শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.১ — বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুনের উপলব্ধি
অর্জুন উবাচ
মদনুগ্রহায় পরমং গুহ্যমধ্যাত্মসংজ্ঞিতম্।
যত্ত্বয়োত্তং বচস্তেন মোহোহয়ং বিগতো মম।।১।।
অনুবাদঃ অর্জুন বললেন-আমার প্রতি অনুগ্রহ করে তুমি যে অধ্যাত্মতত্ত্ব সম্বন্ধীয় পরম গুহ্য উপদেশ আমাকে দিয়েছে, তার দ্বারা আমার এই মোহ দূর হয়েছে।
এই শ্লোকটির শুরুতেই অর্জুনের একটি গভীর মানসিক অবস্থার প্রকাশ ঘটে। তিনি কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করার পর বুঝতে পারেন যে, যাঁকে তিনি এতদিন নিজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আত্মীয়, সখা ও সহচর হিসেবে দেখে এসেছেন, তাঁর প্রকৃত সত্তা সেই পরিচয়ের অনেক ঊর্ধ্বে। এতদিন কৃষ্ণ তাঁর কাছে ছিলেন এমন একজন, যার সঙ্গে তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন, হাসতে পারেন, বন্ধুর মতো আচরণ করতে পারেন। কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের পর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখন তিনি তাঁর অতীতের প্রতিটি আচরণকে নতুন উপলব্ধির আলোয় বিচার করছেন।
“সখেতি মত্বা”—এর অর্থ, “তোমাকে বন্ধু মনে করে” বা “তোমাকে সখা মনে করে”। “সখে” শব্দটি “সখা” থেকে এসেছে, যার অর্থ বন্ধু, অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা হৃদয়ের কাছের মানুষ। “ইতি” অর্থ “এই বলে”, আর “মত্বা” এসেছে √মन् ধাতু থেকে, যার অর্থ মনে করা, ধারণা করা বা বিবেচনা করা। তাই “সখেতি মত্বা” শুধু একটি সাধারণ বাক্য নয়; এর মধ্যে অর্জুনের পূর্ববর্তী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি কৃষ্ণকে তাঁর বন্ধু হিসেবে জানতেন এবং সেই বন্ধুত্বের স্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতার মধ্যেই তাঁর সঙ্গে আচরণ করতেন।
এরপর আসে “প্রসভং”। এর অর্থ বেপরোয়াভাবে, অতিরিক্ত সাহসের সঙ্গে, যথাযথ সম্মান না রেখে বা অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার কারণে অবিনয়পূর্ণভাবে। অর্জুন স্বীকার করছেন যে কৃষ্ণকে বন্ধু মনে করার ফলে তিনি কখনো এমনভাবে কথা বলেছেন বা আচরণ করেছেন, যা কৃষ্ণের প্রকৃত মহিমার তুলনায় যথাযথ ছিল না। এখানে মানুষের সম্পর্কের একটি গভীর সত্য প্রকাশ পায়—অতিরিক্ত পরিচিতি ও ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় মানুষের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি করে যে, “সে তো আমার আপনজন”, ফলে তার প্রকৃত মর্যাদা ও গভীরতাকে আমরা অজান্তেই উপেক্ষা করতে পারি।
“যদুক্তং” অর্থ “যা বলা হয়েছে” বা প্রসঙ্গ অনুযায়ী “আমি যে কথাগুলি বলেছি”। “যৎ” অর্থ “যা”, আর “উক্ত” এসেছে √বচ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ বলা। তাই “প্রসভং যদুক্তং” অর্থ হলো—“আমি যে কথাগুলি বেপরোয়াভাবে বা অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার কারণে বলেছি।” অর্জুন এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট কথার কথা শুধু বলছেন না; কৃষ্ণের সঙ্গে পূর্বে যে বন্ধুসুলভ, অনানুষ্ঠানিক ও কখনো সীমা-অতিক্রমী আচরণ করেছেন, তার সামগ্রিক স্মৃতিই তাঁর মনে ফিরে আসছে।
এরপর তিনি বলেন—“হে কৃষ্ণ, হে যাদব, হে সখে।” এই তিনটি সম্বোধনের মধ্যে অর্জুনের পূর্ববর্তী সম্পর্কের তিনটি দিক প্রকাশিত হয়েছে। “হে কৃষ্ণ” হলো ব্যক্তিগত নাম, “হে যাদব” হলো বংশপরিচয়, আর “হে সখে” হলো অন্তরঙ্গ সম্পর্কের পরিচয়—“হে বন্ধু”। অর্থাৎ অর্জুন কৃষ্ণকে তাঁর পরিচিত মানবিক পরিচয়গুলোর মধ্য দিয়েই দেখতেন। তিনি তাঁকে কৃষ্ণ নামে ডাকতেন, যাদব বলে চিনতেন এবং নিজের সখা হিসেবে অনুভব করতেন। কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের পর তিনি উপলব্ধি করেন যে এই পরিচয়গুলো সত্য হলেও এগুলো কৃষ্ণের পূর্ণ সত্তাকে প্রকাশ করে না।
“অজানতা”—এই শব্দটির অর্থ “না জেনে”, “অজ্ঞাতসারে” বা “জানতে না পেরে”। এটি √জ্ঞা ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্জুন এখানে তাঁর ভুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি স্বীকার করছেন—তিনি কৃষ্ণের প্রকৃত মহিমা জানতেন না। তিনি ইচ্ছা করে কৃষ্ণকে অসম্মান করেননি। তাঁর দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কারণেই তাঁর আচরণে সীমাবদ্ধতা এসেছিল। এই স্বীকারোক্তির মধ্যে গভীর বিনয় রয়েছে। তিনি নিজের ভুলকে যুক্তি দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করছেন না; বরং নিজের অজ্ঞতাকেই স্বীকার করছেন।
“মাহিমানং” এসেছে “মহিমা” শব্দ থেকে। মহিমা অর্থ মহত্ত্ব, গৌরব, ঐশ্বর্য, ব্যাপ্তি বা অসীম শক্তি। কিন্তু এখানে কোনো সাধারণ ব্যক্তির খ্যাতি বা মর্যাদা বোঝানো হচ্ছে না। অর্জুন যে মহিমার কথা বলছেন, তা হলো কৃষ্ণের ঐশ্বরিক ও বিশ্বব্যাপী মহিমা। তিনি বিশ্বরূপে দেখেছেন এমন এক সত্তা যার মধ্যে সমগ্র বিশ্বজগৎ, দেবতা, জীব, সৃষ্টি, ধ্বংস, কাল এবং অস্তিত্বের অসংখ্য স্তর প্রকাশিত। তাই “মাহিমানং” শব্দটি শুধু “মহত্ত্ব” নয়; এটি অর্জুনের সামনে প্রকাশিত অসীমতার অনুভূতি।
“তবেদং”—“তব” অর্থ তোমার এবং “ইদম্” অর্থ এই। তাই “মাহিমানং তবেদং” অর্থ “তোমার এই মহিমা”। এখানে “এই” শব্দটিরও গভীর তাৎপর্য আছে। অর্জুন কোনো শোনা কথা বা কল্পিত মহিমার কথা বলছেন না। তিনি যে মহিমার কথা বলছেন, সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। বিশ্বরূপ দর্শনের মাধ্যমে তাঁর কাছে কৃষ্ণের অসীমতা সরাসরি অভিজ্ঞতার বিষয় হয়ে উঠেছে। তাই তাঁর আগের ধারণা এবং বর্তমান উপলব্ধির মধ্যে বিরাট পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
“ময়া” অর্থ “আমার দ্বারা”। এই ছোট শব্দটির মধ্যেও গভীর আত্মস্বীকার আছে। অর্জুন বলছেন—“আমার দ্বারাই এই আচরণ হয়েছে।” তিনি নিজের ভুলের জন্য অন্য কাউকে দোষ দিচ্ছেন না। সত্যিকারের আত্মজ্ঞান মানুষের মধ্যে এই ক্ষমতা সৃষ্টি করে যে সে নিজের ভুলের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করতে পারে। বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুন নিজের মহত্ত্ব নিয়ে অহংকার করেননি; বরং নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেছেন।
“প্রমাদাৎ” এসেছে “প্রমাদ” থেকে। এর অর্থ অসাবধানতা, অবহেলা, অচেতনতা, ভুল বা কোনো বিষয়ের প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়া। অর্জুন বলছেন, তাঁর আচরণ হয়তো প্রমাদের কারণে হয়েছে। অর্থাৎ তিনি তখন কৃষ্ণের প্রকৃত মহিমার গুরুত্ব উপলব্ধি করেননি। তিনি কৃষ্ণকে এত পরিচিত ও আপন মনে করতেন যে তাঁর অসীমতার কথা তাঁর দৈনন্দিন সম্পর্কের অনুভূতির আড়ালে ঢাকা পড়েছিল।
“প্রণয়েন” শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম কোমল ও সুন্দর শব্দ। “প্রণয়” অর্থ গভীর স্নেহ, ভালোবাসা, অন্তরঙ্গতা বা হৃদয়ের টান। “প্রণয়েন” অর্থ স্নেহের কারণে, ভালোবাসার বশে বা অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার কারণে। অর্জুন এখানে বুঝতে পারছেন যে তাঁর আচরণের মধ্যে কোনো বিদ্বেষ ছিল না। বরং কৃষ্ণের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের কারণেই তিনি এত স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলেন যে কৃষ্ণের ঐশ্বরিক মহিমার কথা অনেক সময় ভুলে যেতেন।
“বাপি” অর্থ “অথবা”, “হয়তো” বা “এমনও হতে পারে”। অর্থাৎ অর্জুন তাঁর আচরণের দুটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করছেন—প্রমাদ, অর্থাৎ অসাবধানতা; অথবা প্রণয়, অর্থাৎ গভীর স্নেহ। এর মাধ্যমে তিনি নিজের অতীত আচরণকে খুব সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করছেন। তিনি বুঝতে পারছেন যে মানুষের আচরণের পেছনে কখনো অজ্ঞতা থাকে, কখনো অসাবধানতা থাকে, আবার কখনো অতিরিক্ত ভালোবাসাও সীমা অতিক্রম করাতে পারে।
সবকিছু একত্র করলে অর্জুনের বক্তব্যের গভীর অর্থ দাঁড়ায়—“তোমাকে আমার বন্ধু মনে করে, তোমার প্রকৃত মহিমা না জেনে, ‘হে কৃষ্ণ, হে যাদব, হে বন্ধু’ বলে আমি যে কথাগুলি অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার বশে বলেছি, সেগুলি হয়তো আমার অসাবধানতা থেকে হয়েছে, অথবা তোমার প্রতি গভীর স্নেহের কারণেও হয়ে থাকতে পারে।”
এই কথার মধ্যে আসলে অর্জুনের দৃষ্টির একটি বিরাট পরিবর্তন প্রকাশিত হয়েছে। আগে তাঁর কাছে কৃষ্ণ ছিলেন “আমার বন্ধু”; এখন তিনি উপলব্ধি করছেন—“যিনি আমার বন্ধু, তিনিই অসীম।” আগে সম্পর্কের দিকটি তাঁর কাছে মুখ্য ছিল; এখন সেই সম্পর্কের অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক গভীরতা তাঁর সামনে প্রকাশিত হয়েছে। তাই তিনি বন্ধুত্বকে অস্বীকার করছেন না; বরং বন্ধুত্বের মধ্যেই ঈশ্বরীয় মহিমাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করছেন।
এখানে একটি গভীর দার্শনিক সত্য আছে—কাউকে চেনা এবং কাউকে সম্পূর্ণভাবে জানা এক বিষয় নয়। আমরা একজন মানুষকে বহু বছর ধরে চিনতে পারি, তার সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলতে পারি, তার অভ্যাস ও স্বভাব জানতে পারি; তবুও তার অন্তরের সম্পূর্ণ গভীরতা হয়তো আমাদের অজানা থেকে যেতে পারে। অর্জুন কৃষ্ণকে খুব ভালোভাবেই চিনতেন, কিন্তু তাঁর অসীম সত্তাকে চিনতেন না। তাই “অজানতা” শব্দটি মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার প্রতীক।
এই শ্লোকের মধ্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সম্পর্কও অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অর্জুনের কৃষ্ণপ্রেম ভুল ছিল না। তাঁর ভুল ছিল এই যে, সেই গভীর ঘনিষ্ঠতার মধ্যে তিনি কৃষ্ণের অসীম মহিমাকে সবসময় উপলব্ধি করতে পারেননি। অর্থাৎ সত্যিকারের ভালোবাসা শ্রদ্ধাকে ধ্বংস করে না; বরং ভালোবাসার সঙ্গে যখন গভীর উপলব্ধি যুক্ত হয়, তখন বন্ধুত্ব ভক্তিতে পরিণত হয়।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এর গভীর শিক্ষা রয়েছে। আমরা যাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ মনে করি, তাদের সঙ্গে অনেক সময় এমনভাবে কথা বলি যা অন্য কারও সঙ্গে বলতাম না। কারণ মনে হয়—“সে তো আমার আপনজন।” কিন্তু এই আপনত্ব যেন কখনো অপরের মর্যাদা ভুলিয়ে না দেয়। অর্জুনের উপলব্ধি আমাদের শেখায়, সত্যিকারের ঘনিষ্ঠতার মধ্যেও সচেতনতা ও শ্রদ্ধা থাকা দরকার।
আধ্যাত্মিক অর্থে এই শ্লোক আরও গভীর। মানুষ যখন পরম সত্যকে নিজের পরিচিত ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে, তখন সে সত্যের পূর্ণতা উপলব্ধি করতে পারে না। অর্জুন প্রথমে কৃষ্ণকে বন্ধু হিসেবে দেখেছিলেন; পরে বুঝলেন, সেই বন্ধুর মধ্যেই বিশ্বসত্তার প্রকাশ। অর্থাৎ সত্য আমাদের পরিচিত রূপের মধ্যে উপস্থিত থাকলেও তার প্রকৃত ব্যাপ্তি আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বড় হতে পারে।
সবশেষে এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত ভাব হলো—মানুষ যখন সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে, তখন তার অহংকার বাড়ে না; বরং সে নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখে। অর্জুনের মহত্ত্ব এই নয় যে তিনি কখনো ভুল করেননি; তাঁর মহত্ত্ব হলো, সত্য উপলব্ধি হওয়ার পর তিনি নিজের ভুল স্বীকার করতে পেরেছেন। “সখে” থেকে “মাহিমানং”, আর “প্রণয়” থেকে “প্রমাদ”—এই পুরো যাত্রার মধ্য দিয়ে একটি গভীর সত্য প্রকাশ পায়: যাকে আমরা খুব কাছের বলে জানি, তার মধ্যেও আমাদের ধারণার অতীত গভীরতা থাকতে পারে; আর সত্যিকারের জ্ঞান হলো সেই গভীরতার সামনে নিজের সীমাবদ্ধতাকে বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করতে পারা।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!