শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.১৭ — সর্বদা শ্রীকৃষ্ণকে চিন্তা করার উপায় ও ঈশ্বরীয় বিভূতির উপলব্ধি
কথং বিদ্যামহং যোগিংস্ত্বাং সদা পরিচিন্তয়ন্।
কেষু কেষু চ ভাবেষু চিন্ত্যোহসি ভগবন্ময়া।।১৭।।
অনুবাদঃ হে যোগেশ্বর! কিভাবে সর্বদা তোমার চিন্তা করলে আমি তোমাকে জানতে পারব? হে ভগবন্! কোন্ কোন্ বিবিধ আকৃতির মাধ্যমে আমি তোমাকে চিন্তা করব?
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতি যোগের সপ্তদশ শ্লোকে অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে এমন একটি প্রশ্ন করেন, যার মধ্যে একজন সত্যসন্ধানী মানুষের সমগ্র আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান যেন একত্রিত হয়ে আছে। তিনি বলেন, “কথং বিদ্যামহং যোগিংস্ত্বাং সদা পরিচিন্তয়ন্। কেষু কেষু চ ভাবেষু চিন্ত্যোহসি ভগবন্ময়া।” অর্থাৎ হে যোগী, আমি সর্বদা তোমাকে চিন্তা করতে করতে কীভাবে তোমাকে জানতে পারি এবং হে ভগবান, কোন কোন ভাব বা প্রকাশের মধ্যে তোমাকে আমার দ্বারা চিন্তা করা উচিত। এই প্রশ্ন কেবল কৃষ্ণকে জানার পদ্ধতি সম্পর্কে একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা নয়। এর গভীরে রয়েছে মানুষের চিরন্তন অনুসন্ধান। সীমিত মন কীভাবে অসীমকে জানবে, বিচ্ছিন্ন জীবনে কীভাবে পরম সত্যকে অনুভব করবে এবং দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য অভিজ্ঞতার মধ্যে কীভাবে ঈশ্বরের উপস্থিতিকে উপলব্ধি করবে, অর্জুনের প্রশ্ন মূলত সেই সত্যেরই অনুসন্ধান।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ “কথং” যার অর্থ কীভাবে। এই একটি শব্দের মধ্যেই অর্জুনের জিজ্ঞাসার প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি কৃষ্ণের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ করছেন না। তিনি জানতে চাইছেন না কৃষ্ণ আছেন কি না। তিনি জানতে চাইছেন তাঁকে কীভাবে জানা যায়। অর্থাৎ এটি অস্তিত্বের প্রশ্নের চেয়ে উপলব্ধির প্রশ্ন। মানুষের জীবনে এই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেক কিছু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারি, কিন্তু কোনো সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একজন মানুষ ভালোবাসা সম্পর্কে শত বই পড়তে পারে, কিন্তু ভালোবাসার প্রকৃত অনুভূতি কেবল জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। তেমনি ঈশ্বর সম্পর্কেও অনেক কথা জানা সম্ভব, কিন্তু ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্য জ্ঞানকে জীবন্ত অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করতে হয়। “কথং” তাই আধ্যাত্মিক সাধনার পদ্ধতি অনুসন্ধানের প্রতীক।
এর পরেই এসেছে “বিদ্যাম্” শব্দটি, যার মূল সংস্কৃত ধাতু √বিদ্। এই ধাতুর অর্থ জানা বা জ্ঞান লাভ করা। এই একই ধাতু থেকে বিদ্যা, বেদ এবং বিদ্বান প্রভৃতি শব্দের উৎপত্তি। কিন্তু এখানে “বিদ্যাম্” কেবল কোনো তথ্য জানা বোঝায় না। অর্জুন এমন এক জ্ঞান চান যা তাঁর চেতনার সঙ্গে যুক্ত হবে। তিনি কৃষ্ণ সম্পর্কে কেবল শুনতে চান না, তিনি কৃষ্ণকে জানতে চান। এই জানা বহির্জগতের কোনো বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের মতো নয়। এখানে জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয়ের সম্পর্ক ধীরে ধীরে গভীরতর হয়। ভক্তির ক্ষেত্রে এটি পরিণত হয় ঈশ্বরের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মধ্যে এবং জ্ঞানযোগের ক্ষেত্রে এটি পরিণত হয় আত্মস্বরূপ উপলব্ধির মধ্যে।
অর্জুন কৃষ্ণকে “যোগিন্” বলে সম্বোধন করেছেন। যোগ শব্দটি সংস্কৃত √যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে, যার মধ্যে যুক্ত হওয়া, সংযুক্ত করা এবং একাগ্র হওয়ার ভাব রয়েছে। যোগী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি যোগে প্রতিষ্ঠিত। কৃষ্ণকে যোগী বলে সম্বোধন করার মধ্যে বিশেষ তাৎপর্য আছে। কারণ কৃষ্ণ এখানে শুধু যোগের শিক্ষক নন, তিনি যোগের গভীরতম সত্যের অধিষ্ঠাতা। তাঁর শিক্ষা মানুষকে বিচ্ছিন্নতা থেকে ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ যখন নিজের মন, কর্ম, জ্ঞান ও ভক্তিকে উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করে, তখন জীবনের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলি একটি বৃহত্তর অর্থ লাভ করতে শুরু করে। তাই “যোগিন্” শব্দটি অর্জুনের শ্রদ্ধা এবং কৃষ্ণের আধ্যাত্মিক অবস্থান উভয়কেই প্রকাশ করে।
“ত্বাম্” শব্দের অর্থ তোমাকে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ সর্বনাম হলেও এর মধ্যে শ্লোকটির ভক্তিমূলক গভীরতা নিহিত রয়েছে। অর্জুন কোনো বিমূর্ত তত্ত্বের কথা বলছেন না। তিনি বলছেন তোমাকে। তাঁর অনুসন্ধানের কেন্দ্র একজন জীবন্ত ঈশ্বরীয় সত্তা। এই কারণে গীতার আধ্যাত্মিকতা নিছক শুষ্ক দর্শন নয়। এখানে জ্ঞান এবং ভক্তি পরস্পরকে পরিপূর্ণ করে। সত্যকে জানতে হয় এবং সেই সত্যের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কও স্থাপন করতে হয়।
“সদা” শব্দটির অর্থ সর্বদা বা সবসময়। এই শব্দটি শ্লোকটির সাধনামূলক তাৎপর্যকে আরও গভীর করে। অর্জুন এমন কোনো ধ্যানপদ্ধতি জানতে চাইছেন না যা কেবল নির্দিষ্ট সময়ে পালন করতে হবে। তিনি জানতে চাইছেন কীভাবে সর্বদা কৃষ্ণকে চিন্তা করা যায়। এর অর্থ হলো আধ্যাত্মিকতা কেবল মন্দির, পূজা বা ধ্যানের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই ঈশ্বরস্মরণের ক্ষেত্র হতে পারে। কাজের মধ্যে, প্রকৃতির মধ্যে, মানুষের সম্পর্কের মধ্যে, আনন্দের মধ্যে এবং দুঃখের মধ্যেও ঈশ্বরকে স্মরণ করা সম্ভব। এই সর্বক্ষণিক স্মরণই “সদা” শব্দের গভীর অর্থ।
“পরিচিন্তয়ন্” শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। এটি চিন্তা ধাতুর সঙ্গে “পরি” উপসর্গের সমন্বয়ে গঠিত। চিন্তা মানে ভাবা, আর পরি শব্দের মধ্যে চারদিক থেকে বা সম্পূর্ণভাবে ঘিরে নেওয়ার ভাব রয়েছে। ফলে পরিচিন্তয়ন্ বলতে কেবল একবার চিন্তা করা বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে গভীরভাবে, বারবার এবং সর্বাঙ্গীণভাবে কোনো বিষয়কে মননে ধারণ করা। সাধারণ চিন্তা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু পরিচিন্তন ধীরে ধীরে মানুষের চেতনার অভ্যাস হয়ে ওঠে। যে বিষয় মানুষ বারবার চিন্তা করে, সেটিই তার মানসিক জগতের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। তাই গীতার এই শিক্ষা মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ যদি ক্রমাগত ভয় নিয়ে চিন্তা করে, তার মন ভয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি ক্রমাগত ক্রোধ নিয়ে চিন্তা করে, ক্রোধ তার স্বভাবকে শক্তিশালী করে। আবার যদি সত্য, করুণা, জ্ঞান এবং ঈশ্বরীয় মহিমা নিয়ে চিন্তা করে, তার চেতনা ধীরে ধীরে সেই উচ্চতর গুণগুলির দিকে অভিমুখী হয়।
এরপর অর্জুন বলেন “কেষু কেষু চ ভাবেষু”। “কেষু কেষু” অর্থ কোন কোন এবং “ভাবেষু” অর্থ বিভিন্ন ভাব, অবস্থা, অস্তিত্ব বা প্রকাশের মধ্যে। ভাব শব্দটি √ভূ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। তাই ভাবের মধ্যে কেবল মানসিক অনুভূতির অর্থ নেই। এর মধ্যে অস্তিত্ব, প্রকৃতি, অবস্থা, প্রকাশ, গুণ এবং সত্তার ধারণাও নিহিত রয়েছে। এই কারণে “কেষু কেষু চ ভাবেষু” এর গভীর অর্থ হলো জগতের কোন কোন প্রকাশের মধ্যে ভগবানকে চিনতে হবে। অর্জুন যেন জানতে চাইছেন, “আমি যখন চারপাশের জগতের দিকে তাকাব, তখন কোন কোন রূপ, গুণ, শক্তি বা মহত্ত্বের মধ্যে তোমার উপস্থিতিকে অনুভব করব।”
এই প্রশ্নের মধ্যেই বিভূতি যোগের মূল উদ্দেশ্য নিহিত আছে। কৃষ্ণ পরবর্তী শ্লোকগুলিতে তাঁর বিভিন্ন ঐশ্বরিক বিভূতির কথা বলবেন। তিনি দেখাবেন যে জগতের শ্রেষ্ঠত্ব, মহিমা, জ্ঞান, শক্তি, সৌন্দর্য এবং বিস্ময়ের মধ্যে তাঁর প্রকাশ উপলব্ধি করা যায়। অর্থাৎ ঈশ্বরকে কোনো একটি সীমিত রূপের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে তাঁর প্রকাশকে সমগ্র অস্তিত্বের মধ্যে অনুভব করতে শেখাই এই শিক্ষার একটি প্রধান উদ্দেশ্য। সূর্যের দীপ্তি দেখলে ঈশ্বরের মহিমা স্মরণ করা যায়। জ্ঞানীর জ্ঞান দেখলে ঈশ্বরের জ্ঞান স্মরণ করা যায়। মহৎ মানুষের চরিত্র দেখলে ঈশ্বরীয় মহত্ত্বের কথা মনে পড়তে পারে। প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্য দেখলে সৃষ্টির অন্তর্নিহিত শক্তির কথা অনুভব করা যায়। এভাবে জগতের প্রতিটি মহৎ অভিজ্ঞতা ঈশ্বরস্মরণের একটি দ্বার হয়ে উঠতে পারে।
“চিন্ত্যঃ” শব্দটি এসেছে চিন্তা ধাতু থেকে এবং এর অর্থ যাকে চিন্তা করা উচিত, যিনি ধ্যানের যোগ্য বা যাকে মননে ধারণ করা উচিত। “অসি” অর্থ তুমি আছ। “চিন্ত্যোহসি” অর্থ তুমি চিন্তার বা ধ্যানের যোগ্য। এখানে একটি গভীর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। মানুষ যখন কোনো মহৎ বিষয় দেখে, তখন সেই মহত্ত্বের উৎস সম্পর্কে ভাবতে পারে। যখন সৌন্দর্য দেখে, তখন সৌন্দর্যের পরম উৎসের কথা স্মরণ করতে পারে। যখন জ্ঞান দেখে, তখন জ্ঞানের চূড়ান্ত উৎস সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পারে। যখন সত্য ও ন্যায়ের প্রকাশ দেখে, তখন সেই চিরন্তন সত্যের কথা মনে করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই জীবনকে সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে।
এরপর আসে “ভগবন্” শব্দটি। ভগবান শব্দের সঙ্গে “ভগ” ধারণাটি যুক্ত, যা ঐশ্বর্য, শক্তি, যশ, সৌন্দর্য, জ্ঞান এবং বৈরাগ্যের মতো পূর্ণতার গুণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ভগবান বলতে সেই পরম সত্তাকে বোঝানো হয় যার মধ্যে পূর্ণতা সর্বোচ্চভাবে প্রকাশিত। অর্জুন যখন কৃষ্ণকে ভগবান বলে সম্বোধন করেন, তখন তাঁর প্রশ্ন কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক থাকে না। সেখানে শ্রদ্ধা, ভক্তি, বিশ্বাস এবং আত্মসমর্পণ যুক্ত হয়। একজন সত্যসন্ধানী যখন সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে, তখন তার প্রশ্নের মধ্যে শুধু জানার আকাঙ্ক্ষা থাকে না, সত্যকে গ্রহণ করার প্রস্তুতিও থাকে। অর্জুনের প্রশ্নের মধ্যেও সেই বিনয় স্পষ্ট।
শেষে আছে “ময়া” শব্দটি, যার অর্থ আমার দ্বারা। এটি ব্যক্তিগত সাধনার দিকটি প্রকাশ করে। কৃষ্ণ সর্বত্র থাকলেও তাঁকে উপলব্ধি করার কাজটি প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের। অন্য কেউ ঈশ্বরকে অনুভব করে দিলেও নিজের চেতনার পরিবর্তন নিজেকেই ঘটাতে হয়। অন্যের অভিজ্ঞতা অনুপ্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু আত্মিক উপলব্ধি ব্যক্তিগত সাধনার বিষয়। তাই “ময়া” শব্দটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ঈশ্বরসন্ধান কোনো দূরের বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের নিজের অন্তর ও চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দার্শনিকভাবে এই শ্লোকটি জ্ঞানতত্ত্বের একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। মানুষ সাধারণত ইন্দ্রিয়, যুক্তি, স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কোনো বিষয়কে জানে। কিন্তু ঈশ্বর যদি ইন্দ্রিয়াতীত হন, তাহলে তাঁকে কীভাবে জানা সম্ভব। গীতার শিক্ষা হলো ঈশ্বরকে কেবল একটি বাহ্যিক বস্তু হিসেবে জানা যায় না। ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্য চেতনার পরিবর্তন প্রয়োজন। অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে এই অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত আত্মা এবং ব্রহ্মের সম্পর্কের উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে জীব ও জগত পরম সত্তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত এবং তাই জগতের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ অনুভব করা যায়। ভক্তি দর্শনের দৃষ্টিতে এই শ্লোক হলো প্রেমময় স্মরণের আহ্বান। ভক্ত সর্বত্র এমন চিহ্ন খুঁজে নেয় যা তাকে প্রিয়তম ভগবানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। মানুষের মন যে বিষয়কে বারবার চিন্তা করে, সেই বিষয় ধীরে ধীরে তার মানসিক অভ্যাসে পরিণত হয়। তাই চিন্তার বিষয় নির্বাচন মানুষের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। “সদা পরিচিন্তয়ন্” আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিক জীবন শুধু বাহ্যিক আচরণ নয়, চিন্তার ধারাকেও পরিবর্তন করা। মানুষ যদি প্রতিদিন জীবনের মহত্তর দিকগুলিকে স্মরণ করে, কৃতজ্ঞতা অনুভব করে, সত্যের প্রতি মনোযোগী হয় এবং নিজের মধ্যে ঈশ্বরীয় গুণগুলির বিকাশ ঘটায়, তবে তার চেতনা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে পারে।
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। কেউ যদি সমুদ্রকে জানতে চায়, তবে সে শুধু একটি ঢেউ দেখে সমুদ্রকে পুরোপুরি বুঝতে পারবে না। কিন্তু ঢেউ, গভীরতা, বিস্তৃতি, লবণাক্ততা এবং অসীম জলরাশির দিকে তাকিয়ে সে সমুদ্রের প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। একইভাবে জগতের বিভিন্ন মহৎ প্রকাশের মধ্যে ঈশ্বরের অসীম মহিমার আভাস পাওয়া যায়। সূর্যের আলো সমগ্র সূর্য নয়, কিন্তু সূর্যের শক্তির প্রকাশ। তেমনি কোনো মহৎ মানুষের জ্ঞান বা কোনো মহান কর্ম ঈশ্বরের সম্পূর্ণতা নয়, কিন্তু তা ঈশ্বরীয় গুণের একটি প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে জগত থেকে বিচ্ছিন্ন না করে জগতের মধ্য দিয়েই পরম সত্যের দিকে নিয়ে যায়।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। “কথং” হলো অনুসন্ধানের প্রতীক। “বিদ্যাম্” হলো জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা। “যোগিন্” হলো ঐক্যের কেন্দ্র। “সদা” হলো নিরন্তরতার প্রতীক। “পরিচিন্তয়ন্” হলো গভীর মননের প্রতীক। “ভাবেষু” হলো বহুর মধ্যে এককে দেখার প্রতীক। “ভগবন্” হলো পরম পূর্ণতার প্রতীক। আর “ময়া” হলো ব্যক্তিগত সাধকের প্রতীক। এই সমস্ত শব্দ একত্রিত হয়ে একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক যাত্রার ছবি তৈরি করে। মানুষ প্রশ্ন করে, জ্ঞান অনুসন্ধান করে, মনকে একাগ্র করে, জগতের প্রকাশগুলিকে নতুন চোখে দেখতে শেখে এবং শেষ পর্যন্ত বহুর মধ্যে একের উপস্থিতি উপলব্ধি করার দিকে এগিয়ে যায়।
শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো ঈশ্বরস্মরণকে জীবনের একটি আলাদা অংশ না বানিয়ে জীবনকেই ঈশ্বরস্মরণের ক্ষেত্র করে তোলা। মানুষ যখন প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে, তখন বিস্ময়ের মাধ্যমে ঈশ্বরকে স্মরণ করতে পারে। যখন জ্ঞান লাভ করে, তখন জ্ঞানের উৎসের কথা ভাবতে পারে। যখন কারও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে, তখন সেই ভালোবাসার অন্তর্নিহিত পবিত্রতাকে অনুভব করতে পারে। যখন নিজের সাফল্য দেখে, তখন অহংকারের পরিবর্তে কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারে। যখন দুঃখের সম্মুখীন হয়, তখন অনিত্যতা ও আত্মসত্যের দিকে ফিরে যেতে পারে। এইভাবে জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা আধ্যাত্মিক জাগরণের উপকরণ হতে পারে।
অতএব “কথং বিদ্যামহং যোগিংস্ত্বাং সদা পরিচিন্তয়ন্” কেবল একটি শাস্ত্রীয় প্রশ্ন নয়। এটি মানুষের হৃদয়ের চিরন্তন প্রশ্ন। আমি কীভাবে সত্যকে জানব। আমি কীভাবে আমার মনকে উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত রাখব। আমি কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে ঈশ্বরকে স্মরণ করব। আর “কেষু কেষু চ ভাবেষু” আমাদের শেখায় যে পরম সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য পৃথিবী থেকে পালিয়ে যাওয়াই একমাত্র পথ নয়। বরং জগতের মধ্যে যে মহত্ত্ব, সৌন্দর্য, জ্ঞান, শক্তি, সত্য ও প্রেম প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলোর মধ্য দিয়েও ঈশ্বরীয়তার দিকে দৃষ্টি ফেরানো যায়।
এই শ্লোকের সারমর্ম তাই হলো জ্ঞান, মনন এবং ভক্তির এক অপূর্ব সমন্বয়। ঈশ্বরকে জানতে হলে শুধু তাঁর সম্পর্কে শুনলেই হবে না, তাঁকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। তাঁকে গভীরভাবে চিন্তা করতে হলে জীবনের প্রতিটি মহৎ প্রকাশের মধ্যে তাঁর উপস্থিতি অনুভব করার দৃষ্টি গড়ে তুলতে হবে। আর সেই দৃষ্টি যখন ক্রমাগত গভীর হয়, তখন জগত আর কেবল বিচ্ছিন্ন বস্তু ও ঘটনার সমষ্টি বলে মনে হয় না। তখন বহুর মধ্যে একের প্রকাশ অনুভূত হয় এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ঈশ্বরস্মরণের সম্ভাবনায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্জুনের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তাই গীতা আমাদের একটি চিরন্তন সাধনার পথ দেখায়। কীভাবে জানব, কীভাবে স্মরণ করব এবং কোথায় তাঁকে দেখব। এই তিনটি প্রশ্নের গভীরে প্রবেশ করলেই মানুষ ধীরে ধীরে নিজের জীবন, জগত এবং পরম সত্যকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!