শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.২৩ — রুদ্রদের মধ্যে শঙ্কর, বসুদের মধ্যে পাবক ও পর্বতশিখরের মধ্যে মেরু
রুদ্রাণাং শঙ্করশ্চাস্মি বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম্।
বসূনাং পাবকশ্চাস্মি মেরুঃ শিখরিণামহম্।।২৩।।
অনুবাদঃ রুদ্রদের মধ্যে আমি শিব, যক্ষ ও রাক্ষসদের মধ্যে আমি কুবের, বসুদের মধ্যে আমি অগ্নি এবং পর্বতসমূহের মধ্যে আমি সুমেরু।
ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের নাম বিভূতি যোগ। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাছে তাঁর ঐশ্বরিক বিভূতিগুলোর পরিচয় তুলে ধরেছেন। সমগ্র জগতে অসংখ্য রূপ, শক্তি, সৌন্দর্য, মহত্ত্ব ও বৈচিত্র্যের মধ্যে কীভাবে পরম সত্তার প্রকাশ উপলব্ধি করা যায়, তারই এক গভীর শিক্ষা এই অধ্যায়ে পাওয়া যায়। দশম অধ্যায়ের তেইশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেন, রুদ্রদের মধ্যে তিনি শঙ্কর, যক্ষ ও রাক্ষসদের মধ্যে তিনি বিত্তেশ, বসুদের মধ্যে তিনি পাবক এবং শিখরবিশিষ্ট পর্বতদের মধ্যে তিনি মেরু। এই বক্তব্যকে শুধু পৌরাণিক দেবদেবীর পরিচয় হিসেবে দেখলে শ্লোকটির গভীর দার্শনিক তাৎপর্য অপ্রকাশিত থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে এই শ্লোক মানুষের দৃষ্টিকে বাহ্যিক বৈচিত্র্যের সীমা অতিক্রম করে সেই এক পরম শক্তির দিকে নিয়ে যায়, যিনি সমস্ত মহিমার অন্তর্নিহিত উৎস।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ রুদ্রাণাম। রুদ্র শব্দটি সংস্কৃত রুদ্র থেকে এসেছে এবং ঐতিহ্যগতভাবে এর সঙ্গে রুদ ধাতুর সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। রুদ ধাতুর অর্থ ক্রন্দন করা বা আর্তনাদ করা। তবে রুদ্রের অর্থ কেবল ভয়ংকর বা ক্রন্দনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বৈদিক সাহিত্যে রুদ্র এক প্রবল ও শক্তিশালী দেবতা, যাঁর মধ্যে ধ্বংস ও আরোগ্য, ভয় ও কল্যাণ, কঠোরতা ও মঙ্গল একসঙ্গে বিদ্যমান। পরবর্তী ভারতীয় ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যে রুদ্র শিবতত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে ওঠেন। রুদ্রের এই দ্বৈত প্রকৃতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের দিকে নিয়ে যায়। জীবনের যে শক্তি একদিকে ধ্বংস করতে পারে, অন্যদিকে সেই শক্তিই পুরাতন ও অপ্রয়োজনীয়কে সরিয়ে নতুন সৃষ্টির পথ প্রস্তুত করতে পারে।
রুদ্রদের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে শঙ্কর হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শঙ্কর শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শম শব্দের সঙ্গে কর ভাবের সমন্বয়ে শঙ্কর শব্দের ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা করা হয়। শম অর্থ শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণ এবং কর অর্থ যিনি করেন বা সাধন করেন। সেই অর্থে শঙ্কর হলেন যিনি কল্যাণ সাধন করেন। এখানে রুদ্র ও শঙ্করের মধ্যে একটি গভীর অর্থগত সম্পর্ক দেখা যায়। রুদ্রের মধ্যে যে প্রবলতা ও ধ্বংসশক্তি রয়েছে, শঙ্করের মধ্যে সেই শক্তিই কল্যাণময় রূপ ধারণ করে। এর মধ্যে গীতার একটি গভীর জীবনদর্শন নিহিত আছে। সব ধ্বংস অমঙ্গল নয়। কখনও কখনও পুরাতনকে ভেঙে নতুনের জন্ম দিতে হয়। মানুষের অহংকার, অজ্ঞতা, আসক্তি ও ভুল অভ্যাসের ধ্বংসও তার আত্মোন্নতির কারণ হতে পারে। তাই শঙ্কর শুধু শিবের একটি নাম নয়, তিনি ধ্বংসাত্মক শক্তির কল্যাণময় রূপান্তরের প্রতীক।
শঙ্করশ্চাস্মি পদটির মধ্যেও গভীর ব্যাকরণগত ও দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে। শঙ্করঃ, চ এবং অস্মি এই তিনটি অংশ সন্ধির মাধ্যমে শঙ্করশ্চাস্মি রূপ ধারণ করেছে। চ অর্থ এবং। অস্মি এসেছে অস্ ধাতু থেকে, যার অর্থ হওয়া বা অস্তিত্বশীল থাকা। অস্মি অর্থ আমি আছি বা আমি। কিন্তু এখানে কৃষ্ণের আমি কোনো সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত অহংকারের প্রকাশ নয়। বিভূতি যোগের প্রেক্ষাপটে এই আমি সর্বব্যাপী পরম সত্তার আত্মপ্রকাশ। অর্থাৎ শঙ্করের মধ্যে যে মহত্ত্ব ও কল্যাণশক্তি প্রকাশিত হয়েছে, তার চূড়ান্ত উৎস সেই পরম সত্তা যাঁর কথা কৃষ্ণ বলছেন।
এরপর আসে বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম। বিত্তেশ শব্দটি বিত্ত এবং ঈশ এই দুই ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। বিত্ত অর্থ ধন, সম্পদ বা ঐশ্বর্য এবং ঈশ অর্থ অধিপতি বা প্রভু। তাই বিত্তেশ অর্থ সম্পদের অধিপতি। এখানে বিত্তেশ বলতে কুবেরকে বোঝানো হয়েছে। ভারতীয় ধর্মীয় ও পৌরাণিক ঐতিহ্যে কুবের যক্ষদের অধিপতি এবং ধনসম্পদের রক্ষক হিসেবে পরিচিত। যক্ষ ও রাক্ষস শব্দ দুটি ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যে অতিমানবীয় সত্তার বিভিন্ন রূপকে নির্দেশ করে। যক্ষদের সঙ্গে প্রকৃতি, গুপ্ত সম্পদ ও ঐশ্বর্যের সম্পর্ক রয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের মধ্যে বিত্তেশকে নিজের বিভূতি হিসেবে উল্লেখ করার মধ্যে সম্পদের শক্তি এবং তার উপর নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
বিত্তেশের প্রতীকী অর্থ কেবল ধনসম্পদ অর্জন নয়। বরং সম্পদের প্রকৃত মূল্য তখনই যখন মানুষ সম্পদের অধিপতি হতে পারে এবং সম্পদের দাসে পরিণত হয় না। অর্থ জীবনের প্রয়োজনীয় শক্তি হতে পারে, কিন্তু অর্থের প্রতি অন্ধ আসক্তি মানুষের স্বাধীনতাকে নষ্ট করতে পারে। কুবেরের প্রতীকের মধ্যে তাই ঐশ্বর্য এবং ঐশ্বর্যের উপর নিয়ন্ত্রণ দুইটিই নিহিত। একজন মানুষ কত সম্পদ অর্জন করেছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করছে। সম্পদ যদি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তবে তা বিভূতির প্রকাশ হতে পারে। কিন্তু সম্পদ যদি অহংকার, লোভ ও আসক্তির কারণ হয়ে ওঠে, তবে তা মানুষের অন্তর্গত স্বাধীনতাকে দুর্বল করে।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন বসূনাং পাবকশ্চাস্মি। বসু শব্দটি সংস্কৃত বসু থেকে এসেছে এবং বৈদিক ও পৌরাণিক সাহিত্যে বসুরা একটি দেবগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। বসু শব্দের মধ্যে অস্তিত্ব, মূল্যবানতা ও ঐশ্বর্যের নানা অর্থগত প্রতিধ্বনি রয়েছে। এই বসুদের মধ্যে কৃষ্ণ নিজেকে পাবক হিসেবে প্রকাশ করেছেন। পাবক শব্দের অর্থ পরিশোধনকারী বা শুদ্ধকারী। অগ্নির একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম পাবক। অগ্নি বস্তু পোড়ায়, কিন্তু শুধু ধ্বংস করে না। অগ্নি রূপান্তর করে, পরিশুদ্ধ করে এবং নতুন রূপের জন্মের পথ তৈরি করে। এই কারণেই অগ্নি ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
পাবক হিসেবে অগ্নির তাৎপর্য মানবজীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গভীর। মানুষের অন্তরে নানা ধরনের অশুদ্ধতা জমে থাকে। অহংকার, হিংসা, লোভ, ভয়, অতিরিক্ত আসক্তি এবং অজ্ঞতা মানুষের চেতনার স্বচ্ছতাকে আচ্ছন্ন করে। যেমন অগ্নি ধাতুকে পরিশুদ্ধ করে, তেমনই জ্ঞান, সাধনা, আত্মসংযম ও সত্যনিষ্ঠা মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করতে পারে। তাই পাবক কেবল বাহ্যিক আগুনের প্রতীক নয়। তিনি অন্তরের সেই রূপান্তরকারী শক্তির প্রতীক, যা মানুষের দুর্বলতাকে পুড়িয়ে তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রকাশ করে।
শ্লোকের শেষ অংশ মেরুঃ শিখরিণামহম্ অত্যন্ত চমৎকার একটি মহাজাগতিক প্রতীক বহন করে। মেরু ভারতীয় প্রাচীন বিশ্বচিন্তায় একটি মহাপর্বত, যাকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রীয় অক্ষ ও স্থিতির প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। শিখর শব্দের অর্থ চূড়া বা শীর্ষ। শিখরিণ শব্দটি সেই সত্তাকে বোঝায় যার শিখর রয়েছে। শিখরিণাম অর্থ শিখরবিশিষ্টদের মধ্যে। কৃষ্ণ বলেন, শিখরবিশিষ্ট পর্বতসমূহের মধ্যে তিনি মেরু। এখানে মেরু কেবল একটি পৌরাণিক পর্বত নয়। এটি মহত্ত্ব, উচ্চতা, স্থিরতা, কেন্দ্র এবং ঊর্ধ্বগমনের প্রতীক।
একটি পর্বতের দিকে তাকালে মানুষের চোখ স্বাভাবিকভাবেই তার চূড়ার দিকে ওঠে। ভূমি থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে উচ্চতর হয়ে পর্বত শিখরে পৌঁছায়। মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনও অনেকটা তেমন। অজ্ঞতা থেকে জ্ঞান, অস্থিরতা থেকে স্থিরতা, আসক্তি থেকে স্বাধীনতা এবং সীমাবদ্ধতা থেকে বিস্তৃত চেতনার দিকে মানুষের যাত্রা একটি ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বগামী পথ। এই দৃষ্টিতে মেরু মানুষের অন্তরের সেই অটল কেন্দ্রের প্রতীক, যা জীবনের পরিবর্তন ও ঝড়ের মধ্যেও স্থির থাকে।
এই চারটি বিভূতিকে একসঙ্গে দেখলে শ্লোকটির একটি গভীর অন্তর্নিহিত জীবনদর্শন প্রকাশিত হয়। শঙ্কর আমাদের শেখান ধ্বংসাত্মক শক্তিকে কল্যাণে রূপান্তর করতে। বিত্তেশ শেখান সম্পদের উপর অধিকার রাখতে এবং সম্পদের দাস না হতে। পাবক শেখান অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে। মেরু শেখান জীবনের পরিবর্তনশীলতার মধ্যে একটি অটল কেন্দ্র খুঁজে নিতে। অর্থাৎ শ্লোকটির চারটি প্রতীক মানুষের আত্মোন্নতির চারটি স্তরের মতো কাজ করতে পারে। প্রথমে নিজের অশুভ ও অপ্রয়োজনীয় প্রবৃত্তিকে রূপান্তর করতে হবে। তারপর বাহ্যিক সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে। এরপর অন্তরকে শুদ্ধ করতে হবে। সবশেষে নিজের চেতনার কেন্দ্রে এমন একটি স্থিরতা অর্জন করতে হবে যা বাহ্যিক পরিস্থিতির দ্বারা সহজে বিচলিত হয় না।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো একত্বের উপলব্ধি। জগতে অসংখ্য নাম, রূপ ও শক্তি রয়েছে। শঙ্কর এক ধরনের শক্তির প্রকাশ, কুবের অন্য ধরনের শক্তির প্রকাশ, অগ্নি আরেক ধরনের শক্তির প্রকাশ এবং মেরু সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মহিমার প্রকাশ। কিন্তু কৃষ্ণ প্রত্যেকটির মধ্যে নিজের উপস্থিতি ঘোষণা করছেন। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি পৃথক বস্তুই তার সীমাবদ্ধ রূপে পরম সত্যের সম্পূর্ণতা। বরং তাদের মধ্যে যে অসাধারণ গুণ, শক্তি ও মহত্ত্ব প্রকাশিত হয়, সেই মহত্ত্বের পরম উৎস এক। এই দৃষ্টিভঙ্গি বহুত্বের মধ্যে ঐক্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
অদ্বৈত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জগতের অসংখ্য নাম ও রূপের অন্তরালে এক পরম চৈতন্যের উপস্থিতি রয়েছে। ভক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জগতের প্রতিটি অসাধারণ প্রকাশ ঈশ্বরস্মরণের একটি সুযোগ। যোগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই বিভূতিগুলো ধ্যানের প্রতীক হতে পারে। একজন সাধক অগ্নির দিকে তাকিয়ে শুদ্ধির কথা স্মরণ করতে পারেন, পর্বতের দিকে তাকিয়ে স্থিরতার কথা স্মরণ করতে পারেন, মহত্ত্বের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরের কথা স্মরণ করতে পারেন। এইভাবে বাহ্যিক জগত আত্মোপলব্ধির পথ হয়ে ওঠে।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষের মধ্যে প্রবল আবেগ ও ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি থাকে। শঙ্করের প্রতীক সেই শক্তিকে সৃজনশীল ও কল্যাণকর পথে রূপান্তরের শিক্ষা দেয়। মানুষের মধ্যে সম্পদের আকাঙ্ক্ষা থাকে। বিত্তেশ সেই আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল করার শিক্ষা দেয়। মানুষের অন্তরে নানা অশুদ্ধতা থাকে। পাবক সেই অশুদ্ধতার পরিশোধনের প্রতীক। আবার মানুষের মন নানা পরিস্থিতিতে অস্থির হয়ে ওঠে। মেরু তাকে নিজের অন্তরের স্থির কেন্দ্র খুঁজে নিতে শেখায়।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতে শ্লোকটির গঠনও অত্যন্ত অর্থবহ। প্রথমে রুদ্রদের মধ্যে শঙ্কর, তারপর যক্ষ ও রাক্ষসদের মধ্যে বিত্তেশ, এরপর বসুদের মধ্যে পাবক এবং শেষে শিখরবিশিষ্ট পর্বতদের মধ্যে মেরু। এই ক্রমে শ্লোকটি দেবীয় শক্তি থেকে ঐশ্বর্য, ঐশ্বর্য থেকে অগ্নির রূপান্তরশক্তি এবং সেখান থেকে মহাজাগতিক উচ্চতা ও স্থিরতার দিকে অগ্রসর হয়। ফলে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত শব্দের মধ্যেই একটি বিস্তৃত মহাবিশ্বের ছবি ফুটে ওঠে।
বাস্তব জীবনে এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত সহজভাবে প্রয়োগ করা যায়। জীবনে যখন কোনো পুরোনো অভ্যাস ভাঙতে হয়, তখন শঙ্করের কথা মনে করা যায়। যখন অর্থ বা ক্ষমতা অর্জিত হয়, তখন বিত্তেশের কথা মনে করে বোঝা যায় যে সম্পদের উপর অধিকারই প্রকৃত ঐশ্বর্য। যখন নিজের দুর্বলতা ও নেতিবাচক প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রাম করতে হয়, তখন পাবকের অগ্নিকে অন্তরের শুদ্ধির প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা যায়। আর যখন জীবনের নানা সমস্যা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মন অস্থির হয়ে ওঠে, তখন মেরুর মতো স্থির থাকার কথা স্মরণ করা যায়।
এই শ্লোকের একটি সুন্দর উপমা হতে পারে সূর্যের আলো এবং অসংখ্য জানালা। একটি বিশাল ভবনের শত শত জানালা দিয়ে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে। প্রতিটি জানালায় আলো ভিন্নভাবে দেখা গেলেও আলোর উৎস একই। তেমনই জগতে শক্তি, সৌন্দর্য, সম্পদ, স্থিরতা ও মহত্ত্ব নানা রূপে প্রকাশিত হলেও তাদের অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক উৎস এক। বিভূতি যোগ মানুষকে এই বহুর মধ্যে এককে উপলব্ধি করতে শেখায়।
অতএব রুদ্রাণাং শঙ্করশ্চাস্মি কেবল শঙ্করকে ঈশ্বরের একটি নাম হিসেবে স্মরণ করার বক্তব্য নয়। এটি ধ্বংস ও কল্যাণের সম্পর্ক বোঝার শিক্ষা। বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম সম্পদের শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহারের শিক্ষা। বসূনাং পাবকশ্চাস্মি আত্মশুদ্ধি ও রূপান্তরের শিক্ষা। মেরুঃ শিখরিণামহম্ জীবনের সমস্ত অস্থিরতার মধ্যে স্থির ও উচ্চ আদর্শ ধরে রাখার শিক্ষা। চারটি প্রতীককে একত্রে দেখলে মানুষের সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মোন্নতির পথ উন্মোচিত হয়।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের বাহ্যিক জগতকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। যে চোখ শুধু বস্তু দেখে সে পর্বতে কেবল পাথর দেখে, আগুনে কেবল তাপ দেখে, সম্পদে কেবল অর্থ দেখে এবং ধ্বংসে কেবল ক্ষতি দেখে। কিন্তু বিভূতির দৃষ্টি মহত্ত্বের অন্তর্নিহিত উৎসকে দেখতে শেখে। সে পর্বতে স্থিরতা দেখে, অগ্নিতে শুদ্ধি দেখে, সম্পদে দায়িত্ব দেখে এবং ধ্বংসের মধ্যেও নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখতে শেখে। এই দৃষ্টির পরিবর্তনই বিভূতি যোগের গভীরতম শিক্ষা।
সুতরাং রুদ্রাণাং শঙ্করশ্চাস্মি বিত্তেশো যক্ষরক্ষসাম বসূনাং পাবকশ্চাস্মি মেরুঃ শিখরিণামহম এই শ্লোকের সারমর্ম হলো জগতের অসংখ্য বৈচিত্র্যের মধ্যে যে মহত্ত্ব, শক্তি, কল্যাণ, শুদ্ধি ও স্থিরতা প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে পরম সত্তার উপস্থিতি অনুভব করা। শঙ্কর আমাদের কল্যাণের শক্তি শেখান, বিত্তেশ আমাদের সম্পদের উপর সংযম শেখান, পাবক আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করার শিক্ষা দেন এবং মেরু আমাদের স্থিরতা ও উচ্চতার আদর্শ দেন। এই চারটি প্রতীক মিলিয়ে শ্লোকটি যেন মানুষের উদ্দেশে এক গভীর আহ্বান জানায়। নিজের ধ্বংসাত্মক শক্তিকে কল্যাণে রূপান্তর করো, সম্পদের উপর অধিকার রাখো, অন্তরকে অগ্নির মতো শুদ্ধ করো এবং মেরুর মতো নিজের সত্যের কেন্দ্রে স্থির থাকো। তখন জগত আর বিচ্ছিন্ন বস্তুর সমষ্টি বলে মনে হবে না। তখন তার প্রতিটি মহৎ প্রকাশের মধ্যে একই পরম সত্যের আলো অনুভব করা সম্ভব হবে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!