শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.১৫ — বিশ্বরূপে অর্জুনের দিব্য দর্শন
অর্জুন উবাচ
পশ্যামি দেবাংস্তব দেব দেহে
সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসঙ্ঘান্।
ব্রহ্মাণমীশং কমলাসনস্থম্
ঋষীংশ্চ সর্বানুরাগাংশ্চ দিব্যান্।১৫।।
অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে দেব! তোমার দেহে দেবতাদের, বিবিধ প্রাণীদের, কমলাসনে স্থিত ব্রহ্মা, শিব, ঋষিদের ও দিব্য সর্পদেরকে দেখছি।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের পঞ্চদশ শ্লোক বিশ্বরূপদর্শনের এমন এক মুহূর্তকে তুলে ধরে, যখন অর্জুনের চোখের সামনে সমগ্র অস্তিত্বের বিচিত্র রূপ এক পরম ঐক্যের মধ্যে প্রকাশিত হয়। তিনি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলেন, তিনি কৃষ্ণের দেহে সমস্ত দেবতাকে দেখছেন, অসংখ্য জীবসমষ্টিকে দেখছেন, পদ্মাসনে উপবিষ্ট ব্রহ্মাকে দেখছেন, ঈশ্বরকে দেখছেন, সমস্ত ঋষিকে দেখছেন এবং দিব্য নাগদেরও দেখতে পাচ্ছেন। এই শ্লোকের গভীরতা বুঝতে হলে প্রথমেই এর প্রধান শব্দ পশ্যামি এর দিকে তাকাতে হয়। পশ্যামি অর্থ আমি দেখছি। সংস্কৃত পশ্যামি শব্দটি দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এখানে সাধারণ চোখে কোনো বস্তু দেখার অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। অর্জুন যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছেন তা সাধারণ ইন্দ্রিয়ের সীমার মধ্যে নয়। কৃষ্ণ তাঁকে দিব্যচক্ষু দিয়েছেন এবং সেই বিশেষ দৃষ্টির মাধ্যমে অর্জুন এমন এক বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করছেন যা সাধারণ মানুষের চোখে অদৃশ্য। তাই পশ্যামি শব্দটির মধ্যে শুধু দেখা নয়, প্রত্যক্ষ উপলব্ধি, অন্তর্দৃষ্টি এবং আধ্যাত্মিক দর্শনের অর্থও নিহিত রয়েছে।
এই পশ্যামি শব্দটির মধ্যেই শ্লোকটির আধ্যাত্মিক নাটকীয়তা লুকিয়ে আছে। এর আগে অর্জুন কৃষ্ণের মুখ থেকে তাঁর মহিমা, বিভূতি এবং সর্বব্যাপী স্বরূপের কথা শুনেছেন। কিন্তু শোনা আর দেখা এক বিষয় নয়। কোনো সত্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এক ব্যাপার এবং সেই সত্যকে নিজের চেতনার মধ্যে প্রত্যক্ষ করা সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার। অর্জুনের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে শ্রুত জ্ঞান দর্শনে পরিণত হয়েছে। তিনি আর কেবল শুনছেন না যে কৃষ্ণ সর্বত্র বিরাজমান। তিনি নিজের চোখে দেখছেন যে সমস্ত দেবতা, সমস্ত জীব এবং সমস্ত ঐশ্বরিক শক্তি কৃষ্ণের বিশ্বদেহের মধ্যেই অবস্থান করছে। তাই পশ্যামি এখানে জ্ঞান থেকে উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রতীক।
শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো দেব। দেব শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত দিভ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে দীপ্তি, আলো, উজ্জ্বলতা এবং ঐশ্বরিকতার ভাব নিহিত আছে। দেব বলতে তাই শুধু কোনো পৌরাণিক চরিত্রকে বোঝানো হয় না। দেব শব্দের গভীরে রয়েছে এমন এক শক্তির ধারণা যা মানুষের সীমিত অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে এবং যা কোনো না কোনোভাবে মহাজাগতিক শক্তির প্রকাশ। অর্জুন কৃষ্ণের দেহে সমস্ত দেবতাকে দেখতে পাচ্ছেন। এর অর্থ হলো বিভিন্ন দেবশক্তি পৃথক পৃথক কোনো চূড়ান্ত বাস্তবতা নয়। তারা একটি বৃহত্তর ঐশ্বরিক সমগ্রতার মধ্যে অবস্থিত। কৃষ্ণের বিশ্বরূপে দেবতাদের উপস্থিতি তাই বহুত্বের মধ্যেও ঐক্যের ঘোষণা।
এরপর আসে তব এবং দেহে শব্দ দুটি। তব অর্থ আপনার এবং দেহে অর্থ আপনার দেহে বা দেহের মধ্যে। এই দুটি শব্দ একত্রে শ্লোকটির দার্শনিক তাৎপর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অর্জুন বলছেন না যে তিনি কৃষ্ণের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য দেবতাকে দেখছেন। তিনি বলছেন যে কৃষ্ণের দেহের মধ্যেই তাদের দেখতে পাচ্ছেন। এখানে দেহ শব্দটি সাধারণ মানবদেহের অর্থে ব্যবহৃত নয়। এটি বিশ্বদেহের ধারণাকে প্রকাশ করছে। কৃষ্ণের দেহ এমন এক মহাজাগতিক দেহ যার মধ্যে সমগ্র সৃষ্টি ধারণ করা আছে। যে দেহের মধ্যে দেবতা, ঋষি, জীবজগৎ এবং অন্যান্য শক্তি অবস্থান করে তা আর সীমাবদ্ধ শরীর নয়। এটি সমগ্র অস্তিত্বের প্রতীক।
এই ধারণাটি ভারতীয় দর্শনের একটি গভীর চিন্তার সঙ্গে যুক্ত। আমরা সাধারণত জগতকে অসংখ্য পৃথক সত্তার সমষ্টি হিসেবে দেখি। মানুষ একদিকে, প্রকৃতি অন্যদিকে, দেবতা একদিকে, জীবজন্তু অন্যদিকে এবং জ্ঞান ও শক্তি যেন সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা বিষয়। কিন্তু বিশ্বরূপের দৃষ্টিতে এই বিভাজন ভিন্নভাবে দেখা যায়। সবকিছু একটি বৃহত্তর সমগ্রতার অংশ। বহুত্ব আছে, কিন্তু সেই বহুত্ব একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে অবস্থিত। কৃষ্ণের দেহ তাই শুধু একটি শরীর নয়। এটি অস্তিত্বের মহাসংহতি।
শ্লোকে ব্যবহৃত ভূতবিশেষসঙ্ঘান্ শব্দটিও অত্যন্ত গভীর। ভূত শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মূল ভাব হলো হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। সেই অর্থে ভূত বলতে অস্তিত্বশীল সত্তাকে বোঝানো যায়। বিশেষ অর্থ বৈশিষ্ট্য বা ভিন্নতা এবং সঙ্ঘ অর্থ সমষ্টি বা সমাবেশ। ভূতবিশেষসঙ্ঘান্ তাই বিভিন্ন প্রকার অস্তিত্বশীল জীবসত্তার সমষ্টি। অর্জুন শুধু দেবতাদের দেখছেন না। তিনি দেখছেন অসংখ্য ধরনের জীব এবং অস্তিত্বের বিভিন্ন রূপ। এর মাধ্যমে বিশ্বরূপের ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঈশ্বরীয় বাস্তবতা কোনো একটি বিশেষ শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অস্তিত্বের বহুবিধ প্রকাশই সেই মহারূপের অন্তর্ভুক্ত।
এরপর অর্জুন বলেন ব্রহ্মাণম্। এখানে ব্রহ্মা বলতে সৃষ্টির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা ব্রহ্মাকে বোঝানো হয়েছে। ব্রহ্মা এবং ব্রহ্ম শব্দ দুটি এক নয়। ব্রহ্মা হলেন পুরাণ ও ধর্মতত্ত্বে সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত দেবতা, আর ব্রহ্ম হলো পরম বাস্তবতা বোঝাতে ব্যবহৃত একটি দার্শনিক ধারণা। অর্জুন কৃষ্ণের বিশ্বরূপে ব্রহ্মাকেও দেখতে পাচ্ছেন। এর অর্থ অত্যন্ত গভীর। যিনি সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত, তিনিও সেই বিশ্বদেহের মধ্যে অবস্থান করছেন। অর্থাৎ সৃষ্টি নিজেই একটি বৃহত্তর পরম বাস্তবতার অন্তর্ভুক্ত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঈশম্ শব্দটি। ঈশ শব্দের সঙ্গে ঈশ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার অর্থ শাসন করা, অধিকার করা বা নিয়ন্ত্রণ করা। ঈশ অর্থ প্রভু, অধীশ্বর বা নিয়ন্তা। এই শ্লোকে প্রচলিত ব্যাখ্যায় ঈশ বলতে শিবকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ অর্জুন কৃষ্ণের বিশ্বরূপে ব্রহ্মা ও শিব উভয়কেই দেখছেন। সৃষ্টি এবং সংহার, উৎপত্তি এবং বিলয়, প্রকাশ এবং রূপান্তর, সবকিছুই সেই বিশ্বরূপের মধ্যে অবস্থান করছে। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাজাগতিক সত্য প্রকাশিত হয়। সৃষ্টি কখনো ধ্বংস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয় এবং ধ্বংসও সৃষ্টির বাইরে নয়। অস্তিত্বের বিভিন্ন পর্যায় একটি বৃহত্তর চক্রের অংশ।
ব্রহ্মাকে বলা হয়েছে কমলাসনস্থম্। কমল অর্থ পদ্ম, আসন অর্থ বসার স্থান এবং স্থ শব্দের মধ্যে অবস্থানের ধারণা রয়েছে। কমলাসনস্থ অর্থ পদ্মাসনে উপবিষ্ট। ভারতীয় সংস্কৃতিতে পদ্ম একটি অত্যন্ত গভীর প্রতীক। পদ্ম কাদামাটির মধ্যে জন্ম নেয় কিন্তু তার সৌন্দর্য ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ থাকে। তাই পদ্ম জগতের মধ্যে অবস্থান করেও জগতের কলুষতায় আবদ্ধ না থাকার প্রতীক। ব্রহ্মার পদ্মাসন সৃষ্টির পবিত্রতা এবং মহাজাগতিক সৃজনশীলতারও প্রতীক। অর্জুন যখন কৃষ্ণের বিশ্বদেহে পদ্মাসনে উপবিষ্ট ব্রহ্মাকে দেখেন তখন তিনি আসলে সৃষ্টিশক্তিকেও সেই মহাসমগ্রতার অন্তর্ভুক্ত দেখতে পান।
এরপর আসে ঋষীংশ্চ সর্বান্। ঋষি শব্দটি ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। ঋষি কেবল কোনো সাধক নন। তিনি সত্যের দ্রষ্টা। বৈদিক ঐতিহ্যে ঋষি সেই ব্যক্তি যিনি মন্ত্র ও সত্যকে উপলব্ধি করেছেন। তাই ঋষি শব্দের মধ্যে দর্শন, জ্ঞান এবং অন্তর্দৃষ্টির গভীর অর্থ নিহিত আছে। অর্জুন কৃষ্ণের বিশ্বরূপে সমস্ত ঋষিকে দেখতে পাচ্ছেন। এর অর্থ হলো মানবজাতির আধ্যাত্মিক জ্ঞানধারাও সেই বিশ্বদেহের অন্তর্ভুক্ত। সত্যের সন্ধান, জ্ঞানের অনুসন্ধান এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলোও মহাজাগতিক বাস্তবতার প্রকাশ।
শেষে অর্জুন বলেন উরাগাংশ্চ দিব্যান্। প্রচলিত পাঠে উরগ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। উরগ বলতে সর্প বা নাগকে বোঝানো হয়। এর ব্যুৎপত্তিগত ব্যাখ্যায় উরঃ এবং গ এর সমন্বয় থেকে এমন সত্তার ধারণা পাওয়া যায় যে বক্ষ বা উদর দিয়ে চলে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে নাগ বা সর্পের প্রতীক অত্যন্ত গভীর। সর্প কখনো গুপ্ত শক্তির প্রতীক, কখনো আদিম প্রাণশক্তির প্রতীক, কখনো রহস্যের প্রতীক এবং কখনো মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। দিব্য শব্দটি সেই সর্পসত্তাগুলির ঐশ্বরিক বা অতিমানবীয় প্রকৃতিকে প্রকাশ করে। ফলে অর্জুনের দর্শন কেবল প্রকাশ্য দেবশক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মহাজাগতিক অস্তিত্বের গভীর ও রহস্যময় শক্তিও সেই বিশ্বরূপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
এই শ্লোকের সবচেয়ে বড় দার্শনিক শিক্ষা হলো বহুত্বের মধ্যে ঐক্যকে দেখতে শেখা। মানুষের সাধারণ দৃষ্টি বিভাজন সৃষ্টি করে। আমরা বলি এটি দেবতা, এটি মানুষ, এটি প্রাণী, এটি প্রকৃতি, এটি জ্ঞান, এটি শক্তি। কিন্তু বিশ্বরূপের দৃষ্টিতে এই সমস্ত বিভাগ একটি বৃহত্তর সমগ্রতার অংশ। অদ্বৈত দর্শনের আলোকে বলা যায় যে অসংখ্য নাম ও রূপের অন্তরালে একটি পরম ঐক্য রয়েছে। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে জগৎ ও জীবকে ঈশ্বরের দেহের সঙ্গে তুলনা করা যায় এবং ঈশ্বরকে সেই সমগ্রতার অন্তর্নিহিত আত্মা হিসেবে দেখা যায়। আবার দ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতে জীব ও ঈশ্বরের পার্থক্য বজায় থাকলেও সমস্ত সত্তা পরমেশ্বরের অধীন এবং তাঁর বিশ্বরূপের মধ্যে অবস্থান করে। ভিন্ন ভিন্ন দর্শন ভিন্ন ভাষায় ব্যাখ্যা করলেও শ্লোকটি আমাদের অস্তিত্বের সম্পর্কিত ও সমগ্রতাময় প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর চিন্তার দিকে নিয়ে যায়।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের নিজের মধ্যেও অসংখ্য প্রবণতা কাজ করে। জ্ঞান আছে, ভয় আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, স্মৃতি আছে, সৃজনশীলতা আছে, শক্তি আছে এবং দুর্বলতাও আছে। সাধারণ অবস্থায় মানুষ নিজের সত্তাকে বিচ্ছিন্ন অংশে দেখে। কিন্তু গভীর আত্মজিজ্ঞাসার মুহূর্তে সে বুঝতে পারে যে তার অস্তিত্ব একটি জটিল সমগ্রতা। বিশ্বরূপকে তাই মানুষের অন্তর্জগতের একটি মহৎ প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। নিজের মধ্যে থাকা বিচিত্র শক্তি ও প্রবণতাকে অস্বীকার না করে তাদের বৃহত্তর সত্তার মধ্যে দেখতে শেখা আত্মজ্ঞানকে গভীর করতে পারে।
আধুনিক জীবনেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ বিশেষায়িত জ্ঞানের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানী বিজ্ঞানকে দেখেন, অর্থনীতিবিদ অর্থনীতিকে দেখেন, রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রকে দেখেন, শিল্পী সৌন্দর্যকে দেখেন এবং দার্শনিক সত্যকে অনুসন্ধান করেন। প্রত্যেকেই বাস্তবতার একটি অংশকে গভীরভাবে বুঝতে পারেন, কিন্তু অংশকে সম্পূর্ণ বাস্তবতা মনে করার বিপদও থাকে। গীতার বিশ্বরূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাস্তবতা অনেক বৃহত্তর। একটি মানুষকে বুঝতে হলে তার শুধু একটি পরিচয় দেখা যথেষ্ট নয়। একটি সমাজকে বুঝতে হলে শুধু অর্থনীতি দেখা যথেষ্ট নয়। একটি সভ্যতাকে বুঝতে হলে শুধু রাজনীতি দেখা যথেষ্ট নয়। সমগ্রকে দেখতে হলে বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে একসঙ্গে দেখতে হয়।
এই কারণেই পশ্যামি শব্দটি শ্লোকটির প্রাণ। অর্জুন শুধু শুনছেন না। তিনি দেখছেন। তাঁর দৃষ্টি সীমিত ব্যক্তি থেকে অসীম সমগ্রের দিকে প্রসারিত হয়েছে। তিনি দেখছেন দেবতা এবং জীবকে, সৃষ্টি এবং জ্ঞানকে, ব্রহ্মা এবং শিবকে, ঋষি এবং নাগকে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি তাদের সবাইকে একটি বিশ্বদেহের মধ্যে দেখছেন। এখানে বিশ্বরূপের মহিমা নিহিত। কৃষ্ণ কেবল একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নন, বরং সমগ্র অস্তিত্বকে ধারণকারী মহাজাগতিক সত্য হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছেন।
এই শ্লোককে একটি বিশাল বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বৃক্ষের পাতা যদি নিজের অস্তিত্বকে আলাদা বলে মনে করে তবে সে বৃক্ষের পূর্ণতাকে বুঝতে পারবে না। ফুল, পাতা, ফল, শাখা, কাণ্ড এবং মূল আলাদা হলেও তারা একটি বৃহত্তর জীবন্ত সমগ্রতার অংশ। তেমনই দেবতা, ঋষি, জীব, প্রকৃতি এবং বিভিন্ন মহাজাগতিক শক্তি পৃথক রূপে প্রকাশিত হলেও বিশ্বরূপের মধ্যে তারা একটি বৃহত্তর ঐক্যের অংশ। বহুত্ব তাই অস্বীকার করা হয় না। বরং বহুত্বকে একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে স্থাপন করা হয়।
গীতা ১১.১৫ তাই শুধু একটি অলৌকিক দর্শনের বিবরণ নয়। এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের একটি শিক্ষা। সাধারণ দৃষ্টি বিচ্ছিন্নতা দেখে। গভীর দৃষ্টি সম্পর্ক দেখে। সাধারণ চোখ রূপ দেখে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টি রূপের অন্তর্নিহিত ঐক্য উপলব্ধি করে। অর্জুনের দিব্যদৃষ্টি আসলে এই বৃহত্তর উপলব্ধির প্রতীক। তিনি বুঝতে শুরু করছেন যে যে জগতকে মানুষ অসংখ্য পৃথক সত্তার সমষ্টি বলে মনে করে, তা একটি বৃহত্তর মহাজাগতিক বাস্তবতার মধ্যে সংযুক্ত।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের ভাষাগত সৌন্দর্য তার দার্শনিক গভীরতার সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। পশ্যামি আমাদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধির কথা বলে। দেব আমাদের ঐশ্বরিক শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। ভূতবিশেষসঙ্ঘান্ আমাদের বহুবিধ জীবনের কথা বলে। ব্রহ্মা সৃষ্টির প্রতীক। ঈশ রূপান্তর ও মহাশক্তির প্রতীক। কমলাসন পবিত্র সৃষ্টির প্রতীক। ঋষি জ্ঞানের প্রতীক। উরগ গভীর ও গুপ্ত শক্তির প্রতীক। আর তব দেহে এই সমস্ত বিচিত্র প্রকাশকে একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে স্থাপন করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১১.১৫ এর গভীরতম শিক্ষা তাই এই যে অস্তিত্বকে কেবল খণ্ড খণ্ড করে দেখলে তার প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় না। অসংখ্য রূপের মধ্যে যে মহাসংহতি রয়েছে, সেই সংহতিকেই বিশ্বরূপের দর্শন প্রকাশ করে। অর্জুনের চোখে তখন দেবতা ও জীব, সৃষ্টি ও জ্ঞান, শক্তি ও রহস্য সবকিছু এক মহাজাগতিক দেহের মধ্যে উপস্থিত। সেই মুহূর্তে পশ্যামি শুধু একটি ক্রিয়াপদ থাকে না। তা হয়ে ওঠে মানুষের সীমিত দৃষ্টি থেকে অসীম সত্যের দিকে যাত্রার প্রতীক। বহুর মধ্যে এক এবং একের মধ্যে অসংখ্যকে দেখতে পাওয়াই এই শ্লোকের চূড়ান্ত সৌন্দর্য।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!