শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.২৭ — অশ্বদের মধ্যে উচ্চৈঃশ্রবা, গজদের মধ্যে ঐরাবত ও মানুষের মধ্যে নরাধিপ
উচ্ছৈঃশ্রবসমশ্বানাং বিদ্ধি মামমৃতোদ্ভবম্।
ঐরাবতং গেজেন্দ্রাণাং নরাণাং চ নরাধিপম্।।২৭।।
অনুবাদঃ অশ্বদের মধ্যে আমাকে সমুদ্র-মন্থনের সময় উদ্ভত উচ্চৈঃশ্রবা বলে জানবে। শ্রেষ্ঠ হস্তীদের মধ্যে আমি ঐরাবত এবং মনুণ্যদের মধ্যে আমি সম্রাট।
ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতি যোগের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ শ্লোক হলো “উচ্চৈঃশ্রবসমশ্বানাং বিদ্ধি মামমৃতোদ্ভবম্। ঐরাবতং গজেন্দ্রাণাং নরাণাং চ নরাধিপম্।” এই শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝাচ্ছেন যে জগতের শ্রেষ্ঠত্ব, সৌন্দর্য, শক্তি, মহিমা ও নেতৃত্বের মধ্যে তাঁরই ঐশ্বরিক প্রকাশ বিদ্যমান। এখানে তিনি অশ্বদের মধ্যে উচ্চৈঃশ্রবা, গজদের মধ্যে ঐরাবত এবং মানুষের মধ্যে নরাধিপকে নিজের বিভূতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাহ্যিকভাবে এটি তিনটি শ্রেষ্ঠ সত্তার পরিচয় হলেও গভীরভাবে বিচার করলে এটি মানুষের চিন্তা, শক্তি, নেতৃত্ব এবং ঈশ্বরচেতনার একটি অসাধারণ দার্শনিক ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে।
“উচ্চৈঃশ্রবস্” শব্দটি এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ। উচ্চৈঃশ্রবা হলো পৌরাণিক সেই দিব্য অশ্ব, যার আবির্ভাব ক্ষীরসমুদ্র মন্থনের সময় ঘটেছিল বলে পুরাণে বর্ণিত হয়েছে। শব্দটির মধ্যে “উচ্চৈঃ” এবং “শ্রবস্” এই দুই ভাবের সম্পর্ক রয়েছে। উচ্চৈঃ অর্থ উচ্চভাবে বা ঊর্ধ্বে এবং শ্রবস্ শব্দের সঙ্গে শ্রবণ ও যশের ধারণা যুক্ত। ফলে ভাবগতভাবে উচ্চৈঃশ্রবা বলতে এমন এক সত্তাকে বোঝানো যায় যার খ্যাতি অত্যন্ত উচ্চ এবং যার মহিমা সর্বত্র প্রতিধ্বনিত। তাই উচ্চৈঃশ্রবা কেবল একটি পৌরাণিক ঘোড়ার নাম নয়। এটি উৎকর্ষ, গতি, শক্তি, সৌন্দর্য এবং মহিমার প্রতীক।
“অশ্বানাম্” শব্দের অর্থ অশ্বদের মধ্যে। সংস্কৃত সংস্কৃতিতে অশ্ব কেবল একটি প্রাণী নয়। বৈদিক যুগ থেকেই অশ্ব গতি, শক্তি, প্রাণশক্তি, বিজয়, রাজকীয় ক্ষমতা এবং অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অশ্ব দ্রুত এগিয়ে চলে এবং তাকে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হয়। এই কারণে উচ্চৈঃশ্রবা মানুষের জীবনের সেই শক্তির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে যা তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষের ইচ্ছা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং কর্মশক্তিও এক অর্থে অশ্বের মতো। এগুলোকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মানুষ উন্নতির দিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন হলে সেই একই শক্তি তাকে বিপথেও নিয়ে যেতে পারে।
শ্লোকে উচ্চৈঃশ্রবার সঙ্গে “অমৃতোদ্ভবম্” শব্দটি যুক্ত হয়েছে। অমৃত শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো যা মৃত নয়, অর্থাৎ মৃত্যুহীন বা অমর। অমৃত শব্দটি সংস্কৃত “মৃত” শব্দের সঙ্গে নিষেধাত্মক “অ” উপসর্গের সংযোগে গঠিত। অন্যদিকে উদ্ভব শব্দটি উদ্ এবং ভূ ধাতুর ভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। উদ্ অর্থ উপরে বা বাইরে এবং ভূ অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা জন্ম নেওয়া। সেই অর্থে অমৃতোদ্ভব বলতে অমৃত থেকে উদ্ভূত বা অমৃতের সঙ্গে সম্পর্কিত উৎপত্তিকে বোঝায়। পৌরাণিক কাহিনিতে উচ্চৈঃশ্রবার আবির্ভাব সমুদ্র মন্থনের সঙ্গে যুক্ত। দেবতা ও অসুরেরা অমৃত লাভের উদ্দেশ্যে ক্ষীরসমুদ্র মন্থন করেছিলেন এবং সেই মন্থন থেকে বহু দিব্য বস্তু ও সত্তার আবির্ভাব ঘটে। উচ্চৈঃশ্রবা সেই অলৌকিক আবির্ভাবের অন্যতম প্রতীক।
এই প্রসঙ্গে অমৃতের ধারণাটি অত্যন্ত গভীর। মানুষের বাহ্যিক জীবন মৃত্যুর অধীন হলেও তার অন্তরে অমরত্বের একটি আকাঙ্ক্ষা সবসময় কাজ করে। মানুষ জ্ঞান সৃষ্টি করতে চায়, কর্মের মাধ্যমে স্মরণীয় হতে চায়, ভালোবাসার মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে দীর্ঘায়িত করতে চায়। কিন্তু গীতার আধ্যাত্মিক দর্শন আমাদের আরও গভীর সত্যের দিকে নিয়ে যায়। আত্মা নশ্বর দেহের মতো নয়। তাই অমৃতের প্রকৃত অর্থ কেবল কোনো পৌরাণিক পানীয় নয়, বরং মৃত্যুকে অতিক্রমকারী চেতনার প্রতীক। উচ্চৈঃশ্রবার অমৃতোদ্ভব হওয়া তাই বাহ্যিক পৌরাণিক পরিচয়ের পাশাপাশি আধ্যাত্মিকভাবে এমন এক শক্তির প্রতীক হতে পারে যার উৎস নশ্বরতার ঊর্ধ্বে।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন “বিদ্ধি মাম্”। বিদ্ধি শব্দের মূল ধাতু হলো বিদ্, যার অর্থ জানা বা জ্ঞান লাভ করা। বিদ্ধি অর্থ জানো, উপলব্ধি করো বা জেনে রাখো। এই শব্দটি শ্লোকটির অন্যতম গভীরতম অংশ। কৃষ্ণ কেবল অর্জুনকে কোনো পৌরাণিক তথ্য দিচ্ছেন না। তিনি তাকে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি শেখাচ্ছেন। তিনি বলছেন, যখন তুমি কোনো অসাধারণ সৌন্দর্য, শক্তি বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখবে তখন সেটিকে শুধু বাহ্যিক বস্তু হিসেবে দেখো না। তার মধ্যে যে মহিমা প্রকাশিত হয়েছে তার উৎসের দিকে দৃষ্টি দাও। অর্থাৎ উচ্চৈঃশ্রবাকে দেখে কৃষ্ণকে স্মরণ করা হলো বিভূতি যোগের সাধনা।
এরপর আসে “ঐরাবতং গজেন্দ্রাণাম্”। ঐরাবত হলো দেবরাজ ইন্দ্রের বিখ্যাত দিব্য হাতি। পুরাণীয় ঐতিহ্যে ঐরাবতও সমুদ্র মন্থনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সে বিশাল, শক্তিশালী, শুভ্র এবং রাজকীয় মহিমার অধিকারী। “গজেন্দ্র” শব্দটি গজ এবং ইন্দ্র এই দুই ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে ইন্দ্র শব্দটি শ্রেষ্ঠ বা প্রধান অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে। তাই গজেন্দ্র বলতে গজদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বা প্রধানকে বোঝায়। কৃষ্ণ বলছেন যে গজদের মধ্যে ঐরাবত তাঁরই বিভূতি। এর মাধ্যমে তিনি শক্তি ও মহিমার একটি উচ্চতর রূপকে নির্দেশ করছেন।
অশ্ব এবং গজের প্রতীকের মধ্যেও একটি সুন্দর পার্থক্য রয়েছে। অশ্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গতি এবং গজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্থিতিশীল শক্তি। অশ্ব দ্রুত এগিয়ে যায়, আর হাতি তার বিশালতা ও দৃঢ়তার মাধ্যমে শক্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। মানুষের জীবনেও এই দুটি শক্তির প্রয়োজন। শুধু দ্রুত এগিয়ে যাওয়া যথেষ্ট নয়, নিজের অবস্থানকে দৃঢ় রাখার ক্ষমতাও প্রয়োজন। উচ্চৈঃশ্রবা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয় এবং ঐরাবত আমাদের স্থির ও সুসংহত শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
শ্লোকের শেষ অংশ হলো “নরাণাং চ নরাধিপম্”। নর অর্থ মানুষ এবং নরাধিপ অর্থ মানুষের অধিপতি বা রাজা। অধিপ শব্দের মধ্যে অধিকার, পরিচালনা এবং রক্ষার ধারণা নিহিত রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তায় আদর্শ রাজা কেবল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রজার রক্ষক, ন্যায়ের ধারক এবং সামাজিক শৃঙ্খলার রক্ষক। তাই নরাধিপ শব্দটিকে শুধু শাসক হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। এর গভীরে নেতৃত্ব, দায়িত্ব, সংযম, ন্যায় এবং সুরক্ষার ধারণা রয়েছে।
এই কারণে শ্লোকটির তিনটি প্রতীককে পাশাপাশি রাখলে একটি সুন্দর দার্শনিক ক্রম দেখা যায়। উচ্চৈঃশ্রবা প্রতিনিধিত্ব করে গতি ও অগ্রগতিকে। ঐরাবত প্রতিনিধিত্ব করে শক্তি ও স্থিতিকে। নরাধিপ প্রতিনিধিত্ব করে নেতৃত্ব ও দায়িত্বকে। অর্থাৎ মানুষের জীবনে শুধু শক্তি থাকা যথেষ্ট নয়। সেই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ক্ষমতাও থাকতে হবে। একজন মানুষ দ্রুত এগোতে পারে, শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে যদি নৈতিক নেতৃত্ব ও বিবেক না থাকে তবে সেই গতি ও শক্তি ধ্বংসের কারণও হতে পারে।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। পরম ব্রহ্ম সর্বত্র বিরাজমান হলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে সর্বত্র সেই এক সত্যকে উপলব্ধি করা কঠিন। তাই জগতের বিশেষ মহিমাময় প্রকাশগুলোকে ধ্যানের সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করা যায়। যখন কেউ প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য দেখে বিস্মিত হয়, কোনো মহান প্রতিভার সামনে শ্রদ্ধায় নত হয় অথবা কোনো মহৎ নেতৃত্ব দেখে অনুপ্রাণিত হয়, তখন সেই বিস্ময়কে পরম সত্যের দিকে পরিচালিত করা যায়। বিভূতি যোগ মানুষের দৃষ্টিকে বাহ্যিক বস্তু থেকে তার অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক উৎসের দিকে ফিরিয়ে দেয়।
ভক্তির দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বরকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জগতের শ্রেষ্ঠ ও মহৎ প্রকাশের মধ্যে অনুভব করতে শেখানো হয়েছে। কোনো অসাধারণ শিল্পকর্ম, প্রকৃতির বিশাল সৌন্দর্য, কোনো মহান ব্যক্তির চরিত্র, কোনো মানুষের অসাধারণ প্রতিভা অথবা কোনো ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্ব আমাদের ঈশ্বরস্মরণের কারণ হতে পারে। এই দৃষ্টিতে সমগ্র জগৎ একটি বিশাল আধ্যাত্মিক বিদ্যালয় হয়ে ওঠে, যেখানে প্রতিটি মহৎ জিনিস আমাদের পরম সত্যের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির গভীর অর্থ রয়েছে। মানুষের মন একটি দ্রুতগামী অশ্বের মতো। চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, আবেগ এবং কল্পনা এক মুহূর্তে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে যায়। আবার মানুষের মধ্যে হাতির মতো বিশাল শক্তিও রয়েছে। ধৈর্য, সহনশীলতা, আত্মসংযম এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থির থাকার ক্ষমতা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির প্রকাশ। কিন্তু এই দুই শক্তিকে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজন নরাধিপের মতো অন্তর্নিহিত নেতৃত্ব। অর্থাৎ নিজের মনকে পরিচালনা করা, নিজের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিজের জীবনের সিদ্ধান্তকে ন্যায় ও বিবেকের দ্বারা পরিচালিত করাই প্রকৃত আত্মনেতৃত্ব।
এই অর্থে উচ্চৈঃশ্রবা আমাদের জিজ্ঞাসা করে আমরা কোথায় যেতে চাই। ঐরাবত আমাদের শেখায় আমরা কত দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। আর নরাধিপ আমাদের জিজ্ঞাসা করে আমরা নিজেদের শক্তি কীভাবে ব্যবহার করব। মানুষের পূর্ণ জীবন তাই কেবল গতি নয়, কেবল শক্তি নয় এবং কেবল ক্ষমতাও নয়। মানুষের প্রকৃত উৎকর্ষ হলো সঠিক লক্ষ্য, সংযত শক্তি এবং নৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়।
বাস্তব জীবনেও এই শিক্ষার অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন অসাধারণ ক্রীড়াবিদ তার গতি ও দক্ষতার মাধ্যমে উচ্চৈঃশ্রবার প্রতীক হতে পারেন। একজন ধৈর্যশীল ও শক্তিশালী ব্যক্তি ঐরাবতের প্রতীকী গুণ ধারণ করতে পারেন। আর একজন ন্যায়পরায়ণ নেতা নরাধিপের প্রকৃত তাৎপর্য প্রকাশ করতে পারেন। তবে গীতার শিক্ষা হলো এই গুণগুলো নিয়ে অহংকার না করে এগুলোকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বিভূতি হিসেবে দেখা। মানুষ যখন বলে “আমি অসাধারণ”, তখন অহংকার জন্ম নিতে পারে। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে “আমার মধ্যে যে অসাধারণ শক্তি প্রকাশিত হয়েছে তার উৎস আমার ব্যক্তিগত অহংকারের ঊর্ধ্বে”, তখন সেই শক্তি বিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই শ্লোকের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক। নরাধিপ শব্দটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নেতৃত্ব মানে অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা নয়। প্রকৃত নেতৃত্ব হলো অন্যদের রক্ষা করা, সঠিক পথে পরিচালনা করা এবং নিজের ক্ষমতাকে বৃহত্তর কল্যাণে ব্যবহার করা। আধুনিক জীবনে একজন রাষ্ট্রনেতা, শিক্ষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসক, পরিবারের কর্তা অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক যার হাতেই ক্ষমতা থাকুক না কেন, তার কাছে এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ যে সে তার ক্ষমতা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে নাকি অন্যদের কল্যাণে।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে অশ্বের মধ্যে উচ্চৈঃশ্রবা, পরে গজের মধ্যে ঐরাবত এবং শেষে মানুষের মধ্যে নরাধিপের উল্লেখের মাধ্যমে একটি সুসংহত ভাবধারা তৈরি হয়েছে। এখানে গতি থেকে শক্তি এবং শক্তি থেকে নেতৃত্বের দিকে একটি মানসিক অগ্রসরতা অনুভূত হয়। শ্লোকটি তাই কেবল পৌরাণিক নামের সমষ্টি নয়। এটি প্রকৃতির শক্তি থেকে মানবসমাজের নৈতিক শক্তির দিকে চিন্তার একটি যাত্রা।
সবশেষে বলা যায়, “উচ্চৈঃশ্রবসমশ্বানাং বিদ্ধি মামমৃতোদ্ভবম্” শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জগতের শ্রেষ্ঠত্বকে কেবল বাহ্যিক বিস্ময় হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায় না। উচ্চৈঃশ্রবা আমাদের গতি ও উচ্চতার কথা মনে করিয়ে দেয়। অমৃতোদ্ভব আমাদের নশ্বরতার অন্তরালে অমৃত সত্যের সন্ধান করতে শেখায়। ঐরাবত আমাদের শক্তি, স্থিরতা ও মহিমার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আর নরাধিপ আমাদের শেখায় যে প্রকৃত ক্ষমতা দায়িত্ব ও ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। “বিদ্ধি মাম্” এই সমস্ত ভাবকে একত্র করে আমাদের দৃষ্টিকে বাহ্যিক জগত থেকে অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক সত্যের দিকে ফিরিয়ে দেয়। তাই এই শ্লোকের সারমর্ম হলো, যেখানে কোনো গুণ তার সর্বোচ্চ মহিমায় প্রকাশিত হয়, সেখানে সেই মহিমার মধ্যে পরম সত্তার উপস্থিতি অনুভব করতে শেখা। জীবনের গতি যেন উচ্চৈঃশ্রবার মতো উন্নতির দিকে যায়, শক্তি যেন ঐরাবতের মতো স্থির ও সংযত হয় এবং নেতৃত্ব যেন নরাধিপের মতো ন্যায়, দায়িত্ব ও কল্যাণের দ্বারা পরিচালিত হয়। এই উপলব্ধিই বিভূতি যোগের গভীরতম সৌন্দর্য।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!