শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.১৩ — পরং ব্রহ্ম, পরম ধাম ও সর্বব্যাপী শ্রীকৃষ্ণের পরম স্বরূপ
আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষিনারদস্তথা।
অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে।।১৩।।
অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- তুমি পরম ব্রহ্ম, পরম ধাম, পরম পবিত্র ও পরম পুরুষ। তুমি নিত্য, দিব্য, আদি দেব, অজ ও বিভু। দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল, ব্যাস আদি ঋষিরা তোমাকে সেভাবেই বর্ণনা করেছেন এবং তুমি নিজেও এখন আমাতে তা বলছ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতি যোগের ত্রয়োদশ শ্লোকে অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে তাঁকে একের পর এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ নামে অভিহিত করেছেন। শ্লোকটি হলো “পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্। পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভুম্”। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ যেন পরমেশ্বরের স্বরূপের একটি করে দরজা খুলে দেয়। এখানে কৃষ্ণ কেবল অর্জুনের বন্ধু, আত্মীয় বা রথের সারথি নন। অর্জুনের চেতনায় তিনি এখন সর্বোচ্চ সত্য, পরম আশ্রয়, চিরন্তন পুরুষ, দেবত্বের উৎস, জন্মহীন এবং সর্বব্যাপী পরম সত্তা হিসেবে প্রকাশিত।
শ্লোকের শুরুতেই অর্জুন বলেন “পরং ব্রহ্ম”। পরং শব্দের অর্থ সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ, চূড়ান্ত বা যার ঊর্ধ্বে আর কিছু নেই। ব্রহ্ম শব্দটি সংস্কৃত বৃহ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে বৃদ্ধি, বিস্তার ও অসীমতার ভাব রয়েছে। তাই ব্রহ্ম বলতে এমন এক পরম বাস্তবতাকে বোঝানো হয় যা সীমাবদ্ধ নয় এবং যার মধ্যে সমগ্র অস্তিত্বের চূড়ান্ত সত্য নিহিত। অর্জুন যখন কৃষ্ণকে পরং ব্রহ্ম বলেন, তখন তিনি ঘোষণা করছেন যে কৃষ্ণ কোনো সীমিত সত্তা নন। তিনি সেই পরম সত্য যাঁর ঊর্ধ্বে আর কোনো চূড়ান্ত সত্য কল্পনা করা যায় না। উপনিষদীয় দর্শনে ব্রহ্ম হলো সমস্ত অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত পরম বাস্তবতা। গীতার এই উপলব্ধিতে সেই পরম সত্যই কৃষ্ণের মধ্যে ব্যক্ত ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
এরপর অর্জুন বলেন “পরং ধাম”। ধাম শব্দের মধ্যে আবাস, আশ্রয়, অবস্থান এবং জ্যোতির ধারণা রয়েছে। ধাম শব্দটি ধারণ বা স্থাপনের ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই পরং ধাম অর্থ সর্বোচ্চ আশ্রয় বা পরম আবাস। মানুষ জীবনে নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের সন্ধান করে। সে পরিবারে আশ্রয় খোঁজে, সম্পদে নিরাপত্তা খোঁজে, সমাজে নিজের পরিচয় খোঁজে এবং সাফল্যের মধ্যে স্থায়িত্ব খোঁজে। কিন্তু এসবই পরিবর্তনশীল। গীতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পরিবর্তনশীল জগতের কোনো কিছুই চূড়ান্ত আশ্রয় হতে পারে না। কৃষ্ণকে পরং ধাম বলা মানে তাঁকে সেই চূড়ান্ত আশ্রয় হিসেবে স্বীকার করা যেখানে মানুষের অস্তিত্ব তার সর্বোচ্চ অর্থ ও শান্তি খুঁজে পেতে পারে।
“পবিত্রং” শব্দটি এই উপলব্ধিকে আরও গভীর করে। পবিত্র শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত পূ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে যার অর্থ শুদ্ধ করা বা পরিশুদ্ধ হওয়া। পবিত্র অর্থ শুধু নির্মল নয়, যা অন্যকেও নির্মল করে। মানুষের মন কামনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অহংকার ও ভয়ের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আধ্যাত্মিক সাধনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এই অন্তরের অশুদ্ধতাগুলো ধীরে ধীরে দূর করা। কৃষ্ণকে পবিত্র বলা তাই কেবল তাঁর নিজস্ব নির্মলতার কথা বলে না। এটি এমন এক পরম চেতনার কথা বলে যার স্মরণ, জ্ঞান, ভক্তি ও আশ্রয় মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করতে পারে। বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার চেয়ে অন্তরের পরিচ্ছন্নতাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর আসে “পরমং ভবান্”। পরম শব্দটি সর্বোচ্চ ও অতুলনীয় অর্থ প্রকাশ করে এবং ভবান্ হলো সম্মানসূচকভাবে বলা আপনি। ফলে পরমং ভবান্ অর্থ দাঁড়ায় আপনিই পরম। এই ছোট্ট বাক্যের মধ্যে অর্জুনের উপলব্ধির গভীর পরিবর্তন প্রকাশ পেয়েছে। কৃষ্ণ তাঁর বন্ধু ছিলেন, আত্মীয় ছিলেন এবং তাঁর রথের সারথি ছিলেন। কিন্তু এখন অর্জুন উপলব্ধি করছেন যে এই পরিচয়গুলোর আড়ালে যে সত্তা রয়েছেন তিনি সীমাবদ্ধ মানবীয় পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ নন। একজন মানুষকে যখন তার বাহ্যিক পরিচয়ের বাইরে তার গভীরতম সত্যের মাধ্যমে দেখা হয় তখন দৃষ্টির পরিবর্তন ঘটে। অর্জুনের ক্ষেত্রে কৃষ্ণকে দেখার সেই দৃষ্টির পরিবর্তনই আধ্যাত্মিক উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
এরপর তিনি কৃষ্ণকে বলেন “পুরুষং”। পুরুষ শব্দটি ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর ধারণা। এর মধ্যে চৈতন্যসত্তা, মহাজাগতিক ব্যক্তি এবং পরম আত্মস্বরূপের ধারণা রয়েছে। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ হলো চৈতন্যের সাক্ষীস্বরূপ সত্তা এবং প্রকৃতি হলো পরিবর্তনশীল জড় প্রকৃতি। গীতার বিস্তৃত দার্শনিক প্রেক্ষাপটে পুরুষ শব্দটি পরমেশ্বরের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। কৃষ্ণকে পুরুষ বলা মানে তাঁকে জগতের কোনো একটি বস্তু হিসেবে না দেখে জগতের অন্তর্নিহিত চৈতন্য ও পরম ব্যক্তিস্বরূপ হিসেবে উপলব্ধি করা। তিনি কেবল সৃষ্টির একটি অংশ নন, বরং সৃষ্টির অস্তিত্ব ও চৈতন্যের গভীরতম ভিত্তি।
“শাশ্বতং” শব্দটি এই পুরুষের আরেকটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। শাশ্বত অর্থ চিরন্তন, অবিনশ্বর এবং যা সময়ের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। পৃথিবীর সমস্ত দৃশ্যমান বস্তু পরিবর্তিত হয়। শরীর পরিবর্তিত হয়, সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়, সভ্যতা পরিবর্তিত হয় এবং প্রকৃতিও পরিবর্তনের ধারায় প্রবাহিত হয়। কিন্তু শাশ্বত সেই সত্য যা পরিবর্তনের মধ্যেও চূড়ান্তভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। কৃষ্ণকে শাশ্বত বলা মানে তাঁকে সাময়িক কোনো অস্তিত্ব হিসেবে না দেখে সময়ের অতীত এক চিরন্তন বাস্তবতা হিসেবে উপলব্ধি করা।
“দিব্যম্” শব্দটি কৃষ্ণের স্বরূপের অতীন্দ্রিয় দিকটি প্রকাশ করে। দিব্য শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত দিব্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে এবং এর মধ্যে আলো, দীপ্তি, আকাশ ও দেবীয়তার ভাব নিহিত। দিব্য মানে কেবল সুন্দর বা অলৌকিক নয়। দিব্য এমন একটি অস্তিত্বের নির্দেশ করে যা সাধারণ ইন্দ্রিয় ও বস্তুগত সীমার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ নয়। কৃষ্ণ মানুষের মতো দৃশ্যমান হলেও তাঁর প্রকৃত সত্তা কেবল মানবীয় সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। তাঁর মানবীয় প্রকাশের মধ্যে একটি অতীন্দ্রিয় সত্য প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই গীতার অবতার ধারণার গভীরতা নিহিত।
এরপর আসে “আদিদেবম্”। আদি অর্থ প্রথম, মূল বা প্রাথমিক এবং দেব অর্থ দীপ্তিমান বা দেবীয় সত্তা। আদিদেব অর্থ দেবতাদেরও আদি উৎস। এখানে কৃষ্ণকে কেবল বহু দেবতার মধ্যে একজন হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। বরং দেবত্বের বিভিন্ন প্রকাশ ও শক্তির যে মূল উৎস, তাঁকে সেই উৎস হিসেবে উপলব্ধি করা হচ্ছে। যেমন অসংখ্য নদীর প্রবাহ শেষ পর্যন্ত কোনো মূল উৎসের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তেমনি বিভিন্ন দেবশক্তির পেছনেও একটি পরম উৎসের ধারণা রয়েছে। কৃষ্ণকে আদিদেব বলা সেই পরম উৎসের দিকেই ইঙ্গিত করে।
“অজং” শব্দটি বিশেষভাবে গভীর। অজ শব্দটি অ এবং জ এর সমন্বয়ে গঠিত। এখানে অ নিষেধসূচক এবং জ জন্মের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অজ অর্থ জন্মহীন বা যাঁর জন্ম নেই। এখানে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে। কৃষ্ণ তো পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তাহলে তাঁকে জন্মহীন বলা হচ্ছে কেন। এর উত্তর গীতার অবতারতত্ত্বে নিহিত। সাধারণ জীব কর্মের অধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু ঈশ্বরের আবির্ভাব সাধারণ কর্মবদ্ধ জন্মের মতো নয়। ঈশ্বর নিজের ইচ্ছায় এবং নিজের শক্তির মাধ্যমে জগতে প্রকাশিত হন। তাই তাঁর পারমার্থিক সত্তা জন্ম ও মৃত্যুর নিয়মের অধীন নয়। অজ শব্দটি সেই অনাদি ও অবিনশ্বর ঈশ্বরস্বরূপের কথা প্রকাশ করে।
শেষে এসেছে “বিভুম্”। বিভু অর্থ সর্বব্যাপী, সর্বত্র বিস্তৃত, অসীমভাবে প্রকাশিত এবং ব্যাপক সত্তা। যে বস্তু সীমাবদ্ধ তার একটি নির্দিষ্ট স্থান ও পরিমাণ থাকে। কিন্তু বিভু সেই সত্তাকে নির্দেশ করে যিনি কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সীমার মধ্যে আবদ্ধ নন। কৃষ্ণকে বিভু বলা মানে তাঁর অস্তিত্বকে সর্বব্যাপী পরম সত্তা হিসেবে উপলব্ধি করা। তিনি কেবল কোনো একটি স্থান বা সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। অস্তিত্বের সর্বত্র তাঁর উপস্থিতির ধারণা এই শব্দের মধ্যে নিহিত।
এই দশটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ একসঙ্গে পড়লে শ্লোকটির গভীর সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরং ব্রহ্ম বলে কৃষ্ণকে সর্বোচ্চ সত্য বলা হয়েছে। পরং ধাম বলে তাঁকে সর্বোচ্চ আশ্রয় বলা হয়েছে। পবিত্রং বলে তাঁকে শুদ্ধতার উৎস হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। পরমং ভবান্ বলে বলা হয়েছে তিনিই সর্বোচ্চ। পুরুষং বলে তাঁকে পরম চৈতন্যসত্তা হিসেবে দেখা হয়েছে। শাশ্বতং বলে তাঁর চিরন্তনতা ঘোষণা করা হয়েছে। দিব্যম্ বলে তাঁর অতীন্দ্রিয় স্বরূপ প্রকাশ করা হয়েছে। আদিদেবম্ বলে তাঁকে দেবত্বের আদি উৎস হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। অজং বলে তাঁর জন্মহীনতা প্রকাশ করা হয়েছে এবং বিভুম্ বলে তাঁর সর্বব্যাপিতা ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ শ্লোকের প্রতিটি শব্দ কৃষ্ণের পরম সত্তার একটি পৃথক মাত্রা প্রকাশ করে এবং সবগুলো একত্রিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ঈশ্বরতত্ত্ব নির্মাণ করে।
এই শ্লোকের দার্শনিক গুরুত্ব ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন ধারায় বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে পরম ব্রহ্ম হলো একমাত্র চূড়ান্ত চৈতন্যস্বরূপ সত্য এবং জগতের বহুত্ব সেই এক সত্যের বিভিন্ন প্রকাশ। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ব্যক্তিস্বরূপ পরম সত্য এবং জীব ও জগত তাঁর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের মধ্যে চিরন্তন পার্থক্য রয়েছে এবং কৃষ্ণ হলেন সর্বোচ্চ স্বাধীন সত্তা। ভক্তি দর্শনে আবার পরম সত্য কেবল জ্ঞানের বিষয় নয়, প্রেম ও আত্মসমর্পণের বিষয়ও। এই কারণে কৃষ্ণ একই সঙ্গে পরম ব্রহ্ম এবং ভক্তের প্রিয়তম প্রভু। এই ব্যক্তিগত ও সর্বোচ্চ ঈশ্বরের সমন্বয় গীতার দর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। পরং ব্রহ্ম মানুষের সত্যের অনুসন্ধানের প্রতীক। পরং ধাম তার চূড়ান্ত আশ্রয়ের অনুসন্ধানের প্রতীক। পবিত্রং অন্তরের শুদ্ধতার প্রতীক। পুরুষং নিজের গভীরতম চৈতন্যসত্তাকে উপলব্ধির প্রতীক। শাশ্বতং পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যে অপরিবর্তনীয় সত্যের সন্ধানের প্রতীক। দিব্যম্ সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতার অতীত এক উচ্চতর সত্যের প্রতীক। আদিদেবম্ সমস্ত শক্তির মূল উৎসের প্রতীক। অজং জন্ম ও মৃত্যুর অতীত অনাদি সত্যের প্রতীক। বিভুম্ সর্বত্র এক পরম চেতনার উপস্থিতি উপলব্ধির প্রতীক।
একটি সমুদ্র ও ঢেউয়ের উপমা দিয়ে এই ভাবটি সহজে বোঝা যায়। সমুদ্রের অসংখ্য ঢেউ একে অন্যের থেকে পৃথক বলে মনে হয়। কোনো ঢেউ বড়, কোনোটি ছোট, কোনোটি কিছুক্ষণ থাকে এবং তারপর বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি ঢেউয়ের গভীরে একই সমুদ্র। মানুষের জীবনও অনেকটা তেমন। আমাদের শরীর, নাম, পরিচয়, সম্পর্ক, সাফল্য ও ব্যর্থতা হলো পরিবর্তনশীল ঢেউয়ের মতো। কিন্তু এই পরিবর্তনশীলতার গভীরে যে চিরন্তন সত্যের অনুসন্ধান মানুষ করে সেটিই তাকে পরম বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়। কৃষ্ণের পরং ব্রহ্ম স্বরূপ সেই পরম সত্যের কথা বলে এবং বিভু স্বরূপ মনে করিয়ে দেয় যে সেই সত্য কোনো এক স্থানে সীমাবদ্ধ নয়।
অর্জুনের উপলব্ধির ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তিনি কৃষ্ণকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। কৃষ্ণ তাঁর বন্ধু, আত্মীয় এবং সারথি ছিলেন। কিন্তু আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আলোয় অর্জুনের দৃষ্টি পরিবর্তিত হলো। একই কৃষ্ণ এখন তাঁর কাছে পরং ব্রহ্ম, পরং ধাম এবং আদিদেব। এর মাধ্যমে একটি গভীর আধ্যাত্মিক সত্য প্রকাশিত হয়। অনেক সময় সত্য আমাদের সামনে উপস্থিত থাকে কিন্তু আমাদের দৃষ্টি প্রস্তুত না থাকায় আমরা তাকে তার প্রকৃত স্বরূপে দেখতে পারি না। জ্ঞান ও আত্মউপলব্ধি দৃষ্টিকে পরিবর্তন করে এবং তখন পরিচিত জগতের মধ্যেই অপরিচিত গভীরতা প্রকাশিত হয়।
আধুনিক মানুষের জীবনেও এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিকতা গভীর। আজ মানুষ প্রযুক্তি, অর্থ, তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগের অসংখ্য সুযোগ পেয়েছে। তবুও তার মনে অস্থিরতা, ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অর্থের সংকট থাকতে পারে। মানুষ প্রায়ই এমন জিনিসকে স্থায়ী মনে করে যার প্রকৃতি আসলে পরিবর্তনশীল। সম্পদ, খ্যাতি, সামাজিক মর্যাদা, শরীর ও সম্পর্ক সবই সময়ের অধীন। এই বাস্তবতার মধ্যে পরং ধাম ধারণাটি মানুষকে জিজ্ঞাসা করে তার প্রকৃত আশ্রয় কোথায়। পরং ব্রহ্ম তাকে জিজ্ঞাসা করে তার জীবনের চূড়ান্ত সত্য কী। পবিত্রং তাকে অন্তরের শুদ্ধতার কথা স্মরণ করায়। শাশ্বতং তাকে ক্ষণস্থায়ী বিষয়ের মধ্যে চিরস্থায়ী সুখ খোঁজার সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করে।
সবশেষে বলা যায়, “পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্। পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভুম্” কেবল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রশংসাসূচক একটি শ্লোক নয়। এটি ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ঘোষণা। এখানে কৃষ্ণ হলেন সর্বোচ্চ সত্য, পরম আশ্রয়, পবিত্রতার উৎস, পরম পুরুষ, চিরন্তন সত্তা, দিব্য বাস্তবতা, দেবত্বের আদি উৎস, জন্মহীন পরমেশ্বর এবং সর্বব্যাপী চৈতন্য। ভাষাগতভাবে প্রতিটি শব্দের নিজস্ব গভীরতা রয়েছে, দার্শনিকভাবে প্রতিটি পদ অস্তিত্বের একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেয় এবং প্রতীকীভাবে প্রতিটি নাম মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি ধাপকে নির্দেশ করে। তাই এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো মানুষ যখন ক্ষণস্থায়ী পরিচয় ও পরিবর্তনশীল জগতের সীমা অতিক্রম করে চিরন্তন সত্যের অনুসন্ধান করে, তখন তার অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত সেই পরম সত্তার দিকে পরিচালিত হয় যিনি একই সঙ্গে সত্য, আশ্রয়, পবিত্রতা, চৈতন্য, চিরন্তনতা এবং সর্বব্যাপী অস্তিত্বের পরম ভিত্তি।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!