শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.২০ — সকল জীবের অন্তরে পরমাত্মার অবস্থান ও সৃষ্টির আদি-মধ্য-অন্ত
অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ।
অহমাদিশ্চ মধ্যং চ ভূতানামন্ত এব চ।।২০।।
অনুবাদঃ হে গুড়াকেশ! আমিই সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থিত পরমাত্মা। আমিই সর্বভূতের আদি, মধ্য ও অন্ত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের বিংশতম শ্লোকটি পরমাত্মা, আত্মা এবং সমগ্র সৃষ্টির সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ককে এক অত্যন্ত গভীর ভাষায় প্রকাশ করেছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সম্বোধন করে বলেন, “অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ। অহমাদিশ্চ মধ্যং চ ভূতানামন্ত এব চ।” এর সরল অর্থ হলো, হে গুড়াকেশ, আমি সকল জীবের অন্তরে অবস্থিত আত্মা। আমিই সকল ভূতের আদি, মধ্য এবং অন্ত। এই ছোট্ট শ্লোকের মধ্যে ঈশ্বরের সর্বব্যাপিতা, অন্তর্যামিত্ব, আত্মতত্ত্ব, সৃষ্টি ও লয়ের রহস্য এবং জীবনের গভীর দার্শনিক অর্থ একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।
শ্লোকটির প্রথম শব্দ অহম্। সংস্কৃত অহম্ শব্দের অর্থ আমি। সাধারণ মানুষের ব্যবহারে আমি বলতে ব্যক্তিগত পরিচয়, ব্যক্তিত্ব অথবা নিজের অস্তিত্বকে বোঝায়। কিন্তু এই শ্লোকে অহম্ শব্দটি কোনো সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত অহংকারের প্রকাশ নয়। বক্তা এখানে শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর আমি বলতে বোঝানো হয়েছে পরম সত্তার আমি। সাধারণ মানুষের অহম্ নিজেকে দেহ, মন, পরিচয় ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে। কিন্তু কৃষ্ণের অহম্ সমস্ত জীব ও সমগ্র অস্তিত্বকে ধারণ করে। তাই এখানে অহম্ শব্দটি ব্যক্তিগত অহংকারের পরিবর্তে সর্বব্যাপী ঈশ্বরীয় সত্তার আত্মপ্রকাশ।
এরপর এসেছে আত্মা শব্দটি। সংস্কৃত আত্মা শব্দটি ভারতীয় দর্শনের অন্যতম গভীর ও বহুমাত্রিক শব্দ। আত্মন শব্দের অর্থ প্রসঙ্গভেদে নিজস্ব সত্তা, অন্তঃসত্তা, প্রাণ, চৈতন্য, স্বরূপ এবং আত্মা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বৈদিক ও উপনিষদীয় চিন্তার ধারায় শব্দটির অর্থ ক্রমে আরও গভীর হয়েছে। মানুষের বাহ্যিক শরীরের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত সত্তা তার অনুসন্ধান থেকেই আত্মা ধারণাটি বিকশিত হয়ে চৈতন্যস্বরূপ পরম বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হয়েছে। গীতার এই শ্লোকে আত্মা বলতে কেবল শরীরের প্রাণশক্তি বোঝানো হয়নি। এখানে আত্মা হলো সেই অন্তর্নিহিত চৈতন্যসত্তা যার উপস্থিতির কারণে জীব অভিজ্ঞতা লাভ করে, চিন্তা করে, অনুভব করে এবং নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়।
কৃষ্ণ যখন বলেন অহমাত্মা, তখন তিনি একটি গভীর সত্য প্রকাশ করছেন। তিনি বলছেন না যে তিনি কেবল কোনো একজন মানুষের আত্মা। তিনি বলছেন আমি সকল জীবের আত্মা। অর্থাৎ সমস্ত জীবের বাহ্যিক রূপ ভিন্ন হলেও তাদের অন্তর্নিহিত অস্তিত্বের গভীরে যে চৈতন্যের সত্য রয়েছে তার সঙ্গে পরম সত্তার গভীর সম্পর্ক আছে। এখানেই এই শ্লোক ব্যক্তিগত ধর্মীয় বক্তব্য থেকে সর্বজনীন দর্শনের স্তরে উন্নীত হয়েছে।
গুড়াকেশ শব্দটি অর্জুনের একটি বিশেষ সম্বোধন। প্রচলিত ব্যাখ্যায় গুড়াকেশ অর্থ যিনি নিদ্রাকে জয় করেছেন। এখানে নিদ্রা কেবল শারীরিক ঘুমের প্রতীক নয়। আধ্যাত্মিক অর্থে নিদ্রা অজ্ঞানতা, আত্মবিস্মৃতি এবং সত্য সম্পর্কে অচেতনতার প্রতীক হতে পারে। যে ব্যক্তি জাগতিক মোহের মধ্যে থেকেও সত্যকে জানতে চায় সে যেন আধ্যাত্মিক নিদ্রাকে জয় করার পথে এগিয়ে যায়। তাই কৃষ্ণ অর্জুনকে গুড়াকেশ বলে সম্বোধন করার মধ্যে একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। তিনি যেন বলছেন, হে জাগ্রত চেতনার অধিকারী, এখন সেই সত্যের কথা শোনো যা সাধারণ ইন্দ্রিয়বোধের অতীত।
এরপর এসেছে সর্বভূতাশয়স্থিতঃ শব্দটি। এটি একটি যৌগিক পদ। সর্ব অর্থ সকল বা সমস্ত। ভূত শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। তাই ভূত বলতে যা অস্তিত্ব লাভ করেছে সেই সমস্ত সত্তাকে বোঝানো যায়। প্রসঙ্গ অনুসারে এর অর্থ জীব, প্রাণী বা সমস্ত সৃষ্ট সত্তা হতে পারে। আশয় শব্দের অর্থ অন্তঃস্থল, আশ্রয়, অন্তর, মনের গভীর স্থান অথবা যেখানে কোনো কিছু অবস্থান করে। স্থিত শব্দটি স্থা ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ দাঁড়ানো, অবস্থান করা বা প্রতিষ্ঠিত থাকা। এই সব অংশ একত্র করলে সর্বভূতাশয়স্থিতঃ অর্থ দাঁড়ায় সকল জীবের অন্তঃস্থলে অবস্থিত।
এই অবস্থানকে কেবল স্থানগত অর্থে বোঝা উচিত নয়। কৃষ্ণ কোনো বস্তু হিসেবে মানুষের শরীরের ভিতরে অবস্থান করছেন এমন ধারণা এই শব্দের পূর্ণ দার্শনিক গভীরতা প্রকাশ করে না। এখানে অন্তঃস্থিত হওয়া মানে অস্তিত্বের গভীরতম ভিত্তি হিসেবে উপস্থিত থাকা। মানুষের চিন্তা পরিবর্তিত হয়, অনুভূতি পরিবর্তিত হয়, শরীর পরিবর্তিত হয়, পরিচয় পরিবর্তিত হয়, কিন্তু এই পরিবর্তনগুলিকে যে চেতনা প্রত্যক্ষ করে তার অনুসন্ধান মানুষকে আত্মতত্ত্বের দিকে নিয়ে যায়। কৃষ্ণ সেই অন্তর্নিহিত আত্মসত্তাকেই নিজের প্রকাশ হিসেবে নির্দেশ করছেন।
এরপর শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে আসে অহমাদিশ্চ মধ্যং চ ভূতানামন্ত এব চ। এখানে অহম্ শব্দটি আবার ব্যবহৃত হয়েছে। আমিই আদি, আমিই মধ্য এবং আমিই অন্ত। আদি শব্দের অর্থ শুরু, উৎস, উৎপত্তি বা প্রথম কারণ। মধ্য অর্থ মাঝ বা মধ্যবর্তী অবস্থা, তবে দার্শনিক অর্থে এটি কেবল মাঝখানের একটি বিন্দু নয়। এটি অস্তিত্বের প্রকাশ, স্থিতি এবং জীবনপ্রবাহকে নির্দেশ করে। অন্ত অর্থ শেষ, পরিণতি, সীমা বা লয়। এই তিনটি শব্দ একত্রে অস্তিত্বের একটি পূর্ণ চক্র নির্মাণ করে। জন্ম, জীবন এবং মৃত্যু যেমন মানবজীবনের তিনটি প্রধান পর্যায়, তেমনই সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয় সমগ্র জগতের একটি বৃহত্তর চক্রকে নির্দেশ করে।
কৃষ্ণ বলছেন যে এই তিন পর্যায়ের কোনোটিই তাঁর বাইরে নয়। তিনি কেবল সৃষ্টির শুরুতে নেই, কেবল জীবনের চলমান অবস্থায় নেই এবং কেবল শেষের মুহূর্তেও নেই। তিনি আদি, মধ্য এবং অন্ত। অর্থাৎ অস্তিত্বের সম্পূর্ণ গতিপথই তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বক্তব্য ঈশ্বরকে কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না। ঈশ্বর এখানে অস্তিত্বের সর্বাঙ্গীন ভিত্তি হিসেবে প্রকাশিত।
আদি, মধ্য ও অন্তের ধারণাটি মানবজীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি মানুষের জন্ম তার আদি, তার জীবনযাত্রা তার মধ্য এবং তার দেহের মৃত্যু তার অন্ত। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে দেহের অন্তকে আত্মার সম্পূর্ণ অন্ত হিসেবে দেখা হয় না। দেহ পরিবর্তনশীল এবং আত্মার প্রকৃতি সেই পরিবর্তনশীল দেহের তুলনায় গভীরতর। তাই এই শ্লোক মানুষের মৃত্যুচিন্তাকেও একটি বৃহত্তর আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে স্থাপন করে।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত দর্শনে আত্মা এবং ব্রহ্মের সম্পর্ককে পরম ঐক্যের দৃষ্টিতে দেখা হয়। সেই দৃষ্টিতে সকল জীবের অন্তর্নিহিত আত্মসত্তা শেষ পর্যন্ত এক পরম চৈতন্যের দিকে নির্দেশ করে। দেহের পার্থক্য, মনের পার্থক্য, ব্যক্তিত্বের পার্থক্য এবং সামাজিক পরিচয়ের পার্থক্যের গভীরে একটি মৌলিক চৈতন্যসত্তার ঐক্য উপলব্ধি করা যায়। সেই অর্থে কৃষ্ণের অহমাত্মা ঘোষণা ব্যক্তি ও পরম সত্তার গভীর সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে এই শ্লোককে অন্তর্যামী ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। ঈশ্বর সকল জীবের অন্তরে অবস্থান করেন এবং তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি ও নিয়ন্তা, কিন্তু জীবের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যও সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায় না। এখানে ঈশ্বর ও জীবের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। দ্বৈত দর্শনে আবার ঈশ্বর ও জীবকে পৃথক সত্তা হিসেবে দেখা হয়। সেই দৃষ্টিতে কৃষ্ণ সকল জীবের আত্মা বলার অর্থ হলো তিনি সকলের অন্তর্যামী, আশ্রয়দাতা, নিয়ন্তা এবং সর্বোচ্চ সত্তা। দর্শনের বিভিন্ন ধারায় ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় সাধারণভাবে স্পষ্ট যে এই শ্লোক ঈশ্বরের অন্তঃস্থিত উপস্থিতি ও সর্বব্যাপী সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
উপনিষদীয় চিন্তার সঙ্গেও এই শ্লোকের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। উপনিষদে অন্তর্যামী বা অন্তরে অবস্থানকারী সেই সত্তার কথা বলা হয়েছে যিনি সকলের মধ্যে থেকেও সাধারণ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা সহজে উপলব্ধ হন না। গীতার এই শ্লোকে কৃষ্ণ সেই অন্তর্নিহিত ঈশ্বরীয় উপস্থিতিকেই সরাসরি নিজের পরিচয় হিসেবে প্রকাশ করেছেন। ফলে গীতার আত্মতত্ত্বকে উপনিষদের আত্মতত্ত্বের একটি জীবন্ত ব্যাখ্যা হিসেবেও দেখা যায়।
এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী অর্থ হলো মানুষের অন্তর্গত আলো। মানুষ নিজের পরিচয়কে সাধারণত নাম, পরিবার, পেশা, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা, সাফল্য ও ব্যর্থতার মাধ্যমে নির্ধারণ করে। কিন্তু আত্মা এই সব পরিচয়ের নিচে থাকা গভীরতর সত্তার দিকে নির্দেশ করে। মানুষ যখন নিজেকে কেবল তার শরীর বা সামাজিক পরিচয় হিসেবে না দেখে নিজের চেতনার প্রকৃতি সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে শুরু করে তখন তার আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা হয়। এই অর্থে আত্মা মানুষের ভিতরের সেই আলো যা তাকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখায়।
আদি শব্দটি প্রতীকীভাবে সম্ভাবনার বীজকে নির্দেশ করতে পারে। যেমন একটি বিশাল বৃক্ষ একটি ক্ষুদ্র বীজের মধ্যে সম্ভাবনা হিসেবে উপস্থিত থাকে, তেমনি প্রতিটি প্রকাশের মধ্যে তার কোনো না কোনো সূচনা থাকে। মধ্য হলো সেই সম্ভাবনার প্রকাশ। একটি বীজ বৃক্ষে পরিণত হয়, একটি শিশু মানুষ হয়ে ওঠে এবং একটি চিন্তা কর্মে পরিণত হয়। আর অন্ত হলো সেই প্রকাশের পরিবর্তন বা পরিণতি। এই তিনটি পর্যায়কে আলাদা করে দেখা গেলেও তাদের মধ্যে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক রয়েছে। কৃষ্ণ এই সম্পূর্ণ ধারাবাহিকতার মধ্যেই নিজের উপস্থিতির কথা বলেছেন।
সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমা দিয়ে এই শ্লোকের অর্থ সহজে বোঝা যায়। সমুদ্রের অসংখ্য তরঙ্গ আছে। কোনো তরঙ্গ ছোট, কোনো তরঙ্গ বড়, কোনোটি দ্রুত সৃষ্টি হয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়। তরঙ্গের জন্ম আছে, তার চলমান অবস্থা আছে এবং তার বিলয় আছে। কিন্তু তরঙ্গের সমস্ত রূপান্তরের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা হলো জল। একইভাবে জীবের জন্ম, জীবন এবং মৃত্যু রয়েছে। বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু গীতার আত্মতত্ত্ব সেই গভীরতর সত্যের অনুসন্ধান করে যা পরিবর্তনের মধ্যেও মৌলিক অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে থাকে।
আরেকটি উপমা হতে পারে নাট্যমঞ্চের। নাটকের চরিত্রগুলো আসে, অভিনয় করে এবং একসময় মঞ্চ থেকে চলে যায়। তাদের পরিচয়, ভূমিকা ও অবস্থান পরিবর্তিত হয়। কিন্তু মঞ্চ তাদের আগমন, অবস্থান এবং প্রস্থানকে ধারণ করে। জীবনের ক্ষেত্রেও মানুষ বিভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ করে। কেউ সন্তান, কেউ পিতা, কেউ শিক্ষক, কেউ কর্মী, কেউ বন্ধু এবং কেউ নেতা। কিন্তু এই সব ভূমিকার নিচে একটি গভীরতর অস্তিত্বের প্রশ্ন থেকে যায়। আমি কে। গীতার আত্মতত্ত্ব সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে মানুষকে বাহ্যিক ভূমিকার গভীরে নিয়ে যায়।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের একটি মূল্যবান শিক্ষা রয়েছে। মানুষ প্রায়ই নিজের চিন্তা, আবেগ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ এক করে ফেলে। সে বলে আমি ব্যর্থ, আমি সফল, আমি দুঃখী, আমি অপমানিত। কিন্তু আত্মতত্ত্বের অনুসন্ধান প্রশ্ন করে যে যে চেতনা দুঃখকে লক্ষ্য করছে সে কি কেবল দুঃখ। যে ব্যক্তি নিজের চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে সে নিজের চিন্তা থেকে কিছুটা পৃথক হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই সাক্ষীভাব আত্মঅনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গীতার আত্মা ধারণাকে আধুনিক মনোবিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়, তবে আত্মপর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এই ভাবনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
মানবজীবনে এই শ্লোকের ব্যবহারিক শিক্ষা আরও গভীর। যদি আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি যে সকল জীবের অন্তরে একই পরম সত্যের উপস্থিতি রয়েছে, তাহলে অন্যকে অবজ্ঞা করা, ঘৃণা করা বা সম্পূর্ণ পর মনে করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই উপলব্ধি মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যের দুঃখকে তখন কেবল অন্যের দুঃখ বলে মনে হয় না। জীবনের বাহ্যিক পার্থক্যের আড়ালে একটি গভীরতর ঐক্য অনুভূত হয়। একই সঙ্গে এই শিক্ষা অহংকারও কমাতে পারে। কারণ নিজের সাফল্যকে তখন নিজের একান্ত সম্পত্তি হিসেবে না দেখে বৃহত্তর অস্তিত্বের ধারার একটি অংশ হিসেবে দেখা যায়।
এই শ্লোক মৃত্যু সম্পর্কেও একটি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। জন্ম ও মৃত্যু মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি। আমরা জন্মকে আগমন এবং মৃত্যুকে প্রস্থান হিসেবে দেখি। কিন্তু কৃষ্ণ যখন নিজেকে আদি, মধ্য এবং অন্ত হিসেবে প্রকাশ করেন তখন তিনি অস্তিত্বকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে শেখান। জীবনের একটি পর্যায়ের অন্ত মানেই সব অর্থের অন্ত নয়। পরিবর্তন অস্তিত্বের স্বাভাবিক ধর্ম। এই উপলব্ধি মানুষের মধ্যে জীবনের অনিত্যতা সম্পর্কে সচেতনতা এবং গভীর আধ্যাত্মিকতা সৃষ্টি করতে পারে।
শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। প্রথমে বলা হয়েছে অন্তরের কথা, তারপর বলা হয়েছে সমগ্র অস্তিত্বের কথা। প্রথম অংশে কৃষ্ণ অন্তরের আত্মা এবং দ্বিতীয় অংশে সমগ্র অস্তিত্বের আদি, মধ্য ও অন্ত। ফলে ব্যক্তি থেকে বিশ্ব এবং অন্তর থেকে মহাবিশ্বের দিকে একটি বিস্তৃত দার্শনিক গতি তৈরি হয়েছে। মানুষ নিজের অন্তরে যে সত্যকে অনুসন্ধান করে সেই অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত সমগ্র অস্তিত্বের প্রশ্নে পৌঁছে যায়। এই কারণে শ্লোকটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত এবং মহাজাগতিক।
সবচেয়ে গভীরভাবে দেখলে এই শ্লোক তিনটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়। আমি কে। ঈশ্বর কোথায়। এবং আমার সঙ্গে সমগ্র অস্তিত্বের সম্পর্ক কী। প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আসে আত্মা। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে আসে সর্বভূতাশয়স্থিতঃ। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে আসে আদি, মধ্য এবং অন্ত। অর্থাৎ ঈশ্বর কেবল দূরবর্তী কোনো সত্তা নন। তিনি সকল জীবের অন্তরে উপস্থিত এবং সমগ্র অস্তিত্বের শুরু, চলমানতা ও পরিণতির সঙ্গে যুক্ত।
অহমাত্মা গুড়াকেশ সর্বভূতাশয়স্থিতঃ এই শ্লোক তাই কেবল ঈশ্বরের মহিমা বর্ণনা করে না। এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের ধারণাকে গভীরভাবে পরিবর্তন করার আহ্বান জানায়। আমরা যদি নিজেকে কেবল শরীর, মন, সামাজিক পরিচয় এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি তবে নিজের অস্তিত্বের একটি ক্ষুদ্র অংশকেই দেখি। কিন্তু আত্মার অনুসন্ধান আমাদের সেই গভীরতর স্তরে নিয়ে যায় যেখানে চেতনা, অস্তিত্ব এবং পরম সত্যের প্রশ্ন এক হয়ে যায়। কৃষ্ণের ঘোষণা হলো তিনি সকলের অন্তরে সেই আত্মস্বরূপে অবস্থান করছেন এবং তিনিই সকল সত্তার আদি, মধ্য ও অন্ত।
এই শ্লোকের সারমর্ম তাই এমন যে মানুষের বাহ্যিক পরিচয় যতই পৃথক হোক, অস্তিত্বের গভীরে একটি মহান ঐক্যের অনুসন্ধান রয়েছে। জন্মের শুরু থেকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এবং শেষ পরিণতি পর্যন্ত একটি পরম সত্যের উপস্থিতি কাজ করে। আত্মা সেই অন্তর্নিহিত চৈতন্যের প্রতীক, সর্বভূতাশয়স্থিতঃ সেই চৈতন্যের সর্বজনীন অন্তঃস্থিতির ঘোষণা, আর আদি, মধ্য ও অন্ত সেই পরম সত্যের পূর্ণ অস্তিত্বব্যাপী প্রকাশের প্রতীক। এই উপলব্ধি মানুষকে নিজের ভিতরে তাকাতে শেখায়, অন্যের মধ্যে একই গভীর সত্যকে সম্মান করতে শেখায় এবং জীবন, মৃত্যু ও অস্তিত্বকে আরও বিস্তৃত ও শান্ত দৃষ্টিতে দেখতে সাহায্য করে। শেষ পর্যন্ত শ্লোকটি যেন আমাদের বলে, যে সত্যকে আমরা দূরে খুঁজছি সেই সত্যের অনুসন্ধান শুরু হতে পারে নিজের অন্তর থেকেই, কারণ পরম সত্তা কেবল বিশ্বজগতের বাইরে নন, তিনি সকল জীবের অন্তঃস্থিত আত্মস্বরূপেও বিরাজমান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!