সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.৫ — অহিংসা, সমতা, তুষ্টি, তপস্যা ও মানবিক গুণের ঈশ্বরীয় উৎস

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোহযশঃ।ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথগবিধাঃ।।৫।।
অহিংসা সমতা তুষ্টিস্তপো দানং যশোহযশঃ।
ভবন্তি ভাবা ভূতানাং মত্ত এব পৃথগবিধাঃ।।৫।।

অনুবাদঃ বুদ্ধি, জ্ঞান, সংশয় ও মোহ থেকে মুক্তি, ক্ষমা, সত্যবাদিতা, ইন্দ্রিয়-সংযম, মনঃসংযম, সুখ, দুঃখ, জন্ম, মৃত্যু, ভয়, অভয়, অহিংসা, সমতা, সন্তোষ, তপস্যা, দান, যশ ও অযশ- প্রাণীদের এই সমস্ত নানা প্রকার ভাব আমার থেকেই উৎপন্ন হয়।

ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতি যোগে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের মধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন গুণ, অনুভূতি, মানসিক অবস্থা এবং জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার গভীর উৎস সম্পর্কে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সত্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, অহিংসা, সমতা, তুষ্টি, তপস্যা, দান, যশ এবং অযশ প্রভৃতি বিভিন্ন ভাব সকল জীবের মধ্যে তাঁর থেকেই পৃথক পৃথকভাবে প্রকাশিত হয়। এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু নৈতিক শিক্ষাই নেই, এর মধ্যে মানুষের মন, চরিত্র, সমাজ, আত্মজ্ঞান এবং ঈশ্বরতত্ত্ব সম্পর্কে একটি গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে। মানুষের জীবনে যে বৈচিত্র্য আমরা দেখতে পাই, তার বাহ্যিক প্রকাশ যতই আলাদা হোক না কেন, তার অন্তর্গত উৎসকে শ্রীকৃষ্ণ এক পরম ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

অহিংসা শব্দের মূল সংস্কৃত অহিংসা। এটি অ এবং হিংসা এই দুটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অ নিষেধ বা অনুপস্থিতি বোঝায় এবং হিংসা শব্দটি হিংস্ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ আঘাত করা, ক্ষতি করা বা পীড়ন করা। সেই অর্থে অহিংসা হলো হিংসার অনুপস্থিতি। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে অহিংসার অর্থ কেবল কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত না করা নয়। মানুষের চিন্তা, কথা এবং আচরণের মধ্যেও হিংসা থাকতে পারে। কোনো মানুষকে অকারণে অপমান করা, ঘৃণা করা, প্রতারণা করা অথবা নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করা হিংসারই সূক্ষ্ম রূপ। তাই অহিংসা হলো এমন এক জীবনদৃষ্টি যেখানে অন্যের অস্তিত্বকে নিজের অস্তিত্বের মতোই মূল্যবান বলে স্বীকার করা হয়। অহিংসার গভীরতম ভিত্তি হলো সকল জীবের মধ্যে এক অন্তর্নিহিত ঐক্যের উপলব্ধি।

এরপর এসেছে সমতা। সমতা শব্দের মূল হলো সম এবং তার সঙ্গে ভাববাচক তা প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে। সম অর্থ সমান, ভারসাম্যপূর্ণ অথবা পক্ষপাতহীন। কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে সমতা মানে বাইরের জগতের সবকিছু একই রকম হয়ে যাওয়া নয়। মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ, লাভ ও ক্ষতি, সম্মান ও অপমান, সাফল্য ও ব্যর্থতা সবসময় একই থাকবে না। সমতার প্রকৃত অর্থ হলো এসব পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের অন্তরের ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রাখা। যে ব্যক্তি সুখ পেলে উন্মত্ত হয়ে যায় এবং দুঃখ পেলে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে, তার মন বাইরের পরিস্থিতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি উভয় অবস্থার মধ্যেই নিজের বিবেক ও স্থিরতা বজায় রাখতে পারে, সে সমতার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে শুরু করে। তাই সমতা হলো অন্তরের স্বাধীনতার একটি লক্ষণ।

তুষ্টি শব্দটি এসেছে তুষ্ ধাতু থেকে। তুষ্ অর্থ সন্তুষ্ট হওয়া, তৃপ্ত হওয়া অথবা আনন্দিত হওয়া। তুষ্টি হলো অন্তরের সন্তোষ। কিন্তু তুষ্টিকে অনেক সময় ভুলভাবে অলসতা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীনতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রকৃত তুষ্টি তা নয়। একজন মানুষ নিজের কর্তব্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়েও অন্তরে তুষ্ট থাকতে পারেন। তুষ্টি হলো নিজের বর্তমান অবস্থাকে অস্বীকার না করে তার মূল্য উপলব্ধি করা। অতৃপ্ত মন সবসময় ভাবে আরও কিছু পেলে সে সুখী হবে। কিন্তু একটি জিনিস পাওয়ার পর আবার অন্য একটি জিনিসের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এভাবে মানুষ বাহ্যিক অর্জনের পেছনে ছুটতে ছুটতে অন্তরের শান্তি হারিয়ে ফেলে। তুষ্টি সেই অন্তহীন অভাববোধকে সংযত করে এবং মানুষকে উপলব্ধি করায় যে প্রকৃত পরিতৃপ্তির উৎস কেবল বাহ্যিক সম্পদের মধ্যে নেই।

তপস্যা শব্দের মূল সংস্কৃত তপস এবং এর উৎস তপ্ ধাতু। তপ্ অর্থ উত্তপ্ত করা বা তাপ সৃষ্টি করা। প্রাচীন আধ্যাত্মিক চিন্তায় এই তাপের ধারণা ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধির অর্থ লাভ করেছে। যেমন আগুনে ধাতু উত্তপ্ত হয়ে তার অশুদ্ধতা হারায়, তেমনই আত্মসংযম, সাধনা, শৃঙ্খলা এবং সচেতন অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষের চরিত্র পরিশুদ্ধ হয়। তপস্যা মানে কেবল কঠোর কষ্ট সহ্য করা নয়। নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা, ইন্দ্রিয়কে সংযত রাখা, সত্যের পথে স্থির থাকা, নিজের দুর্বলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং উচ্চতর উদ্দেশ্যের জন্য সাময়িক আরাম ত্যাগ করাও তপস্যার অন্তর্ভুক্ত। তাই তপস্যা হলো নিজের নিম্নতর প্রবৃত্তিকে অতিক্রম করে উচ্চতর সত্তাকে বিকশিত করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা।

দান শব্দের উৎস দা ধাতু, যার অর্থ দেওয়া। দান বলতে সাধারণত অর্থ বা বস্তু অন্যকে দেওয়াকে বোঝানো হয়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে দানের অর্থ অনেক বিস্তৃত। অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র, জ্ঞান, সময়, শ্রম, ভালোবাসা, আশ্রয়, ক্ষমা এবং সহানুভূতি সবই দানের রূপ হতে পারে। দানের প্রকৃত মূল্য বস্তুটির পরিমাণে নয়, বরং দাতার অন্তরের মানসিকতায়। যদি দানের মধ্যে অহংকার থাকে এবং বিনিময়ে সম্মান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে সেই দান বাহ্যিকভাবে মহৎ হলেও তার আধ্যাত্মিক মূল্য সীমিত হয়ে যায়। প্রকৃত দান হলো নিজের সামর্থ্যকে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য ব্যবহার করা। দানের মাধ্যমে মানুষ নিজের সীমাবদ্ধ স্বার্থের গণ্ডি অতিক্রম করে অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে।

এরপর শ্রীকৃষ্ণ যশ ও অযশের কথা বলেছেন। যশ অর্থ খ্যাতি, সুনাম, মর্যাদা ও সামাজিক সম্মান। অযশ হলো তার বিপরীত অর্থাৎ দুর্নাম, অসম্মান বা অপখ্যাতি। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো যশ কামনা করা এবং অযশকে ভয় করা। মানুষ চায় অন্যরা তাকে ভালো বলুক, তার কাজের প্রশংসা করুক এবং সমাজে তার সম্মান বৃদ্ধি পাক। কিন্তু যশ এবং অযশ উভয়ই পরিবর্তনশীল। আজ যে মানুষ প্রশংসিত, কাল সে সমালোচিত হতে পারে। আজ যে ব্যক্তি অখ্যাত, কাল সে সম্মানিত হতে পারে। তাই গীতার শিক্ষা হলো মানুষের প্রকৃত মূল্য বাহ্যিক প্রশংসা বা নিন্দার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। নিজের কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করাই গুরুত্বপূর্ণ। যশ এলে অহংকার না করা এবং অযশ এলে আত্মবিনাশী হতাশায় না ডুবে যাওয়াই সমতার পরিচয়।

এই সমস্ত শব্দের পর শ্রীকৃষ্ণ ব্যবহার করেছেন ভাব শব্দটি। ভাব এসেছে ভূ ধাতু থেকে। ভূ অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা অথবা প্রকাশিত হওয়া। তাই ভাব বলতে শুধু অনুভূতি বোঝায় না। এটি মানুষের মানসিক অবস্থা, চরিত্রের প্রবণতা, গুণ এবং অস্তিত্বের বিভিন্ন প্রকাশকে বোঝাতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ যখন বলেন যে এই ভাবগুলি জীবের মধ্যে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়, তখন তিনি মানবজীবনের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকার করছেন। কোনো মানুষ শান্ত, কেউ অশান্ত। কেউ দানশীল, কেউ স্বার্থপর। কেউ সাহসী, কেউ ভীত। কেউ সহজেই সন্তুষ্ট হয়, কেউ সবসময় অতৃপ্ত থাকে। মানুষের এই বৈচিত্র্যই তার জটিল অস্তিত্বের একটি অংশ।

পৃথগ্বিধা শব্দটি এই বৈচিত্র্যের কথাই প্রকাশ করে। পৃথক অর্থ আলাদা এবং বিধা অর্থ প্রকার বা ধরন। পৃথগ্বিধা অর্থ বিভিন্ন প্রকারের। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে প্রকাশিত সব গুণ একই রকম নয় এবং সব মানুষের মানসিক গঠনও এক নয়। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্য হলো এই বহুত্বের অন্তরালে একটি ঐক্য রয়েছে। বাহ্যিকভাবে মানুষ বহু রকম হলেও অস্তিত্বের গভীরতম স্তরে তাদের উৎস এক। এখানেই শ্লোকটির দার্শনিক গভীরতা।

মত্ত এব শব্দ দুটি এই বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু। মত্তঃ অর্থ আমার থেকে এবং এব অর্থই বা অবশ্যই। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ বলছেন যে জীবের মধ্যে প্রকাশিত এই বিভিন্ন ভাব তাঁর থেকেই উৎপন্ন। এই বক্তব্যে কৃষ্ণ নিজেকে কেবল একজন নৈতিক শিক্ষক হিসেবে প্রকাশ করছেন না। তিনি নিজেকে সমস্ত জীবনের পরম উৎস হিসেবে ঘোষণা করছেন। মানুষের মধ্যে যে মহৎ গুণ প্রকাশিত হয়, সেটিকে তাই কেবল ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে না দেখে ঈশ্বরপ্রদত্ত শক্তির প্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়। এই উপলব্ধি মানুষের অহংকার কমিয়ে কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি করতে পারে।

এই শিক্ষার একটি বিশেষ দিক হলো মানুষের মধ্যে মহৎ গুণের উপস্থিতির জন্য অহংকার না করে কৃতজ্ঞ হওয়া। কেউ যদি দানশীল হয়, সে যেন মনে না করে যে তার দানশীলতা সম্পূর্ণ তার নিজের সৃষ্টি। কেউ যদি জ্ঞানী হয়, সে যেন জ্ঞানের জন্য অহংকার না করে। কেউ যদি সমদর্শী হয়, সে যেন নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থাকে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার কারণ না বানায়। কারণ গীতার দৃষ্টিতে মানুষের সমস্ত শক্তির গভীরে একটি বৃহত্তর উৎস রয়েছে। এই উপলব্ধি মহৎ গুণকে অহংকারের কারণ না করে ভক্তি ও বিনয়ের কারণ করে তোলে।

এই শ্লোকের মধ্যে আরও একটি অসাধারণ বিষয় হলো শুভ ও অশুভ বলে বিবেচিত বিপরীত অভিজ্ঞতাগুলোকেও একই আলোচনার মধ্যে রাখা হয়েছে। অহিংসা, সমতা, তুষ্টি, তপস্যা ও দানের মতো মহৎ গুণের পাশাপাশি যশ ও অযশের কথাও বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে জীবনের অভিজ্ঞতা কেবল আনন্দদায়ক বিষয় দিয়ে গঠিত নয়। সম্মান ও অসম্মান, সাফল্য ও ব্যর্থতা, সুখ ও দুঃখ সবই জীবনের অংশ। আধ্যাত্মিক জ্ঞান মানুষকে এমন একটি অবস্থায় নিয়ে যেতে চায় যেখানে সে এই পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতার মধ্যেও নিজের অন্তর্গত সত্যকে ভুলে না যায়।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। মানুষের মন একমাত্রিক নয়। একই ব্যক্তির মধ্যে কখনো সাহস প্রকাশ পায়, কখনো ভয়। কখনো সে উদার হয়, কখনো স্বার্থপর হয়ে ওঠে। কখনো সে সন্তুষ্ট থাকে, আবার কখনো অকারণ আকাঙ্ক্ষায় অস্থির হয়। নিজের মধ্যে এই বিপরীত প্রবণতাগুলোকে চিনতে পারা আত্মজ্ঞান অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গীতার শিক্ষা মানুষকে নিজের মনের অবস্থাগুলোকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে শেখায়।

বাস্তব জীবনে এর একটি সুন্দর উদাহরণ দেখা যায় সাফল্য ও ব্যর্থতার ক্ষেত্রে। একজন মানুষ দীর্ঘ পরিশ্রমের পর কর্মক্ষেত্রে সাফল্য পেলেন এবং সমাজে যশ অর্জন করলেন। যদি তিনি সেই যশের কারণে অহংকারী হয়ে অন্যদের ছোট করতে শুরু করেন, তাহলে যশ তার চরিত্রকে উন্নত করতে পারল না। কিন্তু যদি তিনি সাফল্যের জন্য কৃতজ্ঞ হন, নিজের অবস্থানে তুষ্ট থাকেন, অন্যদের সাহায্য করেন এবং আরও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন, তাহলে সেই সাফল্য তার অন্তরের বিকাশে সহায়তা করতে পারে। আবার কোনো সময় তিনি সমালোচিত হলে যদি নিজের ভুল থাকলে তা সংশোধন করেন এবং অযথা নিন্দায় ভেঙে না পড়েন, তাহলে অযশও তার আত্মজ্ঞান বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

একটি বৃক্ষের উপমা দিয়ে এই শ্লোকটির অর্থ আরও সহজভাবে বোঝা যায়। একটি বিশাল বৃক্ষের বাইরে আমরা অসংখ্য শাখা, পাতা ও ফল দেখতে পাই। কিন্তু এই বহুত্বের পেছনে থাকে একটি মূল। তেমনি মানুষের জীবনে অহিংসা, সমতা, তুষ্টি, তপস্যা, দান, যশ ও অযশ নানা শাখার মতো প্রকাশিত হলেও তাদের অস্তিত্বের গভীরে একটি পরম উৎস রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ সেই মূল উৎসের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। বাহ্যিক প্রকাশ যত বিচিত্র হোক, অস্তিত্বের গভীরে ঐক্য রয়েছে।

এই শ্লোকের আধ্যাত্মিক শিক্ষা তাই অত্যন্ত গভীর। মানুষকে নিজের মহৎ গুণের অহংকার থেকে মুক্ত হতে হবে এবং নিজের দুর্বলতার জন্য চিরস্থায়ী আত্মঘৃণায় ডুবে যাওয়াও উচিত নয়। জীবনের প্রতিটি অবস্থাকে আত্মজ্ঞান অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অহিংসা আমাদের অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে। সমতা আমাদের পরিস্থিতির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে। তুষ্টি আমাদের অন্তরের অকারণ অভাববোধ কমায়। তপস্যা আমাদের চরিত্রকে দৃঢ় করে। দান আমাদের হৃদয়কে প্রসারিত করে। যশ আমাদের অহংকারের পরীক্ষা নেয় এবং অযশ আমাদের অন্তরের স্থিতির পরীক্ষা নেয়।

সবশেষে বলা যায়, অহিংসা সমতা তুষ্টি তপস্যা দান যশ ও অযশের এই আলোচনা কেবল কয়েকটি সংস্কৃত শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করে না। এটি মানুষের সম্পূর্ণ জীবনকে একটি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়। মানুষের বাহ্যিক জীবন বহু অভিজ্ঞতায় বিভক্ত হলেও তার অন্তর্গত সত্য একটি গভীর ঐক্যের দিকে নির্দেশ করে। শ্রীকৃষ্ণের মত্ত এব পৃথগ্বিধাঃ বক্তব্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবনের বিচিত্র ভাবগুলোর পেছনে একটি পরম উৎস রয়েছে। তাই মহৎ গুণের জন্য অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা; প্রতিকূলতার জন্য হতাশা নয়, আত্মজ্ঞান; যশের জন্য উন্মাদনা নয়, সমতা; অযশের জন্য ভেঙে পড়া নয়, আত্মপর্যালোচনা হওয়া উচিত। এই উপলব্ধিই মানুষকে ধীরে ধীরে বাহ্যিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে উঠে অন্তরের স্থিরতা, বিনয়, করুণা এবং ঈশ্বরচেতনার দিকে নিয়ে যায়।


বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 19, 2026 August 19, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি