শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.১৬ — শ্রীকৃষ্ণের দিব্য আত্মবিভূতি ও বিশ্বব্যাপী ঈশ্বরীয় প্রকাশের জ্ঞান
বক্তুমর্হস্যশেষণ দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ।
যাভির্বিভূতিভির্লোকানিমাংস্ত্বং ব্যাপ্য তিষ্ঠসি।।১৬।।
অনুবাদঃ তুমি যে সমস্ত বিভূতির দ্বারা এই লোকসমূহে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছ, সেই সমস্ত তোমার দিব্য বিভূতি সকল তুমিই কেবল বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করতে সমর্থ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতি যোগ নামে পরিচিত। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অসংখ্য ঐশ্বরিক প্রকাশের কথা ব্যাখ্যা করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে সমগ্র বিশ্বজগতের শ্রেষ্ঠত্ব, সৌন্দর্য, শক্তি, জ্ঞান, মহিমা ও বিস্ময়ের মধ্যে তাঁরই বিশেষ প্রকাশ বিদ্যমান। এই ধারার ষোড়শ শ্লোকে অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে তাঁর সেই দিব্য আত্মবিভূতিগুলি সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করার অনুরোধ করেন। শ্লোকটি হলো “বক্তুমর্হস্যশেষেণ দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ। যাভির্বিভূতিভির্লোকানিমাংস্ত্বং ব্যাপ্য তিষ্ঠসি।” এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত ভাব বুঝতে হলে প্রতিটি শব্দের মধ্যে নিহিত ভাষাগত, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের দিকে গভীরভাবে তাকাতে হয়।
“বক্তুম্” শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু √বদ্, যার অর্থ বলা, কথা বলা বা প্রকাশ করা। বক্তুম্ অর্থ বলতে বা প্রকাশ করতে। কিন্তু এখানে বলা বলতে কেবল মুখে কোনো তথ্য উচ্চারণ করা বোঝায় না। অর্জুন এমন এক জ্ঞানের সন্ধান করছেন যার মাধ্যমে তিনি অসীম ঈশ্বরীয় সত্তার প্রকাশকে উপলব্ধি করতে পারেন। “অর্হসি” শব্দটি এসেছে √অর্হ্ ধাতু থেকে। এর অর্থ যোগ্য হওয়া, সক্ষম হওয়া বা উপযুক্ত হওয়া। অর্জুন যখন বলেন “বক্তুমর্হসি”, তখন তাঁর বক্তব্যের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধা ও বিনয় প্রকাশ পায়। তিনি নিজের বুদ্ধির দ্বারা ঈশ্বরের অসীমতাকে পরিমাপ করতে চান না। বরং তিনি স্বীকার করছেন যে ঈশ্বর নিজেই তাঁর স্বরূপ প্রকাশ করলে তবেই সেই সত্য যথার্থভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব।
এরপর আসে “অশেষেণ” শব্দটি। “শেষ” অর্থ অবশিষ্ট অংশ এবং তার আগে নিষেধবাচক “অ” যুক্ত হয়ে “অশেষ” অর্থ হয়েছে যার কোনো অবশিষ্ট নেই, সম্পূর্ণ বা নিঃশেষ। “অশেষেণ” অর্থ সম্পূর্ণরূপে, কোনো অংশ বাদ না দিয়ে বা যতদূর সম্ভব পূর্ণভাবে। অর্জুন এখানে ভগবানের কাছে তাঁর দিব্য প্রকাশগুলির আংশিক বিবরণ চান না। তিনি চান কৃষ্ণ যেন তাঁর ঐশ্বরিক মহিমার যতটা প্রকাশ করা সম্ভব তা সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেন। এর মধ্যে মানুষের অসীমকে জানার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ সীমিত, তার জ্ঞান সীমিত, তার ভাষা সীমিত, অথচ তার অনুসন্ধানের লক্ষ্য অনেক সময় অসীম। এই সীমিত মানুষের অসীমকে জানার আকাঙ্ক্ষাই দর্শন, ধর্ম ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের অন্যতম গভীর ভিত্তি।
“দিব্যা” শব্দটি এসেছে “দিব্” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত ভাষাগত পরম্পরা থেকে এবং এর অর্থ স্বর্গীয়, আলোকময়, ঐশ্বরিক বা অতিমানবীয়। তবে গীতার এই প্রসঙ্গে দিব্য শব্দটির অর্থ কেবল অলৌকিক নয়। দিব্য বলতে এমন প্রকাশকে বোঝায় যার মধ্যে সাধারণ অস্তিত্বের সীমা অতিক্রম করে কোনো বিশেষ মহিমা, শক্তি, জ্ঞান বা সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়। সূর্যের দীপ্তি, মহাপুরুষের জ্ঞান, প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্য, সত্যের প্রতি অটল নিষ্ঠা বা নিঃস্বার্থ করুণার মধ্যেও এই দিব্যতার বিশেষ প্রকাশ অনুভব করা যায়।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলির একটি হলো “আত্মবিভূতয়ঃ”। এটি “আত্ম” এবং “বিভূতি” এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। আত্ম শব্দের অর্থ নিজের সত্তা, অন্তর্নিহিত স্বরূপ বা নিজস্ব অস্তিত্ব। বিভূতি শব্দটি এসেছে “বি” উপসর্গ এবং √ভূ ধাতু থেকে। √ভূ অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা, প্রকাশিত হওয়া বা সত্তায় আসা। “বি” উপসর্গের মাধ্যমে বিশেষভাবে বা পৃথকভাবে প্রকাশিত হওয়ার ভাব যুক্ত হয়েছে। সেই অর্থে বিভূতি হলো বিশেষ প্রকাশ, মহিমা, ঐশ্বর্য, শক্তি বা উৎকর্ষের প্রকাশ। তাই আত্মবিভূতি বলতে বোঝায় ভগবানের নিজস্ব ঐশ্বরিক প্রকাশসমূহ। এখানে বিভূতি কোনো সাধারণ সম্পদ বা বাহ্যিক ঐশ্বর্য নয়। এটি এমন এক মহিমা যার মধ্যে পরম সত্তার কোনো বিশেষ শক্তি বা গুণ মানুষের কাছে উপলব্ধ হয়।
শ্রীকৃষ্ণের বিভূতি ধারণার গভীরতা এখানেই যে তিনি নিজেকে কেবল কোনো দূরবর্তী স্বর্গীয় সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন না। তিনি জানান যে জগতের মধ্যে যে অসাধারণ মহত্ত্ব, শক্তি, জ্ঞান, সৌন্দর্য, স্থিরতা, দীপ্তি ও উৎকর্ষ দেখা যায়, তার মধ্যেই তাঁর বিশেষ প্রকাশ রয়েছে। পরবর্তী শ্লোকগুলিতে তিনি বলেন যে আদিত্যদের মধ্যে তিনি বিষ্ণু, জ্যোতিষ্কদের মধ্যে দীপ্তিমান সূর্য, পর্বতদের মধ্যে মেরু, নদীদের মধ্যে গঙ্গা এবং বিভিন্ন শ্রেষ্ঠত্বের মধ্যে তাঁর বিশেষ প্রকাশ রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে কোনো একটি বস্তুই সম্পূর্ণ ঈশ্বর। বরং সেই বস্তু বা শক্তির মধ্যে যে অসাধারণ মহিমা দেখা যায়, তা ঈশ্বরীয় সত্যের দিকে নির্দেশ করে।
“যাভিঃ” শব্দের অর্থ যেসব দ্বারা বা যেসবের মাধ্যমে। এর পরেই এসেছে “বিভূতিভিঃ”, যার অর্থ বিভূতিসমূহের দ্বারা বা ঐশ্বরিক প্রকাশসমূহের মাধ্যমে। এই দুটি শব্দ একত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাব প্রকাশ করে। ভগবান তাঁর অসংখ্য বিভূতির মাধ্যমে জগতকে নিজের উপস্থিতির কথা অনুভব করান। অর্থাৎ ঈশ্বরকে উপলব্ধির জন্য কেবল চোখ বন্ধ করে কোনো বিমূর্ত ধারণা চিন্তা করাই একমাত্র পথ নয়। জগতের মধ্যে যে মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য প্রকাশিত হচ্ছে, তার মধ্য দিয়েও ঈশ্বরীয় সত্যের দিকে অগ্রসর হওয়া যায়।
“লোকান্” শব্দের অর্থ লোকসমূহ, জগতসমূহ বা অস্তিত্বের বিভিন্ন ক্ষেত্র। বৈদিক ও পুরাণীয় চিন্তায় লোক শব্দটি শুধু দৃশ্যমান পৃথিবীকে বোঝায় না। এটি বিভিন্ন অস্তিত্বের স্তর বা জগতের ধারণাকেও প্রকাশ করে। “ইমান্” অর্থ এই এবং “ত্বম্” অর্থ তুমি। অর্থাৎ অর্জুনের দৃষ্টি কোনো দূরবর্তী অজানা বাস্তবতার দিকে নয়। তিনি এই যে জগত আমাদের সামনে রয়েছে, এই জগতের মধ্যেই ঈশ্বরের উপস্থিতিকে উপলব্ধি করতে চাইছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আধ্যাত্মিকতা তখন জীবনের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় থাকে না। বরং জীবন, প্রকৃতি, মানুষ, জ্ঞান, সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব সবই ঈশ্বরস্মরণের পথ হয়ে উঠতে পারে।
“ব্যাপ্য” শব্দটি পরিব্যাপ্ত করা বা সর্বত্র বিস্তার করার ভাব প্রকাশ করে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত সংস্কৃত ধাতুর মধ্যে √আপ্ এবং ব্যাপ্তির ধারণা রয়েছে। “তিষ্ঠসি” এসেছে √স্থা ধাতু থেকে, যার অর্থ থাকা, দাঁড়ানো বা অবস্থান করা। এই দুই শব্দ একত্রে “ব্যাপ্য তিষ্ঠসি” একটি অসাধারণ দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ ভগবান জগতকে পরিব্যাপ্ত করে অবস্থান করছেন। তিনি কেবল জগতের বাইরে কোনো দূরবর্তী সত্তা নন এবং জগতের কোনো একটি অংশের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নন। তিনি সর্বত্র উপস্থিত এবং একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট প্রকাশের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। এই ধারণার মধ্যে ঈশ্বরের অন্তর্নিহিত উপস্থিতি এবং তাঁর অতীন্দ্রিয় অসীমতা একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।
এই কারণে “ব্যাপ্য তিষ্ঠসি” শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ঈশ্বরতত্ত্ব বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বর বিশ্বকে পরিব্যাপ্ত করেছেন, কিন্তু বিশ্ব তাঁকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। যেমন একটি আলো একটি ঘরকে আলোকিত করতে পারে, কিন্তু ঘরের কোনো একটি কোণকে আলো বলেই সমগ্র আলোর সীমা নির্ধারণ করা যায় না, তেমনি জগতের কোনো একটি মহান প্রকাশ ঈশ্বরীয় সত্যের ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু কোনো একটি প্রকাশই পরম সত্যকে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারে না।
বিভূতির এই ধারণাকে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি বিশুদ্ধ সাদা আলো যখন প্রিজমের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন রং প্রকাশিত হয়। লাল, নীল, সবুজ বা বেগুনি রংগুলি আলোর প্রকাশ, কিন্তু কোনো একটি রংই সম্পূর্ণ আলো নয়। তেমনই ঈশ্বরের অসীম সত্তা জগতের মধ্যে বিভিন্ন মহিমা ও শক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। জ্ঞান তাঁর একটি প্রকাশ, শক্তি তাঁর একটি প্রকাশ, সৌন্দর্য তাঁর একটি প্রকাশ, করুণা তাঁর একটি প্রকাশ এবং সত্যের প্রতি অটলতা তাঁর একটি প্রকাশ। এই প্রকাশগুলিকে বলা যায় বিভূতি।
এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জীবনেও গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। আমরা সাধারণত একজন জ্ঞানী মানুষকে শুধু একজন মানুষ হিসেবে দেখি, একজন মহৎ ব্যক্তিকে শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখি, সূর্যকে শুধু একটি নক্ষত্র হিসেবে দেখি এবং একটি নদীকে শুধু একটি জলধারা হিসেবে দেখি। কিন্তু বিভূতি যোগ আমাদের দৃষ্টিকে আরও গভীর করে। একজন জ্ঞানীর মধ্যে জ্ঞানের মহিমা, একজন সৎ মানুষের মধ্যে সত্যের মহিমা, একজন করুণাময় মানুষের মধ্যে দয়ার মহিমা এবং প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্যের মধ্যে সৃষ্টির মহিমা অনুভব করা যায়। তখন জগত কেবল ব্যবহারযোগ্য বস্তুসমষ্টি থাকে না। তা হয়ে ওঠে অর্থপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকের মধ্যে অদ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত এবং দ্বৈত ভাবনার সঙ্গে সংলাপের সুযোগ রয়েছে। অদ্বৈত দৃষ্টিতে পরম সত্য এক এবং অদ্বিতীয়। জগতের বিভিন্ন নাম ও রূপ সেই এক সত্যের প্রকাশের ক্ষেত্র। এই দৃষ্টিতে বিভূতি মানুষের মনকে বহুর মধ্যে একের সন্ধান করতে সাহায্য করে। বিশিষ্টাদ্বৈত দৃষ্টিতে জগত ঈশ্বর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয় এবং ঈশ্বর জগতের অন্তর্যামী। ফলে “ব্যাপ্য তিষ্ঠসি” বিশেষ অর্থ লাভ করে। দ্বৈত দৃষ্টিতে ঈশ্বর ও জীবের মধ্যে পার্থক্য চিরন্তন হলেও জগতের সমস্ত শক্তি ও মহত্ত্ব ঈশ্বরনির্ভর। ফলে বিভূতি ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌম শক্তির প্রকাশ হিসেবে উপলব্ধ হয়। দর্শনের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে এই শ্লোক জগতের মহিমাকে ঈশ্বরীয় সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে।
ভক্তির দৃষ্টিতে শ্লোকটির শিক্ষা আরও সহজ এবং হৃদয়গ্রাহী। মানুষ অনেক সময় বলে যে সে ঈশ্বরকে দেখতে পায় না। বিভূতি যোগ যেন তার উত্তর দেয় যে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্য প্রথমে তাঁর মহিমাগুলিকে দেখতে শেখো। সূর্যের আলোতে আলোর মহিমা অনুভব করো। পর্বতের স্থিরতায় স্থিতির মহিমা উপলব্ধি করো। গঙ্গার প্রবাহে পবিত্রতার প্রতীক দেখো। একজন মহৎ মানুষের চরিত্রে সত্য ও করুণার মহিমা অনুভব করো। জ্ঞানের দীপ্তিতে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করার শক্তিকে উপলব্ধি করো। এভাবে জগতের প্রতিটি শ্রেষ্ঠত্ব ঈশ্বরস্মরণের একটি দরজা হয়ে উঠতে পারে।
মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষের মন বিমূর্ত সত্যের তুলনায় প্রতীক ও দৃশ্যমান উদাহরণের মাধ্যমে গভীর অর্থ সহজে উপলব্ধি করে। সূর্য মানুষের কাছে শুধু একটি নক্ষত্র নয়, জ্ঞানের প্রতীক হতে পারে। সমুদ্র শুধু জলরাশি নয়, অসীমতার প্রতীক হতে পারে। পর্বত শুধু পাথরের স্তূপ নয়, স্থিরতার প্রতীক হতে পারে। একজন মহৎ মানুষ শুধু একটি ব্যক্তি নন, তিনি নৈতিক আদর্শের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। এইভাবে বাহ্যিক জগতের কোনো উৎকৃষ্ট বিষয় অন্তরের আধ্যাত্মিক জাগরণের কারণ হতে পারে।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি গভীর সৌন্দর্য বহন করে। “দিব্যা”, “আত্মবিভূতয়ঃ” এবং “বিভূতিভিঃ” শব্দগুলির পুনরাবৃত্তি বিভূতির ধারণাকে কেন্দ্রে স্থাপন করেছে। আবার “ব্যাপ্য তিষ্ঠসি” শব্দযুগল এমন এক চিত্র সৃষ্টি করে যেখানে ঈশ্বর সর্বত্র বিস্তৃত হয়েও সর্বত্র স্থিত। এই ভাষা একই সঙ্গে গতিশীল এবং স্থির। একদিকে পরিব্যাপ্তির বিস্তার, অন্যদিকে অবস্থানের স্থায়িত্ব। এর মাধ্যমে ঈশ্বরের সর্বব্যাপী উপস্থিতির একটি কাব্যিক ছবি ফুটে ওঠে।
“অশেষেণ” শব্দটিও শ্লোকের গভীরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অর্জুন চান সম্পূর্ণ প্রকাশ। কিন্তু ঈশ্বরের বিভূতি অসীম। ফলে এখানে একটি চিরন্তন মানবিক প্রশ্ন জন্ম নেয়। সীমিত ভাষা কি অসীম সত্যকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে। সম্ভবত পারে না। তবু মানুষের অনুসন্ধান থেমে থাকে না। মানুষ যতটুকু উপলব্ধি করতে পারে, ততটুকু দিয়ে অসীমের দিকে এগিয়ে যায়। গীতার বিভূতি যোগ সেই এগিয়ে যাওয়ার একটি সুন্দর পদ্ধতি তৈরি করে।
এই শ্লোকের বাস্তব জীবনের শিক্ষা তাই অত্যন্ত গভীর। আমরা যদি প্রতিদিনের জীবনে কেবল ভোগের দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখি, তাহলে পৃথিবী আমাদের কাছে কেবল বস্তু ও সুবিধার সমষ্টি হয়ে ওঠে। কিন্তু যদি আমরা বিভূতির দৃষ্টিতে দেখতে শিখি, তাহলে জগতের প্রতিটি মহত্ত্ব আমাদের মধ্যে শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও ঈশ্বরস্মরণ জাগাতে পারে। একজন শিক্ষকের জ্ঞানে, একজন মায়ের ভালোবাসায়, একজন সৎ মানুষের চরিত্রে, একজন বিজ্ঞানীর সত্য অনুসন্ধানে, একজন শিল্পীর সৃষ্টিশীলতায় এবং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে আমরা ঐশ্বরিক মহিমার বিশেষ প্রকাশ অনুভব করতে পারি।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক তাই কেবল একটি ধর্মীয় অনুরোধ নয়। এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের আহ্বান। অর্জুন আসলে জানতে চাইছেন, “আমি তোমাকে এই জগতের মধ্যে কীভাবে চিনব।” কৃষ্ণের উত্তর সমগ্র বিভূতি যোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়। জগতের মধ্যে যা সত্যিই মহৎ, যা সত্যিই জ্ঞানময়, যা সত্যিই শক্তিশালী, যা সত্যিই সুন্দর এবং যা সত্যিই কল্যাণকর, তার মধ্যে ঈশ্বরীয় মহিমার বিশেষ প্রকাশ রয়েছে। সেই মহিমাকে উপলব্ধি করে তার উৎসের দিকে মন ফেরানোই বিভূতি যোগের অন্তর্নিহিত সাধনা।
সবশেষে বলা যায়, “বক্তুমর্হস্যশেষেণ দিব্যা হ্যাত্মবিভূতয়ঃ” এই পদের গভীর অর্থ হলো ঈশ্বরের অসীম সত্তা জগতের অসংখ্য মহিমার মাধ্যমে মানুষের কাছে উপলব্ধ হয়ে ওঠে। “বিভূতি” হলো অসীমের সীমিতের মধ্যে দীপ্তিমান প্রকাশ। “আত্মবিভূতি” হলো পরম সত্তার নিজস্ব ঐশ্বরিক মহিমার প্রকাশ। আর “ব্যাপ্য তিষ্ঠসি” আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সেই পরম সত্য সমগ্র অস্তিত্বকে পরিব্যাপ্ত করে অবস্থান করছে। তাই গীতার এই শিক্ষা আমাদের জগত থেকে পালিয়ে যেতে বলে না। বরং জগতকে আরও গভীরভাবে দেখতে শেখায়। বাহ্যিক সৌন্দর্যের মধ্যে অন্তর্নিহিত মহিমা, দৃশ্যমান শক্তির মধ্যে অদৃশ্য উৎস, জ্ঞানের মধ্যে চৈতন্য এবং জীবনের মধ্যে পরম সত্যের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে শেখায়। এই উপলব্ধিই ধীরে ধীরে সাধারণ দৃষ্টিকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে রূপান্তরিত করে এবং মানুষকে বহুর মধ্যে এক, প্রকাশের মধ্যে উৎস এবং জগতের মধ্যে পরম সত্তার সন্ধান করতে সাহায্য করে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!