শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.১৭ — বিশ্বরূপের অনন্ত জ্যোতি
কিরীটিনং গদিনং চক্রিণং চ
তেজোরাশিং সর্বতো দীপ্তিমন্তম্।
পশ্যামি ত্বাং দুনিরীক্ষ্যং সমস্তা
দ্দীপ্তানলার্কদ্যুতিমপ্রমেয়ম্।।১৭।।
অনুবাদঃ কিরীট শোভিত, গদা ও চক্রধারী, সর্বত্র দীপ্তিমান, তেজঃপুঞ্জ- স্বরূপ, দুর্নিরীক্ষ্য, প্রদীপ্ত অগ্নি ও সূর্যের মতো প্রভাবিশিষ্ট এবং অপ্রমেয় স্বরূপ তোমাকে আমি সর্বত্রই দেখছি।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ে অর্জুন যখন শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করেন, তখন তাঁর পরিচিত জগতের সমস্ত সীমা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে যায়। এতদিন যাঁকে তিনি বন্ধু, সখা এবং পরামর্শদাতা হিসেবে চিনতেন, সেই কৃষ্ণের মধ্যেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন সমগ্র বিশ্বজগতের অসীম শক্তি, দীপ্তি, গতি এবং মহিমা। একাদশ অধ্যায়ের সপ্তদশ শ্লোক সেই মহাদর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এখানে অর্জুন বলছেন যে তিনি কৃষ্ণকে কিরীটধারী, গদাধারী এবং চক্রধারী রূপে দেখছেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁকে সর্বত্র দীপ্তিমান তেজের মহারাশি হিসেবে উপলব্ধি করছেন। তাঁর রূপ এমন প্রখর যে তার দিকে তাকানো কঠিন। সেই রূপ যেন প্রজ্বলিত অগ্নি এবং সূর্যের সম্মিলিত জ্যোতির মতো। অথচ এই অসীম দীপ্তিমান সত্তার কোনো সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এই কারণে শ্লোকটির শেষ শব্দ অপ্রমেয়ম্ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
কিরীটিনং শব্দটির অর্থ কিরীটধারী। কিরীট হলো রাজমুকুট বা মস্তকের রাজচিহ্ন। সংস্কৃত কিরীট শব্দের সঙ্গে ইন্ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে কিরীটিন্ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ যিনি কিরীট ধারণ করেন তিনি কিরীটিন্। এখানে কিরীট কেবল একটি অলংকার নয়। এটি কর্তৃত্ব, মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব এবং শাসনক্ষমতার প্রতীক। সাধারণ রাজা একটি রাজ্যের ওপর কর্তৃত্ব করেন। কিন্তু কৃষ্ণের বিশ্বরূপে কিরীট সেই সীমিত রাজকীয়তার প্রতীক নয়। এখানে কিরীট সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার ওপর পরম কর্তৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। অর্জুন উপলব্ধি করছেন যে তাঁর সামনে যে সত্তা প্রকাশিত হয়েছেন তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা সময়ের শাসক নন। তাঁর কর্তৃত্ব সমগ্র অস্তিত্বকে পরিব্যাপ্ত করে আছে।
এরপর এসেছে গদিনং শব্দটি। গদা শব্দের সঙ্গে ইন্ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গদিন্ শব্দের সৃষ্টি। গদিনং অর্থ গদাধারীকে। শ্রীকৃষ্ণের হাতে গদা শক্তি এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক। গদা এমন একটি অস্ত্র যা শক্তি, প্রতিরোধ এবং অন্যায় দমনের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বরূপের মধ্যে গদার উপস্থিতি তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ঈশ্বরীয় শক্তি শুধু সৃষ্টিশীল বা কোমল নয়। প্রয়োজন হলে সেই শক্তি অন্যায়কে প্রতিহত করে এবং বিশ্বব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের জীবনেও শক্তির প্রকৃত মূল্য তখনই প্রকাশিত হয় যখন তা ন্যায়ের রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। শক্তি যদি ন্যায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয় তবে তা ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। কিন্তু ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত শক্তি হয়ে ওঠে রক্ষাকবচ।
চক্রিণং শব্দটিও একইভাবে গভীর অর্থ বহন করে। চক্র শব্দের সঙ্গে ইন্ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে চক্রিণ্ এবং তার দ্বিতীয়া একবচন রূপ চক্রিণং হয়েছে। এর সরল অর্থ চক্রধারীকে। শ্রীকৃষ্ণের চক্র হলো সুদর্শন চক্র। কিন্তু বিশ্বরূপের প্রেক্ষাপটে চক্রকে কেবল একটি অস্ত্র হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। চক্রের মধ্যে সময়ের গতি, কালচক্র, সৃষ্টি ও বিনাশের ধারাবাহিকতা এবং নিয়তির গতিশীলতার প্রতীকী অর্থ নিহিত রয়েছে। চাকা যেমন ঘুরে ফিরে একই কেন্দ্রকে ঘিরে অগ্রসর হয়, তেমনি সময়ও এক মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্তে এগিয়ে চলে। জন্ম, বৃদ্ধি, পরিবর্তন, ক্ষয় এবং মৃত্যু এই কালচক্রেরই অংশ। কৃষ্ণের হাতে চক্র তাই কেবল যুদ্ধের অস্ত্র নয়। এটি মহাকালের প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যাত হতে পারে।
কিরীট, গদা এবং চক্র এই তিনটি প্রতীককে পাশাপাশি রাখলে কৃষ্ণের বিশ্বরূপের একটি সুন্দর ধারণা প্রকাশ পায়। কিরীট বোঝায় কর্তৃত্ব, গদা বোঝায় শক্তি এবং চক্র বোঝায় সময় ও নিয়তির গতি। অর্থাৎ যে সত্তার সামনে অর্জুন দাঁড়িয়ে আছেন তিনি একই সঙ্গে শাসনের অধিকারী, শক্তির আধার এবং কালচক্রের নিয়ন্তা। এই উপলব্ধি অর্জুনের কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর। কারণ তিনি এতদিন কৃষ্ণকে মানবিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দেখেছেন। এখন সেই পরিচিত মানুষের মধ্যেই তিনি মহাজাগতিক সত্যকে প্রত্যক্ষ করছেন।
এরপর শ্লোকে এসেছে তেজোরাশিং শব্দটি। এটি তেজঃ এবং রাশি এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। তেজঃ অর্থ দীপ্তি, আলো, শক্তি, ঔজ্জ্বল্য, প্রভাব এবং মহিমা। রাশি অর্থ বিপুল সমষ্টি, সঞ্চয় বা ভাণ্ডার। তাই তেজোরাশি অর্থ তেজের বিপুল সমষ্টি বা তেজের মহাভাণ্ডার। এখানে কৃষ্ণকে শুধু দীপ্তিমান বলা হয়নি। বলা হয়েছে তিনি তেজের রাশি। অর্থাৎ তাঁর মধ্যে আলো একটি বাহ্যিক গুণ নয়। তাঁর প্রকাশের মধ্যেই যেন অসংখ্য আলোর উৎস একত্রিত হয়েছে। এই ধারণা কৃষ্ণের বিশ্বরূপকে সাধারণ মানবিক রূপের সীমা থেকে মহাজাগতিক স্তরে উন্নীত করে।
সর্বতো শব্দের অর্থ সর্বদিক থেকে বা চারদিক দিয়ে। তার সঙ্গে দীপ্তিমন্তম্ শব্দটি যুক্ত হয়ে যে চিত্র তৈরি হয় তা অত্যন্ত শক্তিশালী। কৃষ্ণের দীপ্তি কোনো একটি দিক থেকে প্রকাশিত হচ্ছে না। তাঁর আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষকে আমরা একটি নির্দিষ্ট দিক থেকে দেখি। কিন্তু বিশ্বরূপের কোনো নির্দিষ্ট সামনে বা পেছন নেই। তাঁর প্রকাশ সর্বদিকে। এই সর্বব্যাপী দীপ্তি ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় পরম সত্তার সর্বব্যাপিত্বের ধারণাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
দীপ্তিমন্তম্ শব্দটি দীপ্তি এবং মতুপ্ প্রত্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীপ্তি যার মধ্যে আছে তিনি দীপ্তিমান। যেমন শক্তি যার আছে তিনি শক্তিমান এবং বুদ্ধি যার আছে তিনি বুদ্ধিমান। কিন্তু কৃষ্ণের দীপ্তি সাধারণ আলো নয়। এটি জ্ঞান, চেতনা, শক্তি এবং মহিমার সম্মিলিত প্রতীক। আলো অন্ধকার দূর করে। জ্ঞান অজ্ঞতা দূর করে। সত্য বিভ্রান্তি দূর করে। সেই অর্থে কৃষ্ণের দীপ্তি বাহ্যিক আলোর পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জ্ঞানেরও প্রতীক।
এরপর অর্জুন বলেন পশ্যামি ত্বাং। পশ্যামি অর্থ আমি দেখি এবং ত্বাং অর্থ তোমাকে। এখানে দেখা শব্দটির গুরুত্ব বিশেষ। অর্জুন সাধারণ চোখ দিয়ে কৃষ্ণের এই রূপ দেখছেন না। বিশ্বরূপ দর্শনের জন্য তিনি দিব্যদৃষ্টি লাভ করেছেন। তাই পশ্যামি শব্দটি শুধু চোখে দেখা নয়। এটি প্রত্যক্ষ উপলব্ধির অর্থ বহন করে। দর্শন ভারতীয় আধ্যাত্মিক পরিভাষায় কেবল কোনো দৃশ্য দেখা নয়। দর্শন মানে এমন এক উপলব্ধি যার মাধ্যমে দর্শক নিজেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। অর্জুনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। তিনি শুধু কৃষ্ণকে দেখছেন না। কৃষ্ণকে দেখে তাঁর নিজের বিশ্ববোধও পরিবর্তিত হচ্ছে।
দুনিরীক্ষ্যং শব্দটি এই অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ করে। দুর্ উপসর্গ সাধারণত কঠিন বা কষ্টসাধ্য অর্থ প্রকাশ করে এবং নিরীক্ষ্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দুর্নিরীক্ষ্য অর্থ দাঁড়ায় যাঁকে দেখা অত্যন্ত কঠিন। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ এত তীব্র এবং ব্যাপক যে সাধারণ মানুষের সীমিত দৃষ্টি তাকে সহজে ধারণ করতে পারে না। এর মধ্যে একটি গভীর দার্শনিক সত্য রয়েছে। সীমিত ইন্দ্রিয় দিয়ে অসীম বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করা সম্ভব নয়। মানুষ যতই দেখুক না কেন তার দেখার একটি সীমা থাকে। কিন্তু বিশ্বরূপ সেই সীমাকে অতিক্রম করে যায়।
সমন্তাত্ শব্দের অর্থ চারদিকে বা সর্বত্র। সর্বতো এবং সমন্তাত্ একসঙ্গে ব্যবহারের ফলে সর্বব্যাপিত্বের ধারণাটি আরও প্রবল হয়েছে। অর্জুন যেন এমন এক দৃশ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে কোনো দিকেই তাকালে বিশ্বরূপের বাইরে যাওয়া যায় না। সামনে কৃষ্ণ, পেছনে কৃষ্ণ, উপরে কৃষ্ণ এবং নিচেও কৃষ্ণ। এই অভিজ্ঞতা ঈশ্বরের সর্বব্যাপী উপস্থিতির একটি শক্তিশালী প্রতীক। মানুষ সাধারণত ঈশ্বরকে কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা মন্দিরের মধ্যে কল্পনা করতে অভ্যস্ত। কিন্তু বিশ্বরূপ সেই সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে দেয়। এখানে সমগ্র বিশ্বই ঈশ্বরের প্রকাশের ক্ষেত্র।
এরপর আসে শ্লোকটির সবচেয়ে চিত্রময় অংশ দীপ্তানলার্কদ্যুতিম্। এই যৌগিক পদে দীপ্ত, অনল, অর্ক এবং দ্যুতি শব্দের সমন্বয় রয়েছে। অনল অর্থ অগ্নি। অর্ক অর্থ সূর্য। দ্যুতি অর্থ দীপ্তি বা আলো। ফলে দীপ্তানলার্কদ্যুতিম্ অর্থ প্রজ্বলিত অগ্নি এবং সূর্যের মতো দীপ্তিমান। অর্জুন যে দৃশ্য দেখছেন তা সাধারণ আলোর সঙ্গে তুলনা করার মতো নয়। তিনি এমন এক মহাজ্যোতি দেখছেন যেখানে অগ্নির প্রখরতা এবং সূর্যের অসীম প্রকাশশক্তি একত্রিত হয়েছে।
অগ্নি ভারতীয় সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। অগ্নি শুধু তাপ বা আলো দেয় না। অগ্নি রূপান্তরের প্রতীক। যজ্ঞে অগ্নি আহুতি গ্রহণ করে এবং তাকে অন্য এক স্তরে পৌঁছে দেয়। একই সঙ্গে অগ্নি সংহার ও শুদ্ধির প্রতীক। অন্যদিকে সূর্য জ্ঞান, জীবন, প্রকাশ এবং চেতনার প্রতীক। সূর্য উদিত হলে অন্ধকার দূর হয়। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিও সূর্য থেকে আসে। তাই কৃষ্ণের বিশ্বরূপকে অগ্নি ও সূর্যের দীপ্তির সঙ্গে তুলনা করার অর্থ হলো তাঁর মধ্যে রূপান্তরের শক্তি এবং প্রকাশের শক্তি একই সঙ্গে বিদ্যমান।
শ্লোকটির শেষ শব্দ অপ্রমেয়ম্। এটি সমগ্র শ্লোকের দার্শনিক চূড়ান্ত বিন্দু। অপ্রমেয় শব্দটি অ এবং প্রমেয় এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। অ অর্থ নয় এবং প্রমেয় অর্থ যা প্রমাণ, জ্ঞান বা নির্ণয়ের দ্বারা উপলব্ধ কিংবা পরিমাপযোগ্য। তাই অপ্রমেয় অর্থ যা সীমিত মাপকাঠিতে সম্পূর্ণভাবে নির্ণয় বা পরিমাপ করা যায় না। বাংলায় এর অর্থ অপরিমেয়, অসীম, সীমাহীন বা অনির্ণেয়।
অপ্রমেয় শব্দটিকে শুধু অসীম বললে এর গভীরতা পুরোপুরি প্রকাশ পায় না। অসীম বলতে আমরা সাধারণত এমন কোনো কিছুকে বুঝি যার শেষ নেই। কিন্তু অপ্রমেয়ের অর্থ আরও গভীর। এটি এমন বাস্তবতাকে বোঝায় যা মানুষের সীমিত জ্ঞান, ইন্দ্রিয় এবং বুদ্ধির কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না। অর্থাৎ কৃষ্ণের বিশ্বরূপ শুধু বিশাল নয়। তিনি এমন এক বাস্তবতা যাঁকে কোনো সীমিত ধারণার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ করা যায় না।
এই কারণেই শ্লোকটির মধ্যে একটি অসাধারণ দার্শনিক বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে। অর্জুন কৃষ্ণকে দেখছেন অথচ তাঁকে সম্পূর্ণভাবে মাপতে পারছেন না। তিনি প্রত্যক্ষ করছেন অথচ সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারছেন না। তিনি সামনে উপস্থিত একটি রূপ দেখছেন অথচ সেই রূপের সীমা খুঁজে পাচ্ছেন না। এই বৈপরীত্য ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে প্রকাশ করে। পরম সত্যকে উপলব্ধি করা সম্ভব হলেও তাকে সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ ধারণার মধ্যে বন্দী করা সম্ভব নয়।
ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। অর্জুন কৃষ্ণকে তাঁর বন্ধু হিসেবে জানতেন। কিন্তু বিশ্বরূপ দর্শনের পর সেই পরিচিতির মধ্যে নতুন অর্থ জন্ম নেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে যাঁকে তিনি এতদিন সখা বলে সম্বোধন করেছেন তিনিই অসীম বিশ্বশক্তির আধার। ব্যক্তিগত ঈশ্বর এবং মহাজাগতিক ঈশ্বর এখানে একই সত্তার দুই প্রকাশ হিসেবে সামনে আসে। এই উপলব্ধি থেকে জন্ম নেয় বিস্ময়, শ্রদ্ধা এবং ভক্তি। ভালোবাসার পরিচিত সম্পর্কের সঙ্গে মহিমার অনুভূতি যুক্ত হয়।
অদ্বৈত দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। বহুরূপী বিশ্ব এবং এক পরম সত্যের সম্পর্ক এখানে ভাবা যায়। কিরীট, গদা, চক্র, অগ্নি, সূর্য এবং অসংখ্য দীপ্তিমান রূপ শেষ পর্যন্ত একটি মহাসত্তার বিভিন্ন প্রকাশ। বহুত্বের মধ্যে ঐক্য এবং দৃশ্যমান রূপের মধ্যে অদৃশ্য পরম সত্যের প্রকাশ এই বিশ্বরূপের অন্যতম দার্শনিক শিক্ষা।
মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের ছোট ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে বিচার করে। একটি ব্যর্থতা তাকে মনে করায় তার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। একটি সাফল্য তাকে মনে করায় সে সবকিছু অর্জন করে ফেলেছে। কিন্তু বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখা গেলে বোঝা যায় ব্যক্তিগত জীবন একটি বিশাল ব্যবস্থার ক্ষুদ্র অংশ। অর্জুনও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক এবং বন্ধুদের দেখেই সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছিলেন। কৃষ্ণ তাঁকে বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে তাকাতে শেখাচ্ছেন। বিশ্বরূপ দর্শন সেই বৃহত্তর দৃষ্টির চূড়ান্ত প্রকাশ।
এই শ্লোকের প্রতিটি শব্দ যেন একটি করে দরজা খুলে দেয়। কিরীটিনং আমাদের নিয়ে যায় কর্তৃত্বের দিকে। গদিনং নিয়ে যায় শক্তির দিকে। চক্রিণং নিয়ে যায় সময় ও নিয়তির দিকে। তেজোরাশি নিয়ে যায় মহাজাগতিক শক্তির দিকে। দীপ্তিমান নিয়ে যায় আলোর দিকে। দুনিরীক্ষ্যং আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের সীমাবদ্ধতার কথা। দীপ্তানলার্কদ্যুতি আমাদের সামনে তুলে ধরে অগ্নি ও সূর্যের মহাজ্যোতি। আর অপ্রমেয়ম্ আমাদের নিয়ে যায় সেই সীমার কাছে যেখানে মানুষের পরিমাপ শেষ হয়ে যায় এবং অসীমের অনুভব শুরু হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই শ্লোক তাই কেবল কৃষ্ণের একটি অলৌকিক রূপের বর্ণনা নয়। এটি মানুষের দৃষ্টির সীমা এবং মহাবিশ্বের অসীমতার মধ্যে একটি গভীর সংলাপ। অর্জুনের চোখে এখানে কৃষ্ণ আর কেবল একজন ব্যক্তি নন। তিনি রাজমুকুটে সার্বভৌম, গদায় শক্তিমান, চক্রে কালময়, তেজে মহাজাগতিক, অগ্নিতে রূপান্তরশীল, সূর্যে প্রকাশমান এবং অপ্রমেয়তায় সীমাহীন।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোকের মূল শিক্ষা হলো মানুষ যত গভীরভাবে সত্যকে দেখতে শেখে, ততই সে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে শেখে। বিশ্বরূপের মহিমা শুধু তার অসংখ্য রূপে নয়, তার অপ্রমেয়তায়। তাকে দেখা যায়, অনুভব করা যায় এবং তার সামনে বিস্ময়ে নত হওয়া যায়। কিন্তু কোনো সীমিত ধারণা দিয়ে তাকে সম্পূর্ণভাবে মাপা যায় না। কিরীটিনং গদিনং চক্রিণং চ থেকে অপ্রমেয়ম্ পর্যন্ত শ্লোকটির যাত্রা তাই বাহ্যিক রূপ থেকে অন্তর্নিহিত অসীমতার দিকে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা। এখানে কৃষ্ণের বিশ্বরূপ একই সঙ্গে শক্তি, আলো, সময়, জ্ঞান, সৃষ্টি, সংহার এবং অসীম সত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আর অর্জুনের দর্শনের মধ্য দিয়ে মানবচেতনার সামনে উন্মুক্ত হয়েছে সেই চিরন্তন সত্য যে দৃশ্যমান জগতের সীমার ওপারেও এক অপরিমেয় বাস্তবতা বিরাজমান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!