শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.৬ — সপ্তর্ষি, মনু ও সৃষ্টিজগতের ঈশ্বরীয় উৎসের তত্ত্ব
মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারো মনবস্তথা।
মদভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ।।৬।।
অনুবাদঃ সপ্ত মহর্ষি, তাঁদের পূর্বজাত সনকাদি চার কুমার ও চতুর্দশ মনু, সকলেই আমার মন থেকে উৎপন্ন হয়ে আমা হতে জন্মগ্রহণ করেছে এবং এই জগতের স্থাবর-জঙ্গম আদি সমস্ত প্রজা তাঁরাই সৃষ্টি করেছেনে।
ভগবদ্গীতার দশম অধ্যায় বিভূতি যোগে শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে তাঁর বিশ্বব্যাপী সত্তা ও সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রকাশ করছেন। এই অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকে তিনি বলেন, মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারো মনবস্তথা। মদ্ভাবা মানসা জাতা যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ। এই শ্লোকের সহজ অর্থ হলো, সাতজন মহর্ষি এবং তাঁদের পূর্বে চারজন মনু আমার ভাব বা সত্তা থেকে এবং আমার মানসিক শক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছেন। তাঁদের থেকেই এই জগতের সমস্ত প্রজা বা জীবসমষ্টির বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু শ্লোকটিকে কেবল প্রাচীন ঋষি ও মনুদের জন্মবৃত্তান্ত হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। এর মধ্যে রয়েছে ঈশ্বর, চেতনা, সৃষ্টি, জ্ঞান, মানবসভ্যতা এবং জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের এক গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো মহর্ষি। মহা অর্থ মহান, বিশাল বা উচ্চতর এবং ঋষি বলতে বোঝায় জ্ঞানদ্রষ্টা বা সত্যের উপলব্ধিকারী। তাই মহর্ষি বলতে কেবল পণ্ডিত বা বিদ্বান ব্যক্তিকে বোঝায় না। ঋষি এমন একজন যিনি সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং সেই উপলব্ধিকে মানবসমাজের সামনে প্রকাশ করেছেন। এই কারণে সপ্ত মহর্ষি ভারতীয় ঐতিহ্যে জ্ঞান, তপস্যা, অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রতীক। এখানে সাত সংখ্যাটিও কেবল গণনার বিষয় নয়। ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরম্পরায় সাত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী সংখ্যা। সপ্তর্ষির ধারণার মাধ্যমে জ্ঞানের একটি প্রাচীন ও ধারাবাহিক ঐতিহ্যকে বোঝানো হয়েছে।
এরপর এসেছে পূর্বে শব্দটি। পূর্ব অর্থ আগে, প্রাচীন বা পূর্ববর্তী। এই শব্দটি নির্দেশ করে যে মহর্ষি ও মনুদের অবস্থান সৃষ্টির ধারায় অত্যন্ত প্রাচীন। তাঁদের সাধারণ মানুষের মতো পরবর্তী পর্যায়ের সৃষ্টি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং তাঁরা এমন এক আদিম স্তরের প্রতিনিধিত্ব করছেন যাঁদের মাধ্যমে জ্ঞান, মানবব্যবস্থা এবং জীবনের ধারাবাহিকতা পৃথিবীতে প্রকাশিত হয়েছে। এই কারণে শ্লোকটি মানবসভ্যতার দৃশ্যমান ইতিহাসের অনেক গভীরে গিয়ে একটি আদিম সৃষ্টিতত্ত্বের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
চত্বারো মনবস্তথা অংশে চারজন মনুর কথা বলা হয়েছে। মনু শব্দটি সংস্কৃত মন বা মনন ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। মনু ভারতীয় ঐতিহ্যে মানবসমাজের আদিপুরুষ, মানবযুগের অধিপতি এবং সামাজিক ও নৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন শাস্ত্রে মনু ও মন্বন্তর সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। তাই এখানে মনুকে কেবল একজন নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে দেখলে শব্দটির ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়ে যায়। মনু আসলে মানবসমাজের উৎপত্তি, নিয়ম, শৃঙ্খলা ও সভ্যতার বিকাশের একটি বৃহত্তর প্রতীক।
শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর অংশগুলোর একটি হলো মদ্ভাবা মানসা জাতা। মদ্ভাবা শব্দটি মৎ এবং ভাব থেকে গঠিত। মৎ অর্থ আমার এবং ভাব অর্থ সত্তা, প্রকৃতি, অবস্থা, স্বভাব বা অস্তিত্বের ধরন। সুতরাং মদ্ভাবা বলতে বোঝানো যায় আমার ভাব থেকে উদ্ভূত, আমার সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত অথবা আমার ঈশ্বরীয় প্রকৃতি থেকে প্রকাশিত। এখানে কৃষ্ণ কেবল বলছেন না যে মহর্ষি ও মনু তাঁর সৃষ্টি। তিনি আরও গভীর একটি সম্পর্কের কথা বলছেন। তাঁদের অস্তিত্বের মূল উৎস তাঁর পরম সত্তার সঙ্গে যুক্ত।
মানসা শব্দটি এসেছে মন বা মানস ধারণা থেকে। মানস অর্থ মনের সঙ্গে সম্পর্কিত বা মানসিক। আর জাতা শব্দটি সংস্কৃত জন ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ জন্ম নেওয়া, উৎপন্ন হওয়া বা প্রকাশিত হওয়া। ফলে মানসা জাতা বলতে বোঝায় মানসিকভাবে জন্মপ্রাপ্ত বা চেতনা ও সংকল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত। এই অভিব্যক্তি শ্লোকটির সৃষ্টিতত্ত্বকে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্তরে নিয়ে যায়। এখানে সৃষ্টি কেবল বস্তুগত প্রক্রিয়া নয়। সৃষ্টি প্রথমে চেতনা বা সংকল্পের মধ্যে সম্ভাবনা হিসেবে থাকে এবং পরে তা প্রকাশিত হয়।
মানুষের জীবনেও এই ধারণার একটি গভীর প্রতিফলন দেখা যায়। একটি বাড়ি নির্মাণের আগে বাড়িটির ধারণা মানুষের মনে জন্ম নেয়। একটি বই প্রকাশিত হওয়ার আগে তার ভাবনা লেখকের অন্তরে জন্ম নেয়। একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার আগে তার পরিকল্পনা কারও চেতনার মধ্যে তৈরি হয়। অর্থাৎ দৃশ্যমান সৃষ্টির আগে একটি অদৃশ্য ধারণা থাকে। অবশ্য ঈশ্বরীয় সৃষ্টিকে মানুষের নির্মাণের সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখা যায় না। এটি কেবল ধারণাটিকে বোঝার একটি উপমা। গীতার মানসা জাতা ধারণাটি ইঙ্গিত করে যে দৃশ্যমান বহুত্বের অন্তরালে একটি অদৃশ্য চৈতন্যগত উৎস রয়েছে।
এরপর শ্লোকে বলা হয়েছে যেষাং লোক ইমাঃ প্রজাঃ। যেষাং অর্থ যাঁদের এবং প্রজা অর্থ জন্মগ্রহণকারী জীবসমষ্টি বা সৃষ্ট জীব। লোক শব্দের অর্থ জগৎ, জীবনের ক্ষেত্র বা অস্তিত্বের পরিসর। ফলে এই অংশের অর্থ দাঁড়ায়, যাঁদের মাধ্যমে এই জগতের সমস্ত প্রজা বা জীবসমষ্টির বিস্তার ঘটেছে। এখানে একটি সৃষ্টির ধারাবাহিকতা প্রকাশিত হয়েছে। পরম সত্তা থেকে মহর্ষি ও মনুর প্রকাশ, তাঁদের মাধ্যমে জ্ঞান ও মানবব্যবস্থার বিকাশ এবং তার পরিণতিতে অসংখ্য জীবের বিস্তার। এই ধারাটি এক থেকে বহুতে প্রকাশের একটি দার্শনিক চিত্র তুলে ধরে।
এই শ্লোকের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্ন নিহিত রয়েছে। বহুত্বের উৎস কোথায়। আমরা পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি, চিন্তা ও অভিজ্ঞতা দেখতে পাই। কিন্তু এত বহুত্বের পেছনে কি কোনো ঐক্য রয়েছে। গীতার উত্তর হলো, রয়েছে। বহুত্বের অন্তরালে একটি পরম উৎস রয়েছে। অসংখ্য জীবের প্রকাশ হলেও তাদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। তারা একটি বৃহত্তর সত্তা ও সৃষ্টির ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই কারণে শ্লোকটি একত্বের মধ্যে বহুত্ব এবং বহুত্বের মধ্যে একত্ব উপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোককে পরম ব্রহ্মের একত্ব এবং জগতের বহুত্বের প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। চূড়ান্ত সত্য এক এবং সেই এক চৈতন্যের মধ্যেই নাম ও রূপের অসংখ্য প্রকাশ দেখা যায়। এই দৃষ্টিতে মদ্ভাবা শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জীব ও জগতের বহুত্বের অন্তরালে একই পরম চৈতন্যের উপস্থিতি রয়েছে। বহুত্ব মূল সত্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো বাস্তবতা নয়। বরং তা এক পরম সত্যের বিভিন্ন প্রকাশ হিসেবে উপলব্ধ হতে পারে।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে এই শ্লোকের অর্থ কিছুটা ভিন্নভাবে ধরা যায়। সেখানে ঈশ্বর, জীব ও জগতের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জীব ও জগত ঈশ্বরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত হলেও ঈশ্বরের সঙ্গে তাদের সম্পূর্ণ অভিন্নতা স্বীকার করা হয় না। এই দৃষ্টিতে মদ্ভাবা বোঝায় ঈশ্বরের সঙ্গে সৃষ্টির নির্ভরশীল ও অন্তর্নিহিত সম্পর্ক। সমস্ত সৃষ্টি পরমেশ্বরের ওপর নির্ভরশীল এবং তার অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি ঈশ্বরের মধ্যে নিহিত।
ভক্তির দৃষ্টিতে শ্লোকটির শিক্ষা আরও হৃদয়গ্রাহী। কৃষ্ণ যেন ভক্তকে বলছেন যে জগতের যে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, মহত্ত্ব এবং জীবনধারা আমরা দেখতে পাই তার অন্তরালে একটি পরম উৎস রয়েছে। তাই জগতের বিচিত্র রূপ দেখে কেবল বহুত্বে আটকে না থেকে সেই বহুত্বের উৎসের দিকে দৃষ্টি ফেরানোই আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। মহর্ষিদের মধ্যে জ্ঞান, মনুর মধ্যে মানবব্যবস্থা এবং প্রজাদের মধ্যে জীবনের অসংখ্য প্রকাশ দেখতে দেখতে ভক্ত পরমেশ্বরের ঐক্যবদ্ধ সত্তাকে অনুভব করতে পারে।
সপ্তর্ষি এখানে জ্ঞানের প্রতীক এবং মনু মানবসভ্যতার শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তাঁদের থেকে প্রজাদের বিস্তার জীবনের প্রকাশের প্রতীক। এই প্রতীকী পাঠে একটি সুন্দর ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। পরম চেতনা থেকে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে। জ্ঞান থেকে নীতি ও মানবব্যবস্থার বিকাশ হয়। সেই ব্যবস্থার মধ্যে জীবন ও সমাজের বিস্তার ঘটে। অর্থাৎ জ্ঞান, নৈতিকতা এবং জীবনকে বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর সৃষ্টির ধারার অংশ হিসেবে দেখা যায়।
এই শ্লোকের মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মানসা জাতা শব্দবন্ধটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের বহু বাহ্যিক কাজ প্রথমে তার অন্তর্জগতে জন্ম নেয়। একটি চিন্তা থেকে বিশ্বাস তৈরি হয়। বিশ্বাস থেকে সিদ্ধান্ত আসে। সিদ্ধান্ত থেকে কাজ হয়। কাজ থেকে অভ্যাস গড়ে ওঠে। অভ্যাস চরিত্রকে প্রভাবিত করে এবং চরিত্র শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকে গঠন করে। এই কারণে নিজের অন্তর্জগতের প্রতি সচেতন হওয়া আত্মোন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। মানুষ তার মনে কী ধারণ করছে এবং কীভাবে সেই ধারণাকে লালন করছে তা তার জীবনের গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাহিত্য ও সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপমা পাওয়া যায়। একজন কবির কবিতা প্রথমে কাগজে থাকে না। প্রথমে থাকে অনুভূতি। তারপর সেই অনুভূতি চিন্তায় রূপ নেয়। চিন্তা কল্পনায় পরিণত হয়। কল্পনা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে কবিতার রূপ লাভ করে। একইভাবে একজন শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রথমে তার অন্তর্জগতে জন্ম নেয়। পরে তা বাহ্যিক জগতে দৃশ্যমান হয়। এই অর্থে মানসা জাতা হলো অন্তর্জগত থেকে বহির্জগতের দিকে প্রকাশের একটি চিরন্তন প্রক্রিয়ার প্রতীক।
এই শ্লোক আমাদের অহংকার সম্পর্কেও গভীর শিক্ষা দেয়। মানুষ প্রায়ই মনে করে যে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তার সব ক্ষমতা কেবল তার নিজের অর্জন। কিন্তু গীতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি, জীবন, শরীর, প্রকৃতি, সমাজ, পূর্বপুরুষ এবং অসংখ্য অদৃশ্য কারণ তার অস্তিত্বকে গঠন করেছে। আরও গভীরে গেলে এই সমস্ত কারণের অন্তরালে একটি পরম কারণের সন্ধান পাওয়া যায়। ফলে আত্মজ্ঞান মানুষকে অহংকারের দিকে নয়, বরং কৃতজ্ঞতা, বিনয় ও বৃহত্তর সত্যের উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়।
দশম অধ্যায়ের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেও এই শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভূতি যোগে কৃষ্ণ তাঁর বিভিন্ন ঐশ্বরিক প্রকাশের কথা বলছেন। তিনি দেখাচ্ছেন যে জগতের মহান ও বিশিষ্ট সব কিছুর মধ্যেই তাঁর প্রকাশ উপলব্ধ করা যায়। ষষ্ঠ শ্লোকে সেই শিক্ষা আরও বিস্তৃত হয়ে সৃষ্টির প্রাচীন জ্ঞানধারা, মানবব্যবস্থা এবং জীবসমষ্টির উৎপত্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কৃষ্ণ এখানে কেবল একটি নির্দিষ্ট সৃষ্টির কথা বলছেন না। তিনি নিজেকে সমগ্র সৃষ্টির গভীরতম কারণ ও ভিত্তি হিসেবে প্রকাশ করছেন।
এই শ্লোকের একটি সুন্দর উপমা হতে পারে একটি বিশাল বৃক্ষ। আমরা যখন একটি বিশাল বৃক্ষ দেখি তখন তার অসংখ্য পাতা, ডাল, শাখা ও ফল দেখতে পাই। কিন্তু সেই বিশালতার অন্তরালে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র বীজ। বীজের মধ্যে গাছটি দৃশ্যমান অবস্থায় থাকে না, কিন্তু তার সম্ভাবনা থাকে। উপযুক্ত পরিবেশে সেই সম্ভাবনা প্রকাশিত হয়ে বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়। একইভাবে পরম সত্তার মধ্যে সৃষ্টির সম্ভাবনা নিহিত এবং সেই সম্ভাবনা বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে জীবনের অসংখ্য রূপে প্রকাশিত হয়। এই উপমা গীতার এক থেকে বহুতে প্রকাশের ভাবটিকে সহজভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
সবশেষে বলা যায়, ভগবদ্গীতা ১০.৬ কেবল সাত মহর্ষি ও চার মনুর উল্লেখ করা কোনো প্রাচীন শ্লোক নয়। এটি সৃষ্টির উৎস, চেতনার প্রকৃতি, জ্ঞানের উৎপত্তি, মানবসভ্যতার বিকাশ এবং জীবনের বহুত্বের অন্তরালে থাকা একত্ব সম্পর্কে একটি গভীর দার্শনিক ঘোষণা। মহর্ষি এখানে জ্ঞানের প্রতীক, মনু মানবব্যবস্থা ও সভ্যতার প্রতীক এবং প্রজা জীবনের বহুমাত্রিক প্রকাশের প্রতীক। মদ্ভাবা শব্দটি সৃষ্টির সঙ্গে পরম সত্তার অন্তর্নিহিত সম্পর্ককে প্রকাশ করে এবং মানসা জাতা শব্দবন্ধটি ইঙ্গিত দেয় যে প্রকাশিত জগতের পেছনে একটি সূক্ষ্ম চৈতন্যগত উৎস রয়েছে।
এই শ্লোকের চূড়ান্ত শিক্ষা হলো, আমরা যে বহুবিধ জগৎ দেখতে পাই তার অন্তরালে একটি গভীর ঐক্য রয়েছে। জ্ঞান, মানবসভ্যতা এবং জীবনের অসংখ্য প্রকাশ আলাদা আলাদা বলে মনে হলেও তাদের অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর সৃষ্টির ধারার সঙ্গে যুক্ত। তাই এই শ্লোক আমাদের বাহ্যিক জগতের বৈচিত্র্যের মধ্যে অন্তর্নিহিত ঐক্যকে দেখতে শেখায়। মানুষের নিজের জীবনেও এর প্রতিফলন রয়েছে। আমাদের চিন্তা আমাদের কর্মকে প্রভাবিত করে, কর্ম অভ্যাসকে গঠন করে, অভ্যাস চরিত্রকে গড়ে তোলে এবং চরিত্র জীবনকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করে। সেই কারণে নিজের অন্তর্জগতকে শুদ্ধ ও সচেতন করা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির বিষয় নয়, বরং গীতার বৃহত্তর আধ্যাত্মিক শিক্ষার অংশ।
অতএব মহর্ষয়ঃ সপ্ত পূর্বে চত্বারো মনবস্তথা এই পঙক্তি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবনের বহুত্বের পেছনে রয়েছে এক গভীর উৎস, জ্ঞানের পেছনে রয়েছে চেতনা এবং দৃশ্যমান সৃষ্টির পেছনে রয়েছে এক অদৃশ্য পরম সত্য। সেই সত্যকে উপলব্ধি করার মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের সীমিত পরিচয় অতিক্রম করে বিশ্বসত্তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক অনুভব করতে পারে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!