সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.৩ — অজন্মা, অনাদি ও লোকমহেশ্বর হিসেবে শ্রীকৃষ্ণের পরম স্বরূপ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
যো মামজমনাদিং চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্।অসংমূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।।৩।।
যো মামজমনাদিং চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্।
অসংমূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।।৩।।

অনুবাদঃ যিনি আমাকে জন্মরহিত, অনাদি ও সমস্ত গ্রহলোকের মহেশ্বর বলে জানেন, তিনিই কেবল মানুষদের মধ্যে মোহশূন্য হয়ে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন।

ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের তৃতীয় শ্লোকের ভাবার্থে যে গভীর ঈশ্বরতত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো “যো মামজমনাদিং চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্”। শ্লোকটির পূর্ণ সংস্কৃত পাঠ হলো “यो मामजमनादिं च वेत्ति लोकमहेश्वरम् । असम्मूढः स मर्त्येषु सर्वपापैः प्रमुच्यते ॥”। এর সরল অর্থ হলো, যে ব্যক্তি ভগবানকে অজন্মা, অনাদি এবং সমগ্র জগতের মহেশ্বর হিসেবে সত্যরূপে জানে, সে মানুষের মধ্যে থেকেও মোহমুক্ত হয় এবং সমস্ত পাপবন্ধন থেকে মুক্তিলাভ করে। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে ঈশ্বরের স্বরূপ, মানুষের অজ্ঞতা, জ্ঞানলাভ, মোহমুক্তি এবং মুক্তির একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক দর্শন নিহিত রয়েছে।

“যো” শব্দের অর্থ যিনি বা যে ব্যক্তি। “মাম্” শব্দের অর্থ আমাকে এবং এখানে শ্রীকৃষ্ণ নিজেকেই নির্দেশ করেছেন। কিন্তু গীতার দর্শনে কৃষ্ণের এই “আমি” কেবল একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের পরিচয় নয়। বিভিন্ন বেদান্তীয় ব্যাখ্যায় এই “আমি” পরম ঈশ্বর, পরম চৈতন্য অথবা সর্বব্যাপী পরম সত্যের প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যাত হয়েছে। তাই এখানে কৃষ্ণকে জানা বলতে শুধু তাঁর জীবনী, ব্যক্তিত্ব বা ঐতিহাসিক পরিচয় জানা বোঝায় না। বরং তাঁর প্রকৃত আধ্যাত্মিক স্বরূপ উপলব্ধি করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

“অজম্” শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “অজ” থেকে। এর সঙ্গে জন্মের ধারণা সম্পর্কিত। “জন্” ধাতুর অর্থ জন্ম নেওয়া বা উৎপন্ন হওয়া। তার সঙ্গে নিষেধসূচক “অ” যুক্ত হলে “অজ” অর্থ দাঁড়ায় যাঁর জন্ম নেই বা যিনি জন্মহীন। সাধারণ জীব জন্মগ্রহণ করে, বৃদ্ধি পায়, পরিবর্তিত হয় এবং একসময় মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু কৃষ্ণ নিজেকে “অজ” বলছেন। এর দ্বারা বোঝানো হচ্ছে যে পরম ঈশ্বর সাধারণ জীবের মতো কোনো পূর্ববর্তী কারণ থেকে জন্মগ্রহণ করেন না। তিনি সৃষ্টির নিয়মের অধীন কোনো সীমাবদ্ধ সত্তা নন। বরং তিনি সেই পরম সত্য যার ওপর সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের রহস্য নির্ভর করে।

এর পরেই এসেছে “অনাদিম্” শব্দটি। “আদি” অর্থ শুরু, উৎস বা প্রারম্ভ এবং তার আগে নিষেধসূচক “অ” যুক্ত হয়ে “অনাদি” অর্থ হয়েছে যার কোনো আদি নেই, যার কোনো প্রথম মুহূর্ত নেই। “অজ” এবং “অনাদি” শব্দ দুটি পরস্পরের কাছাকাছি হলেও তাদের তাৎপর্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। “অজ” বিশেষভাবে জন্মহীনতার কথা বলে এবং “অনাদি” অস্তিত্বের শুরুহীনতার কথা প্রকাশ করে। অর্থাৎ কৃষ্ণ শুধু জন্মগ্রহণ করেন না এমন নন, তাঁর অস্তিত্বের কোনো প্রথম সূচনাও নেই। তিনি সময়ের মধ্যে শুরু হওয়া কোনো সত্তা নন। তিনি সময়ের সীমাকেও অতিক্রম করে থাকা পরম বাস্তবতার প্রতীক।

“চ” শব্দের অর্থ এবং। এই ছোট শব্দটি “অজ”, “অনাদি” এবং “লোকমহেশ্বর” এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে একত্রিত করেছে। ফলে কৃষ্ণের পরিচয় এখানে তিনটি স্তরে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জন্মহীন, তিনি অনাদি এবং তিনি সমগ্র জগতের মহেশ্বর। এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একত্রে ঈশ্বরের সর্বোচ্চত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা নির্মাণ করে।

“বেত্তি” শব্দটির অর্থ জানে বা উপলব্ধি করে। এটি জ্ঞান বা বিদ্যার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই শব্দটি শ্লোকটির দার্শনিক গভীরতার একটি প্রধান চাবিকাঠি। কৃষ্ণ বলেননি যে যে ব্যক্তি শুধু আমাকে বিশ্বাস করে সে মুক্ত হবে। তিনি বলেছেন যে ব্যক্তি আমাকে সত্যরূপে জানে, সে মুক্ত হয়। এখানে জানা বলতে সাধারণ তথ্যগত জ্ঞান বোঝানো হয় না। কোনো ব্যক্তি কৃষ্ণের নাম, জন্মস্থান, বংশপরিচয় কিংবা জীবনের ঘটনাবলি জানলেও এই জ্ঞান তাকে আধ্যাত্মিকভাবে মুক্ত নাও করতে পারে। এখানে জ্ঞান বলতে সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি, ঈশ্বরের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি এবং নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে সেই সত্যের সম্পর্ক উপলব্ধি করাকে বোঝানো হয়েছে।

“লোকমহেশ্বরম্” পদটি শ্লোকটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যৌগিক শব্দ। এটি “লোক”, “মহা” এবং “ঈশ্বর” ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। “লোক” অর্থ জগৎ, জীবসমষ্টি বা অস্তিত্বের ক্ষেত্র। “মহা” অর্থ মহান, বিশাল বা সর্বোচ্চ। “ঈশ্বর” শব্দের মধ্যে অধিকার, নিয়ন্ত্রণ এবং শাসনের ধারণা রয়েছে। ফলে “লোকমহেশ্বর” অর্থ দাঁড়ায় সমস্ত জগতের মহান অধীশ্বর। এখানে ঈশ্বরকে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থান, জাতি বা সম্প্রদায়ের দেবতা হিসেবে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। তাঁকে সমগ্র অস্তিত্বের পরম নিয়ন্তা ও অধীশ্বর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই কারণে “লোকমহেশ্বর” শব্দটির মধ্যে একটি সর্বজনীন ঈশ্বরতত্ত্ব প্রকাশিত হয়। পৃথিবী, মানুষ, প্রকৃতি, দেবতা এবং দৃশ্যমান ও অদৃশ্য অস্তিত্বের বিভিন্ন স্তর সবকিছুর অন্তরালে যে পরম নিয়ামক সত্য রয়েছে, “লোকমহেশ্বর” সেই সত্যের প্রতীক। এখানে ঈশ্বরের মহত্ত্ব কেবল তাঁর শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মহত্ত্ব নিহিত রয়েছে তাঁর সর্বব্যাপীতা, সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এবং সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে।

শ্লোকটির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “অসংমূঢ়ঃ”। এর অর্থ যিনি মোহমুক্ত, বিভ্রান্তিহীন বা সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতার আবরণ থেকে মুক্ত। “মূঢ়” অর্থ অজ্ঞ, বিভ্রান্ত বা মোহগ্রস্ত। তার সঙ্গে “অ” যুক্ত হয়ে হয়েছে “অমূঢ়” বা এখানে “অসংমূঢ়” অর্থ সম্পূর্ণভাবে বিভ্রান্ত নন। গীতার ভাষায় মোহ কেবল কোনো ব্যক্তির প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ নয়। মোহ হলো বাস্তবতা সম্পর্কে ভুল ধারণা। যা অনিত্য তাকে নিত্য মনে করা, যা পরিবর্তনশীল তাকে স্থায়ী মনে করা এবং দেহ, সম্পদ, সামাজিক পরিচয় কিংবা পার্থিব অবস্থাকেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় বলে মনে করা মোহের বিভিন্ন রূপ।

মানুষ সাধারণত নিজেকে তার দেহ, পেশা, সম্পদ, সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদা কিংবা সাফল্যের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে এক করে দেখে। সে মনে করে তার চাকরি হারানো মানেই তার অস্তিত্বের মূল্য হারানো, সম্পদ হারানো মানেই জীবনের অর্থ হারানো অথবা সামাজিক সম্মান হারানো মানেই নিজের পরিচয় হারানো। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এগুলো মানুষের পরিবর্তনশীল জীবনের বিভিন্ন ভূমিকা মাত্র। এগুলো আত্মার চূড়ান্ত পরিচয় নয়। যে ব্যক্তি এই পার্থক্য বুঝতে পারে, সে ধীরে ধীরে “অসংমূঢ়” হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সে পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যে থেকেও অপরিবর্তনীয় সত্যের সন্ধান করতে শেখে।

“মর্ত্যেষু” শব্দটি মর্ত্য শব্দ থেকে এসেছে। মর্ত্য অর্থ যে মৃত্যুর অধীন। অর্থাৎ মানুষ বা মরণশীল জীব। “মর্ত্যেষু” অর্থ মর্ত্যদের মধ্যে বা মানুষের মধ্যে। এই শব্দটি শ্লোকে একটি গভীর বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। একদিকে কৃষ্ণ অজ এবং অনাদি। অন্যদিকে মানুষ মর্ত্য। একদিকে চিরন্তন সত্য এবং অন্যদিকে জন্মমৃত্যুর অধীন জীব। এই মর্ত্য মানুষ যখন অমর্ত্য পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে, তখন তার নিজের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হয়।

এরপর এসেছে “সর্বপাপৈঃ”। “সর্ব” অর্থ সমস্ত এবং “পাপ” অর্থ অধর্ম, অন্যায় বা এমন কর্ম ও প্রবৃত্তি যা মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে বন্ধনের মধ্যে আবদ্ধ করে। গীতার দৃষ্টিতে পাপকে শুধু সামাজিক অপরাধ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। অজ্ঞতা, অহংকার, লোভ, আসক্তি, বিদ্বেষ এবং স্বার্থপরতা মানুষের চেতনাকে সংকুচিত করে। এগুলো তাকে নিজের প্রকৃত স্বরূপ থেকে দূরে নিয়ে যায়। তাই “সর্বপাপ” বলতে বাহ্যিক অন্যায়ের পাশাপাশি অন্তর্গত বন্ধনের কথাও বোঝা যায়।

“প্রমুচ্যতে” শব্দটি এসেছে মুক্তির ধারণা থেকে। এর মূল অর্থ বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া, ছেড়ে দেওয়া বা নিষ্কৃতি লাভ করা। এখানে “প্রমুচ্যতে” দ্বারা সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই মুক্তি কেবল শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়া নয়। এটি গভীর অর্থে কর্মবন্ধন, অজ্ঞতা, মোহ এবং অহংকার থেকে মুক্তি। মানুষ যখন সত্যকে উপলব্ধি করে, তখন তার কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়, নিজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয় এবং জগতের সঙ্গে সম্পর্কও পরিবর্তিত হয়। এই অন্তর্গত রূপান্তরই মুক্তির দিকে নিয়ে যায়।

এই শ্লোকের দার্শনিক গভীরতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় যখন “অজ”, “অনাদি” এবং “লোকমহেশ্বর” এই তিনটি শব্দকে একত্রে দেখা হয়। “অজ” জন্মের সীমাকে অতিক্রম করে, “অনাদি” সময়ের সীমাকে অতিক্রম করে এবং “লোকমহেশ্বর” জগতের সীমাকে অতিক্রম করে পরম কর্তৃত্বের ধারণা প্রকাশ করে। অর্থাৎ কৃষ্ণকে এমন এক পরম সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যিনি জন্ম, সময় এবং জগতের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ নন।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই বক্তব্যকে ব্রহ্মতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা যায়। পরম সত্য কোনো সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত অস্তিত্ব নয়, বরং সর্বব্যাপী চৈতন্যের প্রকাশ। অন্যদিকে ভক্তিমূলক এবং দ্বৈত ও বিশিষ্টাদ্বৈত ধারায় কৃষ্ণকে স্বতন্ত্র ও সর্বোচ্চ ঈশ্বর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দর্শনের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একটি মৌলিক সত্য তাদের মধ্যে সাধারণ। পরম ঈশ্বর সাধারণ জন্মমৃত্যুর নিয়মের অধীন কোনো সীমাবদ্ধ জীব নন এবং তাঁকে সত্যরূপে উপলব্ধি করা মানুষের চেতনায় গভীর পরিবর্তন আনে।

এই শ্লোকের মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। মানুষের দুঃখের একটি বড় কারণ হলো নিজের পরিবর্তনশীল পরিচয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত আসক্তি। মানুষ ভাবে সে তার সম্পদ, সে তার চাকরি, সে তার সামাজিক মর্যাদা, সে তার ব্যর্থতা অথবা সে অন্য মানুষের মতামত। কিন্তু এগুলো সবই পরিবর্তনশীল। যে মানুষ বুঝতে শেখে যে তার জীবনের কোনো একটি ভূমিকা তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়, তার মধ্যে এক ধরনের অন্তর্গত স্বাধীনতা জন্মায়। এই স্বাধীনতাই “অসংমূঢ়” অবস্থার আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সঙ্গে তুলনীয়।

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। একজন মানুষ চাকরি হারাল। যদি সে মনে করে তার চাকরিই তার সম্পূর্ণ পরিচয়, তাহলে চাকরি হারানোর সঙ্গে তার আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয়ও ভেঙে পড়বে। কিন্তু যদি সে বুঝতে পারে যে চাকরি তার জীবনের একটি ভূমিকা মাত্র, তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নয়, তাহলে সে পরিস্থিতিকে অন্যভাবে গ্রহণ করতে পারবে। একইভাবে সম্পদ, সম্পর্ক, সামাজিক সম্মান এবং বাহ্যিক সাফল্য মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোর কোনোটি তার চূড়ান্ত পরিচয় নয়। গীতার জ্ঞান মানুষকে এই পার্থক্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

এই শ্লোকের একটি সুন্দর প্রতীকী অর্থও রয়েছে। “অজ” চিরন্তন অস্তিত্বের প্রতীক, “অনাদি” সময়ের অতীত সত্যের প্রতীক, “লোকমহেশ্বর” সর্বজনীন নিয়ন্ত্রণ ও ঐক্যের প্রতীক, “অসংমূঢ়” জাগ্রত চেতনার প্রতীক এবং “প্রমুচ্যতে” বন্ধন থেকে মুক্তির প্রতীক। তাই পুরো শ্লোকটিকে মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি প্রতীকী রূপ হিসেবেও দেখা যায়। প্রথমে মানুষ সত্যকে জানতে শেখে, তারপর তার মোহ দূর হয় এবং শেষ পর্যন্ত সে বন্ধন থেকে মুক্তির পথে অগ্রসর হয়।

এই কারণে শ্লোকটির শিক্ষা আধুনিক জীবনেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। আজকের মানুষ অর্থ, সাফল্য, সামাজিক মর্যাদা, পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু গীতার এই শিক্ষা মনে করিয়ে দেয় যে পরিবর্তনশীল জগতের কোনো কিছুকেই নিজের চূড়ান্ত পরিচয় বানানো উচিত নয়। সম্পদ আসবে এবং চলে যাবে, শরীর পরিবর্তিত হবে, সম্পর্কের রূপ বদলাবে, সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হবে এবং জীবনের পরিস্থিতিও ক্রমাগত পরিবর্তিত হবে। কিন্তু সত্যের অনুসন্ধান মানুষের মধ্যে এমন একটি অন্তর্গত কেন্দ্র তৈরি করতে পারে যা এই পরিবর্তনের মধ্যেও স্থিরতা ও অর্থের অনুভূতি দেয়।

সবশেষে বলা যায়, “যো মামজমনাদিং চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্” কেবল কৃষ্ণের মহিমা ঘোষণা করে না, বরং মানুষের আত্মিক জাগরণের একটি গভীর সূত্র প্রদান করে। এখানে কৃষ্ণকে অজ, অনাদি এবং লোকমহেশ্বর হিসেবে জানার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই জ্ঞান মানুষকে মূঢ়তা থেকে অসংমূঢ়তার দিকে নিয়ে যায়। যখন মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে তার প্রকৃত পরিচয় কেবল পরিবর্তনশীল দেহ, সম্পদ, সম্পর্ক বা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তখন তার ভয়, অহংকার এবং আসক্তির প্রকৃতিও পরিবর্তিত হতে থাকে। সেই পরিবর্তিত চেতনাই তাকে পাপ ও কর্মবন্ধনের ঊর্ধ্বে ওঠার পথে নিয়ে যায়। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো পরম সত্যকে জানা মানে শুধু ঈশ্বর সম্পর্কে একটি ধারণা অর্জন করা নয়। পরম সত্যকে সত্যরূপে জানা মানে নিজের অস্তিত্বকেও নতুন আলোয় দেখা। সেই জ্ঞান মোহকে দূর করে, মোহ দূর হলে বন্ধন শিথিল হয় এবং বন্ধন শিথিল হলে মানুষ মুক্তির দিকে অগ্রসর হয়। এইভাবেই অজ, অনাদি এবং লোকমহেশ্বর কৃষ্ণতত্ত্বের উপলব্ধি মানুষের অন্তরে জ্ঞান, স্থিরতা, ভক্তি এবং মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 19, 2026 August 19, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি