সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.১৪ — অর্জুনের ঈশ্বরে বিশ্বাস, সত্যগ্রহণ ও পরম সত্তার অসীমতার উপলব্ধি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সর্বমেতদ্ ঋতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব।ন হি তে ভগবন্ ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন…
সর্বমেতদ্ ঋতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব।
ন হি তে ভগবন্ ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন দানবাঃ।।১৪।।

অনুবাদঃ হে কেশব! তুমি আমাকে যা বলেছ, তা আমি সত্য বলে মনে করি। হে ভগবান! দেবতা অথবা দানবেরা কেউই তোমার তত্ত্ব যথাযথভাবে অবগত নন।

ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতি যোগের চতুর্দশ শ্লোকটি অর্জুনের আধ্যাত্মিক উপলব্ধির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে প্রকাশ করে। শ্লোকটির মূল বক্তব্য হলো

“হে কেশব, আপনি আমাকে যা বলছেন তার সমস্তই আমি সত্য বলে মনে করি। হে ভগবান, দেবতারা আপনার প্রকৃত প্রকাশকে জানেন না এবং দানবরাও জানে না।”

এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু কৃষ্ণের প্রতি অর্জুনের বিশ্বাস প্রকাশিত হয়নি, বরং সত্য সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, ঈশ্বরের অসীমতা এবং আধ্যাত্মিক বিনয়ের একটি গভীর দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। অর্জুন এখানে আর কেবল একজন প্রশ্নকারী শিষ্য নন। তিনি এমন একজন সাধকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছেন যিনি শুনেছেন, চিন্তা করেছেন, উপলব্ধি করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সীমিত জ্ঞানের ঊর্ধ্বে একটি অসীম সত্যের অস্তিত্ব স্বীকার করতে প্রস্তুত হয়েছেন।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “সর্বমেতদ্”। এটি “সর্বম্” এবং “এতৎ” এই দুটি পদের সমন্বয়ে গঠিত। “সর্বম্” অর্থ সমস্ত বা সবকিছু এবং “এতৎ” অর্থ এই বা এই সমস্ত বিষয়। ফলে “সর্বমেতদ্” বলতে বোঝায় এই সমস্ত কথা বা এই সমগ্র বক্তব্য। অর্জুন কৃষ্ণের আগের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করছেন। কৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বরিক স্বরূপ এবং জগতের মধ্যে তাঁর বিভিন্ন বিভূতির কথা প্রকাশ করেছেন। অর্জুন বলছেন যে কৃষ্ণ যা কিছু বলেছেন তিনি তার সামগ্রিকতাকেই গ্রহণ করছেন।

এরপর এসেছে “ঋতম্” শব্দটি, যা এই শ্লোকের অন্যতম গভীর শব্দ। সংস্কৃত “ঋত” ধারণাটি বৈদিক চিন্তায় অত্যন্ত প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে সত্য, যথার্থতা, নিয়ম, মহাজাগতিক শৃঙ্খলা এবং বাস্তবতার প্রকৃত বিন্যাসের ভাব নিহিত রয়েছে। তাই “ঋতম্”কে শুধু সাধারণ অর্থে সত্য বললে এর গভীরতা সম্পূর্ণ প্রকাশ পায় না। এটি এমন সত্য যা বাস্তবতার অন্তর্নিহিত নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্জুন যখন বলেন “এতদ্ ঋতং মন্যে”, তখন তাঁর বক্তব্যের অর্থ শুধু এই নয় যে তিনি কৃষ্ণের কথা সত্য বলে বিশ্বাস করছেন। তিনি যেন বলছেন, “আপনি যে সত্য আমার কাছে প্রকাশ করছেন, আমি তাকে বাস্তবতার প্রকৃত সত্য বলে গ্রহণ করছি।”

“মন্যে” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “মন্” ধাতু থেকে। এর অর্থ চিন্তা করা, মনে করা, বিবেচনা করা বা গ্রহণ করা। এখানে অর্জুনের অবস্থান অন্ধ বিশ্বাসের নয়। তিনি চিন্তা করার পর গ্রহণ করছেন। তিনি নিজের বুদ্ধিকে পরিত্যাগ করছেন না, বরং বুদ্ধির যথাযথ ব্যবহার করে উপলব্ধি করছেন যে একটি এমন সত্য আছে যা তাঁর ব্যক্তিগত জ্ঞানের সীমার চেয়ে অসীমভাবে বৃহৎ। এই কারণে “মন্যে” শব্দটি বিশ্বাস ও বিবেচনার মধ্যে একটি সুন্দর সমন্বয় তৈরি করে।

“যন্মাং বদসি” অর্থ আপনি আমাকে যা বলছেন। “যৎ” অর্থ যা, “মাম্” অর্থ আমাকে এবং “বদসি” এসেছে “বদ্” ধাতু থেকে যার অর্থ বলা বা প্রকাশ করা। এখানে কৃষ্ণের বক্তব্যকে কেবল সাধারণ তথ্য হিসেবে দেখা হয় না। তিনি নিজের স্বরূপের কিছু অংশ অর্জুনের কাছে প্রকাশ করছেন। এই প্রকাশের সামনে অর্জুনের প্রতিক্রিয়া হলো শ্রদ্ধাপূর্ণ গ্রহণ।

এরপর অর্জুন কৃষ্ণকে সম্বোধন করছেন “কেশব” নামে। কেশব কৃষ্ণের একটি প্রসিদ্ধ নাম। এই নামের সঙ্গে তাঁর সুন্দর কেশের ধারণা যেমন যুক্ত, তেমনি কেশী নামক অসুরকে বধ করার পুরাণীয় স্মৃতিও যুক্ত। কিন্তু এই শ্লোকে নামটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো অর্জুনের সম্বোধনের গভীরতা। কৃষ্ণ তাঁর কাছে শুধু বন্ধু বা সারথি নন। তিনি এখন সেই ঐশ্বরিক সত্তা যাঁর মুখ থেকে পরম সত্য প্রকাশিত হচ্ছে।

পরবর্তী অংশে এসেছে “ন হি তে ভগবন্ ব্যক্তিং বিদুর্দেবা ন দানবাঃ”। এখানে “ভগবন্” শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। “ভগবান” শব্দের মধ্যে ঐশ্বর্য, শক্তি, জ্ঞান, সৌন্দর্য, খ্যাতি এবং বৈরাগ্যের মতো পরম গুণের ধারণা নিহিত। অর্জুন যখন কৃষ্ণকে “ভগবান” বলে সম্বোধন করছেন, তখন তিনি তাঁর ঐশ্বরিক মর্যাদাকে স্বীকার করছেন। এটি তাঁর উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখন পরম ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতায় উন্নীত হয়েছে।

“ব্যক্তিং” শব্দটির সঙ্গে “ব্যক্ত” বা প্রকাশিত হওয়ার ধারণা যুক্ত। এর অর্থ প্রকাশ, প্রকৃত প্রকাশ বা স্বরূপের উদ্ভাসন। এই শ্লোকে “আপনার ব্যক্তিং” বলতে কৃষ্ণের বাহ্যিক রূপমাত্র বোঝানো হচ্ছে না। বরং তাঁর প্রকৃত ঐশ্বরিক স্বরূপ এবং সেই স্বরূপের পূর্ণ প্রকাশকে বোঝানো হয়েছে। অর্জুন বলছেন যে দেবতা এবং দানবরাও কৃষ্ণের এই প্রকৃত প্রকাশ সম্পূর্ণভাবে জানেন না।

এখানে “বিদুঃ” শব্দটি এসেছে “বিদ্” ধাতু থেকে, যার অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। কিন্তু এই “জানা” সাধারণ তথ্য জানার মতো নয়। ঈশ্বরের স্বরূপ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা এবং ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। একটি সীমিত সত্তা অসীমকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না। তাই অর্জুনের বক্তব্যের গভীরে রয়েছে ঈশ্বরের অসীমতার উপলব্ধি।

“দেবা ন দানবাঃ” অর্থ দেবতারাও নয়, দানবরাও নয়। এখানে দেবতা এবং দানবকে পাশাপাশি রাখার মধ্যেও একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। দেবতারা জ্ঞান, শক্তি এবং ঐশ্বরিক প্রবৃত্তির প্রতীক হলেও তাঁরা সীমিত সত্তা। দানবরাও শক্তিশালী হলেও তাঁরাও সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ কোনো সীমিত অস্তিত্বই পরম অসীমকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না। কৃষ্ণের স্বরূপ এমন এক বাস্তবতা যা সব সীমিত জ্ঞান ও অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে।

এই কারণে শ্লোকটি মূলত মানুষের জ্ঞানের সীমা এবং পরম সত্যের অসীমতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলে। মানুষ ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধির সাহায্যে জগতকে জানে। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের সীমা আছে, মনের সীমা আছে এবং বুদ্ধিরও সীমা আছে। আমরা যতই জ্ঞান অর্জন করি না কেন, আমাদের উপলব্ধি কোনো না কোনো সীমার মধ্যে অবস্থান করে। অথচ পরম সত্য যদি অসীম হয়, তাহলে সীমিত বুদ্ধি দিয়ে তাকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করা সম্ভব নয়। এই উপলব্ধিই অর্জুনের কথায় বিনয়ের জন্ম দিয়েছে।

এই বিনয় কোনো দুর্বলতা নয়। বরং প্রকৃত জ্ঞানের অন্যতম লক্ষণ হলো নিজের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সচেতন হওয়া। যে ব্যক্তি অল্প জ্ঞান নিয়ে মনে করে সে সবকিছু জানে, তার জ্ঞান তাকে অহংকারী করে। কিন্তু যে ব্যক্তি সত্যের গভীরে প্রবেশ করে, সে বুঝতে পারে যে বাস্তবতা তার ধারণার চেয়ে অনেক বৃহৎ। অর্জুনের অবস্থান এই দ্বিতীয় ধরনের জ্ঞানের পরিচয় বহন করে।

ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। ভক্তির পথে ঈশ্বরকে কেবল যুক্তি দিয়ে আবদ্ধ করা যায় না। শ্রদ্ধা, প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং ঈশ্বরের কৃপাও প্রয়োজন। অর্জুন কৃষ্ণের কথা গ্রহণ করছেন কারণ তাঁর সঙ্গে কৃষ্ণের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে, তিনি কৃষ্ণের জ্ঞান প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাঁর শিক্ষার মাধ্যমে নিজের সংশয় দূর হতে দেখেছেন। তাই অর্জুনের বিশ্বাস অন্ধ বিশ্বাস নয়। এটি অভিজ্ঞতা, চিন্তা এবং শ্রদ্ধার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিশ্বাস।

অদ্বৈত দর্শনের আলোকে এই শ্লোককে দেখলে পরম সত্যের অসীমতার ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রহ্ম সীমাহীন এবং সমস্ত সীমিত নাম ও রূপের অতীত। কোনো সীমিত সত্তা নিজের সীমিত মানসিক কাঠামোর মাধ্যমে অসীম ব্রহ্মকে সম্পূর্ণভাবে অবজেক্ট হিসেবে ধারণ করতে পারে না। এই অর্থে দেবতা ও দানবরাও পরম সত্যকে সম্পূর্ণভাবে জানতে পারে না। পরম সত্যকে উপলব্ধি করা কেবল তথ্যগত জ্ঞান নয়, বরং আত্মস্বরূপের গভীর উপলব্ধির বিষয়।

বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে ঈশ্বর ব্যক্তিগত ও অসীম সত্তা। জীব এবং জগত তাঁর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত হলেও তাঁরা ঈশ্বরের সমান নন। তাই ঈশ্বরের অসীম গুণ ও মহিমা সীমিত জীবের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। দ্বৈত দর্শনেও ঈশ্বরের পরম শ্রেষ্ঠত্ব এবং জীবের সীমাবদ্ধতা বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। এই তিনটি দর্শনের ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একটি সাধারণ উপলব্ধি স্পষ্ট যে পরম সত্য মানুষের সীমিত জ্ঞান দ্বারা সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ নয়।

এই শ্লোকের একটি সুন্দর প্রতীকী অর্থ বোঝা যায় সমুদ্র ও পাত্রের উপমার মাধ্যমে। একটি ছোট পাত্রে সমুদ্রের সমস্ত জল ধারণ করা যায় না। কিন্তু পাত্রে থাকা জল সমুদ্রের জলই। একইভাবে মানুষের উপলব্ধি সীমিত হলেও সেই সীমিত উপলব্ধি সম্পূর্ণ অর্থহীন নয়। মানুষ ঈশ্বরের সত্যকে যত গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে, ততই তার অভিজ্ঞতা গভীর হয়। কিন্তু সেই উপলব্ধির সম্পূর্ণতা কোনো সীমিত মানসিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না।

মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও শ্লোকটির মূল্য অসাধারণ। মানুষের অহংকারের একটি প্রধান লক্ষণ হলো নিজের জ্ঞানকে সম্পূর্ণ মনে করা। কিন্তু অর্জুন এখানে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করছেন। আধুনিক ভাষায় এটিকে জ্ঞানগত বিনয় বলা যায়। একজন প্রকৃত গবেষক জানেন যে তার জ্ঞানের বাইরে আরও অনেক কিছু রয়েছে। একজন প্রকৃত বিজ্ঞানী নতুন তথ্যের সামনে নিজের ধারণা পরিবর্তন করতে প্রস্তুত থাকেন। একজন প্রকৃত শিক্ষকও জানেন যে শেখার কোনো শেষ নেই। এই মানসিকতা অর্জুনের বক্তব্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

আধুনিক জীবনেও এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কর্মক্ষেত্রে, গবেষণায়, সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে মানুষ প্রায়ই মনে করে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিই সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় বহুমাত্রিক। অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা, অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা নতুন কোনো তথ্য আমাদের পূর্ববর্তী ধারণাকে পরিবর্তন করতে পারে। তাই সত্যের প্রতি উন্মুক্ত থাকা এবং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা উন্নত চিন্তার লক্ষণ।

সাহিত্যিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক অর্জুনের চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর প্রকাশ করে। গীতার শুরুতে অর্জুন সংশয়ে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি যুদ্ধ, কর্তব্য, ধর্ম এবং জীবনের অর্থ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কৃষ্ণের শিক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁর চিন্তার পরিধি ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে। এখন তিনি কৃষ্ণকে শুধু একজন প্রিয় বন্ধু বা সারথি হিসেবে দেখছেন না। তিনি তাঁর মধ্যে এমন এক পরম সত্তার প্রকাশ উপলব্ধি করছেন যার স্বরূপ সাধারণ মানুষের জ্ঞানের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। এই উপলব্ধিই পরবর্তী অধ্যায়ে বিশ্বরূপ দর্শনের প্রস্তুতি তৈরি করে।

এই শ্লোকের মধ্যে তাই মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। প্রথমে মানুষ প্রশ্ন করে। তারপর সে শোনে। এরপর চিন্তা করে। ধীরে ধীরে তার মধ্যে বিশ্বাস জন্মায়। তারপর সে উপলব্ধি করে যে সত্য তার ব্যক্তিগত ধারণার চেয়ে অনেক বৃহৎ। শেষ পর্যন্ত তার মধ্যে বিনয় জন্ম নেয়। অর্জুনের বক্তব্য এই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে প্রকাশ করে।

“সর্বমেতদ্ ঋতং মন্যে” তাই কেবল একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি সত্য গ্রহণের একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রকাশ। “আমি আপনার কথা সত্য বলে মনে করি” বলার মধ্যে যেমন বিশ্বাস আছে, তেমনি আছে অনুসন্ধানের পর অর্জিত আস্থা। আর “দেবতারা ও দানবরাও আপনার প্রকৃত স্বরূপ জানে না” বলার মধ্যে রয়েছে অসীমের সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতার বিনয়ী স্বীকৃতি।

এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিজের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে সচেতনতা পরস্পরের পরিপূরক। অহংকার মনে করে সত্যকে সে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করেছে। জ্ঞানী ব্যক্তি জানেন যে সত্যকে অনুসন্ধান করতে হয়। আর আধ্যাত্মিক জ্ঞানী উপলব্ধি করেন যে পরম সত্যের সামনে নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করাও জ্ঞানেরই একটি অংশ।

সবশেষে বলা যায়, “সর্বমেতদ্ ঋতং মন্যে যন্মাং বদসি কেশব” অর্জুনের বিশ্বাসের ঘোষণা হলেও তার মধ্যে একটি বৃহত্তর মানবিক সত্য নিহিত আছে। মানুষ যত বেশি সত্যের দিকে এগিয়ে যায়, ততই তার মধ্যে অহংকার কমে এবং বিস্ময় বাড়ে। সে বুঝতে শেখে যে জগতের দৃশ্যমান রূপের আড়ালে এমন এক গভীর বাস্তবতা রয়েছে যা তার সীমিত বুদ্ধির সম্পূর্ণ অধিকারের বিষয় নয়। “ঋত” তাকে সত্যের গভীরতার কথা মনে করিয়ে দেয়, “মন্যে” তাকে সচেতন গ্রহণের শিক্ষা দেয়, “ভগবান” তাকে পরম ঐশ্বর্যের কথা স্মরণ করায় এবং “দেবা ন দানবাঃ” তাকে অসীমের সামনে বিনয়ের শিক্ষা দেয়। এই কারণে গীতার এই শ্লোক শুধু কৃষ্ণের মহিমা প্রকাশ করে না, বরং মানুষের সত্য অনুসন্ধান, আত্মবোধ এবং আধ্যাত্মিক পরিণতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 19, 2026 August 19, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি