শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.৩১ — শোধনকারীদের মধ্যে পবন, অস্ত্রধারীদের মধ্যে রাম, ঋষিদের মধ্যে মকর ও স্রোতস্বিনীদের মধ্যে জাহ্নবী
পবনঃ পবতামস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্।
ঋষাণাং মকরশ্চাস্মি স্রোতসামস্মি জাহ্নবী।।৩১।।
অনুবাদঃ পবিত্রকারী বস্তুদের মধ্যে আমি বায়ু, শস্ত্রধারীদের মধ্যে আমি পরশুরাম, মৎস্যদের মধ্যে আমি মকর এবং নদীসমূহের মধ্যে আমি গঙ্গা।
ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের নাম বিভূতি যোগ। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কাছে তাঁর অসীম ঐশ্বরিক প্রকাশের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে পরম সত্যকে কেবল কোনো নির্দিষ্ট স্থান, মন্দির, প্রতিমা বা আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। জগতের যে সমস্ত বস্তু, শক্তি, গুণ ও মহিমা মানুষের কাছে সর্বোৎকৃষ্ট বলে প্রতিভাত হয়, সেগুলোর মধ্যেও সেই পরম ঐশ্বরিক সত্তার প্রকাশ উপলব্ধি করা যায়। দশম অধ্যায়ের একত্রিশতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “পবনঃ পবতামস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্। ঋষীণাং মকরশ্চাস্মি স্রোতসামস্মি জাহ্নবী।” অর্থাৎ শোধনকারীদের মধ্যে আমি পবন, অস্ত্রধারীদের মধ্যে আমি রাম, ঋষিদের মধ্যে আমি মকর এবং প্রবাহমান স্রোতসমূহের মধ্যে আমি জাহ্নবী। এই শ্লোকটি বাহ্যত কয়েকটি শ্রেষ্ঠ সত্তার পরিচয় দিলেও গভীরভাবে বিচার করলে এর মধ্যে শুদ্ধি, শক্তি, জ্ঞান, গভীরতা, প্রবাহ এবং মুক্তির এক বিস্ময়কর দার্শনিক সমন্বয় দেখতে পাওয়া যায়।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো পবন। সংস্কৃত পবন শব্দের সঙ্গে শুদ্ধি বা পরিশুদ্ধ করার ভাবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সংস্কৃত √পূ ধাতুর অর্থ শুদ্ধ করা বা পবিত্র করা। এই ধাতুগত ভাবের সঙ্গে পবন শব্দের অর্থগত সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। প্রচলিত অর্থে পবন হলো বায়ু বা বাতাস। কিন্তু বায়ুর এই সরল অর্থের মধ্যেও একটি গভীর প্রতীকী তাৎপর্য নিহিত আছে। বাতাস নিজে অদৃশ্য হলেও তার কার্যকলাপ দৃশ্যমান। সে স্থবিরতা দূর করে, পরিবেশকে সচল করে এবং জীবনের জন্য অপরিহার্য প্রাণপ্রবাহ বহন করে। তাই পবনকে কেবল বাতাস হিসেবে দেখলে শব্দটির সম্পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়ে না। পবন হলো এমন এক শক্তির প্রতীক যা অশুদ্ধতা, স্থবিরতা ও জড়তা দূর করে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। এই কারণেই কৃষ্ণ শোধনকারীদের মধ্যে পবনকে নিজের বিভূতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মানুষের অন্তর্জগতেও পবনের একটি গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে। মানুষের মনে যখন অহংকার, ক্রোধ, হিংসা, ভয়, আসক্তি ও অজ্ঞতার আবর্জনা জমে যায়, তখন তার চেতনা ভারী হয়ে পড়ে। যেমন বদ্ধ ঘরে বিশুদ্ধ বাতাস প্রবেশ করলে পরিবেশ সতেজ হয়ে ওঠে, তেমনি সত্যজ্ঞান, আত্মবিশ্লেষণ, সাধনা এবং বিবেকের আলো মানুষের অন্তরকে শুদ্ধ করতে পারে। এই অর্থে পবন বাহ্যিক বায়ুর পাশাপাশি অন্তরের পরিশুদ্ধির প্রতীক। কৃষ্ণের বক্তব্য যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আধ্যাত্মিক জীবনের প্রথম প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি। মন যতক্ষণ অশান্তি ও অশুদ্ধতায় আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ উচ্চতর সত্য উপলব্ধি করা কঠিন।
এরপর আসে রাম শব্দটি। সংস্কৃত রাম শব্দের সঙ্গে √রম্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। রম্ ধাতুর অর্থ আনন্দ করা, আনন্দ লাভ করা, ক্রীড়া করা বা আনন্দদায়ক হওয়া। এই অর্থ থেকে রাম নামের মধ্যে আনন্দের আধার বা যাঁর মধ্যে মন রমণ করে এমন এক ভাব নিহিত আছে। কিন্তু ভগবদ্গীতার এই শ্লোকে রামকে বিশেষভাবে অস্ত্রধারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিভূতি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানে রাম কেবল আনন্দের প্রতীক নন। তিনি ন্যায়, ধর্ম, আত্মসংযম, কর্তব্যবোধ, সত্যনিষ্ঠা এবং নৈতিক শক্তিরও প্রতীক।
শ্লোকে ব্যবহৃত শস্ত্রভৃতাম শব্দটির অর্থ অস্ত্রধারীদের। শস্ত্র অর্থ অস্ত্র এবং ভৃত শব্দের সঙ্গে ধারণ বা বহনের ভাব যুক্ত। ফলে শস্ত্রভৃত বলতে বোঝায় যিনি অস্ত্র ধারণ করেন। কিন্তু কৃষ্ণ কেন অস্ত্রধারীদের মধ্যে রামকে উল্লেখ করছেন, তার মধ্যে গভীর নৈতিক শিক্ষা রয়েছে। অস্ত্র নিজে ভালো বা মন্দ নয়। শক্তিও নিজে পবিত্র বা অপবিত্র নয়। শক্তির ব্যবহার কী উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে তার ওপর তার নৈতিক মূল্য নির্ভর করে। যে শক্তি অন্যায়, অত্যাচার ও স্বার্থপরতার জন্য ব্যবহৃত হয় তা ধ্বংসাত্মক। কিন্তু যে শক্তি দুর্বলকে রক্ষা করে, অন্যায় প্রতিহত করে এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেই শক্তি মহৎ। রামের মধ্যে এই নিয়ন্ত্রিত ও নৈতিক শক্তির আদর্শ দেখা যায়। তাই রাম এখানে শুধু একজন মহাকাব্যিক নায়ক নন, বরং শক্তির সঠিক ব্যবহারের একটি চিরন্তন আদর্শ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে রামের বিভূতি মানুষের ব্যক্তিজীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন মানুষের জ্ঞান থাকতে পারে, সম্পদ থাকতে পারে, ক্ষমতা থাকতে পারে, সামাজিক প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু যদি সে নিজের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে সেই শক্তি তার নিজের এবং অন্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। প্রকৃত শক্তি হলো সেই শক্তি যা আত্মসংযমের অধীন। যে ব্যক্তি রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ক্ষমতা পাওয়ার পরও অহংকারী হয় না এবং নিজের সামর্থ্যকে ন্যায়ের জন্য ব্যবহার করে, তার মধ্যে রামের প্রতীকী শক্তি প্রকাশ পায়।
এরপর শ্লোকে আসে ঋষীণাং এবং মকর শব্দ দুটি। ঋষি শব্দটি ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋষি কেবল একজন সাধু বা সন্ন্যাসী নন। ঋষি হলেন সত্যদ্রষ্টা। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির মাধ্যমে সত্যকে প্রত্যক্ষ করেছেন। ভারতীয় ঐতিহ্যে ঋষিদের সঙ্গে মন্ত্রদর্শন, জ্ঞান, তপস্যা, অন্তর্দৃষ্টি এবং সত্য উপলব্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এখানে দেখা যায় যে কৃষ্ণের বিভূতি ধারণা কেবল বাহ্যিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত ঐশ্বরিক মহিমা অন্তর্দৃষ্টি ও জ্ঞানের মধ্যেও প্রকাশিত হয়।
মকর শব্দটি ভারতীয় ঐতিহ্যে একটি বিশেষ জলজ প্রাণী বা পৌরাণিক জলচর সত্তাকে নির্দেশ করে। বিভিন্ন প্রাচীন সাহিত্যে মকরের রূপ ও পরিচয়ে বৈচিত্র্য দেখা যায়। কোথাও এটি কুমিরসদৃশ জলজ প্রাণী হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে, আবার কোথাও এটি বৃহৎ ও রহস্যময় জলজ শক্তির প্রতীক। এই কারণে মকরকে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর নাম হিসেবে দেখার পরিবর্তে জলজ জগতের গভীর ও শক্তিশালী সত্তার প্রতীক হিসেবেও বোঝা যায়। জলের গভীরতা যেমন মানুষের চোখের অগোচরে অসংখ্য রহস্য ধারণ করে, তেমনি মানুষের অন্তর্জগতেও এমন অনেক শক্তি ও সত্য রয়েছে যা বাহ্যিক দৃষ্টিতে সহজে ধরা পড়ে না।
মকরের এই প্রতীকী অর্থ মানুষের মনস্তত্ত্বের সঙ্গেও যুক্ত করা যায়। মানুষের চেতনার একটি দৃশ্যমান অংশ আছে এবং একটি গভীর অদৃশ্য স্তরও আছে। সেখানে স্মৃতি, প্রবৃত্তি, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং সুপ্ত শক্তি অবস্থান করে। জলের গভীরে থাকা মকর সেই অদৃশ্য ও গভীর শক্তির প্রতীক হতে পারে। মানুষ যদি নিজের অন্তর্জগতের গভীরে প্রবেশ করতে শেখে, তবে সে নিজের প্রকৃত শক্তি, দুর্বলতা ও আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে পারে। এই আত্মজ্ঞান তাকে আরও পরিণত করে।
শ্লোকটির শেষ অংশে আসে স্রোতসামস্মি জাহ্নবী। স্রোতস শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত √স্রু ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। স্রু অর্থ প্রবাহিত হওয়া বা বয়ে যাওয়া। স্রোতস অর্থ তাই প্রবাহ, জলধারা, স্রোত বা চলমান ধারা। এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ভারতীয় দর্শনে প্রবাহের ধারণা জীবনের একটি গভীর প্রতীক। কোনো নদী একই জায়গায় একই জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না। জল ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়, কিন্তু নদীর পরিচয় অটুট থাকে। মানুষের জীবনও তেমন। শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য, সম্পর্ক, চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়, কিন্তু জীবন তার নিজস্ব প্রবাহ বজায় রাখে।
জাহ্নবী হলো গঙ্গার একটি প্রসিদ্ধ নাম। জাহ্নু ঋষির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে গঙ্গাকে জাহ্নবী বলা হয়। ভারতীয় পুরাণীয় ঐতিহ্যে গঙ্গার সঙ্গে জাহ্নু ঋষির একটি বিখ্যাত কাহিনি যুক্ত আছে। এই কাহিনির মাধ্যমে গঙ্গা শুধু একটি নদী হিসেবে নয়, বরং একটি পবিত্র ও ঐশ্বরিক প্রবাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গঙ্গার বহু নামের প্রত্যেকটির মধ্যে তার একটি বিশেষ পরিচয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য প্রকাশিত হয়। জাহ্নবী নামটি সেই পুরাণীয় সম্পর্ক ও পবিত্রতার স্মারক।
গঙ্গা ভারতীয় সংস্কৃতিতে শুদ্ধি, করুণা, অবতরণ, ধারাবাহিকতা এবং মুক্তির প্রতীক। গঙ্গার জল যেমন অবিরাম প্রবাহিত হয়, তেমনি ঈশ্বরীয় করুণাকেও একটি অবিরাম প্রবাহ হিসেবে কল্পনা করা যায়। মানুষের জীবন যতই পাপ, দুঃখ, ব্যর্থতা ও অশান্তিতে আবদ্ধ হোক, তার সামনে আত্মশুদ্ধি ও নতুনভাবে শুরু করার সম্ভাবনা সবসময় থাকে। এই দৃষ্টিতে জাহ্নবী হলো সেই আশাবাদী প্রবাহ যা অতীতের স্থবিরতা ভেঙে মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়।
পুরো শ্লোকটিকে একত্রে দেখলে চারটি প্রতীক বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পবন হলো শুদ্ধির প্রতীক। রাম হলো নৈতিক শক্তির প্রতীক। মকর হলো গভীর ও অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতীক। জাহ্নবী হলো পবিত্র প্রবাহের প্রতীক। এই চারটি প্রতীককে মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের চারটি স্তর হিসেবেও বোঝা যায়। প্রথমে মানুষকে নিজের মনকে শুদ্ধ করতে হবে। তারপর নিজের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে ন্যায়ের পথে ব্যবহার করতে হবে। এরপর নিজের অন্তর্জগতের গভীরে প্রবেশ করে নিজের প্রকৃত স্বরূপকে বুঝতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাকে জীবনের মহাপ্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতে শিখতে হবে।
এই শ্লোকের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক বক্তব্যও রয়েছে। কৃষ্ণ যখন বলেন আমি পবন, আমি রাম, আমি মকর, আমি জাহ্নবী, তখন তিনি বোঝাচ্ছেন না যে ঈশ্বর কেবল এই কয়েকটি রূপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বরং এই সবকিছুর উৎকৃষ্টতার মধ্য দিয়ে অসীমের একটি সীমিত প্রকাশ উপলব্ধি করা যায়। বিভূতি যোগের মূল শিক্ষা হলো জগতের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে তার অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক উৎসকে অনুভব করা। যে বায়ু আমাদের প্রাণ দেয়, যে নৈতিক শক্তি অন্যায় প্রতিহত করে, যে গভীরতা আমাদের অজানা জগতের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং যে নদী অবিরাম প্রবাহিত হয়ে জীবনকে বহন করে, তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আমরা ঐশ্বরিক মহিমার একটি আভাস দেখতে পারি।
অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে এই ভাব আরও গভীর হয়। পরম সত্য এক এবং অদ্বিতীয়। বহুরূপী জগত সেই এক পরম বাস্তবতার প্রকাশ। তাই পবন, রাম, মকর ও জাহ্নবী আলাদা আলাদা অস্তিত্ব হিসেবে প্রতিভাত হলেও তাদের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা একই পরম সত্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে জগত ঈশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কযুক্ত এবং জগতের মধ্যে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশিত হয়। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের পার্থক্য বজায় থাকলেও জগতের শ্রেষ্ঠ গুণ ও মহিমা ঈশ্বরের অসীম শক্তির প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে দর্শনের বিভিন্ন ধারায় ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় সাধারণভাবে স্পষ্ট যে জগতের মহিমাকে ঈশ্বরীয় বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখাই এই শ্লোকের অন্যতম উদ্দেশ্য।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটির অসাধারণ তাৎপর্য রয়েছে। পবন আমাদের শেখায় মানসিক আবর্জনা দূর করতে। রাম শেখায় নিজের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে। মকর আমাদের নিজের অবচেতন ও গভীর মনস্তত্ত্বের দিকে তাকাতে আহ্বান জানায়। জাহ্নবী শেখায় অনুভূতি ও জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহকে গ্রহণ করতে। মানুষ যখন অতীতের ব্যর্থতা, অপমান, রাগ বা ভয়কে আঁকড়ে ধরে রাখে, তখন তার মন স্থবির হয়ে যায়। নদীর মতো প্রবাহিত হতে শেখা মানে অতীতকে অস্বীকার করা নয়। বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্যও অসাধারণ। কৃষ্ণ এখানে কোনো বিমূর্ত দার্শনিক তত্ত্বকে শুষ্ক যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেননি। তিনি এমন কয়েকটি দৃশ্যমান ও অনুভবযোগ্য প্রতীক ব্যবহার করেছেন যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষও গভীর সত্য উপলব্ধি করতে পারে। পবনকে আমরা দেখতে না পেলেও অনুভব করতে পারি। রামকে আমরা নৈতিক বীরত্বের আদর্শ হিসেবে কল্পনা করতে পারি। মকর আমাদের জলজ গভীরতার রহস্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। আর জাহ্নবী আমাদের চোখের সামনে প্রবাহিত পবিত্র নদীর চিত্র তুলে ধরে। এভাবে অদৃশ্য ঈশ্বরীয় সত্য দৃশ্যমান জগতের প্রতীকের মাধ্যমে আমাদের কাছে ধরা দেয়।
এই শ্লোকের একটি বিশেষ সৌন্দর্য হলো পবন ও জাহ্নবীর মধ্যে নিহিত গতি। পবন প্রবাহিত হয় এবং জাহ্নবীও প্রবাহিত হয়। একটির গতি বায়ুতে, অন্যটির গতি জলে। উভয়ই স্থবিরতার বিপরীত। এর মাধ্যমে যেন একটি গভীর সত্য প্রকাশিত হয় যে জীবন প্রকৃতিগতভাবে গতিশীল। যে মন পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারে না, সে নিজের মধ্যেই বন্দী হয়ে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি জীবনের পরিবর্তন, ক্ষয়, সৃষ্টি, বিচ্ছেদ ও নতুন সূচনাকে গ্রহণ করতে শেখে, সে বৃহত্তর অস্তিত্বের প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের ঈশ্বরকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। ঈশ্বরকে শুধু দূরের কোনো অতিলৌকিক সত্তা হিসেবে না দেখে প্রকৃতির শুদ্ধিতে, ন্যায়ের শক্তিতে, জ্ঞানের গভীরতায় এবং জীবনের পবিত্র প্রবাহে অনুভব করা যায়। পবন আমাদের অন্তরকে শুদ্ধ করার শিক্ষা দেয়। রাম আমাদের শক্তিকে ধর্মের অধীন রাখার শিক্ষা দেয়। মকর আমাদের অন্তর্নিহিত গভীরতাকে উপলব্ধি করার আহ্বান জানায়। আর জাহ্নবী আমাদের শেখায় যে জীবনকে প্রবাহিত হতে দিতে হয়।
এইভাবে “পবনঃ পবতামস্মি রামঃ শস্ত্রভৃতামহম্” কেবল কয়েকটি সংস্কৃত শব্দের সমষ্টি নয়। এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, নৈতিক শক্তি, অন্তর্দৃষ্টি এবং জীবনপ্রবাহের একটি গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন। এর সারকথা হলো মানুষ যখন নিজের অশুদ্ধতাকে দূর করে, শক্তিকে সংযত করে, নিজের গভীর সত্তাকে উপলব্ধি করে এবং জীবনের পবিত্র প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে, তখন তার মধ্যেও ঐশ্বরিক মহিমার প্রকাশ ঘটতে শুরু করে। সেই অর্থে কৃষ্ণের এই বাণী শুধু প্রাচীন ভারতের একটি ধর্মীয় শিক্ষা নয়। এটি আজও মানুষের অন্তর্জীবন, নৈতিকতা এবং আত্মঅন্বেষণের জন্য এক চিরন্তন পথনির্দেশ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!