শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.১৫ — পুরুষোত্তম, দেবদেব ও জগৎপতি শ্রীকৃষ্ণের পরম স্বরূপ
স্বয়মেবাত্মনাত্মনং বেত্থ ত্বং পুরুষোত্তম।
ভূতভাবন ভূতেশ দেবদেব জগৎপতে।।১৫।।
অনুবাদঃ হে পুরুষোত্তম! হে ভূতভাবন! হে ভূতেশ! হে দেবদেব! হে জগৎপতে! তুমি নিজেই তোমার চিৎশক্তির দ্বারা তোমার ব্যক্তিত্ব অবগত আছ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতি যোগে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের মহিমা উপলব্ধি করে তাঁর কাছে যে গভীর শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণের ভাষা প্রকাশ করেছেন, তার একটি অনন্য উদাহরণ পাওয়া যায় পঞ্চদশ শ্লোকে। শ্লোকটি হলো স্বয়মেবাত্মনাত্মনং বেত্থ ত্বং পুরুষোত্তম। ভূতভাবন ভূতেশ দেবদেব জগৎপতে। এখানে অর্জুন কেবল কৃষ্ণের প্রশংসা করছেন না, বরং ঈশ্বরের প্রকৃতি, আত্মজ্ঞানের স্বরূপ এবং পরম সত্যের অসীমতার একটি গভীর দর্শন প্রকাশ করছেন। এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ যেন ঈশ্বরতত্ত্বের একটি করে দরজা খুলে দেয়। স্বয়মেব শব্দে প্রকাশ পেয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, আত্মনা আত্মানং পদবন্ধে প্রকাশ পেয়েছে আত্মার স্বপ্রকাশমান প্রকৃতি, পুরুষোত্তম শব্দে প্রকাশ পেয়েছে পরম চৈতন্যের শ্রেষ্ঠত্ব, আর ভূতভাবন, ভূতেশ, দেবদেব ও জগৎপতে শব্দগুলোর মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে সমগ্র সৃষ্টি ও বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে সেই পরম সত্তার সম্পর্ক।
স্বয়মেব শব্দটি গঠিত হয়েছে স্বয়ম্ এবং এব এই দুই অংশের সমন্বয়ে। স্বয়ম্ অর্থ নিজে বা স্বয়ং এবং এব অর্থই, একমাত্র বা অবশ্যই। ফলে স্বয়মেবের অর্থ দাঁড়ায় নিজেই, স্বয়ংই অথবা একমাত্র নিজেই। অর্জুন এখানে শুধু বলছেন না যে কৃষ্ণ নিজেকে জানেন। তিনি বিশেষভাবে বলছেন যে কৃষ্ণ নিজেই নিজের দ্বারা নিজেকে জানেন। এই জোর দেওয়ার মধ্যে একটি গভীর দার্শনিক বক্তব্য রয়েছে। সীমিত কোনো ব্যক্তি যখন কোনো বিষয়কে জানতে চায়, তখন তার জ্ঞান ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা এবং যুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়। কিন্তু পরম সত্তা যদি সমস্ত জ্ঞান ও চৈতন্যের উৎস হন, তাহলে সেই পরম সত্তাকে কোনো সীমিত জ্ঞানের বস্তু হিসেবে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করা সম্ভব নয়। তিনি নিজের মধ্যেই স্বপ্রকাশমান। এই কারণেই স্বয়মেব শব্দটি কেবল ব্যাকরণগতভাবে জোর প্রদান করে না, এটি ঈশ্বরের স্বয়ংসম্পূর্ণতার ধারণাকেও প্রকাশ করে।
আত্মনা শব্দটি এসেছে আত্মন্ শব্দ থেকে। আত্মন্ শব্দটি ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর ও বহুমাত্রিক শব্দ। সাধারণ অর্থে আত্মা, নিজ সত্তা বা নিজের প্রকৃতি বোঝাতে এটি ব্যবহৃত হয়। আত্মনা হলো তার তৃতীয়া একবচন রূপ এবং এর অর্থ নিজের দ্বারা বা নিজের মাধ্যমে। অন্যদিকে আত্মানং হলো আত্মন্ শব্দের দ্বিতীয়া একবচন রূপ এবং এর অর্থ নিজেকে বা নিজের স্বরূপকে। ফলে আত্মনা আত্মানং একত্র করলে অর্থ হয় নিজের দ্বারা নিজেকে। এই একই মূল শব্দের দুটি ভিন্ন ব্যাকরণিক রূপের ব্যবহার শ্লোকটির দার্শনিক গভীরতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয় যেন একই পরম সত্তার মধ্যে মিলিত হয়েছে। সাধারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে একজন জ্ঞাতা একটি জ্ঞেয় বিষয়কে জ্ঞানের মাধ্যমে জানতে পারে। কিন্তু পরম আত্মার ক্ষেত্রে সেই বিভাজন আর আগের মতো থাকে না। আত্মা নিজেই নিজের স্বরূপে প্রকাশিত।
বেত্থ শব্দটি সংস্কৃত বিদ্ ধাতু থেকে এসেছে। বিদ্ ধাতুর মূল অর্থ জানা, উপলব্ধি করা বা সত্য সম্পর্কে অবগত হওয়া। বেত্থ অর্থ আপনি জানেন। কিন্তু এখানে জানা বলতে কেবল কোনো তথ্য সম্পর্কে অবহিত থাকা বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি এবং স্বরূপগত জ্ঞান। কৃষ্ণ নিজেকে জানেন মানে তিনি নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। এই বক্তব্যের মধ্যে এমন একটি ধারণা নিহিত আছে যে পরম সত্যকে কোনো বাহ্যিক উপায়ে সম্পূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। পরম সত্য নিজেই নিজের জ্ঞাতা এবং নিজের প্রকাশের উৎস।
এই কারণেই স্বয়মেবাত্মনাত্মনং বেত্থ পদবন্ধটি গীতার আত্মতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। এর সরল অর্থ হলো আপনি নিজেই নিজের দ্বারা নিজেকে জানেন। কিন্তু গভীর অর্থ হলো পরম চৈতন্য স্বপ্রকাশমান। মানুষের জ্ঞান সাধারণত অন্য কোনো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। আমরা চোখ দিয়ে রং দেখি, কান দিয়ে শব্দ শুনি, মন দিয়ে চিন্তা করি এবং বুদ্ধি দিয়ে বিচার করি। কিন্তু যে চৈতন্যের উপস্থিতিতে চোখ দেখা, কান শোনা, মন চিন্তা এবং বুদ্ধি বিচার করতে পারে, সেই চৈতন্যকে একই ধরনের কোনো বাহ্যিক উপকরণ দিয়ে প্রকাশ করতে হয় না। যেমন সূর্যকে দেখানোর জন্য আরেকটি প্রদীপের প্রয়োজন হয় না, তেমনি চৈতন্য নিজেই নিজের প্রকাশের ভিত্তি।
এরপর এসেছে ত্বং পুরুষোত্তম। এখানে ত্বং অর্থ আপনি এবং পুরুষোত্তম অর্থ সর্বোচ্চ পুরুষ বা পরম পুরুষ। পুরুষ শব্দটি ভারতীয় দর্শনে অত্যন্ত গভীর একটি ধারণা। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ হলো চৈতন্যস্বরূপ সাক্ষীসত্তা। বেদান্তে আত্মা ও পরমাত্মার আলোচনায় পুরুষ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। গীতায় পুরুষোত্তম শব্দটি এই ধারণাকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যায়। পুরুষোত্তম অর্থ এমন এক পরম পুরুষ যিনি সীমিত ব্যক্তিসত্তা এবং জগতের পরিবর্তনশীলতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। তিনি কেবল কোনো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নন, বরং সমস্ত চৈতন্যসত্তার পরম ভিত্তি।
পুরুষোত্তম শব্দের মধ্যে উত্তম শব্দটি সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ বা উৎকৃষ্ট অর্থ প্রকাশ করে। তাই পুরুষোত্তমকে বলা যায় পরম পুরুষ, সর্বোচ্চ চৈতন্য বা সকল সত্তার চূড়ান্ত আশ্রয়। গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ে ক্ষর, অক্ষর এবং পুরুষোত্তমের ধারণা আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই দৃষ্টিতে পুরুষোত্তম হলেন সেই পরম সত্য যিনি পরিবর্তনশীল জগতের সীমাবদ্ধতা এবং জড়তার অতীত হয়েও সমস্ত অস্তিত্বের সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত।
অর্জুন এরপর কৃষ্ণকে ভূতভাবন নামে সম্বোধন করেছেন। ভূত অর্থ সৃষ্ট বা অস্তিত্বশীল জীব ও সত্তা এবং ভাবন অর্থ যিনি উৎপন্ন করেন, বিকাশ ঘটান বা পোষণ করেন। তাই ভূতভাবন অর্থ সমস্ত জীবের উৎপাদক, বিকাশকারী ও পোষক। এই নামটি ঈশ্বরকে কেবল সৃষ্টির সূচনাকারী হিসেবে দেখায় না, বরং সৃষ্টির ধারাবাহিক অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। একটি বীজ থেকে যেমন বৃক্ষ জন্মায়, বৃদ্ধি পায় এবং বহু ফল ও বীজের জন্ম দেয়, তেমনি সমগ্র জীবজগতের উৎপত্তি ও বিকাশের অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে পরম সত্তাকে ভাবা হয়েছে।
এরপর ভূতেশ শব্দটি এসেছে। ভূত অর্থ সমস্ত জীব ও অস্তিত্বশীল সত্তা এবং ঈশ অর্থ প্রভু, অধিপতি বা নিয়ন্তা। তাই ভূতেশ অর্থ সমস্ত জীবের প্রভু। ভূতভাবন এবং ভূতেশ এই দুটি নামকে পাশাপাশি রাখলে একটি সুন্দর অর্থ প্রকাশ পায়। কৃষ্ণ শুধু জীবের স্রষ্টা নন, তিনি তাদের অধিপতিও। তিনি শুধু অস্তিত্ব প্রদান করেন না, সেই অস্তিত্বকে একটি বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে ধারণ করেন। এই ধারণা মানুষের মধ্যে বিনয় ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করতে পারে। মানুষ নিজেকে সমস্ত কিছুর মালিক মনে না করে বৃহত্তর অস্তিত্বের একটি অংশ হিসেবে নিজেকে উপলব্ধি করতে শেখে।
দেবদেব শব্দটির অর্থ দেবতাদের দেবতা। ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে দেবতা বলতে প্রকৃতি, শক্তি ও বিশ্বব্যবস্থার বিভিন্ন ঐশ্বরিক প্রকাশকে বোঝানো হয়। দেবদেব নামের মাধ্যমে কৃষ্ণকে সেই সমস্ত শক্তিরও পরম উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে এখানে কেবল কোনো বাহ্যিক ক্ষমতার শ্রেণিবিন্যাস করা হচ্ছে। বরং এর গভীর দর্শন হলো সমস্ত বিচ্ছিন্ন শক্তির পেছনে একটি ঐক্যবদ্ধ পরম সত্য রয়েছে। প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি, জীবনের বিভিন্ন রূপ এবং মহাবিশ্বের বিভিন্ন কার্যপ্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত একটি পরম চৈতন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সবশেষে অর্জুন বলেন জগৎপতে। জগৎ শব্দটি গম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে গতিশীলতার ধারণা রয়েছে। যা ক্রমাগত পরিবর্তিত ও গতিশীল সেটিই জগৎ। পতি অর্থ প্রভু, অধিপতি বা রক্ষক। তাই জগৎপতি অর্থ সমগ্র জগতের প্রভু। এই নামের মধ্যে একটি গভীর দার্শনিক বৈপরীত্য রয়েছে। জগৎ সর্বদা পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের অন্তরালে একটি স্থায়ী নীতি বা চৈতন্যের উপস্থিতি কল্পনা করা হচ্ছে। জন্ম, বৃদ্ধি, ক্ষয় ও মৃত্যু জগতের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু এই পরিবর্তনশীলতার অন্তরালে যে পরম সত্যকে গীতা উপলব্ধি করতে বলছে, কৃষ্ণ সেই সত্যেরই ব্যক্তিগত ও ঈশ্বরীয় প্রকাশ।
শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। অর্জুন একের পর এক কৃষ্ণকে পুরুষোত্তম, ভূতভাবন, ভূতেশ, দেবদেব এবং জগৎপতে নামে সম্বোধন করছেন। এই নামগুলোর মধ্যে একটি বিস্তৃত ক্রম দেখা যায়। প্রথমে কৃষ্ণ পরম পুরুষ। তারপর তিনি সমস্ত জীবের উৎস ও পোষক। এরপর তিনি সমস্ত জীবের অধিপতি। তারপর তিনি দেবতাদেরও দেবতা। সবশেষে তিনি সমগ্র জগতের প্রভু। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ঈশ্বর থেকে মহাজাগতিক ঈশ্বরের দিকে তাঁর উপলব্ধি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। অর্জুনের ভাষায় তাই কেবল ভক্তি নেই, আছে উপলব্ধির গভীর অগ্রগতি।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে স্বয়মেবাত্মনাত্মনং বেত্থ কথাটির মধ্যে আত্মার স্বপ্রকাশমান প্রকৃতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আত্মাকে অন্য কোনো চৈতন্য দিয়ে প্রকাশ করতে হয় না। আত্মাই সমস্ত জ্ঞানের ভিত্তি। মানুষ যখন বলে আমি জানি, তখন সেই জানার পেছনে একটি চৈতন্য উপস্থিত থাকে। আবার যখন মানুষ বলে আমি জানি যে আমি জানি, তখন সেই আত্মসচেতনতার মধ্যেও চৈতন্যের স্বপ্রকাশমানতা অনুভূত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মা কোনো বাহ্যিক বস্তু নয়। আত্মা সেই সত্তা যার উপস্থিতিতে সমস্ত অভিজ্ঞতা সম্ভব হয়।
ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের অর্থ আরও হৃদয়গ্রাহী। অর্জুন এখানে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে কৃষ্ণের অসীমতাকে গ্রহণ করছেন। তিনি যেন বলছেন, হে প্রভু, আপনার প্রকৃত মহিমা আপনি নিজেই জানেন। আমি সীমিত জীব হিসেবে আপনাকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারি না। এই উপলব্ধির মধ্যে ভক্তির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। ভক্তি মানে অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতার উপলব্ধি এবং পরম সত্যের সামনে অহংকারের অবসান।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের গভীর প্রয়োগ রয়েছে। মানুষ সাধারণত নিজেকে শরীর, নাম, পরিচয়, পেশা, সম্পর্ক, সাফল্য, ব্যর্থতা এবং স্মৃতির মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করে। কিন্তু এগুলো পরিবর্তনশীল। শৈশবের শরীর আজ নেই, পুরোনো চিন্তা আজ নেই, অনেক সম্পর্ক ও পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হয়েছে। তবু মানুষ নিজের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা অনুভব করে। সেই ধারাবাহিকতার গভীরে রয়েছে আত্মসচেতনতা। গীতার শিক্ষা মানুষকে বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে নিজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে অনুসন্ধান করতে আহ্বান জানায়।
এই আত্মঅনুসন্ধানের একটি সহজ উদাহরণ হতে পারে রাগের মুহূর্ত। কেউ আমাদের অপমান করলে আমরা বলি আমি রেগে গেছি। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় রাগ একটি মানসিক অবস্থা, যা আসে এবং চলে যায়। দুঃখ আসে এবং চলে যায়। আনন্দ আসে এবং চলে যায়। চিন্তা আসে এবং চলে যায়। যদি এগুলো পরিবর্তনশীল হয়, তাহলে যে সত্তা এগুলোর পরিবর্তন লক্ষ্য করছে, তার প্রকৃতি কী। এই প্রশ্ন মানুষকে সাক্ষীসত্তার দিকে নিয়ে যায়। এখানেই আত্মজ্ঞান কেবল একটি দার্শনিক ধারণা না থেকে জীবনের প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে পরিণত হয়।
এই শ্লোককে একটি আয়নার উপমা দিয়ে বোঝানো যায়। আয়নায় অসংখ্য মুখ প্রতিফলিত হয়, কিন্তু আয়না নিজে কোনো মুখ হয়ে যায় না। তেমনি চৈতন্যের মধ্যে অসংখ্য চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা প্রকাশিত হয়। কিন্তু চৈতন্য নিজে এসব পরিবর্তনশীল বিষয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্ম নয়। আবার সূর্যের উপমাও এখানে প্রাসঙ্গিক। সূর্য নিজে আলোকিত এবং তার আলোয় অন্য সবকিছু দৃশ্যমান হয়। চৈতন্যও তেমনভাবে নিজে প্রকাশিত এবং তার উপস্থিতিতে সমস্ত অভিজ্ঞতা সম্ভব হয়।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থ তাই অত্যন্ত বিস্তৃত। স্বয়মেব প্রতীক স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্যের। আত্মনা আত্মানং প্রতীক আত্মসাক্ষাৎকারের। পুরুষোত্তম প্রতীক পরম চৈতন্যের। ভূতভাবন প্রতীক সৃষ্টির উৎস ও জীবনের ধারক শক্তির। ভূতেশ প্রতীক সমস্ত জীবের ঐক্য ও অন্তর্নিহিত নিয়মের। দেবদেব প্রতীক সমস্ত বিচ্ছিন্ন ঐশ্বরিক শক্তির পেছনে থাকা এক পরম উৎসের। আর জগৎপতে প্রতীক পরিবর্তনশীল বিশ্বজগতের অন্তরালে থাকা পরম নিয়ামক সত্যের।
সুতরাং স্বয়মেবাত্মনাত্মনং বেত্থ ত্বং পুরুষোত্তম এই পদবন্ধ শুধু একটি ধর্মীয় উক্তি নয়। এটি জ্ঞান, আত্মা, ঈশ্বর, চৈতন্য এবং বিশ্বসৃষ্টির সম্পর্ক নিয়ে একটি গভীর দার্শনিক ঘোষণা। এখানে বলা হচ্ছে যে পরম সত্যকে বাহ্যিক কোনো সীমিত ধারণার মধ্যে সম্পূর্ণ আবদ্ধ করা যায় না। তিনি নিজের মধ্যেই স্বপ্রকাশমান। তিনি পুরুষোত্তম হিসেবে সর্বোচ্চ চৈতন্য, ভূতভাবন হিসেবে সমস্ত জীবনের উৎস, ভূতেশ হিসেবে সমস্ত জীবের অধিপতি, দেবদেব হিসেবে সমস্ত ঐশ্বরিক শক্তির পরম উৎস এবং জগৎপতি হিসেবে সমগ্র পরিবর্তনশীল বিশ্বজগতের প্রভু।
এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা সম্ভবত এখানেই যে মানুষ যখন নিজের সীমিত অহংকারকে অতিক্রম করে নিজের অন্তর্গত চৈতন্যকে অনুসন্ধান করতে শুরু করে, তখন তার কাছে জগতের অর্থও পরিবর্তিত হতে থাকে। সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি হিসেবে না দেখে বৃহত্তর অস্তিত্বের অংশ হিসেবে উপলব্ধি করতে শেখে। নিজের মধ্যে যে চৈতন্য অনুভূত হয়, তার প্রকৃতি অনুসন্ধান করতে করতে সে পরম চৈতন্যের প্রশ্নে পৌঁছে যায়। তাই এই শ্লোক একদিকে কৃষ্ণের মহিমার স্তব, অন্যদিকে আত্মজিজ্ঞাসার আহ্বান এবং একই সঙ্গে পরম সত্যের স্বপ্রকাশমান প্রকৃতির একটি গভীর দার্শনিক ঘোষণা।
সবশেষে বলা যায়, স্বয়মেবাত্মনাত্মনং বেত্থ ত্বং পুরুষোত্তমের সারকথা হলো পরম সত্তা নিজেই নিজের জ্ঞাতা এবং নিজের প্রকাশের উৎস। তিনি এমন কোনো বাহ্যিক বস্তু নন যাকে সীমিত বুদ্ধি দিয়ে সম্পূর্ণভাবে পরিমাপ করা যায়। তিনি সেই পরম চৈতন্য যার আলোয় জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, জীবন এবং জগত প্রকাশিত হয়। অর্জুনের কণ্ঠে তাই এই শ্লোক একই সঙ্গে ভক্তির বিনয়, জ্ঞানের গভীরতা এবং আত্মতত্ত্বের চূড়ান্ত অনুসন্ধানকে ধারণ করে। মানুষ যখন নিজের বাহ্যিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে নিজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে জানতে চায়, তখন এই শ্লোক তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে সত্যের সর্বোচ্চ উপলব্ধি বাইরে নয়, চৈতন্যের গভীরতম স্তরে। আর সেই পরম সত্যই গীতার ভাষায় পুরুষোত্তম, ভূতভাবন, ভূতেশ, দেবদেব এবং জগৎপতি।
Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.
30 Day Money-Back Guarantee
Say goodbye to your low online sales rate!