শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.১৮ — শ্রীকৃষ্ণের যোগ ও দিব্য বিভূতি শ্রবণে অর্জুনের অমৃতময় জ্ঞানপিপাসা
বিস্তরেণাত্মনো যোগং বিভূতিং চ জনার্দন।
ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তির্হি শৃণ্বতো নাস্তি মেহমৃতম্।।১৮।।
অনুবাদঃ হে জনার্দন! তোমার যোগ ও বিভূতি বিস্তারিতভাবে পুনরায় আমাকে বল। কারণ তোমার উপদেশামৃত শ্রবণ করে আমার পরিতৃপ্তি হচ্ছে না; আমি আরও শ্রবণ করতে ইচ্ছা করি।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের কাছে তাঁর ঐশ্বরিক যোগ এবং বিভূতির কথা আরও বিস্তারিতভাবে শ্রবণ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো “বিস্তরেণাত্মনো যোগং বিভূতিং চ জনার্দন। ভূয়ঃ কথয় তৃপ্তির্হি শৃণ্বতো নাস্তি মে অমৃতম্।” এর সরল অর্থ হলো, হে জনার্দন, আপনার যোগ এবং আপনার ঐশ্বরিক বিভূতিগুলি আমাকে বিস্তারিতভাবে আবার বলুন। কারণ আপনার অমৃতময় বাণী শ্রবণ করতে করতে আমার কোনো তৃপ্তি হয় না। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে জ্ঞানপিপাসা, ঈশ্বরানুসন্ধান, ভক্তি, শ্রবণ এবং বিশ্বজগতের মধ্যে ঈশ্বরীয় প্রকাশ উপলব্ধির এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।
“বিস্তরেণ” শব্দটির মধ্যে বিস্তার ও প্রসারণের ধারণা নিহিত রয়েছে। এর মূল ভাব হলো কোনো বিষয়কে সীমিত বা সংক্ষিপ্তভাবে না দেখে তার বিভিন্ন দিক উন্মোচিত করে বোঝা। অর্জুন কৃষ্ণকে শুধু তাঁর যোগ ও বিভূতির নাম বলতে বলছেন না। তিনি চান সেই রহস্যের বিস্তৃত ব্যাখ্যা। কারণ আধ্যাত্মিক সত্য কখনো কখনো একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যে প্রকাশিত হলেও তার অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়। মানুষের জ্ঞানও তেমন। একটি সত্য প্রথমবার শুনলে তার বাহ্যিক অর্থ বোঝা যায়, কিন্তু একই সত্যকে চিন্তা ও মননের মাধ্যমে বারবার উপলব্ধি করলে তার গভীর স্তর প্রকাশিত হয়। তাই বিস্তরেণ শব্দটি শুধু বিস্তারিতভাবে বলার অনুরোধ নয়, বরং দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধতা থেকে অসীমতার দিকে প্রসারিত করার আহ্বান।
“আত্মনো” শব্দটি আত্মন্ শব্দ থেকে এসেছে এবং প্রসঙ্গ অনুযায়ী এর অর্থ নিজের, আত্মার অথবা আপনার হতে পারে। এখানে অর্জুন কৃষ্ণের নিজের ঐশ্বরিক স্বরূপের কথা জানতে চাইছেন। আত্মা শব্দটি ভারতীয় দর্শনে অত্যন্ত গভীর এবং বহুমাত্রিক। কখনো এটি ব্যক্তির অন্তঃসত্তাকে বোঝায়, কখনো চৈতন্যকে বোঝায়, আবার পরমার্থিক দর্শনে আত্মা ও পরম সত্যের সম্পর্ক নিয়ে গভীর আলোচনা রয়েছে। এই শ্লোকে আত্মনো যোগ বলতে কৃষ্ণের সেই ঐশ্বরিক যোগকে বোঝানো হয়েছে যার মাধ্যমে তিনি অসীম সত্তা হয়েও সমগ্র বিশ্বজগতের মধ্যে বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হন।
“যোগ” শব্দটি সংস্কৃত “যুজ” ধাতু থেকে উৎপন্ন। এর মূল অর্থ যুক্ত করা, সংযুক্ত করা, নিয়োজিত করা বা একত্রিত করা। কিন্তু গীতার প্রসঙ্গে যোগ শব্দের অর্থ কেবল ধ্যান বা কোনো নির্দিষ্ট সাধনাপদ্ধতি নয়। এখানে কৃষ্ণের যোগ বলতে তাঁর ঐশ্বরিক শক্তি ও সেই রহস্যকে বোঝানো হয়েছে যার দ্বারা এক পরম সত্তা অসংখ্য রূপে এবং অসংখ্য শক্তির মাধ্যমে বিশ্বে প্রকাশিত হন। এই অর্থে যোগ হলো ঐক্যের রহস্য। আমরা জগতে অসংখ্য ব্যক্তি, বস্তু, শক্তি, ঘটনা ও অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্য দেখি। কিন্তু কৃষ্ণের যোগ সেই বৈচিত্র্যের অন্তরালে একটি ঐক্য উপলব্ধি করতে শেখায়।
এর পরেই এসেছে “বিভূতি” শব্দটি। বিভূতি শব্দটি বিশেষভাবে প্রকাশিত হওয়া, মহিমা বা ঐশ্বরিক প্রকাশের ধারণা বহন করে। এর সঙ্গে “ভূ” ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। গীতার দশম অধ্যায়ে বিভূতি বলতে জগতে ঈশ্বরের বিশেষ বিশেষ মহিমাময় প্রকাশকে বোঝানো হয়েছে। যেখানে অসাধারণ জ্ঞান, শক্তি, সৌন্দর্য, মহত্ত্ব, ঐশ্বর্য, সাহস, প্রজ্ঞা বা সৃষ্টিশীলতা দেখা যায়, সেখানে ঈশ্বরীয় মহিমার একটি বিশেষ প্রকাশ অনুভব করা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের সাধারণ জগতকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। তখন প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু সৌন্দর্য থাকে না, মহাজাগতিক শক্তি শুধু শক্তি থাকে না, জ্ঞান শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা থাকে না। এগুলোর মধ্যে পরম সত্তার প্রকাশ অনুভব করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
“যোগ” এবং “বিভূতি” তাই একই বিষয়ের দুটি পরস্পরসম্পর্কিত দিক। যোগ হলো ঈশ্বরীয় প্রকাশের অন্তর্নিহিত শক্তি ও রহস্য, আর বিভূতি হলো সেই শক্তির দৃশ্যমান ও বিশেষ প্রকাশ। যেমন সূর্য এক, কিন্তু তার আলো অসংখ্য বস্তুকে আলোকিত করে এবং প্রতিটি বস্তুর মধ্যে আলোর প্রকাশ ভিন্নভাবে প্রতীয়মান হয়, তেমনি পরম সত্তা এক হলেও তাঁর মহিমা বিশ্বজগতের অসংখ্য রূপের মধ্যে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হতে পারে। এই উপলব্ধি মানুষকে বাহ্যিক বৈচিত্র্যের মধ্যে অন্তর্নিহিত ঐক্য অনুভব করতে সাহায্য করে।
অর্জুন কৃষ্ণকে “জনার্দন” নামে সম্বোধন করেছেন। জনার্দন কৃষ্ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ভারতীয় ঐতিহ্যে এই নামের বিভিন্ন ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এবং এর সঙ্গে মানুষের কল্যাণ, দুঃখ নিবারণ ও অশুভ শক্তির দমন করার ভাব যুক্ত। অর্জুনের এই সম্বোধনের মধ্যেও গভীর আস্থা রয়েছে। তিনি এমন একজনের কাছে জ্ঞান চাইছেন যিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং যিনি অজ্ঞানতা ও দুঃখের অন্ধকার দূর করতে পারেন। ফলে জনার্দন সম্বোধনটি শ্লোকটিকে শুধু দার্শনিক নয়, ভক্তিময় আবেগও প্রদান করেছে।
“ভূয়ঃ” শব্দের অর্থ আবার, পুনরায় অথবা আরও। এই একটি শব্দ অর্জুনের মানসিক অবস্থাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশ করে। তিনি ইতিমধ্যে কৃষ্ণের কাছ থেকে অনেক কিছু শুনেছেন। তবু তাঁর জিজ্ঞাসা শেষ হয়নি। তিনি আবার শুনতে চান। কারণ সত্যিকারের জ্ঞান মানুষের জিজ্ঞাসাকে শেষ করে দেয় না, বরং আরও গভীর করে। কোনো বিষয়ের বাহ্যিক অর্থ বোঝার পর তার অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে ইচ্ছা জাগে। তাই “ভূয়ঃ” কেবল পুনরাবৃত্তির কথা নয়। এটি গভীরতর উপলব্ধির জন্য পুনরায় শ্রবণের আকাঙ্ক্ষা।
“কথয়” শব্দের অর্থ বলুন বা বর্ণনা করুন। এটি অনুরোধসূচক ক্রিয়ারূপ। অর্জুনের অবস্থায় এটি কোনো আদেশ নয়। এটি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং জ্ঞানপিপাসায় পূর্ণ একটি বিনীত আবেদন। একজন প্রকৃত শিক্ষার্থী যেমন জ্ঞানীর কাছে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে আরও জানতে চায়, অর্জুনও তেমনভাবে কৃষ্ণের কাছে জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত করার আবেদন করছেন।
এরপর আসে “তৃপ্তির্হি”। তৃপ্তি শব্দের মূল ভাব হলো সন্তুষ্ট হওয়া বা পরিতৃপ্ত হওয়া। অর্জুন বলছেন তাঁর তৃপ্তি হয় না। সাধারণ জীবনে তৃপ্তির অভাবকে অপূর্ণতার লক্ষণ বলা হয়। কিন্তু এখানে তৃপ্তি না হওয়ার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্জুন কোনো বস্তুগত ভোগের জন্য অস্থির নন। তিনি কৃষ্ণের জ্ঞান ও ঈশ্বরীয় মহিমার কথা শুনে আরও শুনতে চাইছেন। তাই এখানে তৃপ্তির অভাব আসলে জ্ঞানপিপাসার গভীরতা। সত্যের প্রতি ভালোবাসা যত গভীর হয়, সত্যকে জানার আকাঙ্ক্ষাও তত বৃদ্ধি পায়।
“শৃণ্বতো” শব্দটি “শ্রু” ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ শোনা। এই ধাতু থেকেই শ্রবণ, শ্রুতি এবং শ্রুতির মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ শব্দের উৎপত্তি। ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে শ্রবণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সত্যকে উপলব্ধি করার প্রথম ধাপ হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা। তারপর আসে মনন এবং গভীরভাবে অন্তরে ধারণ করা। অর্জুন এখানে সেই আদর্শ শ্রোতার প্রতীক যিনি শুধু শুনছেন না, বরং শোনার মাধ্যমে নিজের চেতনার পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন। তাঁর শ্রবণ নিষ্ক্রিয় নয়। তাঁর শ্রবণের মধ্যে জিজ্ঞাসা, মনোযোগ, শ্রদ্ধা এবং অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
সবশেষে এসেছে “অমৃতম্”। অমৃত শব্দটি “অ” এবং “মৃত” ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। মৃতের বিপরীত অর্থে অমৃত হলো যা মৃত্যুর অধীন নয়। ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে অমৃত দেবতাদের অমরত্বদায়ক পানীয়ের প্রতীক। কিন্তু এখানে অমৃত কোনো বস্তুগত পানীয় নয়। কৃষ্ণের বাণীকে অমৃত বলা হয়েছে কারণ এই জ্ঞান মানুষের অজ্ঞতা, ভয় এবং সীমাবদ্ধতার বন্ধন অতিক্রম করার পথ দেখায়। যে জ্ঞান মানুষকে তার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন করে এবং জীবনের গভীর সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে, সেই জ্ঞান অমৃতস্বরূপ।
অর্জুনের কাছে কৃষ্ণের বাণী অমৃত হয়ে ওঠার কারণ এখানেই। সাধারণ আনন্দ ইন্দ্রিয়নির্ভর এবং ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আত্মজ্ঞান মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। মানুষ যখন নিজেকে কেবল দেহ, সামাজিক পরিচয়, সম্পদ, সাফল্য বা ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর চৈতন্যের অংশ হিসেবে দেখতে শেখে, তখন তার জীবনের অর্থও পরিবর্তিত হয়। কৃষ্ণের জ্ঞান তাই অর্জুনের কাছে শুধু তথ্য নয়। তা জীবনদৃষ্টির রূপান্তরকারী শক্তি।
এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য বিশেষভাবে গভীর। বেদান্তের দৃষ্টিতে মানুষের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন হলো সে আসলে কে। আমরা নিজেদের সাধারণত দেহ, মন, নাম, পরিচয়, সম্পর্ক ও সামাজিক ভূমিকার মাধ্যমে চিনে থাকি। কিন্তু গীতা মানুষকে তার গভীরতর সত্তার দিকে তাকাতে শেখায়। কৃষ্ণের যোগ ও বিভূতি সম্পর্কে জ্ঞান সেই অন্তর্দৃষ্টিকে আরও বিস্তৃত করে। মানুষ যখন জগতের অসংখ্য মহত্ত্বের মধ্যে একটি ঐশ্বরিক উৎসের প্রকাশ দেখতে শেখে, তখন তার দৃষ্টিতে বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে ঐক্যের অনুভূতি জন্মায়।
অদ্বৈত ভাবনার আলোকে এই শ্লোককে আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। অসংখ্য রূপের অন্তরালে যদি এক পরম সত্য থাকে, তাহলে বিশ্বজগতের বৈচিত্র্য সেই এক সত্যের প্রকাশমাত্র। বিভূতিগুলিকে তাই বহুর মধ্যে একের প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। মানুষের চেতনা যখন বিভিন্ন মহিমার মধ্যে একই ঐশ্বরিক উৎসের আভাস উপলব্ধি করে, তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি বাহ্যিক বৈচিত্র্য অতিক্রম করে অন্তর্নিহিত ঐক্যের দিকে এগিয়ে যায়।
ভক্তির দৃষ্টিতে শ্লোকটির অর্থ আরও হৃদয়স্পর্শী। ভক্তের কাছে ঈশ্বরের কথা শুনে তৃপ্তি না হওয়া প্রেমের লক্ষণ। যেমন প্রিয় মানুষের কথা যত শোনা যায় ততই আরও শুনতে ইচ্ছা করে, তেমনি ঈশ্বরের গুণ, মহিমা ও লীলার কথা ভক্তের কাছে অন্তহীন আনন্দের উৎস। এখানে জ্ঞান ও ভক্তির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বরং জ্ঞান যত গভীর হয়, ঈশ্বরের প্রতি আকর্ষণ তত গভীর হয়। অর্জুনের জিজ্ঞাসা তাই কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক নয়। এর মধ্যে গভীর ভক্তি রয়েছে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্জুন এমন জ্ঞানের সন্ধান করছেন যা বাইরের কোনো পুরস্কারের জন্য নয়। জ্ঞান নিজেই তাঁর কাছে আনন্দের উৎস। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে অন্তর্নিহিত প্রেরণার সঙ্গে তুলনা করা যায়। যে মানুষ সত্যিই কোনো বিষয়কে ভালোবাসে, তার শেখার আগ্রহ বাহ্যিক চাপের ওপর নির্ভর করে না। জ্ঞান যত বাড়ে, কৌতূহলও তত বাড়ে। অর্জুন সেই গভীর জ্ঞানপিপাসার প্রতীক।
এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অসাধারণ। “বিস্তরেণ” মানুষের দৃষ্টির প্রসারণের প্রতীক। “যোগ” বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ঐক্য উপলব্ধির প্রতীক। “বিভূতি” দৈনন্দিন জগতের মধ্যে অসাধারণ ও ঐশ্বরিককে শনাক্ত করার প্রতীক। “শ্রবণ” সত্য গ্রহণের প্রস্তুতির প্রতীক। “অমৃত” রূপান্তরকারী জ্ঞানের প্রতীক। আর “তৃপ্তি নেই” সত্যের অনুসন্ধানের অসীমতার প্রতীক। অর্থাৎ পুরো শ্লোকটি মানুষের অন্তর্জাগরণের একটি প্রতীকী মানচিত্রের মতো।
বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন শিক্ষার্থী যদি কোনো মহান শিক্ষকের কাছে মহাবিশ্ব, জীবন বা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর কোনো সত্য শুনতে শুরু করে, তাহলে প্রথম উত্তর তার কৌতূহলকে শেষ না করে আরও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। সে তখন বলে, আরও বলুন। এর কারণ সে উত্তর পায়নি এমন নয়। বরং উত্তর পাওয়ার ফলে তার প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে। অর্জুনের অবস্থাও তেমন। কৃষ্ণের কথা তাঁকে বিভ্রান্ত করছে না, বরং তাঁর চেতনার পরিধি প্রসারিত করছে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এই যে সত্যিকারের জ্ঞান মানুষের মধ্যে অহংকার বাড়ায় না, বরং বিস্ময় ও বিনয় বাড়ায়। যে মানুষ অল্প জ্ঞান অর্জন করে সে ভাবতে পারে যে সে অনেক কিছু জানে। কিন্তু সত্যের গভীরে প্রবেশ করলে মানুষ উপলব্ধি করে যে বাস্তবতা তার ধারণার চেয়ে অসীমভাবে বৃহৎ। তখন জিজ্ঞাসা আরও গভীর হয়। অর্জুনের “ভূয়ঃ” সেই বিনয়ী জিজ্ঞাসার প্রতীক।
“তৃপ্তির্হি শৃণ্বতো নাস্তি মে অমৃতম্” এই অংশটি বিশেষভাবে হৃদয়গ্রাহী। এখানে তৃপ্তিহীনতা কোনো অভাবের চিহ্ন নয়। এটি এমন এক আনন্দের প্রকাশ যার শেষ নেই। কৃষ্ণের বাণী অর্জুনের কাছে অমৃতস্বরূপ হওয়ায় তিনি যত শুনছেন ততই আরও শুনতে চাইছেন। অর্থাৎ সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক যত গভীর হয়, সত্যকে জানার আকাঙ্ক্ষাও তত গভীর হয়। এই তৃপ্তিহীনতাই আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসার প্রাণ।
সমগ্র শ্লোকটিকে একত্রে দেখলে একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক যাত্রা স্পষ্ট হয়। প্রথমে আসে বিস্তৃতভাবে জানার আকাঙ্ক্ষা। তারপর আসে নিজের স্বরূপ ও ঈশ্বরীয় যোগ বোঝার চেষ্টা। এরপর আসে জগতের মধ্যে ঐশ্বরিক বিভূতি শনাক্ত করার শিক্ষা। তারপর আসে শ্রদ্ধাপূর্ণ শ্রবণ। আর সেই শ্রবণ শেষ পর্যন্ত অমৃতের স্বাদ দেয়। এখানে জ্ঞান কোনো শুষ্ক তথ্য নয়। জ্ঞান হয়ে ওঠে অন্তরের খাদ্য এবং চেতনার রূপান্তরের মাধ্যম।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের এই শ্লোক তাই কেবল অর্জুনের একটি প্রশ্ন নয়। এটি একজন সত্যসন্ধানী মানুষের আদর্শ মানসিক অবস্থার প্রকাশ। যে মানুষ সত্যিই জানতে চায়, সে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করতে পারে। যে মানুষ সত্যকে ভালোবাসে, সে বারবার শুনতে পারে। যে মানুষ জগতের মধ্যে ঈশ্বরীয় প্রকাশ দেখতে শেখে, তার দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়। আর যে জ্ঞান মানুষের অন্তরকে রূপান্তরিত করে, সেই জ্ঞানই তার কাছে অমৃত হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, “বিস্তরেণাত্মনো যোগং বিভূতিং চ জনার্দন” শ্লোকটি মানুষের জ্ঞানপিপাসা, ঈশ্বরানুসন্ধান এবং অন্তর্দৃষ্টির এক অসাধারণ প্রকাশ। বিস্তরেণ আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত করতে শেখায়, আত্মনো আমাদের নিজের গভীরতর স্বরূপের দিকে ফিরিয়ে দেয়, যোগ আমাদের বহুর মধ্যে ঐক্য দেখতে শেখায়, বিভূতি আমাদের জগতের মহত্তম প্রকাশের মধ্যে ঈশ্বরীয় সৌন্দর্য অনুভব করতে শেখায়, শ্রবণ আমাদের সত্য গ্রহণের পথ খুলে দেয় এবং অমৃত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত জ্ঞান কেবল তথ্য দেয় না, জীবনকে রূপান্তরিত করে। অর্জুনের তৃপ্তিহীন শ্রবণ তাই আসলে অপূর্ণতার চিহ্ন নয়। এটি সত্যের প্রতি এমন এক গভীর আকর্ষণ যেখানে জ্ঞান যত গভীর হয়, অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা ততই বৃদ্ধি পায়। এই কারণেই শ্লোকটি আজও সত্যসন্ধানী মানুষের হৃদয়ে এক অনন্ত আহ্বান হয়ে ধ্বনিত হয়। সত্যকে জানো, আরও গভীরে যাও, মন দিয়ে শোনো এবং জগতের বহুরূপের মধ্যে সেই এক পরম সত্যের প্রকাশ উপলব্ধি করো। তাহলেই জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কের বিষয় থাকবে না, তা ধীরে ধীরে জীবনের অমৃত হয়ে উঠবে।
Make Your Business Online By The Best No—Code & No—Plugin Solution In The Market.
30 Day Money-Back Guarantee
Say goodbye to your low online sales rate!