শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.৩৪ — সর্বহরণকারী মৃত্যুর মধ্যে কৃষ্ণ, ভবিষ্যৎ সৃষ্টির উদ্ভব এবং নারীর মধ্যে কীর্তি, শ্রী, বাক্, স্মৃতি, মেধা
মৃত্যুঃ সর্বহরশ্চাহমুদ্ভবশ্চ ভবিষ্যতাম্।
কীর্তিঃ শ্রীর্বাক্ চ নারীণাং স্মৃতির্মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা।।৩৪।।
অনুবাদঃ সমস্ত হরণকারীদের মধ্যে আমি সর্বগ্রাসী মৃত্যু, ভাবীকালের বস্তুসমূহের মধ্যে আমি উদ্ভব। নারীদের মধ্যে আমি কীর্তি, শ্রী, বাণী, স্মৃতি, মেধা, ধৃতি ও ক্ষমা।
ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায়ের নাম বিভূতি যোগ। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর ঐশ্বরিক প্রকাশের বিভিন্ন দিক বোঝাতে গিয়ে জগতের নানা মহৎ, শক্তিশালী, সুন্দর ও গভীর বিষয়ের মধ্যে নিজের উপস্থিতির কথা ঘোষণা করেছেন। দশম অধ্যায়ের চৌত্রিশতম শ্লোকটি এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শ্রীকৃষ্ণ একদিকে নিজেকে সর্বহরণকারী মৃত্যু হিসেবে প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সত্তাদের উদ্ভব হিসেবেও নিজের পরিচয় দিয়েছেন। এরপর তিনি মানুষের মধ্যে বিশেষত নারীদের মধ্যে কীর্তি, শ্রী, বাক্, স্মৃতি, মেধা, ধৃতি এবং ক্ষমার মতো মহৎ গুণকে নিজের বিভূতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই একটি শ্লোকের মধ্যে তাই জীবন ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও লয়, স্মৃতি ও জ্ঞান, ধৈর্য ও ক্ষমা, সৌন্দর্য ও মহত্ত্বের এক গভীর সমন্বয় দেখা যায়।
শ্লোকটির মূল সংস্কৃত পাঠ হলো “মৃত্যুঃ সর্বহরশ্চাহমুদ্ভবশ্চ ভবিষ্যতাম্। কীর্তিঃ শ্রীর্বাক্ চ নারীণাং স্মৃতির্মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা।। ” এর সরল অর্থ হলো, আমি সর্বহরণকারী মৃত্যু এবং ভবিষ্যৎ সত্তাদের উদ্ভব। নারীদের মধ্যে আমি কীর্তি, শ্রী, বাক্, স্মৃতি, মেধা, ধৃতি এবং ক্ষমা। প্রথম দৃষ্টিতে এই বক্তব্যের মধ্যে একটি বিস্ময়কর বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে মৃত্যু, যা মানুষের কাছে ভয় ও বেদনার প্রতীক, অন্যদিকে কীর্তি, সৌন্দর্য, জ্ঞান, স্মৃতি, ধৈর্য ও ক্ষমার মতো কোমল ও মহৎ গুণ। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এই বৈপরীত্য আসলে কোনো বিরোধ নয়। কারণ ঈশ্বরীয় বাস্তবতা কেবল আনন্দ, সৌন্দর্য বা সৃষ্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সৃষ্টি যেমন তাঁর প্রকাশ, তেমনি লয়ও তাঁর প্রকাশ। জীবনের সূচনা যেমন তাঁর শক্তির প্রকাশ, তেমনি জীবনের একটি রূপের অবসানও সেই মহাজাগতিক ব্যবস্থারই অংশ।
“মৃত্যু” শব্দটির মূল সংস্কৃত ধাতু হলো √মৃ, যার অর্থ মারা যাওয়া, বিনষ্ট হওয়া বা মৃত্যুবরণ করা। এই ধাতু থেকেই মৃত, মরণ এবং মৃত্যু ইত্যাদি শব্দের উৎপত্তি। সাধারণ অর্থে মৃত্যু হলো জীবনের সমাপ্তি বা দেহের প্রাণক্রিয়ার অবসান। কিন্তু গীতার দার্শনিক প্রেক্ষাপটে মৃত্যুকে কেবল শারীরিক দেহের অবসান হিসেবে দেখলে এর গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। এখানে মৃত্যু হলো একটি নির্দিষ্ট রূপের অবসান এবং অস্তিত্বের পরিবর্তনশীলতার অনিবার্য প্রকাশ। যা জন্ম নিয়েছে তা একদিন পরিবর্তিত হবে এবং তার বর্তমান রূপের অবসান ঘটবে। তাই মৃত্যু জীবনের বিপরীত কোনো বিচ্ছিন্ন শক্তি নয়, বরং জীবনের পরিবর্তনশীলতার একটি অপরিহার্য অংশ।
এরপর এসেছে “সর্বহর” শব্দটি। সর্ব অর্থ সব বা সকল এবং হর অর্থ হরণকারী বা নিয়ে যায় যে। হর শব্দটি সংস্কৃত √হৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ নেওয়া, বহন করা বা হরণ করা। তাই সর্বহর অর্থ সকলকে হরণকারী। মৃত্যুকে সর্বহর বলা হয়েছে কারণ মৃত্যু মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের সমস্ত পার্থক্য একসময় মুছে দেয়। রাজা ও প্রজা, ধনী ও দরিদ্র, শক্তিশালী ও দুর্বল, বিখ্যাত ও অখ্যাত সবাই মৃত্যুর সামনে একই অনিবার্য নিয়মের অধীন। মৃত্যু মানুষের দেহ, যৌবন, সম্পদ, ক্ষমতা, সামাজিক অবস্থান এবং বাহ্যিক পরিচয়কে একে একে কেড়ে নেয়। এই কারণে মৃত্যুকে সর্বহর বলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
“সর্বহরশ্চাহম্” পদটির মধ্যে রয়েছে “সর্বহরঃ”, “চ” এবং “অহম্”। এখানে “চ” অর্থ এবং এবং “অহম্” অর্থ আমি। সন্ধির ফলে সর্বহরশ্চাহম্ রূপটি তৈরি হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য হলো, সর্বহরণকারী মৃত্যুও আমি। এর মাধ্যমে তিনি মৃত্যুকে নিজের থেকে পৃথক কোনো অশুভ শক্তি হিসেবে দেখছেন না। বরং জগতের নিয়মের অন্তর্গত লয় ও অবসানকেও তিনি নিজের ঐশ্বরিক প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরছেন। এই শিক্ষা মানুষের মৃত্যুভয়কে সরাসরি অস্বীকার করে না, বরং মৃত্যুকে বৃহত্তর অস্তিত্বের ধারার মধ্যে দেখতে শেখায়।
এরপর এসেছে “উদ্ভব” শব্দটি। এটি উদ্ এবং √ভূ ধাতুর সমন্বয়ে গঠিত। উদ্ অর্থ উপরে, বাইরে বা প্রকাশের দিকে এবং √ভূ অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। সুতরাং উদ্ভব অর্থ হলো অপ্রকাশিত অবস্থা থেকে প্রকাশিত হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা আবির্ভূত হওয়া। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, ভবিষ্যৎ সত্তাদের উদ্ভবও তিনি। অর্থাৎ তিনি শুধু অতীতের অবসান নন, ভবিষ্যতের সম্ভাবনার উৎসও। যে সত্তাগুলো ভবিষ্যতে অস্তিত্ব লাভ করবে, তাদের প্রকাশের মধ্যেও সেই একই ঐশ্বরিক শক্তি কাজ করছে।
এখানে মৃত্যু এবং উদ্ভবকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে অত্যন্ত গভীর উদ্দেশ্যে। সাধারণ মানুষের কাছে জন্ম আনন্দের এবং মৃত্যু দুঃখের বিষয়। কিন্তু প্রকৃতির বৃহত্তর চক্রে জন্ম এবং মৃত্যু পরস্পর সম্পর্কিত। একটি বীজ যখন মাটির মধ্যে নিজের পূর্ববর্তী অবস্থাকে হারায়, তখনই অঙ্কুরের জন্ম হয়। একটি পুরোনো পাতা ঝরে পড়ার মধ্য দিয়ে নতুন পাতার জন্য স্থান তৈরি হয়। একটি দিনের সমাপ্তি রাতের সূচনা করে এবং রাতের অবসান নতুন দিনের আগমন ঘটায়। তাই এক রূপের মৃত্যু অনেক সময় অন্য রূপের উদ্ভবের পথ তৈরি করে। গীতার দৃষ্টিতে সৃষ্টি ও লয় একই মহাজাগতিক ধারার দুটি পরস্পর সম্পর্কিত প্রকাশ।
এরপর শ্লোকের দ্বিতীয় অংশে মানুষের জীবনের সাতটি মহৎ শক্তির কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি হলো “কীর্তি”। কীর্তি শব্দটি সংস্কৃত √কীর্ত ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে প্রশংসা করা, মহিমা প্রচার করা ও গুণের কথা ঘোষণা করার ধারণা রয়েছে। কীর্তি অর্থ যশ, সুনাম, খ্যাতি ও গৌরব। কিন্তু কীর্তি কেবল বিখ্যাত হওয়া নয়। একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যদি তার সৎকর্ম, আদর্শ, জ্ঞান বা মানবিক অবদান মানুষের মনে থেকে যায়, তখন সেই স্থায়ী স্মরণীয়তাই কীর্তির প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করে। অর্থাৎ কীর্তি হলো ব্যক্তিগত জীবনের সীমা অতিক্রম করে মানুষের সম্মিলিত স্মৃতিতে বেঁচে থাকার একটি রূপ।
এরপর এসেছে “শ্রী”। শ্রী একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ সংস্কৃত শব্দ। এর অর্থ সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য, সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য, দীপ্তি, মর্যাদা এবং কল্যাণ। শ্রীকে শুধু অর্থসম্পদ হিসেবে বোঝা উচিত নয়। যে ব্যক্তির চরিত্রে সৌন্দর্য, আচরণে মর্যাদা, জীবনে কল্যাণ এবং উপস্থিতিতে এক ধরনের দীপ্তি রয়েছে, তার মধ্যেও শ্রী প্রকাশিত হয়। ভারতীয় ঐতিহ্যে শ্রী দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে শ্রী কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, জীবনের সুষমা, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণের প্রতীক।
“বাক্” শব্দের অর্থ কথা, ভাষা বা বাণী। মানুষের বিশেষ ক্ষমতাগুলোর মধ্যে বাক্ একটি অসাধারণ শক্তি। মানুষ চিন্তাকে শব্দে প্রকাশ করতে পারে এবং শব্দের মাধ্যমে অন্য মানুষের চেতনাকে স্পর্শ করতে পারে। একটি সত্য বাক্য একজন মানুষকে পরিবর্তন করতে পারে। একটি মিথ্যা বাক্য সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। একটি সান্ত্বনার বাক্য দুঃখী মানুষকে শক্তি দিতে পারে। আবার একটি কঠোর বাক্য গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাক্ কেবল কথা বলার ক্ষমতা নয়। এটি চেতনাকে প্রকাশ করার শক্তি। বৈদিক ঐতিহ্যে বাক্ নিজেই এক গভীর শক্তিরূপে বিবেচিত হয়েছে।
“নারীণাম্” অর্থ নারীদের মধ্যে। শ্রীকৃষ্ণ নারীদের মধ্যে কীর্তি, শ্রী, বাক্, স্মৃতি, মেধা, ধৃতি এবং ক্ষমাকে নিজের বিভূতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই বক্তব্যকে কেবল বাহ্যিক লিঙ্গভিত্তিক গুণের তালিকা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এখানে যে গুণগুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলো মানবচরিত্রের গভীর ও সর্বজনীন শক্তি। নারীদের মধ্যে তাদের বিশেষ প্রকাশের কথা বলা হলেও এই গুণের আধ্যাত্মিক মূল্য সকল মানুষের জন্যই প্রযোজ্য।
“স্মৃতি” শব্দটি এসেছে √স্মৃ ধাতু থেকে, যার অর্থ স্মরণ করা বা মনে রাখা। সাধারণ অর্থে স্মৃতি হলো অতীত অভিজ্ঞতা মনে রাখার ক্ষমতা। কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে স্মৃতির তাৎপর্য আরও গভীর। মানুষ নিজের সত্য পরিচয়, কর্তব্য, মূল্যবোধ এবং জীবনের উদ্দেশ্য ভুলে যেতে পারে। তাই সত্যকে স্মরণে রাখা নিজেই এক ধরনের আধ্যাত্মিক শক্তি। গীতার বৃহত্তর দর্শনে মানুষ যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপ ও কর্তব্যকে স্মরণ করে, তখন তার বিভ্রান্তি দূর হতে শুরু করে। সেই অর্থে স্মৃতি শুধু মস্তিষ্কের তথ্য সংরক্ষণ নয়, সত্যকে অন্তরে ধরে রাখার শক্তি।
এরপর এসেছে “মেধা”। মেধা অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি, উপলব্ধিশক্তি, জ্ঞান ধারণের ক্ষমতা এবং গভীরভাবে বোঝার সামর্থ্য। স্মৃতি যেখানে কোনো বিষয় মনে রাখে, মেধা সেখানে সেই বিষয়ের অর্থ ও পারস্পরিক সম্পর্ক উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। একজন মানুষ অনেক তথ্য মুখস্থ করতে পারে, কিন্তু তথ্যের অন্তর্নিহিত সম্পর্ক বুঝে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষমতা হলো মেধার প্রকাশ। তাই মেধা জ্ঞানকে জীবন্ত করে তোলে।
“ধৃতি” শব্দটি এসেছে √ধৃ ধাতু থেকে, যার অর্থ ধারণ করা, ধরে রাখা বা বহন করা। ধৃতি অর্থ ধৈর্য, দৃঢ়তা, মানসিক স্থিরতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখার শক্তি। জীবনে সাফল্যের সময় দৃঢ় থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু ব্যর্থতা, অপমান, দুঃখ বা বিপর্যয়ের সময়ও নিজের নীতি ও লক্ষ্য ধরে রাখতে পারা ধৃতির পরিচয়। যে ব্যক্তি পড়ে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়ায়, ব্যর্থতার পরেও চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং সংকটের মধ্যেও নিজের বিবেক হারায় না, তার মধ্যে ধৃতি প্রকাশিত হয়।
শেষে এসেছে “ক্ষমা”। ক্ষমা অর্থ অপরাধ মার্জনা করা, সহ্য করা এবং প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা অতিক্রম করার শক্তি। ক্ষমাকে দুর্বলতা মনে করা ভুল। অনেক সময় প্রতিশোধ নেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নেওয়ার জন্য যে আত্মশক্তি প্রয়োজন, সেটিই প্রকৃত ক্ষমা। ক্ষমা মানুষের অন্তরকে অতীতের আঘাত থেকে মুক্ত করতে পারে। যে মানুষ ক্ষমা করতে শেখে, সে কেবল অন্যকে মুক্ত করে না, নিজেকেও মানসিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে।
শ্লোকটির সাতটি গুণকে একসঙ্গে দেখলে মানবজীবনের একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক কাঠামো দেখা যায়। কীর্তি মানুষের কাজকে সময়ের মধ্যে স্থায়িত্ব দেয়। শ্রী জীবনে সৌন্দর্য ও কল্যাণ আনে। বাক্ চিন্তাকে প্রকাশ করে। স্মৃতি অতীতকে ধারণ করে। মেধা অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান আহরণ করে। ধৃতি মানুষকে বিপদের মধ্যেও স্থির রাখে। ক্ষমা মানুষকে অতীতের বন্ধন থেকে মুক্ত করে। এই সাতটি শক্তি মানুষের ব্যক্তিত্বকে গভীর, পরিণত ও মহৎ করে তুলতে পারে।
দার্শনিকভাবে শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো ঈশ্বরকে কোনো একটি সীমিত ধারণার মধ্যে আবদ্ধ না করা। যদি ঈশ্বরকে শুধু সৃষ্টি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ধ্বংসকে বোঝা যায় না। যদি ঈশ্বরকে শুধু আনন্দ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে দুঃখ ও মৃত্যুর অর্থ অস্পষ্ট থেকে যায়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলেন, আমি মৃত্যুও এবং উদ্ভবও। অর্থাৎ সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়ের বৃহত্তর ব্যবস্থার মধ্যেই ঐশ্বরিক বাস্তবতা প্রকাশিত। অদ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে নাম ও রূপ পরিবর্তনশীল হলেও তাদের অন্তর্নিহিত চৈতন্য এক। তাই একটি রূপের অবসানকে পরম সত্যের সম্পূর্ণ বিনাশ হিসেবে দেখা যায় না।
এই বক্তব্য মানবজীবনের ক্ষেত্রেও গভীরভাবে প্রযোজ্য। মানুষের জীবনে অনেক কিছু মারা যায় এবং অনেক কিছু নতুন করে জন্ম নেয়। শৈশবের অবসান ঘটে কৈশোর আসে। কৈশোরের অবসান ঘটে যৌবন আসে। পুরোনো চিন্তার অবসান ঘটলে নতুন উপলব্ধির জন্ম হতে পারে। একটি ব্যর্থতা কখনও নতুন পথের সূচনা করতে পারে। একটি পুরোনো অভ্যাসের মৃত্যু একটি নতুন চরিত্রের জন্ম দিতে পারে। তাই মৃত্যু শুধু শারীরিক ঘটনা নয়। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে পুরোনো রূপের অবসান এবং নতুন রূপের উদ্ভব ঘটে।
এই দৃষ্টিতে “মৃত্যু” মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং সচেতন করার জন্যও একটি শক্তিশালী প্রতীক। মানুষ যদি বুঝতে পারে যে তার সময় সীমিত, তাহলে সে জীবনের মূল্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে। অহংকার, লোভ, প্রতিহিংসা এবং অপ্রয়োজনীয় আসক্তির মূল্য তখন কমে আসে। মৃত্যু মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে বাহ্যিক অর্জন স্থায়ী নয়। ফলে জীবনের আসল মূল্য কোথায় তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে “উদ্ভব” আমাদের আশার কথা বলে। একটি অধ্যায় শেষ হলেই পুরো জীবন শেষ হয়ে যায় না। একটি পথ বন্ধ হলে অন্য পথ খুলতে পারে। একটি পুরোনো পরিচয় বিলীন হলে নতুন পরিচয়ের জন্ম হতে পারে। এই কারণে মৃত্যু এবং উদ্ভবকে পাশাপাশি রেখে শ্রীকৃষ্ণ জীবনের গভীর সত্যটি বোঝান। পরিবর্তনকে ভয় না করে পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করাই পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি।
এই শ্লোককে একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। নদীর একটি জলবিন্দু তার আগের অবস্থায় থাকে না। সে বাষ্প হয়ে আকাশে উঠতে পারে, মেঘ হতে পারে, বৃষ্টি হয়ে মাটিতে ফিরে আসতে পারে এবং আবার নদীর অংশ হতে পারে। তার একটি রূপের অবসান অন্য একটি রূপের সূচনা করে। ঠিক তেমনি জীবনের বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু বৃহত্তর অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা চলতে থাকে। গীতার দৃষ্টিতে এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেই ঈশ্বরীয় ব্যবস্থার প্রকাশ।
সবশেষে বলা যায়, “মৃত্যুঃ সর্বহরশ্চাহমুদ্ভবশ্চ ভবিষ্যতাম্” মানবজীবনের সীমাবদ্ধতা ও মহাজীবনের অনন্ত প্রবাহকে পাশাপাশি দাঁড় করায়। মৃত্যু আমাদের শেখায় যে কোনো বাহ্যিক অর্জন চিরস্থায়ী নয়। উদ্ভব আমাদের শেখায় যে সমাপ্তির মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা থাকে। আর “কীর্তিঃ শ্রীর্বাক্ চ নারীণাং স্মৃতির্মেধা ধৃতিঃ ক্ষমা” আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব শুধু তার বাহ্যিক সাফল্যে নয়, তার চরিত্রের গভীর গুণাবলিতে। কীর্তি আমাদের কর্মকে অর্থবহ করে, শ্রী জীবনকে সুন্দর করে, বাক্ চিন্তাকে প্রকাশ করে, স্মৃতি অতীতকে ধারণ করে, মেধা সত্যকে উপলব্ধি করে, ধৃতি সংকটে আমাদের স্থির রাখে এবং ক্ষমা হৃদয়কে মুক্ত করে।
এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত সত্য তাই অত্যন্ত গভীর। ঈশ্বর শুধু জন্মের মধ্যে নন, মৃত্যুর মধ্যেও আছেন। তিনি শুধু ধ্বংসের মধ্যে নন, নতুন উদ্ভবের মধ্যেও আছেন। তিনি শুধু মহাবিশ্বের বিশাল ঘটনায় নন, মানুষের স্মৃতি, জ্ঞান, বাক্, ধৈর্য, সৌন্দর্য এবং ক্ষমার মধ্যেও প্রকাশিত। এই উপলব্ধি মানুষকে জীবনের প্রতি আরও সচেতন, মৃত্যুর প্রতি আরও নির্ভীক এবং নিজের চরিত্র গঠনের প্রতি আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। শেষ পর্যন্ত শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে জীবনকে এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে আমাদের কর্মে কীর্তি থাকে, চরিত্রে শ্রী থাকে, কথায় সত্য থাকে, মনে স্মৃতি থাকে, চিন্তায় মেধা থাকে, সংকটে ধৃতি থাকে এবং হৃদয়ে ক্ষমা থাকে। তখন মানুষের সীমিত জীবনও একটি বৃহত্তর সত্যের দীপ্ত প্রকাশ হয়ে উঠতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!