সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.২ — সৃষ্টি ও লয়ের মহাতত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ভবাপ্যয়ৌ হি ভুতানাং শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া।ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্।।২।।
ভবাপ্যয়ৌ হি ভুতানাং শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া।
ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্।।২।।

অনুবাদঃ হে পদ্ধপলাশলোশন! সর্বভূতের উৎপত্তি ও প্রলয় তোমার থেকেই হয় এবং তোমার কাছ থেকেই আমি তোমার অব্যয় মাহাত্ম্য অবগত হলাম।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের দ্বিতীয় শ্লোকটি অর্জুনের অন্তর্জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুহূর্তকে প্রকাশ করে। কৃষ্ণের কাছ থেকে পরম সত্য, জীবের প্রকৃতি, সৃষ্টি ও লয়ের রহস্য এবং ঈশ্বরের মহিমা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করার পর অর্জুনের মোহ অনেকটাই দূর হয়েছে। তিনি এখন আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ নন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত সংকট অতিক্রম করে মহাজাগতিক সত্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই শ্লোকে তিনি কৃষ্ণকে উদ্দেশ করে বলেন, হে কমলপত্রাক্ষ, তোমার কাছ থেকে আমি সমস্ত জীবের সৃষ্টি ও লয়ের কথা বিস্তারিতভাবে শুনেছি এবং তোমার অবিনশ্বর মহিমার কথাও শুনেছি। এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে সৃষ্টি, বিলয়, জ্ঞান, শ্রবণ, ঈশ্বরের মহিমা এবং চিরন্তন সত্যের এক গভীর দর্শন একসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।

শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ভবাপ্যয়ৌ। শব্দটি ভব এবং অপ্যয় এই দুটি ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। ভব শব্দের মূল সম্পর্ক সংস্কৃত ভূ ধাতুর সঙ্গে, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা, উৎপন্ন হওয়া বা প্রকাশিত হওয়া। অন্যদিকে অপ্যয় বলতে বোঝায় ক্ষয়, বিলয়, অন্তর্ধান বা পূর্বাবস্থায় প্রত্যাবর্তন। তাই ভবাপ্যয়ৌ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো সৃষ্টি ও লয়, উৎপত্তি ও বিলয়, প্রকাশ ও প্রত্যাবর্তন। এখানে অর্জুন কেবল মানুষের জন্ম ও মৃত্যুর কথা বলছেন না। তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের আবির্ভাব ও বিলয়ের কথা স্মরণ করছেন। যা প্রকাশিত হয়েছে তা একসময় অপ্রকাশিত হয়। যা জন্ম নিয়েছে তা একসময় বিলীন হয়। প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্যমান রূপ পরিবর্তনের অধীন। এই পরিবর্তনই ভবাপ্যয়ের মূল সত্য।

এর পর রয়েছে ভূতানাম শব্দটি। ভূত শব্দের সঙ্গেও ভূ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। ভূত বলতে অস্তিত্ব লাভ করা সত্তা বা সৃষ্ট জীবকে বোঝায়। ভূতানাম অর্থ সকল জীবের বা সমস্ত সৃষ্ট সত্তার। ফলে ভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানাম অর্থ দাঁড়ায় সমস্ত জীব ও সৃষ্ট সত্তার উৎপত্তি এবং লয়। গীতার দৃষ্টিতে সৃষ্টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি বৃহত্তর মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার অংশ। জীবন প্রকাশিত হয়, বিকশিত হয়, পরিবর্তিত হয় এবং একসময় তার দৃশ্যমান রূপ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সেই লয়কে সম্পূর্ণ শূন্যতা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। ভারতীয় দর্শনের বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে লয় অনেক সময় প্রকাশিত অবস্থা থেকে অপ্রকাশিত অবস্থায় প্রত্যাবর্তনের ধারণা বহন করে।

অর্জুন এরপর বলেন শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া। শ্রুত শব্দটির উৎস সংস্কৃত শ্রু ধাতু, যার অর্থ শোনা। ময়া অর্থ আমার দ্বারা বা আমি। বিস্তরশঃ অর্থ বিস্তারিতভাবে বা বিস্তৃতভাবে। অর্থাৎ অর্জুন নিজের জ্ঞানকে নিজের আবিষ্কার হিসেবে দাবি করছেন না। তিনি স্পষ্টভাবে বলছেন যে কৃষ্ণের কাছ থেকে তিনি এই জ্ঞান শুনেছেন। এই শ্রবণ ভারতীয় আধ্যাত্মিক শিক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শ্রবণ মানে শুধু কানে কোনো কথা পৌঁছানো নয়। সত্যকে মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করা, বিচার করা, চিন্তা করা এবং শেষ পর্যন্ত উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হওয়াই প্রকৃত শ্রবণ। অর্জুন কৃষ্ণের কথা শুনেছেন, প্রশ্ন করেছেন, সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং উত্তর গ্রহণ করে নিজের উপলব্ধিকে গভীর করেছেন। তাই এই শ্লোকের মধ্যে জ্ঞান লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথও প্রকাশিত হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে ত্বত্তঃ শব্দটির তাৎপর্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ত্বত্তঃ অর্থ তোমার কাছ থেকে। অর্জুন বলছেন যে তিনি এই জ্ঞান কৃষ্ণের কাছ থেকেই শুনেছেন। এর মধ্যে একজন সত্যসন্ধানী শিষ্যের বিনয় প্রকাশিত হয়েছে। জ্ঞানের পথে অহংকার একটি বড় বাধা। যে ব্যক্তি মনে করে সে সবকিছু জানে, তার কাছে নতুন সত্যের দরজা অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়। অর্জুন সেই অবস্থায় নেই। তিনি জানেন যে তাঁর নিজের সীমিত দৃষ্টির বাইরে আরও গভীর সত্য রয়েছে। তাই তিনি কৃষ্ণের কাছ থেকে শুনছেন এবং সেই জ্ঞান গ্রহণ করছেন। এই শ্রবণ আসলে আত্মসমর্পণ নয়, বরং সত্যের সামনে নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করার একটি পরিণত মানসিকতা।

এরপর আসে শ্লোকটির সবচেয়ে সুন্দর সম্বোধন কমলপত্রাক্ষ। কমল অর্থ পদ্ম, পত্র অর্থ পাতা এবং অক্ষ অর্থ চোখ। কমলপত্রাক্ষ অর্থ যাঁর চোখ পদ্মপত্রের মতো। কৃষ্ণের জন্য এই সম্বোধন শুধু শারীরিক সৌন্দর্যের কাব্যিক প্রশংসা নয়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে পদ্ম একটি গভীর প্রতীক। পদ্ম জলের মধ্যে জন্মায়, কিন্তু তার সৌন্দর্য ও নির্মলতা জলের কাদামাটির সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে যায় না। এই কারণে পদ্মকে নির্মলতা, সৌন্দর্য, বিচ্ছিন্নতা এবং অনাসক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কৃষ্ণকে কমলপত্রাক্ষ বলে সম্বোধন করার মধ্যে তাই তাঁর কোমলতা ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি এক নির্মল ও উচ্চতর দৃষ্টির প্রতীকী ইঙ্গিতও রয়েছে।

শ্লোকটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো মহাত্ম্যম্। মহাত্ম্য শব্দটি মহা এবং আত্মা এই দুটি ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। মহা অর্থ মহান বা বিশাল এবং আত্মা অর্থ অন্তঃসত্তা বা আত্মস্বরূপ। মহাত্ম্য বলতে তাই মহত্ত্ব, মহিমা, গৌরব এবং অসীম শ্রেষ্ঠত্ব বোঝানো হয়। এখানে অর্জুন কৃষ্ণের সাধারণ ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত গুণের প্রশংসা করছেন না। তিনি কৃষ্ণের এমন এক মহিমার কথা বলছেন যা জগতের সীমিত মাপকাঠিতে পরিমাপ করা যায় না। কৃষ্ণের মহাত্ম্য তাঁর ঐশ্বরিক স্বরূপের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মধ্যে এমন এক পরম সত্যের প্রকাশ রয়েছে যা সমস্ত সৃষ্টির উৎস ও আশ্রয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই মহাত্ম্যকে আরও গভীর করে তোলে অব্যয় শব্দটি। অব্যয় অর্থ যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, যা নিঃশেষ হয় না, যার মহিমা কমে না। শব্দটির গঠনেও এর অর্থ নিহিত রয়েছে। অ অর্থ না এবং ব্যয় অর্থ ক্ষয় বা নিঃশেষ। তাই অব্যয় অর্থ অক্ষয় বা অবিনশ্বর। এখানে একটি অসাধারণ দার্শনিক বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে। জীব ও জগতের ভবাপ্যয় রয়েছে, কিন্তু কৃষ্ণের মহাত্ম্য অব্যয়। অর্থাৎ প্রকাশিত জগতের রূপ পরিবর্তনশীল হলেও পরম সত্যের মহিমা ক্ষয়শীল নয়। জগতের দৃশ্যমান রূপ আসে এবং চলে যায়, কিন্তু সেই চিরন্তন সত্যের মূল্য ও মহিমা কোনো পরিবর্তনের দ্বারা ক্ষুণ্ণ হয় না।

এই জায়গাতেই শ্লোকটি গভীর দার্শনিক অর্থ লাভ করে। মানুষের চোখে জীবন অনেক সময় শুরু এবং শেষের একটি সরল রেখা বলে মনে হয়। জন্ম হলো শুরু এবং মৃত্যু হলো শেষ। কিন্তু গীতার দৃষ্টিতে অস্তিত্বকে এত সরলভাবে দেখা হয় না। সৃষ্টি ও লয় একটি বৃহত্তর চক্রের অংশ। যেমন একটি বীজ থেকে গাছ জন্মায়, গাছ থেকে ফুল ও ফল আসে এবং ফলের মধ্যে আবার নতুন বীজের সম্ভাবনা থাকে, তেমনই প্রকাশ ও বিলয়ের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। তাই ভবাপ্যয় ধ্বংসের দর্শন নয়, বরং পরিবর্তনের দর্শন। এটি মানুষকে শেখায় যে কোনো দৃশ্যমান অবস্থা চিরস্থায়ী নয়।

মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই সত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শৈশব চলে যায়, কৈশোর আসে, যৌবন আসে এবং আবার পরিবর্তিত হয়। সম্পর্কের রূপ বদলায়। সমাজ বদলায়। সভ্যতা বদলায়। মানুষের চিন্তা বদলায়। রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলায়। প্রযুক্তি বদলায়। একটি প্রজন্ম চলে যায় এবং আরেকটি প্রজন্ম তার জায়গা নেয়। কিন্তু মানুষ প্রায়ই এই পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারে না। সে স্থায়ীভাবে পরিচিত কোনো অবস্থাকে ধরে রাখতে চায়। তখন পরিবর্তন তার কাছে ভয় ও দুঃখের কারণ হয়ে ওঠে। ভবাপ্যয়ের শিক্ষা হলো পরিবর্তন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। পরিবর্তনই প্রকাশিত অস্তিত্বের স্বাভাবিক নিয়ম।

এই উপলব্ধি মানুষের মানসিক জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সুখ স্থায়ী নয়, দুঃখও স্থায়ী নয়। সাফল্য চিরদিন একই অবস্থায় থাকে না, ব্যর্থতাও চিরকাল একইভাবে থাকে না। যে পরিস্থিতিকে আজ অপরিবর্তনীয় মনে হচ্ছে, সময়ের প্রবাহে সেটিও পরিবর্তিত হতে পারে। ভবাপ্যয় তাই মানুষকে একদিকে অহংকার থেকে এবং অন্যদিকে অতিরিক্ত হতাশা থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। কারণ যা পেয়েছি তা পরিবর্তিত হতে পারে এবং যা হারিয়েছি তার পরেও জীবনের নতুন প্রকাশ সম্ভব।

এই শ্লোকের মধ্যে শ্রবণের যে গুরুত্ব রয়েছে, সেটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্জুন প্রথমে শুনেছেন। তারপর তিনি বুঝেছেন। তারপর তাঁর মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে দেখার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এই ধারাটি একাদশ অধ্যায়ের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্জুন শুধু তত্ত্ব শুনে সন্তুষ্ট থাকেননি। তিনি কৃষ্ণের বিশ্বরূপ প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন। অর্থাৎ জ্ঞান তাঁর কাছে কেবল ধারণা হয়ে থাকেনি। জ্ঞান তাঁর মধ্যে দর্শনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। এই কারণেই এই শ্লোককে শ্রবণ থেকে দর্শনের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে দেখা যায়।

দার্শনিকভাবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। যে জগতকে আমরা প্রতিদিন দেখি, তার সবকিছু যদি পরিবর্তনশীল হয়, তবে সেই পরিবর্তনের অন্তরালে কি কোনো অপরিবর্তনীয় সত্য রয়েছে। গীতার উত্তর এই অনুসন্ধানকে পরম সত্যের দিকে পরিচালিত করে। মানুষের শরীর পরিবর্তনশীল, কিন্তু আত্মার ধারণা পরিবর্তনশীল নয়। প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনশীল, কিন্তু তার অন্তরালে যে পরম বাস্তবতার কথা গীতা বলে তা অব্যয়। এই কারণে ভবাপ্যয় এবং অব্যয় শব্দ দুটি একসঙ্গে বসে জগত ও পরম সত্যের পার্থক্যকে গভীরভাবে প্রকাশ করেছে।

সাহিত্যিক দিক থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর। প্রথমে আসে ভবাপ্যয়ৌ, অর্থাৎ সৃষ্টি ও লয়ের বিশাল মহাজাগতিক ধারণা। তারপর আসে ভূতানাম, অর্থাৎ সমস্ত জীবের কথা। এরপর অর্জুন বলেন তিনি তা বিস্তারিতভাবে শুনেছেন। তারপর হঠাৎ ভাষা কোমল হয়ে ওঠে। তিনি কৃষ্ণকে বলেন কমলপত্রাক্ষ। শেষ পর্যন্ত তিনি পৌঁছান অব্যয় মহাত্ম্যের ধারণায়। যেন শ্লোকটি পরিবর্তনশীল জগত থেকে অপরিবর্তনীয় সত্যের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ভাষাগত বিন্যাসের মধ্যেই শ্লোকটির দার্শনিক যাত্রা নিহিত।

প্রতীকী অর্থে ভব হলো প্রকাশ এবং সম্ভাবনার প্রতীক। অপ্যয় হলো প্রত্যাবর্তন ও বিলয়ের প্রতীক। কমলপত্রাক্ষ হলো নির্মল দৃষ্টির প্রতীক। মহাত্ম্য হলো অসীম মহত্ত্বের প্রতীক এবং অব্যয় হলো চিরন্তনতার প্রতীক। এই প্রতীকগুলোকে একত্র করলে শ্লোকটি মানুষের সামনে একটি গভীর আধ্যাত্মিক পথ খুলে দেয়। মানুষ প্রথমে জগতের পরিবর্তনকে দেখে। তারপর পরিবর্তনের প্রকৃতি বোঝে। এরপর সেই পরিবর্তনের অন্তরালে থাকা স্থায়ী সত্যের সন্ধান করে। এই অনুসন্ধানই ধীরে ধীরে তাকে আত্মজ্ঞান ও ঈশ্বরজিজ্ঞাসার দিকে নিয়ে যায়।

অর্জুনের অবস্থাটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর সামনে ছিল ভয়াবহ দায়িত্ব, সম্পর্কের সংকট এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব। কিন্তু কৃষ্ণের শিক্ষা তাঁর দৃষ্টিকে ব্যক্তিগত সংকটের বাইরে নিয়ে গেছে। তিনি এখন নিজের দুঃখকে বৃহত্তর অস্তিত্বের প্রেক্ষাপটে দেখতে শুরু করেছেন। এটাই জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জ্ঞান সবসময় সমস্যাকে সরিয়ে দেয় না, কিন্তু সমস্যাকে দেখার দৃষ্টিকে পরিবর্তন করে। অর্জুনের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই ঘটছে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। মানুষ পরিবর্তনকে থামাতে পারে না। জন্মকে থামাতে পারে না, লয়কে থামাতে পারে না, সময়কে থামাতে পারে না। কিন্তু সে পরিবর্তনের অর্থ বুঝতে পারে। সে জানতে পারে কোনটি ক্ষণস্থায়ী এবং কোনটি চিরন্তন। সে বুঝতে পারে যে জীবনের দৃশ্যমান রূপ পরিবর্তিত হলেও সত্যের অনুসন্ধান কখনো পুরোনো হয় না। এই উপলব্ধিই তাকে বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যে থেকেও অন্তরের স্থিরতা অর্জনের পথে নিয়ে যেতে পারে।

সুতরাং ভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানাং শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্ শুধু একটি শ্লোক নয়। এটি পরিবর্তনশীল জগত এবং অবিনশ্বর সত্যের মধ্যকার সম্পর্কের একটি সংক্ষিপ্ত দার্শনিক ঘোষণা। এখানে সৃষ্টি আছে, লয় আছে, শ্রবণ আছে, জ্ঞান আছে, সৌন্দর্য আছে, ঈশ্বরের মহিমা আছে এবং সর্বোপরি আছে চিরন্তনতার অনুসন্ধান। অর্জুনের কণ্ঠে উচ্চারিত এই বক্তব্য আমাদেরও একটি গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। জীবনের সব দৃশ্যমান রূপ পরিবর্তিত হবে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে মানুষ অবিনশ্বর সত্যের সন্ধান করে, তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে বাহ্যিক জগতের সীমা অতিক্রম করে অন্তরের গভীর বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যায়। এই কারণেই গীতার এই শ্লোকটি শুধু কৃষ্ণের মহিমা প্রকাশ করে না, মানুষের আত্মজিজ্ঞাসারও এক অনন্ত আহ্বান হয়ে ওঠে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 21, 2026 August 21, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি