শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.১৩ — বিশ্বরূপে একের মধ্যে বহুর দর্শন
তত্রৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা।
অপশ্যদ্দেবদেবস্য শরীরে পান্ডবস্তদা।।১৩।।
অনুবাদঃ তখন অর্জুন পরমেশ্বর ভগবানের বিশ্বরূপে নানাভাবে বিভক্ত সমগ্র জগৎ একত্রে অবস্থিত দেখলেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের ত্রয়োদশ শ্লোক বিশ্বরূপ দর্শনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে সামনে নিয়ে আসে। শ্লোকে বলা হয়েছে, তত্রৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা। অপশ্যদ্দেবদেবস্য শরীরে পাণ্ডবস্তদা। অর্থাৎ তখন পাণ্ডব অর্জুন দেবদেবের সেই শরীরের মধ্যে সমগ্র জগতকে একস্থানে অবস্থিত এবং বহুভাবে বিভক্ত অবস্থায় দেখতে পেলেন। এই একটি শ্লোকের মধ্যে এমন এক গভীর বিশ্বদর্শন প্রকাশিত হয়েছে যেখানে এক এবং বহু, ঐক্য এবং বৈচিত্র্য, সীমিত ও অসীম, ব্যক্তি ও বিশ্ব এক আশ্চর্য সম্পর্কের মধ্যে ধরা পড়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদ তত্রৈকস্থং। শব্দটি তত্র এবং একস্থং এর সমন্বয়ে গঠিত। তত্র অর্থ সেখানে বা সেই অবস্থায়। একস্থং শব্দের মধ্যে এক এবং স্থ ধাতুর ভাব রয়েছে। স্থ ধাতুর অর্থ হলো থাকা, অবস্থান করা বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সেই অর্থে তত্রৈকস্থং বলতে বোঝায় সেখানে এক স্থানে অবস্থিত বা এক আধারের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের প্রসঙ্গে এর অর্থ কেবল একটি নির্দিষ্ট জায়গায় থাকা নয়। এখানে বোঝানো হয়েছে যে অসংখ্য বিচ্ছিন্ন সত্তা একটি মহাসত্তার মধ্যে একত্রে প্রতিষ্ঠিত। এই ধারণাটিই পরবর্তী প্রবিভক্তমনেকধা শব্দের সঙ্গে মিলিত হয়ে শ্লোকটির গভীরতম দর্শন সৃষ্টি করেছে।
জগৎ শব্দটির মধ্যেও রয়েছে একটি গভীর ভাব। সংস্কৃত জগৎ শব্দটি গতিশীলতা এবং পরিবর্তনের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। যে বিশ্ব সর্বদা চলছে, পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যাচ্ছে, সেটিই জগৎ। জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, ক্ষয় এবং বিলয় এই জগতের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। আমরা যে পৃথিবীকে স্থির বলে মনে করি, বাস্তবে তা কখনো স্থির নয়। মানুষ পরিবর্তিত হচ্ছে, প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে, সভ্যতা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সময়ের সঙ্গে সমগ্র অস্তিত্বের প্রকাশও পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই জগৎ শব্দটি শুধু পৃথিবী বা বিশ্ব অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে রয়েছে পরিবর্তনশীল সমগ্র অস্তিত্বের ধারণা।
এর পরের শব্দ কৃৎস্নং। কৃৎস্ন অর্থ সম্পূর্ণ, সমগ্র, সর্বাংশ বা কোনো অংশ বাদ না দিয়ে পুরোটা। অর্জুন এখানে জগতের কোনো একটি অংশ দেখেননি। তিনি সমগ্র জগতকে দেখেছেন। এই কৃৎস্ন শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বরূপ দর্শনের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো সামগ্রিকতা। সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা জগতকে খণ্ড খণ্ডভাবে দেখি। আমরা মানুষকে আলাদা দেখি, প্রাণীকে আলাদা দেখি, প্রকৃতিকে আলাদা দেখি, গ্রহ নক্ষত্রকে আলাদা দেখি এবং দেবতা বা অতিপ্রাকৃত শক্তিকেও আলাদা বলে কল্পনা করি। কিন্তু বিশ্বরূপের মধ্যে অর্জুন এমন একটি দৃষ্টি লাভ করেন যেখানে বিচ্ছিন্ন অংশগুলোর পরিবর্তে সমগ্র অস্তিত্ব একই মহারূপের মধ্যে প্রকাশিত হয়।
প্রবিভক্তম্ শব্দটি এসেছে বিভক্ত হওয়ার ধারণা থেকে। এর সঙ্গে সংস্কৃত ভজ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে ভাগ করা বা বিভাজনের ভাব রয়েছে। প্র এবং বি উপসর্গের মাধ্যমে বিভাজনের ভাব আরও সুস্পষ্ট হয়েছে। প্রবিভক্তম্ অর্থ বহুভাবে বিভক্ত, বিভিন্ন অংশে প্রকাশিত বা পৃথক পৃথক রূপে দৃশ্যমান। এর পরেই এসেছে অনেকধা। অনেক অর্থ বহু বা একের অধিক এবং ধা দ্বারা প্রকার বা পদ্ধতির ধারণা প্রকাশ পায়। তাই অনেকধা অর্থ অনেকভাবে বা বহুরূপে। প্রবিভক্তম্ অনেকধা একত্রে বোঝায় যে সমগ্র জগৎ অসংখ্য রূপ, অংশ এবং প্রকাশের মধ্যে বিভক্ত হয়ে আছে।
এখানেই শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর রহস্য নিহিত। একদিকে বলা হচ্ছে একস্থং, অর্থাৎ এক স্থানে প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে বলা হচ্ছে প্রবিভক্তম্ অনেকধা, অর্থাৎ বহুভাবে বিভক্ত। অর্থাৎ বিশ্ব এক এবং বহু একই সঙ্গে। বাহ্যিকভাবে আমরা বহুত্ব দেখি, কিন্তু সেই বহুত্ব একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। এই ধারণা ভারতীয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বহুর মধ্যে এক এবং একের মধ্যে বহুর প্রকাশ এই শ্লোকের একটি কেন্দ্রীয় সত্য।
অপশ্যৎ শব্দটি এসেছে দৃশ্য বা দর্শনের ধারণা থেকে। এর মূল ধাতু দৃশ্, যার অর্থ দেখা। কিন্তু এখানে অর্জুনের দেখা সাধারণ ইন্দ্রিয়ের দেখা নয়। কৃষ্ণের ঐশ্বরিক শক্তির মাধ্যমে অর্জুন এমন একটি দর্শন লাভ করেন যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টির বাইরে। তাই অপশ্যৎ শব্দটিকে শুধু চোখ দিয়ে দেখা হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। এটি প্রত্যক্ষ উপলব্ধি, গভীর সত্যের সাক্ষাৎ অনুভব এবং অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার প্রতীক। অর্জুন এখানে কোনো ধারণা শুনছেন না। তিনি কোনো তত্ত্ব নিয়ে কেবল চিন্তা করছেন না। তিনি সেই সত্যকে প্রত্যক্ষ করছেন।
দেবদেবস্য শব্দের অর্থ দেবতাদের দেবতার। দেব শব্দটি আলো, দীপ্তি এবং ঐশ্বরিকতার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। দেবদেব অর্থ দেবতাদেরও দেবতা। কৃষ্ণকে এখানে কেবল একজন ব্যক্তি বা সাধারণ দেবতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তাঁর বিশ্বরূপ এমন এক সর্বব্যাপী ঐশ্বরিক সত্তার প্রকাশ যার মধ্যে দেবতা, মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি এবং সমগ্র বিশ্বজগৎ স্থান লাভ করেছে। এই কারণে দেবদেবস্য শব্দটি কৃষ্ণের সর্বোচ্চ ঐশ্বরিক অবস্থানকে নির্দেশ করে।
শরীরে শব্দটির মধ্যেও বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণ অর্থে শরীর হলো দেহ। কিন্তু এখানে কৃষ্ণের শরীর সাধারণ মানবদেহ নয়। এটি বিশ্বরূপের আধার। সাধারণভাবে আমরা মনে করি একটি মানুষের শরীরের মধ্যে একটি ব্যক্তি অবস্থান করে। কিন্তু অর্জুন যে দৃশ্য দেখছেন সেখানে বিপরীত ঘটনা ঘটছে। সমগ্র জগতই যেন কৃষ্ণের শরীরের মধ্যে অবস্থান করছে। অর্থাৎ কৃষ্ণের শরীর এখানে মহাবিশ্ব ধারণকারী এক অসীম আধারে পরিণত হয়েছে। এই ধারণা ঈশ্বর এবং বিশ্বজগতের সম্পর্ককে বোঝার জন্য অত্যন্ত গভীর একটি প্রতীক তৈরি করে।
পাণ্ডব শব্দটি অর্জুনের পরিচয় নির্দেশ করে। তিনি পাণ্ডুর পুত্র বলে পাণ্ডব। কিন্তু গীতার দার্শনিক পাঠে অর্জুনকে শুধু মহাভারতের একজন বীর হিসেবে দেখলে এই শ্লোকের গভীরতা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। অর্জুন এখানে সত্যসন্ধানী মানবসত্তার প্রতীক। তিনি প্রশ্ন করেন, দ্বিধায় পড়েন, সংকটে ভোগেন এবং শেষ পর্যন্ত সত্যকে প্রত্যক্ষ করতে চান। তাঁর চোখের মাধ্যমে যেন সাধারণ মানুষ মহাবিশ্বের গভীর সত্যকে দেখার সুযোগ পায়।
তদা অর্থ তখন বা সেই সময়। কিন্তু এই শব্দটির মধ্যেও একটি সূক্ষ্ম তাৎপর্য রয়েছে। এটি শুধু সময়ের একটি মুহূর্তকে বোঝায় না। এটি এমন এক বিশেষ অবস্থাকে নির্দেশ করে যখন মানুষের সাধারণ দৃষ্টি পরিবর্তিত হয়ে যায়। অর্জুনের জন্য সেটিই ছিল এক রূপান্তরময় মুহূর্ত। তাঁর সামনে আর শুধু তাঁর বন্ধু কৃষ্ণ নেই। তাঁর সামনে প্রকাশিত হয়েছে এমন এক মহাসত্তা যার মধ্যে সমগ্র বিশ্বজগৎ অবস্থান করছে।
এই শ্লোকের দার্শনিক অর্থ বোঝার জন্য এক এবং বহু ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সাধারণ দৃষ্টি বহুত্বকে দেখে। আমরা অসংখ্য ব্যক্তি দেখি, অসংখ্য বস্তু দেখি, অসংখ্য প্রাণী দেখি এবং প্রত্যেককে পৃথক বলে মনে করি। কিন্তু গভীরতর দৃষ্টিতে দেখা যায় যে এই বহুত্বের প্রত্যেকটি বৃহত্তর একটি অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন একটি বিশাল বৃক্ষের অসংখ্য শাখা, পাতা, ফুল এবং ফল থাকলেও তাদের উৎস একই বৃক্ষ। তেমনি বিশ্বে অসংখ্য সত্তা থাকলেও তারা বৃহত্তর একটি অস্তিত্বের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বরূপ দর্শন সেই সত্যকে দৃশ্যমান করে।
অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোককে বহুর মধ্যে একের প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। নাম ও রূপ অসংখ্য হলেও তাদের অন্তর্নিহিত সত্য এক। সমুদ্রের মধ্যে অসংখ্য ঢেউ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি ঢেউকে পৃথক মনে হয়। কিন্তু কোনো ঢেউ সমুদ্র থেকে পৃথক নয়। ঢেউয়ের বৈচিত্র্য সমুদ্রের ঐক্যকে ধ্বংস করে না। একইভাবে জগতের অসংখ্য নাম ও রূপের অন্তরালে একটি মৌলিক ঐক্যের ধারণা উপলব্ধি করা যায়।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে এই শ্লোকের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে। সেখানে জগৎ ও জীব ঈশ্বরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং বিশ্বকে ঈশ্বরের শরীর হিসেবে ভাবা হয়। এই দৃষ্টিতে দেবদেবের শরীরে সমগ্র জগতের অবস্থান একটি অত্যন্ত অর্থবহ ধারণা। ঈশ্বর জগতের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নন। বরং জগৎ তাঁর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করে। ভক্তি দর্শনের দিক থেকেও এই শ্লোক কৃষ্ণের অসীম মহিমার প্রকাশ। অর্জুন এতদিন কৃষ্ণকে বন্ধু হিসেবে দেখেছেন। এখন তিনি বুঝতে পারছেন যে সেই পরিচিত বন্ধুর অন্তরালে এমন এক অসীম সত্তা রয়েছেন যাঁর মধ্যে সমগ্র বিশ্ব প্রকাশিত।
এই শ্লোকের মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও অত্যন্ত গভীর। কুরুক্ষেত্রের শুরুতে অর্জুনের দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক, বন্ধু এবং পরিচিত মানুষদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলেন। তাঁর আবেগ এত প্রবল ছিল যে বৃহত্তর কর্তব্য ও বাস্তবতাকে তিনি দেখতে পারছিলেন না। কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের মাধ্যমে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হয়। তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকীর্ণ পরিসর অতিক্রম করে সমগ্র অস্তিত্বকে দেখতে শুরু করেন। এই দৃষ্টির পরিবর্তনই তাঁর চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর।
মানবজীবনেও আমরা প্রায়ই নিজের সমস্যা, নিজের পরিচয় এবং নিজের দুঃখকে সমগ্র বাস্তবতা বলে মনে করি। কোনো একটি ব্যর্থতা আমাদের কাছে পুরো জীবনকে ব্যর্থ মনে করাতে পারে। কোনো একটি সম্পর্কের বিচ্ছেদ আমাদের কাছে পৃথিবীর সমস্ত আনন্দকে অর্থহীন মনে করাতে পারে। কিন্তু দৃষ্টির পরিধি যখন প্রসারিত হয় তখন বোঝা যায় যে ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা বৃহত্তর অস্তিত্বের একটি অংশ মাত্র। অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন সেই বৃহত্তর দৃষ্টির একটি শক্তিশালী প্রতীক।
এই শ্লোক আধুনিক সমাজের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে। মানুষ জাতি, ভাষা, ধর্ম, দেশ, রাজনৈতিক মত, অর্থনৈতিক অবস্থান এবং সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত। এই বৈচিত্র্য বাস্তব এবং মানবসভ্যতার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু বৈচিত্র্যকে যদি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বলে মনে করা হয়, তাহলে সংঘাত তৈরি হয়। বিশ্বরূপের ধারণা মনে করিয়ে দেয় যে বহুত্বের মধ্যেও একটি বৃহত্তর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ মানুষ থেকে আলাদা হলেও সকলেই বৃহত্তর মানবসমাজের অংশ। মানুষ প্রকৃতি থেকে আলাদা নয়। মানুষ প্রকৃতিরই একটি অংশ। এই উপলব্ধি পারস্পরিক দায়িত্ব এবং সহাবস্থানের চেতনাকে গভীর করতে পারে।
সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অসাধারণ। মাত্র কয়েকটি শব্দের মধ্যে কবি একটি বিশাল মহাজাগতিক দৃশ্য নির্মাণ করেছেন। তত্রৈকস্থং শব্দটি ঐক্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং প্রবিভক্তমনেকধা শব্দটি বহুত্বের অসীম বিস্তারকে সামনে আনে। একদিকে এক, অন্যদিকে বহু। একদিকে সমগ্রতা, অন্যদিকে অসংখ্য প্রকাশ। এই দ্বৈততার মধ্যেই শ্লোকটির কাব্যিক শক্তি নিহিত। মনে হয় যেন একটি অসীম আয়নার মধ্যে সমগ্র বিশ্ব নিজের অসংখ্য রূপে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এই ভাবকে একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বোঝা যায়। একটি বিশাল বৃক্ষের দিকে তাকালে আমরা অসংখ্য পাতা দেখতে পাই। প্রতিটি পাতা আলাদা। প্রতিটি শাখা আলাদা। ফুল ও ফলও আলাদা। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব একটি বৃক্ষের সঙ্গে যুক্ত। তেমনি অসংখ্য প্রাণী, মানুষ, প্রকৃতি, নক্ষত্র এবং জগতের বিভিন্ন শক্তি পৃথক রূপে প্রকাশিত হলেও তারা একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের মধ্যে সম্পর্কিত। আবার সমুদ্রের উদাহরণও এখানে প্রযোজ্য। ঢেউ অসংখ্য, কিন্তু জল এক। রূপ বহু, কিন্তু মৌলিক উপাদান একই।
এই কারণেই তত্রৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা কেবল একটি পৌরাণিক দৃশ্যের বর্ণনা নয়। এটি অস্তিত্বের একটি গভীর দর্শন। মানুষ সাধারণত জগতকে অংশে ভাগ করে বোঝে। কিন্তু বিশ্বরূপের দৃষ্টি অংশের পেছনে সমগ্রতাকে দেখতে শেখায়। আমরা যে পৃথিবীকে বিচ্ছিন্ন বস্তু ও ব্যক্তির সমষ্টি বলে দেখি, সেই পৃথিবীই একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে যুক্ত। এই উপলব্ধি মানুষের অহংকারকে কমাতে পারে এবং তাকে নিজের অস্তিত্বের বৃহত্তর সম্পর্ক সম্পর্কে সচেতন করতে পারে।
শ্লোকটির সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো দৃষ্টির পরিবর্তন। বাস্তবতা সবসময় শুধু আমাদের চোখের সামনে যা আছে তার সমান নয়। আমাদের দৃষ্টি সীমিত হতে পারে, কিন্তু অস্তিত্ব সীমিত নয়। অর্জুন যখন বিশ্বরূপ দেখলেন তখন তাঁর সামনে জগতের এমন একটি মাত্রা উন্মোচিত হলো যা সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। তাই তাঁর দর্শন আসলে একটি আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রতীক। তিনি শুধু কৃষ্ণকে নতুনভাবে দেখলেন না, তিনি সমগ্র বিশ্বকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করলেন।
সবশেষে বলা যায়, তত্রৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা শ্লোকাংশটি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ঐক্য ও বহুত্বের দর্শনের এক অনন্য প্রকাশ। তত্রৈকস্থং আমাদের জানায় যে সবকিছু একটি বৃহত্তর আধারে প্রতিষ্ঠিত। জগৎ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দৃশ্যমান বিশ্ব পরিবর্তনশীল। কৃৎস্নং নির্দেশ করে সমগ্রতাকে। প্রবিভক্তমনেকধা প্রকাশ করে অসীম বৈচিত্র্যকে। আর অপশ্যৎ নির্দেশ করে এমন এক প্রত্যক্ষ উপলব্ধিকে যা সাধারণ দৃষ্টির সীমা অতিক্রম করে। অর্জুন দেবদেবের শরীরে সমগ্র জগতকে দেখতে পেয়ে উপলব্ধি করেন যে বহুত্বের অন্তরালে একটি গভীর ঐক্য রয়েছে। এই শ্লোক যেন আমাদেরও প্রশ্ন করতে শেখায় আমরা কি কেবল বিচ্ছিন্ন রূপগুলোই দেখছি, নাকি সেই রূপগুলোর অন্তর্নিহিত ঐক্যকেও উপলব্ধি করতে পারছি। গীতার এই বিশ্বরূপ দর্শনের গভীরতম শিক্ষা তাই হতে পারে এই যে অসংখ্য রূপে প্রকাশিত হলেও অস্তিত্বের গভীরে একটি বৃহত্তর সমগ্রতা বিরাজমান এবং সেই সমগ্রতাকে উপলব্ধি করাই মানুষের দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধতা থেকে অসীমতার দিকে নিয়ে যায়।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!