সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.১৮ — পরম অক্ষর ও সনাতন পুরুষ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্। ত্বমব্যয়ঃ শাশ্বতধর্মগোপ্তাসনাতনস্ত্বং পুর…
ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং 
ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্। 
ত্বমব্যয়ঃ শাশ্বতধর্মগোপ্তা
সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতো মে।।১৮।।

অনুবাদঃ তুমি পরম ব্রহ্ম এবং একমাত্র জ্ঞাতব্য। তুমি বিশ্বের পরম আশ্রয়। তুমি অব্যয়, সনাতন ধর্মের রক্ষক এবং সনাতন পরম পুরুষ। এই আমার অভিমত।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের অষ্টাদশ শ্লোকটি বিশ্বরূপদর্শনের ধারাবাহিকতায় অর্জুনের উপলব্ধির এক অসাধারণ প্রকাশ। বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুন আর কৃষ্ণকে কেবল তাঁর পরিচিত সখা, রথের সারথি কিংবা যাদববংশীয় এক মহাপুরুষ হিসেবে দেখতে পারছেন না। তাঁর চোখের সামনে যে অসীম বিশ্বসত্তা প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে তিনি উপলব্ধি করছেন এমন এক পরম বাস্তবতাকে, যা একই সঙ্গে অবিনশ্বর, সর্বোচ্চ জ্ঞাতব্য, সমগ্র বিশ্বজগতের পরম আশ্রয়, ক্ষয়হীন, চিরন্তন ধর্মের রক্ষক এবং সনাতন পুরুষ। তাই এই শ্লোকটি কেবল কৃষ্ণের প্রশংসা নয়। এটি আসলে বিশ্বরূপদর্শনের পর অর্জুনের দার্শনিক উপলব্ধির একটি গভীর ঘোষণা।

শ্লোকটির শুরুতেই অর্জুন বলেন, “ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং”। এখানে “ত্বম্” শব্দের অর্থ আপনিই বা তুমি। এই সর্বনামটির পুনরাবৃত্তি শ্লোকটির ভাবকে বিশেষভাবে গভীর করেছে। অর্জুন যেন তাঁর উপলব্ধির প্রতিটি স্তরে ফিরে এসে বলছেন, আপনিই সেই সত্য। আপনিই অক্ষর। আপনিই পরম জ্ঞাতব্য। আপনিই বিশ্বজগতের আশ্রয়। আপনিই অব্যয়। আপনিই শাশ্বত ধর্মের রক্ষক। আপনিই সনাতন পুরুষ। অর্থাৎ পুরো শ্লোকের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃষ্ণের সর্বাত্মক সত্তা।

“অক্ষর” শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। সংস্কৃত “অক্ষর” শব্দটি সাধারণত “অ” এবং “ক্ষর” এই দুই অংশের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। “ক্ষর” শব্দের মধ্যে ক্ষয় হওয়া, ঝরে পড়া, পরিবর্তিত হওয়া বা বিলীন হওয়ার ধারণা রয়েছে। তার সঙ্গে নিষেধাত্মক “অ” যুক্ত হলে অর্থ দাঁড়ায় যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা বিনষ্ট হয় না, যা পরিবর্তনের দ্বারা শেষ হয়ে যায় না। তাই অক্ষর মানে অবিনশ্বর। কিন্তু গীতার দর্শনে অক্ষরের অর্থ কেবল দীর্ঘকাল টিকে থাকা কোনো বস্তু নয়। এটি এমন এক বাস্তবতার দিকে নির্দেশ করে যা সময়, পরিবর্তন ও ধ্বংসের সাধারণ নিয়মের অতীত।

বিশ্বরূপের মধ্যে অর্জুন দেখছেন অসংখ্য জীবের জন্ম, বিকাশ ও বিলয়। তিনি দেখছেন সৃষ্টি ও ধ্বংসের অবিরাম প্রবাহ। এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেই তিনি উপলব্ধি করছেন এমন একটি সত্যকে, যা নিজে পরিবর্তনের অধীন নয়। তাই কৃষ্ণ তাঁর কাছে অক্ষর। পৃথিবীর সমস্ত দৃশ্যমান রূপ পরিবর্তিত হতে পারে। শরীর পরিবর্তিত হয়। সমাজ পরিবর্তিত হয়। সভ্যতা পরিবর্তিত হয়। ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তিত হয়। মানুষের পরিচয় পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই সমস্ত পরিবর্তনের অন্তরালে যে পরম সত্য স্থিতিশীল থাকে, অর্জুন সেই সত্যকেই কৃষ্ণের মধ্যে প্রত্যক্ষ করছেন।

এর পরেই এসেছে “পরমং বেদিতব্যম্”। “পরম” অর্থ সর্বোচ্চ, শ্রেষ্ঠ বা চূড়ান্ত। “বেদিতব্য” শব্দটি জ্ঞান বা জানা সম্পর্কিত সংস্কৃত “বিদ্” ধাতুর সঙ্গে যুক্ত। “বিদ্” অর্থ জানা বা জ্ঞান লাভ করা। “বেদিতব্য” অর্থ যা জানা উচিত বা যা জ্ঞাতব্য। ফলে “অক্ষরং পরমং বেদিতব্যম্” এর অর্থ দাঁড়ায়, আপনিই সেই অবিনশ্বর পরম সত্য যাকে জানা উচিত। এখানে জ্ঞান বলতে কেবল কোনো তথ্য বা তাত্ত্বিক ধারণা বোঝানো হয় না। এখানে জ্ঞান হলো পরম বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা।

মানুষ পৃথিবীতে অসংখ্য বিষয় জানে। বিজ্ঞান জানে। ইতিহাস জানে। প্রকৃতির নিয়ম জানে। সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে। কিন্তু গীতার প্রশ্ন আরও গভীর। এই সমস্ত জ্ঞানের অন্তিম লক্ষ্য কী। যা পরিবর্তিত হচ্ছে তার প্রকৃতি জানা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিবর্তনের অন্তরালে থাকা সত্যকে জানা। তাই কৃষ্ণকে এখানে পরম বেদিতব্য বলা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁকে জানা মানে অস্তিত্বের গভীরতম সত্যকে জানার দিকে অগ্রসর হওয়া।

এর পর অর্জুন বলেন, “ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্”। এখানে “অস্য বিশ্বস্য” অর্থ এই সমগ্র বিশ্বের। “বিশ্ব” শব্দের মধ্যে সমগ্র জগত, সর্বব্যাপী সৃষ্টিসত্তা এবং সমস্ত অস্তিত্বের ধারণা রয়েছে। আর “নিধান” শব্দের অর্থ ভাণ্ডার, সংরক্ষণস্থল, আশ্রয় বা আধার। শব্দটির মধ্যে এমন একটি স্থানের ধারণা রয়েছে যেখানে কোনো কিছু রাখা বা নিহিত থাকে। সেই অর্থে “পরং নিধানম্” মানে পরম আশ্রয় বা সর্বোচ্চ আধার।

এই বক্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। কৃষ্ণ কেবল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একজন অংশ নন। তিনি বিশ্বজগতের পরম আশ্রয়। অর্থাৎ বিশ্ব তাঁর উপর নির্ভরশীল। জগতের অসংখ্য রূপ তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। এখানে ঈশ্বরকে কেবল আকাশের দূরে অবস্থানকারী কোনো অতিমানবীয় সত্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং সমস্ত অস্তিত্বের ভিতরকার ভিত্তি হিসেবে উপলব্ধি করা হচ্ছে। বিশ্ব তাঁর মধ্যে অবস্থান করছে এবং তাঁর অস্তিত্বের উপর নির্ভর করছে। এই উপলব্ধিই “পরং নিধানম্” ধারণাটিকে গভীর করে তোলে।

এরপর আসে “ত্বমব্যয়ঃ”। “অব্যয়” অর্থ যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা হ্রাস পায় না, যার কোনো নিঃশেষ ঘটে না। “অক্ষর” এবং “অব্যয়” শব্দ দুটি কাছাকাছি অর্থ বহন করলেও তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। অক্ষর শব্দটি বিশেষভাবে বিনাশহীনতার ধারণাকে সামনে আনে। অব্যয় শব্দটি ক্ষয়হীনতা ও অক্ষয় পূর্ণতার ধারণাকে প্রকাশ করে। অর্জুন যেন একই সত্যকে দুটি দিক থেকে দেখছেন। কৃষ্ণ শুধু ধ্বংসের অতীত নন, তিনি এমন এক পূর্ণতা যার কোনো ক্ষয় ঘটে না।

এরপর আসে শ্লোকটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ “শাশ্বতধর্মগোপ্তা”। এটি একটি সমাসবদ্ধ শব্দ। “শাশ্বত” অর্থ চিরন্তন বা কালাতীত। “ধর্ম” শব্দটি সংস্কৃত “ধৃ” ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ ধারণ করা বা ধরে রাখা। তাই ধর্মের গভীর অর্থ কেবল কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় বা আচার নয়। ধর্ম হলো এমন নীতি যা ব্যক্তি, সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থাকে ধারণ করে। এর মধ্যে কর্তব্য, ন্যায়, নৈতিকতা, বিশ্বশৃঙ্খলা এবং অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত নিয়মের ধারণা রয়েছে। “গোপ্তা” অর্থ রক্ষক বা সংরক্ষক। ফলে “শাশ্বতধর্মগোপ্তা” অর্থ শাশ্বত ধর্মের রক্ষক।

এই শব্দের মধ্যে গীতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শন নিহিত রয়েছে। ধর্ম কেবল মানুষের তৈরি সাময়িক সামাজিক নিয়ম নয়। ধর্মের একটি গভীর অস্তিত্বগত ভিত্তি রয়েছে। যখন অধর্ম বৃদ্ধি পায় এবং ন্যায় ও শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হয়, তখন ঈশ্বরীয় শক্তি ধর্মকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে। এই ভাবনা গীতার অবতারতত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কৃষ্ণ তাই শুধু ধর্মের কথা বলছেন না। তিনি নিজেকে ধর্মের রক্ষক হিসেবে প্রকাশ করছেন। বিশ্বরূপের মধ্যে অর্জুন সেই মহাজাগতিক ধর্মরক্ষার শক্তিকেও প্রত্যক্ষ করছেন।

“সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতো মে” শ্লোকটির শেষ অংশ। “সনাতন” অর্থ চিরন্তন, অনাদি এবং কালাতীত। “পুরুষ” শব্দটি এখানে আধুনিক বাংলায় প্রচলিত পুরুষ বা নারী বিরোধী অর্থে গ্রহণ করলে শ্লোকটির প্রকৃত দর্শন হারিয়ে যায়। ভারতীয় দর্শনে পুরুষ একটি অত্যন্ত গভীর পরিভাষা। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ চৈতন্যের প্রতীক এবং প্রকৃতি পরিবর্তনশীলতার প্রতীক। উপনিষদীয় ও গীতার বৃহত্তর পরিসরে পুরুষ শব্দটি মহাজাগতিক চৈতন্য, পরম সত্তা বা বিশ্বব্যাপী চেতন বাস্তবতার ধারণা বহন করে।

অর্জুন যখন বলেন “সনাতন পুরুষ”, তখন তিনি এমন এক পরম চৈতন্যসত্তার কথা বলছেন যিনি সময়ের সীমায় আবদ্ধ নন। তাঁর কোনো সাময়িক সূচনা নেই এবং কোনো ধ্বংসের মাধ্যমে তাঁর অস্তিত্ব শেষ হয় না। বিশ্বজগতের অসংখ্য রূপ পরিবর্তিত হলেও সেই পরম সত্তা চিরন্তন। এই কারণেই “সনাতন” এবং “অক্ষর” ধারণা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

শ্লোকের শেষে “মতো মে” শব্দবন্ধটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ আমার মতে বা আমার উপলব্ধিতে। এখানে অর্জুন কোনো বই পড়ে তাত্ত্বিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি। তিনি বিশ্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর সামনে এমন এক মহাজাগতিক বাস্তবতা প্রকাশিত হয়েছে যা তাঁর পূর্ববর্তী সমস্ত ধারণাকে অতিক্রম করেছে। তাই তাঁর এই ঘোষণা প্রত্যক্ষ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত। তিনি বলছেন, আমার উপলব্ধিতে আপনিই সেই সনাতন পুরুষ।

দার্শনিকভাবে দেখলে এই শ্লোকের মধ্যে অস্তিত্ব, জ্ঞান, নৈতিকতা এবং চেতনা এই চারটি স্তর একত্রিত হয়েছে। “অক্ষর” প্রকাশ করছে অবিনশ্বর অস্তিত্বের ধারণা। “বেদিতব্য” প্রকাশ করছে পরম জ্ঞানের লক্ষ্য। “পরং নিধানম্” প্রকাশ করছে বিশ্বজগতের চূড়ান্ত আশ্রয়ের ধারণা। “শাশ্বতধর্মগোপ্তা” প্রকাশ করছে নৈতিক ও মহাজাগতিক শৃঙ্খলার রক্ষকের ধারণা। আর “সনাতন পুরুষ” প্রকাশ করছে চিরন্তন চৈতন্যসত্তার ধারণা। এই চারটি স্তর একত্রে কৃষ্ণের বিশ্বরূপের একটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক পরিচয় নির্মাণ করে।

অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোককে দেখলে অক্ষর ও পরম সত্যের ধারণা ব্রহ্মতত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়। পরিবর্তনশীল নাম ও রূপের অন্তরালে রয়েছে অপরিবর্তনীয় পরম সত্য। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর সর্বোচ্চ ব্যক্তিসম্পন্ন পরম সত্তা এবং বিশ্ব ও জীব তাঁর উপর নির্ভরশীল বাস্তবতা। এই দৃষ্টিতে “পরং নিধানম্” বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বৈত দর্শনে কৃষ্ণ সর্বোচ্চ স্বাধীন ঈশ্বর এবং জীব ও জগত তাঁর উপর নির্ভরশীল। তাই বিভিন্ন বেদান্তীয় ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট। এই শ্লোকে কৃষ্ণকে সাধারণ সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত কোনো সীমিত সত্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তাঁকে পরম বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।

সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটির নির্মাণ অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে অর্জুন কৃষ্ণকে অক্ষর বলেন। তারপর তাঁকে পরম জ্ঞাতব্য বলেন। এরপর তাঁকে বিশ্বজগতের পরম আশ্রয় হিসেবে চিহ্নিত করেন। তারপর তাঁকে অব্যয় বলেন। এরপর শাশ্বত ধর্মের রক্ষক হিসেবে দেখেন। সবশেষে তাঁকে সনাতন পুরুষ বলে ঘোষণা করেন। অর্থাৎ বক্তব্যটি ধীরে ধীরে গভীরতর হয়। একজন পরিচিত ব্যক্তিকে সম্বোধন দিয়ে শুরু হয়ে তা শেষ হয় মহাজাগতিক পরম সত্যের উপলব্ধিতে।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের জীবন পরিবর্তনের ধারায় আবদ্ধ। শরীর পরিবর্তিত হয়। চিন্তা পরিবর্তিত হয়। সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়। সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়। সম্পদ আসে এবং চলে যায়। ক্ষমতা আসে এবং বিলীন হয়। সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং একদিন ইতিহাসে পরিণত হয়। এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যে “অক্ষর” ধারণা মানুষকে এমন একটি সত্যের সন্ধান করতে আহ্বান জানায় যা পরিবর্তনের বাইরে। “নিধান” মানুষকে প্রশ্ন করে তার প্রকৃত আশ্রয় কোথায়। “ধর্মগোপ্তা” মনে করিয়ে দেয় যে ন্যায় ও সত্য রক্ষা করা কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, মানবজীবনের গভীর দায়িত্ব। আর “সনাতন পুরুষ” মানুষকে তার চৈতন্যের প্রকৃতি নিয়ে ভাবতে আহ্বান জানায়।

একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। সমুদ্রের উপর অসংখ্য ঢেউ সৃষ্টি হয় এবং বিলীন হয়ে যায়। প্রতিটি ঢেউয়ের নিজস্ব আকার আছে। কোনো ঢেউ বড়, কোনোটি ছোট। কোনোটি কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়, কোনোটি মুহূর্তেই ভেঙে যায়। কিন্তু ঢেউয়ের এই পরিবর্তনের মধ্যেও সমুদ্র তার অস্তিত্ব ধরে রাখে। এই উপমায় পরিবর্তনশীল ঢেউকে বিশ্বজগতের পরিবর্তনশীল রূপের সঙ্গে এবং সমুদ্রকে পরম আশ্রয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। অবশ্যই এটি কেবল একটি উপমা। গীতার পরম তত্ত্বকে আক্ষরিকভাবে সমুদ্রের সঙ্গে অভিন্ন করা নয়।

আধুনিক মানুষের জীবনেও এই শ্লোকের তাৎপর্য গভীর। আজ মানুষ তথ্যের অভাবে নয়, বরং অতিরিক্ত তথ্যের মধ্যে বাস করছে। আমরা অনেক কিছু জানি, কিন্তু সব জানা আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। আমরা জানি কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয় এবং কীভাবে সামাজিক সাফল্য অর্জন করতে হয়। কিন্তু আমরা প্রায়ই ভুলে যাই কেন বাঁচছি, সত্যিকার আশ্রয় কোথায় এবং জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী। “বেদিতব্য” শব্দটি তাই আজও আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে। অসংখ্য বিষয় জানার পরে আমরা কি সেই সত্যকে জানতে চাই, যার জ্ঞান আমাদের সমস্ত জ্ঞানকে অর্থপূর্ণ করে তোলে।

সবশেষে বলা যায়, গীতা ১১.১৮ মূলত অর্জুনের এক গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ভাষা। বিশ্বরূপ দর্শনের পর তিনি উপলব্ধি করেছেন যে কৃষ্ণ কেবল তাঁর পরিচিত জগতের একজন ব্যক্তি নন। তিনি সেই অক্ষর সত্য, যিনি ক্ষয় ও বিনাশের অতীত। তিনি সেই পরম সত্য, যাকে জানা মানুষের জ্ঞানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে। তিনি সমগ্র বিশ্বজগতের পরম আশ্রয়। তিনি অব্যয়, অর্থাৎ যার কোনো ক্ষয় নেই। তিনি শাশ্বত ধর্মের রক্ষক। তিনি সনাতন পুরুষ, চিরন্তন চৈতন্যসত্তা। এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো পরিবর্তনশীল পৃথিবীর মধ্যে থেকেও মানুষ যেন অপরিবর্তনীয় সত্যের সন্ধান করে, বাহ্যিক আশ্রয়ের পরিবর্তে পরম আশ্রয়কে উপলব্ধি করে এবং নিজের জীবনকে শাশ্বত ধর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। বিশ্বরূপের বিস্ময়ের মধ্যে অর্জুন যে সত্যটি দেখেছিলেন, এই শ্লোক সেই সত্যেরই সংক্ষিপ্ত ভাষ্য। সেই সত্য হলো অক্ষর, পরম, অব্যয়, সনাতন এবং সর্বজগতের অন্তর্নিহিত পরম পুরুষ।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 21, 2026 August 21, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি