সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১০.৭ — ঈশ্বরের বিভূতি ও যোগ তত্ত্বজ্ঞান এবং অবিচল যোগের শিক্ষা

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।সোহবিকল্পেন যোগেন যুজ্যতে নাত্র সংশয়ঃ।।৭।।
এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
সোহবিকল্পেন যোগেন যুজ্যতে নাত্র সংশয়ঃ।।৭।।

অনুবাদঃ ‍যিনি আমার এই বিভূতি ও যোগ যথার্থরূপে জানেন, তিনি অবিচলিতভাবে ভক্তিযোগে যুক্ত হন। সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায় জ্ঞানবিজ্ঞান যোগের সপ্তম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ঐশ্বরিক স্বরূপ, বিশ্বজগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং সেই সত্যকে উপলব্ধি করার ফলে মানুষের চেতনায় যে স্থিরতা জন্ম নেয়, তার একটি গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। শ্লোকটির প্রচলিত পাঠ হলো “এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ। সোহবিকম্পেন যোগেন যুজ্যতে নাত্র সংশয়ঃ।” এর সরল অর্থ হলো, যে ব্যক্তি আমার এই বিভূতি এবং যোগকে তত্ত্বত জানে, সে অবিচল যোগের দ্বারা আমার সঙ্গে যুক্ত হয়। এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। এই সংক্ষিপ্ত শ্লোকের মধ্যে জ্ঞান, ঈশ্বরতত্ত্ব, বিশ্বদর্শন, আত্মোপলব্ধি এবং মানসিক স্থিরতার একটি গভীর সমন্বয় রয়েছে।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “এতাং”। এটি সংস্কৃত নির্দেশবাচক সর্বনাম থেকে গঠিত এবং এর অর্থ এই বা এইটিকে। এখানে শব্দটি পূর্বে আলোচিত কৃষ্ণের ঐশ্বরিক প্রকাশের দিকে নির্দেশ করছে। অর্থাৎ কৃষ্ণ হঠাৎ কোনো বিচ্ছিন্ন ধারণা উপস্থাপন করছেন না। তিনি যে বিষয়গুলি পূর্বে ব্যাখ্যা করেছেন, সেই সমস্ত বিষয়কে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করার কথা বলছেন। এই নির্দেশের মধ্যে একটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। সত্যকে বোঝার জন্য বিচ্ছিন্ন তথ্য যথেষ্ট নয়। একটি ধারণাকে তার পূর্বাপর সম্পর্কের মধ্যে বুঝতে হয়। জ্ঞান তখনই গভীর হয় যখন তা একটি বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়।

এরপর এসেছে “বিভূতিং” শব্দটি। বিভূতি শব্দটি সংস্কৃত “ভূ” ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার মূল অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। এর সঙ্গে “বি” উপসর্গ যুক্ত হয়ে বিশেষ বা স্বতন্ত্র প্রকাশের ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। তাই বিভূতি বলতে বোঝায় বিশেষ ঐশ্বর্য, মহিমা, গৌরব, শক্তির অসাধারণ প্রকাশ কিংবা কোনো কিছুর মধ্যে প্রকাশিত মহত্ত্ব। গীতার প্রেক্ষাপটে বিভূতি বলতে জগতের বিভিন্ন শক্তিশালী, সুন্দর, মহৎ ও বিস্ময়কর প্রকাশের মধ্যে ঈশ্বরের ঐশ্বরিক মহিমাকে বোঝানো হয়েছে। সূর্যের দীপ্তি, পর্বতের বিশালতা, নদীর প্রবাহ, জ্ঞানের মহত্ত্ব, সাহসের শক্তি কিংবা কোনো মহান চরিত্রের অসাধারণ গুণ যখন মানুষের মনে বিশ্বসত্তার মহিমার অনুভূতি জাগায়, তখন তাকে বিভূতির ধারণার মাধ্যমে বোঝা যায়। এই অর্থে বিভূতি হলো সীমিতের মধ্যে অসীমের বিশেষ প্রকাশ।

এরপর রয়েছে “যোগং” শব্দটি। যোগ শব্দটি সংস্কৃত “যুজ্” ধাতু থেকে এসেছে। যুজ্ ধাতুর অর্থ যুক্ত করা, সংযুক্ত হওয়া, একত্র করা বা কোনো কিছুর সঙ্গে নিজেকে নিবদ্ধ করা। সাধারণ ব্যবহারে যোগ বলতে শরীরচর্চা বা ধ্যানের একটি পদ্ধতিকে বোঝানো হলেও গীতার দর্শনে যোগের অর্থ অনেক বিস্তৃত। যোগ হলো বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ঐক্য উপলব্ধি করা এবং নিজের চেতনাকে সত্যের সঙ্গে যুক্ত করা। এখানে বিভূতি এবং যোগ পাশাপাশি ব্যবহৃত হওয়ার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বিভূতি আমাদের ঈশ্বরের প্রকাশ দেখতে শেখায় এবং যোগ সেই প্রকাশের সঙ্গে নিজের চেতনার সম্পর্ক স্থাপন করতে শেখায়। শুধু জগতের সৌন্দর্য দেখে বিস্মিত হওয়া যথেষ্ট নয়। সেই সৌন্দর্যের অন্তর্নিহিত ঐক্যকে উপলব্ধি করাই যোগের গভীরতর উদ্দেশ্য।

“চ” শব্দটি এখানে এবং অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভূতি এবং যোগকে একত্র করা হয়েছে। অর্থাৎ ঈশ্বরের ঐশ্বরিক প্রকাশকে জানা এবং সেই প্রকাশের সঙ্গে তাঁর যোগ বা বিশ্বব্যাপী সম্পর্ককে জানা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিষয়। তারপর এসেছে “মম” শব্দটি, যার অর্থ আমার। কৃষ্ণ এখানে নিজের ঐশ্বরিক স্বরূপের কথা বলছেন। তিনি শুধু একজন নৈতিক শিক্ষক হিসেবে কথা বলছেন না। তিনি জগতের অন্তর্নিহিত ঐক্য এবং নিজের সঙ্গে সেই জগতের সম্পর্কের কথা ঘোষণা করছেন। “মম বিভূতি” অর্থ আমার ঐশ্বরিক মহিমা এবং “মম যোগ” অর্থ আমার ঐশ্বরিক শক্তির সেই ব্যবস্থা যার মাধ্যমে বহুরূপী জগৎ এক বৃহত্তর সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

“যঃ” শব্দের অর্থ যে ব্যক্তি বা যিনি। এরপর এসেছে “বেত্তি”। এটি সংস্কৃত “বিদ্” ধাতু থেকে এসেছে এবং এর অর্থ জানা বা উপলব্ধি করা। কিন্তু এই জানা সাধারণ তথ্য জানার মতো নয়। কারণ তার পরেই রয়েছে “তত্ত্বতঃ” শব্দটি। তত্ত্বতঃ অর্থ প্রকৃত স্বরূপ অনুযায়ী, যথার্থভাবে বা তত্ত্বের দৃষ্টিতে। “তত্ত্ব” শব্দটি গঠিত হয়েছে “তৎ” এবং “ত্ব” এর সমন্বয়ে। তৎ অর্থ সেই বা তা এবং ত্ব কোনো কিছুর প্রকৃত অবস্থা বা স্বরূপ নির্দেশ করে। ফলে তত্ত্ব অর্থ কোনো কিছুর প্রকৃত সত্তা। সেই কারণে “তত্ত্বতঃ জানা” মানে কোনো বিষয় সম্পর্কে শোনা বা মুখস্থ করা নয়। এর অর্থ সেই বিষয়ের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা।

এই “বেত্তি তত্ত্বতঃ” অংশটি গীতার জ্ঞানতত্ত্ব বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ অনেক কিছু সম্পর্কে তথ্য জানতে পারে, কিন্তু তথ্য আর উপলব্ধি এক বিষয় নয়। কেউ যদি জানে যে ক্রোধ মানুষের ক্ষতি করে, কিন্তু সামান্য উত্তেজনায় নিজের ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে তার কাছে তথ্য আছে, কিন্তু সেই জ্ঞান এখনো তার চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অন্যদিকে যে ব্যক্তি নিজের অন্তরের ক্রোধের প্রকৃতি উপলব্ধি করেছে, সে ক্রোধকে নিজের প্রকৃত সত্তা বলে মনে করবে না। এই পরিবর্তনই জ্ঞানকে তত্ত্বজ্ঞান করে তোলে। গীতার ভাষায় সত্যিকারের জ্ঞান মানুষের অস্তিত্বকে পরিবর্তিত করে।

এরপর এসেছে “সঃ” শব্দটি, যার অর্থ সে বা সেই ব্যক্তি। “যঃ” এবং “সঃ” মিলে একটি সম্পর্ক তৈরি করেছে। যে ব্যক্তি তত্ত্বত জানে, সেই ব্যক্তি একটি বিশেষ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে জ্ঞানের পরিণতি সরাসরি পরবর্তী শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেই শব্দ হলো “অবিকম্পেন”। আপনার দেওয়া পাঠে “অবিকল্পেন” শব্দটি রয়েছে, কিন্তু গীতার প্রচলিত পাঠে এখানে “অবিকম্পেন” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। অবিকম্প শব্দটি “অ” এবং “বিকম্প” এর সমন্বয়ে গঠিত। বিকম্প অর্থ কম্পন, কাঁপন বা বিচলন এবং অ অর্থ তার অভাব। ফলে অবিকম্প অর্থ যা বিচলিত হয় না, যা অটল, যা স্থির এবং যা সহজে কেঁপে ওঠে না। “অবিকম্পেন” অর্থ অবিচলভাবে বা অটল যোগের দ্বারা।

এই অবিকম্পতার ধারণাটি শ্লোকটির অন্যতম গভীর শিক্ষা। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ নানা ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। সাফল্য আসে এবং চলে যায়। সম্পদ আসে এবং হারিয়ে যেতে পারে। প্রশংসা যেমন আসে, তেমনি নিন্দাও আসে। প্রিয় মানুষ কাছে থাকে আবার কখনো দূরে চলে যায়। শরীর পরিবর্তিত হয়, পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয় এবং মানুষের সামাজিক অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে। যদি মানুষের অন্তরের স্থিরতা সম্পূর্ণভাবে এই পরিবর্তনশীল বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করে, তাহলে তার মনও ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকবে। কিন্তু তত্ত্বজ্ঞান মানুষকে এমন একটি অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রের সন্ধান দেয় যা বাহ্যিক পরিবর্তনের তুলনায় গভীরতর। সেই কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকাই অবিকম্পতার প্রতীক।

এরপর এসেছে “যোগেন” শব্দটি। এটি যোগ শব্দের তৃতীয়া বিভক্তির রূপ এবং এর অর্থ যোগের দ্বারা বা যোগের মাধ্যমে। তারপর “যুজ্যতে” শব্দটি এসেছে, যার উৎসও যুজ্ ধাতু। এর অর্থ যুক্ত হয়, সংযুক্ত থাকে বা যোগ লাভ করে। এখানে একটি চমৎকার ভাবগত সম্পর্ক দেখা যায়। যোগ শব্দটি যে ঐক্য বা সংযোগের কথা বলে, যুজ্যতে সেই সংযোগে প্রবেশ করার ক্রিয়াকে প্রকাশ করে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈশ্বরের বিভূতি এবং যোগকে তত্ত্বত উপলব্ধি করে, সে সেই উপলব্ধির মাধ্যমে একটি অবিচল আধ্যাত্মিক সংযোগে প্রতিষ্ঠিত হয়।

শ্লোকের শেষাংশ হলো “নাত্র সংশয়ঃ”। ন অর্থ না এবং অত্র অর্থ এখানে বা এই বিষয়ে। সংশয় অর্থ সন্দেহ, দ্বিধা, অনিশ্চয়তা বা মানসিক দোটানা। কৃষ্ণ বলছেন, এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই। এই বক্তব্যের মধ্যে গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। অজ্ঞতা থেকে সংশয় জন্মায়। অসম্পূর্ণ জ্ঞান মানুষকে দ্বিধায় রাখে। কিন্তু সত্যকে তত্ত্বত উপলব্ধি করলে চেতনার মধ্যে একটি দৃঢ়তা জন্মায়। তাই এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত ধারাটি হলো অজ্ঞতা থেকে সংশয়, সংশয় থেকে অনুসন্ধান, অনুসন্ধান থেকে তত্ত্বজ্ঞান এবং তত্ত্বজ্ঞান থেকে অবিচলতা।

দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক বহুত্বের মধ্যে ঐক্য উপলব্ধির শিক্ষা দেয়। আমরা পৃথিবীতে অসংখ্য নাম, রূপ, ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু এবং শক্তি দেখতে পাই। বাহ্যিকভাবে তারা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক বলে মনে হয়। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে এই বহুত্বের পেছনে একটি বৃহত্তর ঐক্য রয়েছে। বিভূতি হলো সেই এক সত্যের বিভিন্ন প্রকাশ এবং যোগ হলো সেই প্রকাশগুলোর অন্তর্নিহিত ঐক্য উপলব্ধির পথ। অদ্বৈত দর্শনের আলোকে বলা যায়, বহুরূপী জগতের অন্তরে এক চৈতন্যের উপলব্ধি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে। ভক্তি দর্শনের আলোকে বলা যায়, জগতের মহিমার মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ অনুভব করলে ভক্তির বিশ্বাস গভীর হয়। কর্মযোগের দৃষ্টিতে বলা যায়, ঈশ্বরীয় সত্যে প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ বাহ্যিক ফলাফলের দ্বারা অতিরিক্ত বিচলিত না হয়ে নিজের কর্তব্য পালন করতে পারে।

এই শ্লোকের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। মানুষের মন সাধারণত বাহ্যিক পরিস্থিতির সঙ্গে ওঠানামা করে। প্রশংসায় সে আনন্দিত হয় এবং নিন্দায় ভেঙে পড়ে। লাভে সে আশাবাদী হয় এবং ক্ষতিতে হতাশ হয়। সাফল্যকে নিজের পরিচয় মনে করলে ব্যর্থতা তার আত্মপরিচয়কে আঘাত করে। কিন্তু যদি মানুষ বুঝতে পারে যে বাহ্যিক ঘটনা তার জীবনের একটি অংশ মাত্র, তার সম্পূর্ণ সত্তা নয়, তখন সে ধীরে ধীরে অন্তর্গত স্থিরতা অর্জন করতে পারে। অবিকম্প যোগ তাই অনুভূতিহীনতার শিক্ষা নয়। এটি আবেগকে অস্বীকার করার শিক্ষা নয়। বরং আবেগের মধ্যেও নিজের গভীরতর কেন্দ্রকে হারিয়ে না ফেলার শিক্ষা।

এই বিষয়টি একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। সমুদ্রের উপরিভাগে ক্রমাগত ঢেউ ওঠে এবং নামে। কখনো ঢেউ শান্ত, কখনো উত্তাল। কিন্তু সমুদ্রের গভীরতা উপরিভাগের ঢেউয়ের তুলনায় অনেক বেশি স্থির। মানুষের মনও অনেকটা এমন। জীবনের ঘটনা হলো সমুদ্রের ঢেউ এবং মানুষের গভীরতর চেতনা হলো সমুদ্রের গভীর স্তর। যে ব্যক্তি প্রতিটি বাহ্যিক পরিবর্তনকে নিজের অস্তিত্বের সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে করে, সে প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে দুলতে থাকে। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের গভীরতর সত্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে শেখে, সে জীবনের ঢেউয়ের মধ্যেও এক ধরনের অন্তর্গত স্থিরতা বজায় রাখতে পারে।

আধুনিক জীবনে এই শিক্ষার গুরুত্ব আরও বেশি। আজ মানুষ অসংখ্য তথ্য, মতামত, আকাঙ্ক্ষা এবং তুলনার মধ্যে বাস করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে হতে পারে। অর্থনৈতিক পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ মানুষের মনকে ক্রমাগত অস্থির করে তুলতে পারে। এই অবস্থায় গীতার অবিকম্প যোগের শিক্ষা মানুষকে নিজের অন্তর্গত কেন্দ্রের দিকে ফিরে যেতে আহ্বান করে। বাইরের পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করা সবসময় সম্ভব নয়, কিন্তু নিজের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ এবং চেতনার সঙ্গে সম্পর্ককে গভীর করা সম্ভব।

সাহিত্যিক ও প্রতীকী অর্থেও বিভূতি এবং অবিকম্পতার মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক রয়েছে। বিভূতি হলো আলো, মহিমা, সৌন্দর্য এবং শক্তির প্রকাশ। অবিকম্প হলো সেই আলো উপলব্ধি করার পর অন্তরে জন্ম নেওয়া স্থিরতা। একটি পাহাড়কে এখানে অবিকম্পতার প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা যায়। ঝড় আসে, বৃষ্টি নামে, বজ্রপাত হয়, ঋতু পরিবর্তিত হয়, কিন্তু পাহাড় নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষের জীবনেও একইভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে থাকে। কিন্তু তত্ত্বজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের গভীরতর সত্যের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে।

এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে ঈশ্বরকে জানা মানে কেবল ঈশ্বর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা নয়। ঈশ্বর সম্পর্কে অসংখ্য শাস্ত্র পড়া যেতে পারে, অসংখ্য তত্ত্ব আলোচনা করা যেতে পারে এবং অসংখ্য শব্দ মুখস্থ করা যেতে পারে। কিন্তু সেই জ্ঞান যদি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্র এবং অন্তরের স্থিরতা পরিবর্তন না করে, তাহলে তা এখনো তত্ত্বত জ্ঞানে পরিণত হয়নি। তত্ত্বজ্ঞান তখনই জীবন্ত হয় যখন তা মানুষের আচরণে, চিন্তায় এবং অস্তিত্বের অনুভূতিতে প্রকাশ পায়।

এই কারণে “এতাং বিভূতিং যোগং চ মম যো বেত্তি তত্ত্বতঃ” শুধু একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি মানুষের জ্ঞানলাভের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গভীর বক্তব্য। এখানে বলা হচ্ছে, জগতের বিচিত্র প্রকাশকে দেখো, সেই প্রকাশের অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক ঐক্যকে বোঝো এবং সেই সত্যকে নিজের চেতনার সঙ্গে যুক্ত করো। তখন জ্ঞান আর কেবল মস্তিষ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা ধীরে ধীরে জীবনের ভিত্তিতে পরিণত হবে। আর সেই ভিত্তি থেকেই জন্ম নেবে অবিকম্পতা।

সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় শিক্ষা হলো সত্যিকারের জ্ঞান মানুষের মধ্যে স্থিরতা সৃষ্টি করে। বিভূতি আমাদের শেখায় জগতের মহিমার মধ্যে ঈশ্বরীয় প্রকাশ অনুভব করতে। যোগ শেখায় সেই প্রকাশের সঙ্গে নিজের চেতনাকে যুক্ত করতে। তত্ত্বত জ্ঞান শেখায় বাহ্যিক রূপের অন্তরে প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান করতে। অবিকম্প যোগ শেখায় সেই সত্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে। আর সংশয়ের অবসান ঘটে যখন জ্ঞান কেবল ধারণা না থেকে জীবন্ত উপলব্ধিতে পরিণত হয়। এই অর্থে শ্লোকটি মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রার একটি গভীর সূত্র প্রকাশ করে। বহুত্বের মধ্যে ঐক্যকে দেখা, ঐক্যের মধ্যে ঈশ্বরীয় সত্যকে উপলব্ধি করা এবং সেই উপলব্ধির মধ্যে অবিচল থাকা, এই পথেই মানুষ বাহ্যিক অস্থিরতার মধ্যেও অন্তরের শান্তি ও স্থিরতার সন্ধান পেতে পারে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 19, 2026 August 19, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি