সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১১.৭ — বিশ্বরূপে সমগ্র জগতের ঐক্য

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্।মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি।।৭।।
ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্।
মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি।।৭।।

অনুবাদঃ হে অর্জুন! আমার এই বিরাট শরীরে একত্রে অবস্থিত সমগ্র স্থাবর-জঙ্গমাত্মক বিশ্ব এবং অন্য যা কিছু দেখতে ইচ্ছা কর, তা এক্ষণে দর্শন কর।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোক বিশ্বরূপদর্শনের এক গভীরতম দ্বার উন্মুক্ত করে। এর আগে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর অসংখ্য ঐশ্বরিক প্রকাশের কথা বলেছেন। এখন তিনি এমন এক দর্শনের প্রস্তুতি দিচ্ছেন যেখানে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হওয়া সমগ্র জগত এক মহাসত্তার মধ্যে একত্রে প্রত্যক্ষ হবে। শ্লোকটি হলো “ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্। মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি।” এর সহজ অর্থ হলো, হে গুড়াকেশ, আজ আমার এই দেহের মধ্যে একই স্থানে সমগ্র সচরাচর জগতকে দেখো এবং তুমি যা কিছু অন্যভাবে দেখতে ইচ্ছা করছ তাও এখানে দেখতে পারো। এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু একটি অলৌকিক দৃশ্যের ঘোষণা নেই। এর মধ্যে রয়েছে অস্তিত্বের ঐক্য, বহুত্বের রহস্য, মানুষের সীমিত দৃষ্টির অতিক্রম এবং পরম সত্যের প্রত্যক্ষ উপলব্ধির এক গভীর দর্শন।

“ইহৈকস্থম্” শব্দটির দিকে তাকালে শ্লোকটির প্রথম রহস্যটি প্রকাশ পায়। “ইহ” অর্থ এখানে এবং “একস্থ” অর্থ একই স্থানে অবস্থিত বা একত্র অবস্থানকারী। “একস্থ” শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত স্থা ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে যার অর্থ দাঁড়ানো, অবস্থান করা বা প্রতিষ্ঠিত থাকা। ফলে “ইহৈকস্থম্” বলতে বোঝায় এখানে একই স্থানে অবস্থিত। কিন্তু কৃষ্ণের বক্তব্য কোনো সাধারণ স্থানগত অবস্থান বোঝায় না। তিনি এমন এক মহাজাগতিক অবস্থার কথা বলছেন যেখানে অসংখ্য পৃথক অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে একত্রিত হয়ে আছে। মানুষের চোখে পৃথিবী বিচ্ছিন্ন। মানুষ আলাদা, প্রাণী আলাদা, নদী আলাদা, পর্বত আলাদা, নক্ষত্র আলাদা এবং অসংখ্য জীবনের মধ্যে যেন অসংখ্য দূরত্ব। কিন্তু বিশ্বরূপের দৃষ্টিতে এই বিচ্ছিন্নতার অন্তরালে একটি গভীর ঐক্য প্রকাশিত হয়।

এরপর আসে “জগৎ” শব্দটি। সংস্কৃত জগৎ শব্দের সঙ্গে গম ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। গম অর্থ যাওয়া বা গমন করা। যে অস্তিত্ব ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে, এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যাচ্ছে এবং স্থির না থেকে প্রবাহিত হচ্ছে তাকে জগৎ বলা হয়। তাই জগৎ কেবল পৃথিবী নয়। এটি সমগ্র পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের প্রতীক। জন্ম থেকে মৃত্যু, সৃষ্টি থেকে বিনাশ, উত্থান থেকে পতন এবং পরিবর্তন থেকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে বিশ্ব প্রবাহিত হচ্ছে সেটিই জগৎ। এই কারণে জগৎ শব্দের মধ্যে পরিবর্তনশীলতার একটি গভীর দার্শনিক ধারণা নিহিত আছে।

“কৃৎস্নম্” শব্দটি এই অর্থকে আরও বিস্তৃত করেছে। কৃৎস্ন অর্থ সম্পূর্ণ, সমগ্র, কোনো অংশ বাদ না দিয়ে সবকিছু। তাই “জগৎ কৃৎস্নম্” অর্থ সমগ্র জগৎ। কৃষ্ণ এখানে পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল, কয়েকজন মানুষ কিংবা কয়েকটি জীবের কথা বলছেন না। তিনি বলছেন সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে দেখতে। এই সমগ্রতার ধারণাই বিশ্বরূপের মূল শক্তি। মানুষের দৃষ্টি সাধারণত খণ্ডিত। আমরা কোনো ঘটনার একটি অংশ দেখি এবং সেটিকেই সম্পূর্ণ সত্য মনে করি। কিন্তু ঈশ্বরীয় দৃষ্টি সম্পূর্ণতাকে দেখতে শেখায়। যে মানুষ শুধু একটি পাতা দেখে সে বৃক্ষকে সম্পূর্ণভাবে জানে না। যে মানুষ শুধু একটি ঘটনা দেখে সে ইতিহাসকে বুঝতে পারে না। একইভাবে যে মানুষ নিজের জীবনের ক্ষুদ্র পরিসরেই বাস্তবতাকে সীমাবদ্ধ রাখে সে অস্তিত্বের বৃহত্তর সত্য উপলব্ধি করতে পারে না।

“সচরাচরম্” শব্দটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চর অর্থ যা চলে এবং অচর অর্থ যা চলে না। চর এবং অচরকে একত্র করলে বোঝায় চলমান ও অচল সবকিছু। অর্থাৎ জীবজগৎ এবং জড়জগৎ, মানুষ ও পশু, বৃক্ষ ও পর্বত, নদী ও ভূমি, দৃশ্যমান এবং স্থিতিশীল সবকিছুকে নিয়ে সমগ্র সৃষ্টি। এই একটি শব্দের মাধ্যমে কৃষ্ণ যেন অস্তিত্বের কোনো অংশকেই বাদ রাখছেন না। আমরা সাধারণত জীবিত ও জড়, সচল ও স্থির, মানুষ ও প্রকৃতি, নিজের এবং অন্যের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করি। কিন্তু বিশ্বরূপের দৃষ্টিতে এই সমস্ত পার্থক্য বৃহত্তর একতার মধ্যে অবস্থান করছে।

এই শ্লোকের সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দগুলোর একটি হলো “পশ্য”। এর উৎস সংস্কৃত দৃশ্ ধাতু। অর্থ দেখা বা দর্শন করা। কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন “পশ্য” অর্থাৎ দেখো। এখানে শুধু বিশ্বাস করতে বলা হয়নি। কোনো তত্ত্ব মুখস্থ করতে বলা হয়নি। কোনো দর্শন কেবল বুদ্ধির মাধ্যমে গ্রহণ করতে বলা হয়নি। বলা হয়েছে প্রত্যক্ষ করো। ভারতীয় আধ্যাত্মিক চিন্তায় দর্শনের গুরুত্ব এখানেই। সত্যকে কেবল শোনা বা পড়া যথেষ্ট নয়। সত্যকে উপলব্ধি করতে হয়। একটি নদীর কথা শতবার শোনা এবং নিজের চোখে নদী দেখা এক বিষয় নয়। তেমনি ঈশ্বরের সর্বব্যাপী অস্তিত্ব সম্পর্কে তত্ত্ব জানা এবং সেই ঐক্যকে অন্তরের গভীরে উপলব্ধি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

“অদ্য” শব্দের অর্থ আজ বা এখন। কৃষ্ণ বলছেন আজই দেখো। এই আজ কোনো সাধারণ দিনের নির্দেশ নয়। এটি অর্জুনের জীবনের এক অনন্য আধ্যাত্মিক মুহূর্ত। দীর্ঘ সংশয়, দ্বিধা ও মানসিক সংকটের পর তার সামনে এমন এক সত্য উন্মোচিত হতে চলেছে যা তার পূর্ববর্তী দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করবে। একজন মানুষের জীবনেও এমন মুহূর্ত আসে যখন পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গি আর যথেষ্ট মনে হয় না। তখন তাকে নতুন চোখে জীবনকে দেখতে হয়। কৃষ্ণের “অদ্য” যেন সেই জাগরণের মুহূর্তের প্রতীক।

এরপর আসে “মম দেহে” অর্থাৎ আমার দেহে। এই অংশটি শ্লোকটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বক্তব্য। সাধারণ দেহের মধ্যে কীভাবে সমগ্র বিশ্ব থাকতে পারে এই প্রশ্ন স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে কৃষ্ণের দেহ কোনো সীমাবদ্ধ মানবদেহের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এটি বিশ্বরূপের দেহ। এটি এমন এক মহাজাগতিক দেহ যার মধ্যে সমস্ত সৃষ্টি প্রকাশিত। কৃষ্ণের ব্যক্তিগত রূপ এখানে মহাজাগতিক রূপে বিস্তৃত হয়ে যায়। তাঁর দেহের মধ্যে স্থান সংকুচিত হয়ে অসীমতার প্রতীক হয়ে ওঠে। একটি সীমিত বলে মনে হওয়া রূপের মধ্যে অসীম অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। এখানেই বিশ্বরূপদর্শনের মহিমা।

কৃষ্ণ অর্জুনকে “গুড়াকেশ” নামে সম্বোধন করেছেন। গুড়াকেশ অর্জুনের একটি বিশেষ নাম। প্রচলিত ব্যাখ্যায় গুড়াকা অর্থ নিদ্রা এবং ঈশ অর্থ অধিপতি বা প্রভু। অর্থাৎ গুড়াকেশ হলেন যিনি নিদ্রাকে জয় করেছেন। এই নামের মধ্যেও গভীর প্রতীক রয়েছে। নিদ্রা এখানে শুধু শারীরিক ঘুম নয়। আধ্যাত্মিক অর্থে অজ্ঞানতাও এক ধরনের নিদ্রা। মানুষ যখন নিজের প্রকৃত স্বরূপ, নিজের কর্তব্য এবং অস্তিত্বের গভীর সত্য সম্পর্কে অচেতন থাকে তখন সে যেন অজ্ঞতার ঘুমে নিমগ্ন থাকে। কৃষ্ণ অর্জুনকে গুড়াকেশ বলে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে সে জাগ্রত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। বাহ্যিক চোখ দিয়ে বিশ্বকে দেখা এক বিষয় এবং জাগ্রত চেতনা দিয়ে বিশ্বকে দেখা আরেক বিষয়।

“যচ্চান্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি” অংশটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে বলা হচ্ছে তুমি যা কিছু অন্যভাবে দেখতে ইচ্ছা করছ তাও এখানে দেখতে পারো। কৃষ্ণ যেন অর্জুনের সমস্ত অনুসন্ধানকে একটি বৃহত্তর সত্যের মধ্যে স্থান দিচ্ছেন। মানুষের মনে অসংখ্য প্রশ্ন থাকে। সে জানতে চায় পৃথিবীর প্রকৃতি কী, জীবনের উদ্দেশ্য কী, ঈশ্বর কোথায়, মৃত্যুর পরে কী আছে, মানুষ কেন দুঃখ পায় এবং তার কর্তব্য কী। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ সেই অনুসন্ধানকে একটি সর্বাঙ্গীন দৃষ্টির মধ্যে নিয়ে আসে। যেন বলা হচ্ছে, তুমি যে সত্য খুঁজছ তার বিচ্ছিন্ন অংশগুলিকে আলাদা আলাদাভাবে অনুসরণ না করে সমগ্র অস্তিত্বের ঐক্যের মধ্যে তাকে প্রত্যক্ষ করো।

দার্শনিকভাবে এই শ্লোকের কেন্দ্রে রয়েছে একের মধ্যে বহুর প্রকাশ এবং বহুর মধ্যে একের উপস্থিতি। পৃথিবীতে আমরা অসংখ্য নাম ও রূপ দেখি। কিন্তু এই বহুত্বের অন্তরালে একটি গভীর ঐক্য রয়েছে। সমুদ্রের অসংখ্য ঢেউয়ের মতো মানুষ ও জীবজগতের অসংখ্য প্রকাশ পৃথক বলে মনে হলেও তাদের অস্তিত্ব বৃহত্তর সমুদ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঢেউয়ের আকার আলাদা হতে পারে, গতি আলাদা হতে পারে এবং স্থায়িত্ব আলাদা হতে পারে। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত উপাদান একই জল। বিশ্বরূপের ধারণাও তেমন। নাম আলাদা, রূপ আলাদা, জীবন আলাদা, কিন্তু সবকিছু একটি বৃহত্তর মহাজাগতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে এই শ্লোকের মধ্যে বহুত্বের অন্তরালে এক পরম সত্যের ধারণা দেখা যায়। নাম ও রূপের পার্থক্য বাস্তবতার বহিরঙ্গ প্রকাশকে নির্দেশ করে। কিন্তু সেই বহুত্বের গভীরে একত্বের সন্ধান করা হয়। ভক্তির দৃষ্টিতে আবার কৃষ্ণ এখানে সর্বব্যাপী ঈশ্বরীয় সত্তার প্রকাশ। ভক্ত উপলব্ধি করে যে ঈশ্বর কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সীমিত প্রকাশের মধ্যে আবদ্ধ নন। তিনি সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে বিরাজমান। অন্যদিকে সাংখ্যের আলোকে দেখলে প্রকৃতির বহুবিধ প্রকাশের মধ্যেও একটি বৃহত্তর তত্ত্বের অনুসন্ধান স্পষ্ট হয়। গীতার নিজস্ব দার্শনিক পরিসরে এই সমস্ত দৃষ্টিকে অতিক্রম করে কৃষ্ণের বিশ্বরূপ একটি সমন্বিত মহাজাগতিক দর্শন নির্মাণ করে।

সাহিত্যিক দিক থেকেও এই শ্লোক অসাধারণ। একটি দেহের মধ্যে সমগ্র জগতকে দেখার কল্পনা মানুষের কল্পনাশক্তিকে সীমা অতিক্রম করতে বাধ্য করে। এখানে স্থান যেন আর স্থান থাকে না। একটি রূপের মধ্যে অসংখ্য রূপ, একটি দেহের মধ্যে সমগ্র সৃষ্টি এবং একটি দৃশ্যের মধ্যে সমগ্র অস্তিত্ব প্রকাশিত হতে চলেছে। ভারতীয় সাহিত্যে মহাজাগতিক চিত্রকল্পের এটি এক অনন্য উদাহরণ। পরবর্তী শ্লোকগুলিতে এই ধারণাই আরও বিস্ময়কর রূপ লাভ করবে এবং অর্জুন যে দর্শনের সম্মুখীন হবেন তা তার মানবিক দৃষ্টির সমস্ত সীমাকে অতিক্রম করবে।

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। অর্জুনের সংকটের একটি বড় কারণ ছিল তার সীমিত দৃষ্টি। সে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের আত্মীয়, শিক্ষক, বন্ধু এবং পরিচিত মানুষদের দেখছিল। সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের আবেগ তার কর্তব্যবোধকে আচ্ছন্ন করেছিল। কৃষ্ণ তার দৃষ্টিকে ব্যক্তিগত পরিসর থেকে মহাজাগতিক পরিসরে নিয়ে যেতে চাইছেন। মানুষ যখন কোনো সমস্যাকে খুব কাছ থেকে দেখে তখন কখনো কখনো সমস্যাটিই তার কাছে সমগ্র পৃথিবী হয়ে ওঠে। কিন্তু দৃষ্টির পরিসর বাড়লে সমস্যাটির অর্থও বদলে যায়। বিশ্বরূপদর্শন তাই শুধু একটি অলৌকিক ঘটনা নয়। এটি দৃষ্টির রূপান্তর।

এই শিক্ষার সঙ্গে আধুনিক জীবনেও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আজ মানুষ প্রযুক্তি, অর্থনীতি, পরিবেশ, রাজনীতি এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে অভূতপূর্বভাবে যুক্ত। একটি দেশের সিদ্ধান্ত অন্য দেশের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি অঞ্চলের পরিবেশগত সংকট বহু দূরের মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। একটি ব্যক্তির কাজ তার পরিবার, সমাজ এবং বৃহত্তর পরিবেশে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এই আন্তঃসম্পর্কের বাস্তবতা আমাদের শেখায় যে আমরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সত্তা নই। গীতার বিশ্বরূপদর্শন এই আন্তঃসম্পর্ককে আরও গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ দেয়।

এই শ্লোককে একটি বৃক্ষের উপমায় বোঝা যায়। একটি বিশাল বৃক্ষের শিকড় মাটির গভীরে, কাণ্ড এক স্থানে এবং শাখা অসংখ্য দিকে বিস্তৃত। পাতাগুলো একে অপরের থেকে আলাদা মনে হয়। ফুল ও ফলও পৃথক। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের জীবন একই বৃক্ষের সঙ্গে যুক্ত। যদি একটি পাতা নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করে তবে সে বৃক্ষের প্রকৃত সত্য বুঝতে পারবে না। একইভাবে মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সত্তা মনে করলে অস্তিত্বের বৃহত্তর সম্পর্ককে উপলব্ধি করতে পারে না। বিশ্বরূপ আমাদের সেই বৃহত্তর বৃক্ষকে দেখতে শেখায় যার অসংখ্য প্রকাশ আমরা নিজের চারপাশে দেখি।

এই শ্লোকের আরেকটি গভীর শিক্ষা হলো দৃষ্টির পরিবর্তন। বাস্তবতা কখনো কখনো আমাদের দৃষ্টির চেয়ে অনেক বড়। আমরা যে অংশটুকু দেখি সেটিকে সম্পূর্ণ সত্য মনে করি। কিন্তু কৃষ্ণ অর্জুনকে সেই সীমা অতিক্রম করতে বলছেন। মানুষের চোখ সীমিত হতে পারে। মানুষের বুদ্ধি সীমিত হতে পারে। মানুষের অভিজ্ঞতাও সীমিত। কিন্তু সত্যের পরিসর সীমাহীন। তাই আধ্যাত্মিক জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নিজের সীমিত দৃষ্টিকে স্বীকার করে বৃহত্তর সত্যের দিকে উন্মুক্ত হওয়া।

সবশেষে বলা যায়, “ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্” কেবল বিশ্বরূপদর্শনের একটি ঘোষণা নয়। এটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির এক মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান। “ইহৈকস্থম্” আমাদের শেখায় এক স্থানে বহুর সমাবেশ দেখতে। “জগৎ” আমাদের পরিবর্তনশীল অস্তিত্বের কথা স্মরণ করায়। “কৃৎস্নম্” আমাদের খণ্ড নয়, সম্পূর্ণতাকে দেখতে শেখায়। “সচরাচরম্” চলমান ও অচল সমস্ত অস্তিত্বকে একই মহাসমগ্রের অংশ হিসেবে উপলব্ধি করায়। “পশ্য” আমাদের বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির দিকে আহ্বান জানায়। “মম দেহে” প্রকাশ করে সেই মহাজাগতিক দেহের ধারণা যার মধ্যে সমগ্র সৃষ্টি একত্রিত। আর “গুড়াকেশ” স্মরণ করিয়ে দেয় যে সত্যকে দেখতে হলে শুধু চোখ খোলা যথেষ্ট নয়, চেতনাকেও জাগ্রত করতে হয়। এই কারণেই গীতার একাদশ অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোক মানুষের সামনে এক গভীর সত্য উন্মোচন করে। আমরা যে বহুবিধ জগতের মধ্যে বাস করি তার অন্তরে রয়েছে এক গভীর ঐক্য। আর সেই ঐক্যকে যখন সত্যিকার অর্থে দেখা যায় তখন মানুষ শুধু পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখে না, নিজেকেও নতুনভাবে চিনতে শুরু করে।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 21, 2026 August 21, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি