাই কেবল কোনো শিক্ষকের মতো তথ্য প্রদান নয়। এটি ঈশ্বরীয় করুণার প্রকাশ।

অজ্ঞানজম্ তমঃ এই পদবন্ধটি শ্লোকটির দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। অজ্ঞান শব্দটি অ এবং জ্ঞান এই দুই অংশে গঠিত। জ্ঞানের অনুপস্থিতি বা সত্যের প্রকৃত উপলব্ধির অভাবকে অজ্ঞান বলা হলেও গীতার দর্শনে অজ্ঞান কেবল কোনো বিষয় সম্পর্কে না জানাকে বোঝায় না। এর গভীর অর্থ হলো নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে ভুল ধারণা। মানুষ যখন নিজেকে কেবল শরীর বলে মনে করে, যখন বাহ্যিক সম্পদকে নিজের প্রকৃত পরিচয় মনে করে, যখন ইন্দ্রিয়সুখকে জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বলে ধরে নেয় অথবা নিজের মূল্যকে অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, তখন সে অজ্ঞানের দ্বারা আবৃত থাকে। এই অজ্ঞান থেকেই তমঃ বা অন্ধকারের সৃষ্টি হয়।

তমঃ শব্দের আক্ষরিক অর্থ অন্ধকার। কিন্তু এখানে এটি কোনো রাতের অন্ধকার নয়। এটি চেতনার অন্ধকার, বিবেকের অন্ধকার এবং সত্যকে যথার্থভাবে দেখতে না পারার অন্ধকার। অন্ধকারে মানুষ সামনে কী আছে দেখতে পারে না। ফলে দড়িকে সাপ মনে হতে পারে, ছায়াকে মানুষ মনে হতে পারে এবং সামান্য শব্দকেও বিপদের সংকেত বলে মনে হতে পারে। একইভাবে অজ্ঞানের অন্ধকারে মানুষ বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপকে ভুলভাবে দেখে। সে যা নশ্বর তাকে চিরস্থায়ী মনে করে, যা পরিবর্তনশীল তাকে নিজের স্থায়ী পরিচয় মনে করে এবং যা বাহ্যিক তাকে নিজের অন্তরের সত্য বলে গ্রহণ করে। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ অজ্ঞানকে অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

এরপর এসেছে নাশয়ামি। এই শব্দটি সংস্কৃত নশ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ বিনষ্ট করা বা ধ্বংস করা। নাশয়ামি অর্থ আমি বিনষ্ট করি। কিন্তু এখানে অজ্ঞানের অন্ধকারকে ধ্বংস করার ধারণাটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম। অন্ধকারকে কোনো অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করতে হয় না। একটি প্রদীপ জ্বালালেই অন্ধকার দূর হয়ে যায়। অন্ধকারের নিজস্ব কোনো স্বাধীন শক্তি নেই। আলো অনুপস্থিত থাকলেই অন্ধকার দেখা যায়। ঠিক তেমনি সত্যের জ্ঞান উদিত হলে অজ্ঞানের অন্ধকার আর টিকে থাকতে পারে না। তাই শ্রীকৃষ্ণের নাশয়ামি আসলে জ্ঞানের আলোর মাধ্যমে অজ্ঞানের অবসানের কথা বলে।

এই ভাবটিই আরও স্পষ্ট হয়েছে জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা পদবন্ধে। জ্ঞান এবং দীপ শব্দের সমাসে জ্ঞানদীপ শব্দটি গঠিত হয়েছে। জ্ঞানদীপ অর্থ জ্ঞানের প্রদীপ। ভাস্বতা শব্দটি ভাস্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর অর্থ দীপ্তিমান, উজ্জ্বল বা আলোকময়। ফলে জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা অর্থ দীপ্তিমান জ্ঞানের প্রদীপ দ্বারা। এখানে জ্ঞানকে প্রদীপের সঙ্গে তুলনা করার মধ্যে অসাধারণ কাব্যিক ও দার্শনিক সৌন্দর্য রয়েছে। প্রদীপ কোনো নতুন বস্তু সৃষ্টি করে না। সে শুধু অন্ধকারের মধ্যে ইতিমধ্যে থাকা বস্তুগুলিকে দৃশ্যমান করে। একইভাবে আত্মজ্ঞান আত্মাকে সৃষ্টি করে না। আত্মা আগে থেকেই আছে। জ্ঞান কেবল অজ্ঞানের আবরণ সরিয়ে সেই সত্যকে প্রকাশ করে।

শ্লোকের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ আত্মভাবস্থঃ। আত্মভাব এবং স্থ ধাতুর ভাব থেকে গঠিত এই পদটির অর্থ আত্মভাবে অবস্থানকারী বা আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত। এর একটি গভীর অর্থ হলো ঈশ্বর ভক্তের অন্তরে অবস্থান করেন। অর্থাৎ ঈশ্বরকে কেবল দূরবর্তী কোনো সত্তা হিসেবে খুঁজতে হবে না। মানুষের অন্তরের গভীরতম স্তরেও ঈশ্বরীয় উপস্থিতির সন্ধান পাওয়া যায়। আবার আত্মভাবস্থঃ এমন একটি অবস্থাকেও নির্দেশ করতে পারে যেখানে ঈশ্বর নিজের আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অন্তরের অন্ধকার দূর করেন। এই কারণে এই পদটি গীতার অন্তর্নিহিত আত্মদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

শ্রীকৃষ্ণের এই বক্তব্যে ঈশ্বর এবং মানুষের সম্পর্কের একটি অত্যন্ত সুন্দর চিত্র ফুটে ওঠে। মানুষ যখন আন্তরিকভাবে সত্যের সন্ধান করে এবং ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভক্তিতে হৃদয় নিবেদন করে, তখন ঈশ্বরীয় উপস্থিতি তার অন্তরকে আলোকিত করে। এখানে ঈশ্বর কোনো বাহ্যিক তথ্যের শিক্ষক মাত্র নন। তিনি অন্তরের চৈতন্যকে জাগ্রত করেন। এই জাগরণই জ্ঞানদীপের প্রজ্জ্বলন। মানুষের ভেতরে যে সত্য উপলব্ধির সম্ভাবনা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, ঈশ্বরীয় করুণা তাকে জাগিয়ে তুলতে পারে।

এই শ্লোকের দার্শনিক অর্থ বুঝতে হলে জ্ঞান এবং অজ্ঞানের সম্পর্কটি বোঝা জরুরি। অজ্ঞান হলো বাস্তবতাকে ভুলভাবে দেখা এবং জ্ঞান হলো বাস্তবতাকে তার প্রকৃত স্বরূপে দেখা। এই পার্থক্যটি একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। অন্ধকার ঘরে একটি দড়ি পড়ে আছে। আলো না থাকায় কেউ সেটিকে সাপ মনে করে ভয় পেয়ে গেল। আলো জ্বালানোর পর সে বুঝতে পারল যে সেখানে কোনো সাপ নেই। আলো নতুন করে দড়ি সৃষ্টি করেনি। দড়ি আগেও সেখানে ছিল। শুধু অজ্ঞানের কারণে তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশিত হয়নি। আলো আসার সঙ্গে সঙ্গে ভুল ধারণা দূর হয়েছে। আত্মজ্ঞানও তেমন। আত্মা নতুন করে সৃষ্টি হয় না। জ্ঞান আত্মার প্রকৃত স্বরূপকে প্রকাশ করে।

এই কারণে গীতার জ্ঞান কেবল বই পড়ে অর্জিত তথ্য নয়। তথ্য জানা এবং সত্য উপলব্ধি করা এক জিনিস নয়। একজন মানুষ আত্মা সম্পর্কে বহু শাস্ত্রীয় কথা মুখস্থ করতে পারে, কিন্তু নিজের জীবনে সেই সত্য উপলব্ধি না করলে তার অজ্ঞানের মূল সম্পূর্ণভাবে দূর হয় না। প্রকৃত জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে। সে নিজেকে, অন্য মানুষকে এবং জগতকে নতুনভাবে দেখতে শেখে। তার মধ্যে বিবেক, সমতা, সংযম, করুণা এবং আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই শ্লোকের অজ্ঞানকে অবিদ্যা এবং জ্ঞানদীপকে আত্মজ্ঞান হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। মানুষের মূল ভুল হলো নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে না জানা এবং অনাত্মকে আত্মা বলে গ্রহণ করা। দেহ, মন, ইন্দ্রিয় এবং পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থাকে নিজের চূড়ান্ত পরিচয় মনে করাই এই অজ্ঞানের প্রকাশ। আত্মজ্ঞান উদিত হলে মানুষ উপলব্ধি করে যে তার প্রকৃত স্বরূপ পরিবর্তনশীল দেহ ও মনের সীমায় আবদ্ধ নয়। এই উপলব্ধিই অজ্ঞানের অন্ধকারকে দূর করে।

ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে আবার অনুকম্পা শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ভক্ত নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ করে। সে মনে করে নিজের প্রচেষ্টা প্রয়োজনীয় হলেও ঈশ্বরের কৃপা ছাড়া অন্তরের গভীরতম অন্ধকার সম্পূর্ণভাবে দূর করা কঠিন। তাই ভক্তির মধ্যে বিনয় থাকে এবং সেই বিনয় হৃদয়কে জ্ঞানের জন্য উন্মুক্ত করে। শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্যে এই ভক্তি এবং জ্ঞান একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে।

মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ অনেক সময় বাইরের সমস্যাকে নিজের সমস্ত দুঃখের কারণ মনে করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার চেয়ে সমস্যাকে নিয়ে তার ভুল ধারণাই বেশি কষ্ট সৃষ্টি করে। একজন ব্যক্তি ব্যর্থতাকে নিজের সম্পূর্ণ মূল্যহীনতার প্রমাণ মনে করতে পারে। আরেকজন একই ব্যর্থতাকে শিক্ষার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। বাহ্যিক ঘটনা একই হলেও অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। এখানেই জ্ঞানের প্রদীপের প্রয়োজন। জ্ঞান বাস্তবতাকে সবসময় পরিবর্তন করে না, কিন্তু বাস্তবতাকে সঠিকভাবে দেখার ক্ষমতা দেয়।

এই শ্লোকের প্রতীকী সৌন্দর্যও অসাধারণ। এখানে অন্ধকার হলো আত্মবিস্মৃতির প্রতীক, প্রদীপ হলো আত্মসচেতনতার প্রতীক, আলো হলো সত্যের প্রতীক এবং ঈশ্বরীয় অনুকম্পা হলো সেই অন্তর্গত শক্তির প্রতীক যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। পুরো শ্লোকটিকে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা হিসেবে দেখা যায়। প্রথমে আছে অজ্ঞান। অজ্ঞানের ফলে আছে অন্ধকার। তারপর আসে ঈশ্বরীয় করুণা। সেই করুণায় জ্ঞানের আলো জ্বলে। আলো উদিত হলে অন্ধকার বিলীন হয় এবং মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপের দিকে এগিয়ে যায়।

দীপের প্রতীকটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রদীপ অন্ধকারের সঙ্গে যুদ্ধ করে না। সে শুধু জ্বলে এবং তার আলো চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। এই ভাবটি মানুষের জীবনেও প্রযোজ্য। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সবসময় অসত্যের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হয় না। অনেক সময় নিজের মধ্যে সত্যের আলো জ্বালানোই যথেষ্ট। একজন জ্ঞানী মানুষ নিজের জীবনকে আলোকিত করলে তার আচরণ, চিন্তা এবং উপলব্ধির মাধ্যমে অন্যের জীবনও আলোকিত হতে পারে। তাই জ্ঞানদীপ ব্যক্তিগত মুক্তির পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক আলোরও প্রতীক।

এই শ্লোকের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো ঈশ্বরীয় জ্ঞান মানুষের অন্তর থেকেই উদ্ভাসিত হতে পারে। বাহ্যিক শিক্ষক, শাস্ত্র এবং সাধনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যকে নিজের চেতনার মধ্যে উপলব্ধি করতে হয়। শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন যে তিনি আত্মভাবে অবস্থান করে জ্ঞানের প্রদীপ দিয়ে অজ্ঞানের অন্ধকার দূর করেন, তখন মানুষের অন্তরের ঈশ্বরীয় সম্ভাবনার কথাই বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়। ঈশ্বরকে কেবল বাইরে খুঁজতে খুঁজতে নিজের অন্তরের নীরব উপস্থিতিকে ভুলে যাওয়া এই শ্লোকের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত শক্তিশালী। অজ্ঞানজাত অন্ধকার এবং দীপ্তিমান জ্ঞানের প্রদীপের মধ্যে যে বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে, তা সমগ্র শ্লোকের ভাবকে এক মুহূর্তে দৃশ্যমান করে তোলে। অন্ধকার মানে না দেখা, আর আলো মানে দেখা। অজ্ঞান মানে ভুল জানা, আর জ্ঞান মানে সত্যকে দেখা। অজ্ঞান মানে আত্মবিস্মৃতি, আর জ্ঞান মানে আত্মস্মৃতি। এই বিপরীত ধারণাগুলিকে একত্র করে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের আধ্যাত্মিক অবস্থার একটি চিরন্তন চিত্র এঁকেছেন।

সবশেষে বলা যায়, তেষামেবানুকম্পার্থমহমজ্ঞানজং তমঃ নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা শ্লোকাংশটি মানুষের অন্তর্গত রূপান্তরের এক অসাধারণ দর্শন প্রকাশ করে। এখানে অনুকম্পা হলো ঈশ্বরীয় করুণা, অজ্ঞান হলো সত্য সম্পর্কে ভুল ধারণা, তমঃ হলো সেই অজ্ঞানের অন্ধকার, আত্মভাবস্থঃ হলো অন্তরে ঈশ্বরীয় উপস্থিতি, জ্ঞানদীপ হলো আত্মসত্যের আলোকপ্রাপ্তি এবং ভাস্বতা হলো সেই জ্ঞানের দীপ্তি যা অন্ধকারকে বিলীন করে দেয়। এই শ্লোক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের সবচেয়ে গভীর অন্ধকার বাইরের জগতের অন্ধকার নয়, বরং নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতা। আর সেই অন্ধকার দূর করার জন্য প্রয়োজন অন্তরের জ্ঞানপ্রদীপের জ্বলে ওঠা। ভক্তি হৃদয়কে প্রস্তুত করে, করুণা হৃদয়কে স্পর্শ করে, জ্ঞান চেতনাকে আলোকিত করে এবং আত্মসত্যের উপলব্ধি মানুষকে অজ্ঞানের বন্ধন থেকে মুক্তির পথে নিয়ে যায়। এই কারণেই গীতার এই শ্লোক কেবল একটি ধর্মীয় বক্তব্য নয়, এটি মানুষের আত্মজাগরণ, আত্মপরিচয় এবং চেতনার মুক্তির এক চিরন্তন আহ্বান।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 19, 2026 August 19, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি